• রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

গল্প : জীবন আমার মেঘের নাম

  রিকেল বড়ুয়া

০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৫:৫১
গল্প
ছবি : প্রতীকী

আমার মা ছিলেন বাড়ির বড় মেয়ে। দু’এক বছর পরে মায়ের একটা ভাই এলো। ভাইটা মায়ের বেশিদিন বাঁচলো না। যেকয়টা দিন বাঁচলো এর মধ্যেই মা হয়তো তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। শিশু বয়সেই বোধহয় এমন করে ভালোবেসে ছিলেন হয়তো পরের ভাই-বোনদের তেমন করে ভালোবাসতে পারেন নাই। হয় তো বেসেছেন তার চেয়েও অধিক। আমি জানি না। কিন্তু সেই যে একটা দুঃখ পেল মা, সেটা হয়তো ঘুচলো না তার। মা বড় হলেন। সংসার করলেন। দিদি এলো, আমিও এলাম। আমি ভাঙা ভাঙা শব্দে দাদা ডাকতে পারি, বাবা ডাকতে পারি, মা ডাকতে পারি না। মা শব্দ মুখে আমার ফুটে না। মা আমার ভিখারির চাল চুরি করে খাওয়ায়, তবু আমি মা ডাকি না। ভাত বাড়া বাঁশের কাটি আলতো করে আমার মুখে দিয়ে নাড়ায়, তবু আমি মা ডাকি না। মায়ের তখন সবে একুশ বছর বয়স। আমাদের রেখে মা তার হারিয়ে যাওয়া ভাইয়ের কাছে চলে যান। মা আমার মা ডাক শুনতে পারেন নাই আর। এখনো কি ডাকতে পারি সেই ডাক! 

মাকে চিতায় নিয়ে যাবার আগে শেষবার মায়ের পাশে শুয়ে মৃত দুধ খাই। এর পনেরো দিন পর ঠাকুরদা মারা যান। কেমন এক শ্মশান নীরবতার শোক নেমে এলো বাড়িতে। আমাকে তখন দোলনায় রাখলে ওঠে যাই। বিছানায় রাখলে ওঠে যাই। কোলে নিলে নেমে যাই। হামাগুড়ি দিয়ে এদিক ওদিক যাই। দেয়াল ধরে দাঁড়াই। মায়ের পুরনো শাড়ি ধরে টানি। মা মা লাগে, মা আমার নাই। কাঁদি। ঠাকুমা তার দুধ আমার মুখে গুজে দেয়। দুধ খাই, দুধ পাই না। কাকিমা দেয়। আমি তখন হাঁটতে শিখি নাই, দৌড়তে শিখি নাই, কেবল দেয়াল আর দরজার কপাট ধরে দাঁড়াতে শিখেছি। 

যে দেখে সেই কোলে নেয়। আদর করে। চুমু খায়। কেউ কেউ টলোমলো চোখে স্নেহ বিলায়। ঘরে মায়ের একটাই ছবি। চোখ পড়লেই সেই ছবির দিকে আমি আঙুল দেখাই। বাড়ির লোক ছবি নামিয়ে লুকিয়ে রাখেন। সেই যে লুকিয়ে রাখলেন এখনও সে ছবি আবিষ্কার হয় নাই। মায়ের ছবি না দেখে বড় হতে হতে মায়ের মুখ আমার আর মনে নাই। পৃথিবীতে আছেন কেউ যে আমাকে মা এঁকে দিতে পারেন!

কাকিমা আর ঠাকুমার কাছে ধীরে ধীরে বড় হই। দিদি ভর্তি হয় মামার বাড়ির স্কুলে, আমি কাকার বাড়ির স্কুলে। দু’জন নদীর দু’পাড়ে। বছরে কয়েকবার মামার বাড়ি বেড়াতে আসি। দিদিমা পথে দাঁড়াই থাকেন। আমি এলেই কোলে নিয়ে দিদিমা কাঁদেন। পথে পথে কাঁদেন। রান্নাঘরে কাঁদেন। বারান্দায় কাঁদেন। দিদিমা আমার উঠোনজুড়ে কাঁদেন। খুঁটিতে বেঁধে রাখা গরু গুলো কাঁদে। সোনার মতো ধানগুলো রোদের উঠোনে কাঁদে। আমি দিদিমার কোলে বসে সেসব দেখি। 

কাকার ছিল পাঁচ সন্তান। সবচেয়ে যে বড় যে আমার সমবয়সী তার ছিল সাত বছর বয়স। বই বুকে চেপে ধরে স্কুলে যাবার বয়স। সেও একটা সময় মায়ের মতো মেঘ হয়ে যায়, আকাশ হয়ে যায়। সেই শোকে সবাই কাঁদে, আমিও দুঃখ পাই। আমি আর মেঘ ধরতে পারি না, আকাশ ছুঁতে পারি না। খেলার সাথী হারাই। মনখারাপ লাগে। আনারকলি ছিল আমার খেলার নাম। এমন সুন্দর নাম কেউ রাখে! সুন্দর যে বড় বেদনার। ওহ্ মন, বেদনার নাম কেন যে এত সুন্দর হয়!

প্রাইমারি শেষ করে হাই স্কুলে গেলাম। আমি তখন নবম শ্রেণি। কাকার খরচ বেড়ে গেল। তবু আমাকে তারা ছাড়েন নাই। ভালো করে লেখাপড়াটা যেন করতে পারি সেই চিন্তা করে বাবা আর ঠাকুমা মামার বাড়ি রেখে গেলেন। এই প্রথম দিদিকে আমার একার করে পাওয়া। একসাথে স্কুলে যাই। পড়তে বসি। দিদির পড়ার টেবিল আমাকে দিয়ে দেয়। তার জমানো কলম আমাকে দিয়ে দেয়। তার খুচরো পয়সা আমাকে দিয়ে দেয়। তার শ্যাম্পু আমাকে সে দিয়ে দেয়। আমারই অধিকার যেন! কেবল তার দুঃখ আমাকে দেয় না। দিদিমা আমাকে একার করে পান। আমি যেন সেই মরে যাওয়া তার প্রথম সন্তান। পৃথিবীর সকল মায়ের আদর নিয়ে তিনি আমাদের বুকের মধ্যে জড়িয়ে রাখেন। পড়তে বসলে রাত জাগেন। ভোর সকালে জাগিয়ে দেন। খাবার দেন। পড়তে যাই। স্কুলে যাই। বাড়ি ফিরি। আবার ভাত বেড়ে দেন। 

আমাদের স্কুল তখন শেষ। আমরা তখন দ্বাদশ শ্রেণি। ঘরে প্রথম মামি এলেন। তিনজন একসাথে কলেজ যাই। একসাথে ঘরে ফিরি। একসাথে প্রাইভেটে যাই। একসাথে পড়তে বসি। একসাথে ভাত খাই। যেদিন দিদি আর মামি আমাকে ভাত বেড়ে দেন সেদিন আমার পেট ভরে না। দিদিমা একমুঠো দিলেও আমার পেট ভরে যায়। মুখে আমি খাই না, যেন মনে মনে ভাত খাই। যেন ছোট্টবেলার সেই হাড়ি পাতিল খেলা। পুতুল বাড়ির বিয়ে, দাগ টানা ঘর। এই যেন ক্যাকটাসের মাংস দিয়ে মিছেমিছি ভাত খেলাম পাতার বাসনে। আমারও ক্ষুধা গেছে উবে। এই করে করে কলেজ শেষ। আমি তখন উনিশ। দিদির তখন একুশ। মায়ের সমান বয়স। ভাবা যায়! একদিন সকালবেলা হুট করে সে নাই। কথা বলে না, চোখ খুলে না। দুপুরবেলা চোখের সামনে শ্মশানজুড়ে আগুন। তখন থেকে আমার বাঁশ বাগানে মাথার উপর চাঁদ...

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড