• বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২০, ১৯ চৈত্র ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

গল্প : আঁধারে আলো

  আবদুল্লাহ নয়ন

২৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৫:২৫
কবিতা
ছবি : প্রতীকী

- কাদির ভাই, জিহাদ আবার সিগারেট টানতেছে।

এগারো বছরের ছেলের এমন বদঅভ্যাস পাড়াপড়শির মুখে শুনতে শুনতে কাদির সাহেবের কানে তালা লেগে গেছে। এই ছেলেকে মানুষ করার জন্য সে কি না করেছে! বড় ছেলে জোনায়েদ আর ছোট ছেলে জিহাদ পিঠাপিঠি বয়স।ওরা যখন কথা বলা শিখেছে তখন থেকেই  বিভিন্ন ধরনের দোয়া, আরবি বর্ণমালা শিখিয়েছে। মসজিদে সাথে করে নিয়ে নামাজ শিখিয়েছে। একটু বুঝদার হলে, দু’ভাইকে একই মাদ্রাসায় ভর্তি করে কিছুটা চিন্তামুক্ত হয়।

সবই ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু হঠাৎ করে ছোটছেলে বেঁকে বসল। একবার বাড়িতে আসলে আরেকবার মাদ্রাসায় নিয়ে যেতে হলে রীতিমতো তার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা খেলতে হয়। এবাড়ি ওবাড়ি দৌড়িয়ে তবে মাদ্রাসায় দিয়ে আসতে হয়। এতেও কাদির সাহেবের কোন দুঃখ নেই। ছোট বলে কথা, তাদের মাথায় এখনো পড়ার খেয়াল আসেনি। যখন বুঝতে শিখবে তখন বড় ছেলের মতো নিজ তাগিদেই পড়বে।নিজে যখন মাদ্রাসায় পড়েছে প্রথম প্রথম সেও একটু পাগলামো করেছে,কিন্তু যখন বুঝতে শিখেছে অন্যদের তুলনায় অনেক তাড়াতাড়িই পড়া শেষ করেছে।অনেকদিন মাদ্রাসায় মাষ্টারিও করেছে, একমাত্র ছেলে সন্তান হওয়ায় বাপের অজ্ঞাত সম্পত্তি দেখাশোনা করতে চাকরি ছেড়ে সংসার ধর্মে মনোনিবেশ করে।

গফুর সারাজীবন হাড় ভাঙ্গা খাটুনি খেটে তিল তিল করে গড়ে তুলেছে এ সংসার। তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়ে একমাত্র ছেলে কাদিরের হাতে সম্পত্তি বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিল, ছেলে নেয় নি। আগের নিয়মেই মায়ের হাতে ছেলে বুড়ো দুইজনেই টাকা তুলে দেয়। যখন যেখানে প্রয়োজন জোবেদা খাতুন হিসাব করে টাকা দেয়। সংসারের চাবি হাতে না পেয়ে বউমা আয়শার মনে কোন ক্লেশ নেই, কারণ সে জানে শ্বাশুড়ি যা করবে তার নিজের সংসারের ভালর জন্যই করবে।

গফুরের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের স্বভাব টা কাদিরও পেয়েছে।কাজ ছাড়া দ্বিতীয় কিছু সে বুঝে না।পরিশ্রমের ভারে শরীর পাটকাঠির মতো শীর্ণকায় হলেও শরীরের দিকে তার খেয়াল নেই।কাজে যেমন কঠিন নামাজেও তেননই কঠিন। এক ওয়াক্ত নামাজ কাজা হতে দিবে না, মাঠে গেলে জায়নামাজ সাথে করে নিয়ে যায়।

বাড়ির মায়া কাটানোর জন্য, যাতে ঘনঘন বাড়িতে না আসতে পারে তার জন্য দূরের মাদ্রাসায় ছেলেদের ভর্তি করে দিয়েছে।

বয়স যত বাড়ছে জিহাদের পাগলামোও তত বাড়ছে।একদিনের ঘটনা ঈদের ছুটি কাটিয়ে মাদ্রাসায় যাওয়ার দিন কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় নি।সন্ধ্যায় বাড়িতে এলে সবাই মিলে বুঝাতে লাগল কাল সকালে যেন যায় কিন্তু যতই বুঝানো হচ্ছে ছেলের একঘেয়েমিতা ততই বাড়ছে। তার এক কথা মাদ্রাসায় পড়বে না, সকালে উঠে অনেক দৌড়াদৌড়ি করে ধরেও যখন তাকে মাদ্রাসায় নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না, শেষে রশ্মি দিয়ে বেঁধে মাদ্রাসায় দিয়ে আসল। পরের দিন সকালে মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে বাড়িতে হাজির। তবে এবার খালি হাতে আসে নি, দাদী আর মা খাওয়ার জন্য আদর করে অতিরিক্ত কিছু টাকা দিয়ে দিত, সেই টাকা দিয়ে পুরাতন মোবাইল কিনে নিয়ে এসেছে। লোকমুখে শোনা গেছে তার বয়সী কয়েকটা ছেলের সাথে নাকি সিগারেট খেতে দেখা গেছে।

ছেলের এহেন অবস্থায় কাদির সাহেবের সংসারে যে সুখ উঠে গেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।নিজে শাসন করে ব্যর্থ হয়েও সে ক্ষান্ত দেয় নি,এলাকার বড় বড় কবিরাজ অনেক ঝাড়ফুঁক দিয়েছে। অমাবস্যার রাতে অন্ধকার বৈঠক ঘরে জিহাদের সামনে কবিরাজ বসে আছে। আজকে জ্বীনের চোদ্দগুষ্টির হদিস বের করে ছাড়বে। সবাই বাইরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, কবিরাজ অনবরত জ্বীন বশের দোয়া জিকির পড়ে যাচ্ছে। ঘণ্টা দেড়েক পড়ে জ্বীন বশের পরিবর্তে কবিরাজ নিজেই বশ হয়ে বেহুঁশ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। নাকেমুখে পানি দিয়ে যখন হুঁশ ফিরানো হল, এ জ্বীন অনেক ত্যান্দোড়, তার পক্ষে এতবড় জ্বীনকে শায়েস্তা করা সম্ভব না বলে কবিরাজ চলে গেল। এলাকার কবিরাজের জ্ঞানে যখন ভাটা পড়ে, কিশোরগঞ্জের নাম করা কবিরাজ বাবা আওলাদে মজনু শাহ কে আনা হল। জনশ্রুতি আছে, মজনু শাহ এখনো দশ দশটা জ্বীনকে নিচের অধীনে কাজ করায়। তার আরেকটা গুনের কদর এলাকার মানুষ আজও করে আসছে, শুধুমাত্র রোগীর নাম শুনেই, রোগীর সাথে দেখা না করেই, নিজের ডেরায় বসে ঝাড়ফুঁক দিয়ে বিষাক্ত সাপের বিষ নামিয়ে দিতে পারে।

সরষের তেলে ভিজানো শুকনো মরিচ আগুনে পুড়িয়ে  জিহাদের নাকে ঘসা হচ্ছে।কিছুক্ষণ পর পর মজনু শাহের খানদানি লাঠি দিয়ে জিহাদের রক্তে মিশে থাকা জ্বীনকে আঘাত করে, যেখান থেকে আসছে সেখানে চলে যাওয়ার আদেশ ছুড়ে দিচ্ছে। কয়েকমিনিট পরে বাবাগো বলে জিহাদ জ্ঞান হারায়। সবাই কানাকানি করছে, এই না হলে বড় কবিরাজ, জ্বীন যাওয়ার সময় ছেলের শরীরটা কেমন করে কেঁপে উঠছিল! ভরপেট খেয়ে যাওয়ার আগে বলে গেছে, ভাল হয়ে গেলে পাগলা মসজিদে একটা কোরান শরিফ আর মোম দেওয়ার জন্য। দু’দিন যাবত ছেলে শান্ত, জ্বীন চলে যাওয়ার ব্যাপারে সবাই নিশ্চিত। 

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, পাগলা মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে,কাদির সাহেব বসে আছে অমরার মত মসজিদকে বেষ্টনি করে বেয়ে চলা নরসুন্দা নদীর তীরে, মসজিদের ঘাটে। পায়ের গোড়ালির উপরে প্যান্ট, লুঙ্গি পড়ে একগাদা লোক মসজিদের দিকে আজানের স্রোতের সাথে সাথে আসছে। এক বৃদ্ধা সাদা রঙের নৌকা টুপি ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে ফুলিয়ে আসছে, উঠতি বয়সী ছেলেদের মাথায় আধুনিক স্টাইলের রংবেরঙের টুপি, কেউবা মাথা থেকে টুপি খুলে টুপির সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে আবার মাথায় চালিয়ে দিচ্ছে।কাদির সাহেব তিন রাকাত মাগরিবের ফরজ নামাজ শেষে বিসমিল্লাহ বলে মোম আর কোরান শরিফ মসজিদের দান বাক্সে রেখে দিয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে সাইকেলে প্যাডেল দিয়েছে। জোছনা রাতে সাইকেল চালিয়ে বাড়িতে এসে দেখে মা বিছানায় শুয়ে আছে, সবাই চারপাশে ঘিরে কান্নাকাটি করছে। 

কাদির সাহেব বাড়ি থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই শান্ত জিহাদ অশান্ত হয়ে ঘরের জিনিসপত্র ভাঙ্গতে শুরু করে। পুরাতন মোবাইল বিক্রি করে নতুন টাচস্ক্রীন মোবাইল কেনার টাকা চাচ্ছে।

জোবেদা মাটির চুলায় শুকনো পাতা দিয়ে উঠোনে রান্না করছিল। মাঝেমাঝে হাতের কাঠি চুলায় গুঁজে দিয়ে আগুনের উত্তপ্ততা বাড়াচ্ছে।

কয়েকবার দৌড়ানি খেয়ে বাহির বাড়ি থেকে ঢিল মারা শুরু করলে স্বাস্থ্যবতী ষাটোর্ধ জোবেদা হাতের কাঠি নিয়েই ক্ষেতের আইল ধরে দৌড়িয়ে নিয়ে যায়। কড়ই গাছের নিচে আসতেই জোবেদা ধপাস করে মাটিতে পড়ে যায়। পাড়ার মনা মিয়া বাজারের ব্যাগ নিয়ে যাওয়ার সময় দেখেছে জিহাদের শরীরের জ্বীন জোবেদাকে ফেলে দিয়ে যাওয়ার সময় জলপাই গাছের একটা ডাল ভেঙ্গে চলে গেছে।কিন্তু হাজার খোঁজেও ভাঙ্গা ডালের হদিস পাওয়া যায়নি। এঘটনার পর থেকে জোবেদার খানাপিনা বন্ধ, দুর্বল হাড় নিয়ে বিছানা থেকে উঠতে চাইলে মনে হয় মেরুদণ্ড ভেঙ্গে যাচ্ছে, সারা শরীরের হাড়ে ব্যথা, যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। গফুরের বিশ্বাস জিহাদের শরীরে থাকা জ্বীন এ কাজ করেছে। একমাত্র কবিরাজ-ই জ্বীন তাড়াতে পারে।

একেক কবিরাজ আসে, নিজস্ব পন্থায় জ্বীন তাড়ানোর ব্যবস্থা করে, ৭ দিনের গ্যারান্টি দিয়ে টাকা নিয়ে বিদায় হয়। এলাকার কবিরাজ যখন ব্যর্থ, দূর দেশ থেকে নামি-দামি কবিরাজ নিয়ে আসা হয়। ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়, অনেক দিন যাবত দানাপানি না খেতে পেরে চামড়া ঢিলা হয়ে লুকানো দুর্বল হাড়গুলো মাথা ভাসান দিতে শুরু করে।

কবিরাজ যে কিছু করতে পারবে না, কাদির সাহেব অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিল। সেও আরবি লাইনে শিক্ষিত,সে জানে কবিরাজের দৌড় কোন পর্যন্ত। কিন্তু বাবার অবাধ্য হওয়ার ভয়ে, শহুরের অচেনা পথঘাটে কোথায় কিভাবে ডাক্তার দেখাবে সেই সাহসের অভাবে, কবিরাজের উপর ক্ষীণ ভরসা করেছিল মাত্র। মায়ের অবস্থা বেগতিক খারাপ হচ্ছে দেখে, বাবার অবাধ্য হয়ে রীতিমতো ঝগড়া করে অচেনা শহরে ডাক্তারের কাছে আধমরা মাকে নিয়ে অনিশ্চয়তার পথে একাই পাড়ি জমায়। 
 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড