• রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ধারাবাহিক গল্প : এক পলকের একটু দেখায় (১১তম পর্ব)

  সাবিকুন নাহার নিপা

০৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৪:১০
গল্প
ছবি : প্রতীকী

রহমান সাহেব খুব ভোরে বাড়ি ফিরলেন সাথে একটা ছোট মেয়েকে নিয়ে সিসিলিয়ার আজ স্কুল আছে তাই সকালে ঘুম থেকে উঠেছে। রহমান সাহেবকে দেখে অবাক হয়ে বলল, ‘আঙ্কেল আপনি এতো সকাল সকাল?’
রহমান সাহেব এক প্রকার গর্জন করে বলল, ‘কেনো আমার বাড়ি আমাকে ফিরতে হলে কি কারও পারমিশন নিতে হবে?’
সিসিলিয়া একটু নিভলো। আমতা আমতা করে বলল, ‘না আপনি তো কাউকে কিছু বলেন নি তাই..’
রহমান সাহেব আগের মতোই গমগমে গলায় বলল, ‘কাকে বলতে হবে? তোমাকে নাকি ওই গাধাটা আর গাধিটাকে।’ 
সিসিলিয়ার হাসি পেল খুব। হাসি চেপে বলল, ‘গাধি কি অনন্যা?’
রহমান সাহেব খেয়াল করলেন যে সিসিলিয়া হাসি চেপে রেখেছে। একটু রাগী গলায় বলল, ‘তুমিও কি আজকাল আমার সাথে রসিকতা করছো নাকি?’
সিসিলিয়া অপ্রস্তুত হয়ে গেল। বলল, ‘আপনি ভিতরে আসুন আঙ্কেল।’
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে এতক্ষণে নজর পড়ল সিসিলিয়ার। মেয়েটার বয়স বছর সাতেক হবে। পড়নে পাতলা একটা সোয়েটার, গলায় ওড়না। মাথার চুলগুলো তেল দিয়ে ঝুটি বাধা। সিসিলিয়া হেসে জিজ্ঞেস করলো, 
- তোমার নাম কি রাজকুমারী? 
মেয়েটা বড় বড় চোখ দিয়ে সিসিলিয়াকে দেখল। সিসিলিয়া এগিয়ে এসে হাত ধরে বলল, ‘থাক নাম পরে শুনবো। এখন ভিতরে এসো।’

মেয়েটার নাম জেরিনা। রহমান সাহেব মেয়েটাকে নিয়ে এসেছে কারণ মেয়েটার থাকার কোনো জায়গা নেই। জেরিনার বাবা মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। মা অন্যত্র বিয়েও করে নিয়েছে। কিন্তু জেরিনার দায়িত্ব নিতে নারাজ। জেরিনা আগের মতোই বড় বড় চোখ করে সিসিলিয়াকে দেখছে। ওর সামনে প্লেটে গরম ভাত সাথে আলুভর্তা আর ডিম। সিসিলিয়া বলল, ‘তুমি খাচ্ছো না কেনো জেরিনা?’
জেরিনা এবারে মুখ খুলে বলল, ‘আফনেগো বাসায় কি হগোলে একটা কইরা আণ্ডা খায়?’
সিসিলিয়া বুঝতে না পেরে বলল, ‘আণ্ডা মানে কি? ডিম?’
- হয়।
সিসিলিয়া হেসে ফেলল। বলল, ‘হ্যাঁ। তুমি এখন খাও। আমরা পরে গল্প করবো।’

প্রতীক ঘুম থেকে উঠেই সরাসরি সৈকতের ঘরে গেল। সৈকত ঘুম চোখে বিরক্ত হয়ে বলল, ‘সকাল সকাল জালাতে আসছিস ক্যান শালা!’
প্রতীক ভীত কণ্ঠে বলল, ‘বলা নেই কওয়া নেই সকাল সকাল প্রাইম মিনিস্টার এসে হাজির।’
সৈকত চমকে উঠে বলল, ‘তোর বাপ এসেছে?’
- হ্যাঁ, ভাই।
- কি বলিস, এখন তো তাহলে সকালের ঘুম শেষ! 
প্রতীক মন খারাপ করা গলায় বলল, ‘সবই কপাল!’

সৈকত আর ঘুমাতে গেল না। কিছুক্ষণ সকালের মিষ্টি রোদে বসে থেকে নিচে চলে গেল। অনন্যা তখন শাড়ির আঁচল কোমরে গুজে রান্নাঘরে কাজ করছে। সৈকত কে দেখে বলল, ‘আজ কিন্তু কোনো রুটি কিংবা পরোটা হবেনা। ভাত খেতে হবে।’
সৈকত হেসে বলল,
- আপনি যা দেবেন তাই খেয়ে নেব কোনো ব্যাপার না। কিন্তু কথা হলো আপনার শ্বশুর সাহেব কোথায়? 
- উনি ঘুমাচ্ছেন। রাতে জার্নি করেছে তো। 
- একটু বেশী তাড়াহুড়ো করছে মনে হলো। 
অনন্যা ঠোঁট উল্টে বলল, ‘কি জানি!’
সৈকত জেরিনাকে দেখে বলল, ‘কি খুকী ভালো আছো?’
জেরিনা একটু লজ্জা পেল। সৈকত হেসে বলল, ‘তোমার নাম কি?’
জেরিনা লাজুক গলায় বলল, ‘জেরিনা।’
- আমি এতো বড় নাম ডাকতে পারবো না। আমি তোমায় জেরি ডাকবো কেমন! 
জেরিনা মাথা নেড়ে সায় দিলো। 
এই বাড়ির মানুষ গুলো কে জেরিনার খুব পছন্দ হয়েছে। বেশী পছন্দ হয়েছে সিসিলিয়াকে। 
সৈকত জেরিনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কি ভাবছো তুমি?’
জেরিনা বলল, ‘আফনেরা খুব ভালা। আফনেও আর আফনের বউ ও।’
সৈকত চমকে উঠে জিজ্ঞেস করল, ‘আমার বউ?’
- জি লিহা আফা। কি সোন্দর আফনেরা!


প্রমার মন খারাপ ভাব কমেছে এখন পুরোপুরি। প্রমা ঠিক করেছে এখন থেকে না আর বাবার সাথে যোগাযোগ রাখবে আর না সিসিলিয়ার সাথে। এখন থেকে শুধু নিজের কথাই ভাববে। তাই অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাওসিফের সাথে কাজ করবে। সৈকত কে বার দুয়েক ফোন করলো কিন্তু ফোন বন্ধ পেয়ে টেক্সট করল, ‘আই নিড ইউ তাওসিফ।’

এনামুল চৌধুরী গতকাল একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অনেক ভেবে চিন্তে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা করবেন।
উকিল কে ডেকে  উইল করতে বললেন, প্রমা আর সেলিনার নামে ৫০ভাগ আর সিসিলিয়ার নামে বাকী ৫০ভাগ যেন দেয়া হয়। এবং তা অতিদ্রুত। 

এই ব্যাপারটা নিয়ে সেলিনার সাথে মন কষাকষি চলছে। সেলিনা ঘটনা জানতে পেরে কতক্ষণ কান্নাকাটি করেছে কিন্তু তাতে এনামুল সাহেব নির্বিকার। সেলিনা চিতকার করে বলল, ‘তুমি এরকম উইল করতে পারোনা, সবকিছু কেনো সমান সমান ভাগ হবে না!’
- কারণ, আমি চাইছি সবাই নায্য পাওনা বুঝে পাক।
- এতে কি করে নায্য হচ্ছে? বরং অনায্য হচ্ছে। এই সিসিলিয়া এতদিন কোথায় ছিলো! ও তো তোমার সাথে ছিলো না!
- সেজন্যই ও বেশী পাবে। আরও একটা কারণে ও বেশী পাবে।
- কি কারণ?
- কারণ, একমাত্র ওর ই এনামুল চৌধুরীর সম্পত্তিতে লোভ নেই।
সেলিনা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এনামুল সাহেব ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ করে। তার শান্তির প্রয়োজন, কিন্তু কোথাও একদণ্ড শান্তির জায়গা নেই। একজনের কাছে আছে কিন্তু সেখানে যেতে এনামুল সাহেবের ভীষণ ভয় হয়।


স্কুল থেকে বের হতেই সৈকত কে দেখতে পেল সিসিলিয়া। ওকে দেখেই গত রাতের ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। সিসিলিয়া লজ্জায় মাথানিচু করে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলে সৈকত উঁচু গলায় ডেকে বলল,
- ও ভাবি খবর কি? কাল রাতে কি মাথায় লেগে স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছেন?
সিসিলিয়া কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘আপনি এখানে কি করছেন?’
-আমি তো আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি ভাবী।
সিসিলিয়া ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করল, 
- কেন?
- আসলে আপনাকে সকালে উঠে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছিলো তো তাই।
সিসিলিয়ার মন টা ভালো হয়ে গেল। আপনাআপনি মুখে হাসি হাসি ভাব চলে এলো। সৈকত আড়চোখে সিসিলিয়া কে দেখে ঠোঁট টিপে মুচকি হেসে সামনের দিকে তাকিয়ে হাটতে লাগলো। 

সিসিলিয়া এই সুযোগে ভালো করে সৈকতের দিকে তাকালো। শ্যামবর্ণ রঙের জন্য ক্রিম কালারের টিশার্ট টা গায়ে মানিয়ে গেছে কি সুন্দর! খোচা খোচা দাড়ি, পাতলা ঠোঁট, গভীর চোখ,লম্বা ঝাঁকড়া চুল,মৃদু বাতাসে কিছু চুল কপালে লেপ্টে আছে। সব মিলিয়ে দেখতে কি সুন্দর! 

সৈকতের হাসিতে ধ্যান কাটে সিসিলিয়ার। হাসির কারণ জানতে চাইলে সৈকত বলল, ‘আপনি যেভাবে আমাকে দেখছিলেন তাতে কিন্তু আমি একটু লজ্জা পেয়েছি।’
সিসিলিয়া লজ্জা পেল। গলায় ঈষৎ রাগ মিশিয়ে বলল, ‘আপনি অনেক অসভ্য।’
- সত্যি ভাবী আপনার মুখে খারাপ কথাগুলো শুনতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। কারণ আপনি যে মিষ্টি! যে ব্যটার সাথে আপনার বিয়ে হবে নির্ঘাত তার সুগারের প্রবলেম হবে।
সিসিলিয়া কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘পটানোর জন্য কি আপনি সবাইকেই এগুলো বলেন?’
সৈকত যেন আকাশ থেকে পড়ল। এমন ভাব করে বলল,
- নাউজুবিল্লাহ! আমি আপনাকে পটাবো! আসতাগফিরুল্লাহ।
সিসিলিয়া তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
- আপনাকে আমি হাড়েমজ্জায় চিনি।
সৈকত দুষ্ট চোখে সিসিলিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাহলে এতো টা খেয়াল করেছেন আমায়!’
সিসিলিয়া অপ্রস্তুত হয়ে গেল। খুব দ্রুত নিজেকে সামলেও নিলো। তারপর বলল,
- কি কাজে এসেছেন বলুন?
হাটতে হাটতে বড় রাস্তায় এসে গেলে চায়ের দোকান দেখে সৈকত বলল, ‘চা খাবেন?’
সিসিলিয়ার খুব ইচ্ছে করলো চা খেতে তবুও বলল খাবে না। সৈকত যেন সেটা বুঝেও গেল। বলল,
-ঠিক আছে আপনার খাওয়ার দরকার নেই। আমি খাবো আর আপনি দাড়িয়ে দেখবেন।

চায়ে চুমুক দিয়ে সৈকত বলল, ‘চা টা দারুণ না!’
সিসিলিয়া বলল, ‘হু!’
- অবশ্য আপনার চায়ের সামনে কিছুই না। 
সিসিলিয়া সৈকতকে কিছু বলতে যাবে তার আগে সৈকতের ফোন বেজে উঠলো। 

ফোনের স্ক্রিনে তাওসিফের নাম দেখে সৈকতের কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়ল। যেটা চোখ এড়ালো না সিসিলিয়ার।

সৈকত একটু দুরে গিয়ে ফোন রিসিভ করল। ফোনের ওপাশে তাওসিফ উত্তেজিত গলায় বলল, ‘সৈকেত তুই কই?’
- আমি একটু বাইরে আছি। কি হয়েছে?
উত্তেজনায় তাওসিফ কথা বলতে পারছে না। কোনোভাবে বলল, ‘বাবার খোঁজ পেয়েছি সৈকত।’
সৈকতের মুখের রঙ পাল্টে গেল। দুর থেকে সিসিলিয়া লক্ষ্য করছে সৈকত কে। সৈকতের গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না, ‘সৈকত শুনছিস?’
- হ্যাঁ। কোথায় খোঁজ পেয়েছ?
-বাবার গ্রামের বাড়ি খোঁজ লাগিয়েছিলাম। উনি সেখানে আছেন শুনে আমিও সেখানে যাই কিন্তু একটুর জন্য মিস হয়ে যায়। খোঁজ খবর নিয়ে জেনেছি বাবা আর প্রতীক নাকি এখানে ব্যবসা শুরু করবে। আর তাছাড়া ঢাকায় কোথায় থাকছে সেটাও জেনে গেছি।

সৈকতের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে এরকম অনুভূতি হচ্ছে৷ তাওসিফ তার বাবা ভাইকে আজ না হয় কাল খুঁজে পেতো কিন্তু সমস্যা তো সিসিলিয়া.... 

সিসিলিয়া কাছাকাছি এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কি হয়েছে?’
সৈকত গভীর চোখে সিসিলিয়ার দিকে তাকালো। মনে মনে বলল, হয়তো আবারও কিছু বাজে ঘটনার মুখোমুখি আপনি হবেন সিসিলিয়া। কিন্তু এবার আপনার সামনে ঢাল হয়ে আমি থাকব।

(চলবে...)

আরো পড়ুন ১০ম পর্ব- ধারাবাহিক গল্প : এক পলকের একটু দেখায়

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড