• রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২২ চৈত্র ১৪২৬  |   ৩৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ধারাবাহিক গল্প : এক পলকের একটু দেখায় (১১তম পর্ব)

  সাবিকুন নাহার নিপা

০৭ জানুয়ারি ২০২০, ১৩:১৬
গল্প
ছবি : প্রতীকী

সিসিলিয়া আর সৈকতের বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। দু’জনকে একসঙ্গে দেখে অনন্যা অবাক হয়ে গেল। বিস্মিত গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা দুজন কি একসঙ্গে ছিলে লিয়া?’
সিসিলিয়া অপ্রস্তুত হয়ে বলল, না তো! রাস্তায় দেখা হয়ে গেল।
অনন্যার চোখ মুখ দেখে সিসিলিয়া বুঝতে পারলো ওর কথা বিশ্বাস করেনি। তাই আর কথা বাড়ালো না। 

অনন্যাকে কেন যে মিথ্যে বলল সেটা কিছুতেই ভাবনায় আসছে না সৈকতের। সত্যি বললে কি হতো! সৈকতের মন আজ হালকা লাগছে। সিসিলিয়া সব জানে তাই আর কোনো ভয় নেই। ওকে দেখে মনে হয়না যে তাওসিফের সামনাসামনি হলে ইমোশনাল হয়ে যাবে। বরং প্র‍্যাকটিকাল মনে হয়েছে যেটা একটা পজিটিভ দিক। এখন তাওসিফকে ওর পরিবারের সামনে আনতে হবে। আর সত্যিটাও জানাতে হবে। 

সৈকত রহমান সাহেবের ঘরের দরজায় কড়া নাড়তেই রহমান সাহেব বলল, ‘আয়।’
সৈকত ভিতরে ঢুকে দাঁড়িয়ে রইলো। রহমান সাহেব পেপার পড়ছিলেন মনোযোগ দিয়ে। পেপার পড়া শেষে বলল, ‘তাওসিফ কি বাড়ির ঠিকানা পেয়ে গেছে?’
- এখনও পায়নি তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
রহমান সাহেব পা উঠিয়ে বিছানায় বসে সৈকত কে বসতে বলল। তারপর জিজ্ঞেস করলো, ‘তোর কি মনে হয় তাওসিফ খুঁজে পাবে?’
সৈকত আমতা আমতা করে বলল, আমি কি করে বলবো?
- আরে গাধা অনুমান করে বল। 
সৈকত একটু ভয়ে ভয়ে বলল, ‘মনে হয় পেয়ে যাবে।’
রহমান সাহেব নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, ‘আমারও মনে হয় পেয়ে যাবে। ওর সেন্স অফ হিউমার ভালো। ছোটটার মতো গাধা হয়নি।’
সৈকত কিছু বলল না। রহমান সাহেব চিন্তিত গলায় বললেন, ‘আমার ভয় শুধু লিয়াকে নিয়ে।’
- কিন্তু উনি তো সব জানেন। ওনার যথেষ্ট সাহস আছে বলে মনে হলো। 
রহমান সাহেব নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তাওসিফকে আমি ভালো করে চিনি সৈকত। তোর কি মনে হয় আমার উপর কি কারণে ওর এতো রাগ?
সৈকত কিছু বলল না। রহমান সাহেব বলল, ‘তাওসিফের সমস্যা হলো ও কোনো কিছু ভোলেনা। সব মনে রাখে। কলেজে পড়াকালীন প্রেম টাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেছিলাম বলে আমার উপর আজও ওর ক্ষোভ। যখন জানবে ওর মা গলায় দড়ি দিয়েছে তখন কি আমাদের কাউকে ছেড়ে দেবে? লিয়াকে ছাড়বে!’
শেষের কথাগুলো বলে রহমান সাহেব ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিতে শুরু করলেন। সৈকত চিন্তিত গলায় বলল, ‘আপনি এতো ভাববেন না খালুজান। আমি আপনার সাথে আছি।’
রহমান সাহেব নিজেকে ধাতস্থ করে বলল, ‘তোমার খালা কিছু সম্পত্তি রেখে গেছেন তোমার জন্য। এখন সময় এসেছে সেগুলো বুঝে নেওয়ার, আমি যেকোনো সময় মরে যেতে পারি।’
সৈকত মন খারাপ করে বলল, ‘আমার কিছু লাগবে না খালুজান। না চাইতেও আপনারা আমার জন্য যা করে যাচ্ছেন তাতেই আমি খুশি।’


সকাল সকাল প্রমা এসেছে তাওসিফের খোঁজে। তাওসিফ অবাক গলায় বলল, ‘তুমি এখানে?’
প্রমা তাওসিফকে দেখে যেন প্রাণ ফিরে পেল। হঠাৎই তাওসিফকে বিস্মিত করে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল। ফিসফিস করে বলল, ‘কোথায় গিয়েছিলে তুমি? জানো কতো অপেক্ষা করেছি তোমার।’  
তাওসিফের বিস্ময় ভাব এখনও কাটেনি। নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করল না। প্রমাকে বলল, ‘তুমি রিলাক্স হও প্রমা। আমি ঠিক আছি।’
প্রমা দুরে সরে যায়। আচমকা এরূপ আচরণে দুজনেই অপ্রস্তুত হয়ে যায়। তাওসিফ জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি এর আগেও আমার বাসায় এসেছিলে নাকি?’
প্রমা মাথা নেড়ে সায় জানালো। তাওসিফ এরপর কি বলবে খুঁজে পেলো না। কিছুসময় চুপ করে থেকে বলল, ‘কফি খাবে কি?’
প্রমা মাথা নেড়ে সায় দিল এবারও কিন্তু কথা বলল না।

তাওসিফের মন বিষিয়ে আছে কাল থেকে। এতো চেষ্টা করেও শেষমেশ কোনো ঠিকানা পাওয়া যায় নি। বাবা যখন একবার টের পেয়ে গেছে তখন নিশ্চয়ই এতক্ষণে ওর হাতের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ব্যাপারটা যতবার ভাবে ততবারই মনটা খারাপ হয়ে যায়। 
প্রমা তাওসিফের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, ‘কোনো সমস্যা?’
তাওসিফ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘নাহ! এখন থেকে আমার লাইফে তিন অক্ষরের এই সমস্যা ওয়ার্ড টা থাকবে না।’

কফির মগে চুমুক দিয়ে এলোমেলো অবাধ্য চুলগুলোকে সামলাতে সামলাতে প্রমা বলল, ‘আমি তোমার সাথে কাজ করতে চাই তাওসিফ।’ 
তাওসিফ নির্বিকার ভঙ্গিতে কফি খেতে লাগলো। প্রমা আবারও বলল, ‘বাবার সাথে সবকিছু চুকেবুকে গেছে। এখন আমি মুক্ত, আর কোনো পিছুটান নেই। এখন আমি আর বাবার কাছ থেকে টাকাও নিচ্ছি না’
তাওসিফ গভীর চোখে প্রমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি কি তোমার ডিপ্রেশন কাটিয়ে ভালো জীবন চাও প্রমা?’
- চাই।
- আর তোমার বাবাকে শাস্তি দিতে?
প্রমা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘হ্যাঁ চাই।’
তাওসিফ উঠে দাঁড়িয়ে প্রমার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে বলল, ‘তোমার আর আমার গন্তব্য এক, পথও এক সেটা কি বুঝতে পেরেছ তুমি?’
প্রমা বুঝতে পারলো না। তাওসিফ আবারও বলল, ‘আমাদের লাইফের প্রবলেম গুলোও কিন্তু এক। আর দুজনের লক্ষ্য যখন এক তাহলে আমরা তো একসাথে থাকতেই পারি!’
প্রমার চোখ মুখে বিস্ময়। তাওসিফ আরেকটু কাছে এসে বলল, ‘তুমি চাইলে আমরা লিভ ইন রিলেশনশিপে থাকতে পারি প্রমা।’
প্রমা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। গা, হাত পা সমানে কেঁপে যাচ্ছে।


স্কুল থেকে ফেরার পর পরই জেরিনার সাথে দেখা হলো সিসিলিয়ার। অনন্যার মাথা ব্যথা তাই শুয়ে আছে। সিসিলিয়া জেরিনাকে নিয়ে খেতে বসেছে।  খেতে বসেই জেরিনা বলল, ‘আফা দুলাভাইরে খাইতে ডাকবেন না?’
সিসিলিয়া চমকে উঠে জিজ্ঞেস করল, দুলাভাই আবার কে?
- আফনের জামাই। ওই যেই বেডা দেখতে একদম রিয়াজ ভাইর মতো। 
- তুমি কার কথা বলছ?
- যেই বেডা উফরে বইস্যা খালি আকাম করে রং নিয়া।
- সৈকত? 
- হ।
সিসিলিয়ার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। এই মেয়েটা সৈকত কে ওর স্বামী ভেবেছে! নাকি সৈকত ওকে বলেছে। 
সিসিলিয়া রাগী গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘তোমাকে কে বলেছে যে উনি আমার জামাই?’
সিসিলিয়ার রাগ দেখে জেরিনা ভয় পেয়ে যায়। তাই মিথ্যে করে বলে যে, ‘সৈকত বলেছে।’
সিসিলিয়া আবারও জিজ্ঞেস করে, ‘আর কি বলেছে?’
- আর কিচ্ছু কয়নায় আফা।
- আর এই রিয়াজ ভাইকে?
- পেমের তাজমহল ছবির হিরু।
- এসব ও কি ওই সৈকত বলেছে?
জেরিনা মাথা নেড়ে সায় দিলো। সিসিলিয়া খাওয়া রেখে জেরিনার হাত ধরে বলল, চলো আজ তোমার হিরুর একটা হেস্তনেস্ত করে আসবো। 

সৈকত বাইরে বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন সময় সিসিলিয়া দরজায় ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকে জেরিনাকে দেখেয়ে বলল,
- আপনি ওকে কি বলেছেন?
সৈকত অবাক গলায় বলল, ‘আমি আবার কি বললাম?’
- দিন দিন কিন্তু আপনার অসভ্যতা বেড়েই চলছে।
- আরে আমার অপরাধ টা কি?
- আপনি ওকে বলেছেন যে আপনি আমার স্বামী? 
সৈকত আকাশ থেকে পড়ার ভান করে বলল, ‘আমি এসব কেনো বলবো?’
- আপনি নিজেকে নায়ক ভাবেন?
- হ্যাঁ। 
সিসিলিয়া অবাক হয়ে বলল, ‘সিরিয়াসলি আপনি নিজেকে নায়ক রিয়াজ ভাবেন?’
- না আমি তো নায়ক সৈকত ভাবি।
সিসিলিয়া ধমক দিয়ে বলল, ফাজলামো করেন আমার সাথে? 
- না আমি সত্যি বললাম তো।
- আপনি কি আয়নায় নিজের চেহারা দেখেন না! আপনার চুল দেখতে একদম কাকের বাসার মতো। কোনদিন দেখবেন কোকিল এসে টয়লেট করে রেখে গেছে।
সৈকত একটু চিন্তিত গলায় বলল, ‘এতদিন জানতাম কাকের বাসায় কোকিল ডিম পারে, আজ জানলাম যে টয়লেট ও করে।’
সিসিলিয়া রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল, আমারই ভুল আপনার মতো একটা ইউজলেস মানুষকে পাত্তা দেয়া।
সৈকত অত্যন্ত বিনয়ী সুরে বলল, মানুষ মাত্রই ভুল।
- আপনার মতো বেইমান আমি জীবনে দেখিনি। 
সৈকত চমকানোর ভান করে বলল, ‘কাল দুটো বাদাম বেশী খেয়েছিলাম বলে এভাবে বেইমান বলবেন।’
জেরিনা ভীত চোখে দুজনের ঝগড়া দেখছে আর মনে মনে আল্লাহ ডাকছে। সৈকত যদি বলে দেয় যে জেরিনা মিথ্যে বলছে তাহলে তো ওর লিহা আফা এরপর ওর বারোটা বাজাবে।

সিড়ি বেয়ে নামতে নামতে সিসিলিয়া সৈকতকে বলল, ‘এরপর নিচে আসলে একদম ঠ্যাং ভেঙে দেব।’
- তাহলে ভিক্ষের জন্য একটা থালা দিয়েন। কাঁচা বাজারের মোড়ে থালা হাতে বসে যদি গান গাই আল্লাহ নিশ্চয়ই মুখ তুলে তাকাবে। 
সিসিলিয়া হনহন করে চলে গেল।

সারা সন্ধ্যা ঘর থেকে বের হয়নি সিসিলিয়া। অনন্যা সন্ধ্যার পর ঘরে এসে বলল, ‘তোমার কি শরীর খারাপ লিয়া?’
সিসিলিয়া নিজেকে সামলে বলল, ‘একটু মাথা ব্যথা আর কি। সেড়ে যাবে।’
- তুমি উঠে হাতমুখ ধুয়ে নাও। আমি তোমার জন্য একটু কফি নিয়ে আসি।

সিসিলিয়া আয়নায় ভালো করে নিজেকে দেখল চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। অনন্যা সেই সময় ঘরে ঢুকে বলল,
-প্রেমে পড়ার প্রধান লক্ষনগুলোর মধ্যে কান্না একটা লক্ষণ। এসময় কারণে অকারণে কান্না পায়। 
কফির মগ হাতে নিয়ে সিসিলিয়া বলল,
- কি আজেবাজে বলছো?
- তুমি প্রেমে পড়েছ লিয়া।
- এসব ফালতু কথা আর বলবে না আমাকে। প্লিজ।
- প্রেমে পড়লে মানুষ ইনিয়ে বিনিয়ে মিথ্যে বলাও শিখে যায়।
- আমি কি মিথ্যে বলেছি?
অনন্যা হাসিমুখ করে বলল, মিথ্যে বলোনি?
সিসিলিয়া চোখ নামিয়ে কফির মগে চুমুক দেয়। বিরবির করে বলে, বাউণ্ডুলে বদমায়েশ টা মাথায় চেপে বসেছে। এটা কিছুতেই প্রেম হতে পারে না।
অনন্যা হেসে ফেলল। হাসি থামিয়ে বলল, ‘তুমি শুধু প্রেমে পড়োনি, কঠিন প্রেমে পড়েছ। তার প্রমাণ হলো এতক্ষণ ধরে যেটা কফি ভেবে খাচ্ছিলে সেটা আসলে লেবুর পানি।’

সিসিলিয়া তাকিয়ে দেখল যে সত্যিই তাই। অনন্যা হাসতে হাসতে বলল, তুমি শেষ পর্যন্ত সৈকত ভাইরাসে আক্রান্ত হলে!

(চলবে...)

আরো পড়ুন ১১ম পর্ব- ধারাবাহিক গল্প : এক পলকের একটু দেখায়

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড