• রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬  |   ১৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ (৩০তম পর্ব)

  রিফাত হোসেন

০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:৪৪
গল্প
ছবি : প্রতীকী

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বাবার বলা কথাটা শুনে আতঙ্কে উঠল ইতি। জিহ্বায় কামড় দিয়ে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।

আনিস উদ্দিন ইতির ঘরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই যে জমিদারের মেয়ে, ঘরের ভিতরে থেকে বাপকে গালাগাল না দিয়ে সামনে আয়। কানের নিচে দু’টো থাপ্পড় খেয়ে যা।’

সায়েমের মেজাজ চটে গেল আনিস উদ্দিনের কথা শুনে। ইতির ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখল, ইতি পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। সায়েমকে ওদিকে তাকাতে দেখে, ইতি অসহায়ের মতো মুখটা করল। সায়েম ইশারায় ওকে সামনে আসতে বলল। ইতি ভয়ে কাচুমাচু হয়ে বাবার সামনে এসে বলল, ‘আসসালামু আলাইকুম বাবা।’

আনিস উদ্দিন মনে মনে কী যেন বিড়বিড় করলেন। সায়েম বুঝতে না পারলেও ইতি বুঝে নিলো বাবা সালামের উত্তর দিয়েছেন। আনিস উদ্দিন বসা থেকে ওঠে মেয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। ইতি ভীত হয়ে আড়চোখে বাবাকে দেখছেন। আনিস উদ্দিন হঠাৎ ধমক দিয়ে বললেন, ‘সেই কখন এসেছি বাড়িতে, অথচ এক কাপ চা কেউ অফার করল না। এদের নাকি এই শিক্ষাই দিয়েছি।’

সায়েম মনে মনে বলল, ‘ইহ, আসছে আবার চা খেতে। কিচ্ছু দিবো না তোমাকে। চা তো দূরে থাক, তুমি আমাদের দিকে তাকাতেও পারবে না। তোমার মতো বাবা আমরা চাই না। নিজের জেদের জন্য তুমি ছেলে-মেয়েকে ত্যাগ করেছ।’

কথাটা মনেই চেপে রাখল সায়েম। মুখে বলল, ‘তুমি বোসো, আমি চা বানিয়ে আনছি।’

আনিস উদ্দিন তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, ‘হাতটা ভালো করে ধুয়ে নিস আগে। ঘরে সাবান না থাকলে কিনে নিয়ে আয়। টাকা না থাকলে আমার কাছ থেকে নিয়ে যা।’

সায়েম রাগে কটমট করতে করতে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। ইতি ইশারায় সায়েমকে যেতে বলল। সায়েমও সহ্য করে রান্নাঘরের দিকে যেতে লাগল। যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলল, ‘না জানি কোন মতলবে আবার এখানে এসেছে।’

সায়েম রান্নাঘরে গিয়ে পানি গরম করতে লাগল। দরজার কাছে এসে আবার ড্রয়িংরুমে উঁকি দিয়ে শুনতে লাগল আনিস উদ্দিন এর কথা। কিন্তু না, সে ইতিকে কিছু বলল না। উল্টো সায়েমকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘বাতি ইন্দুরের মতো কানাকানা না করে নিজের কাজে মন দে। আর আড়ি পাতার স্বভাবটা এখনো পরিবর্তন করলি না। কবে যে মানুষ হতে পারবি।’

সায়েম দরজার কাছ থেকে সরে গেল। আনিস উদ্দিন সায়েমকে বাতি ইন্দুর বলায় ইতি ফিক করে হেসে দিলো। সায়েম ভিতরে দাঁড়িয়ে মুখে হাত দিয়ে বলল, ‘আজব তো! আমাকে অপমান করে কথা বলা ছাড়া কী এই লোকটার আর কোনো কাজ নেই? আমি তার কী এমন ক্ষতি করেছি যে, আমাকেই সবসময় খোঁচামারা কথা বলতে হবে।?’

সায়েম আবারও চা বানাতে মনোযোগ দিলো। আনিস উদ্দিন মেয়েকে হাসতে দেখে বলল, ‘আমাকে কী জোকার মনে হয়? যে আমার কথা শুনে হাসতে হবে।’

ইতি হাসি থামিয়ে ভীত গলায় বলল, ‘ছি ছি বাবা, এইসব কী বলছ তুমি? বাবাকে নিয়ে কেউ এইসব ভাবে। তুমি কী আমাকে এইরকম শিক্ষা দিয়েছ বল?’

- বাপকে পাম মারা-ও শিখে গেছিস দেখছি। তা এইসব কী তোর ভাই শিখিয়েছে? হতেই পারে। এমন একটা ভাই যার থাকে, সে কী আর ভদ্র হবে। ভাইটা তো বাপকে সম্মান তো দূরে থাক, মন থেকে কখনো বাবা বলেও ডাকেনি। এখন বোনকেও তাহলে সেরকমই ট্রেনিং দিচ্ছে।

- তুমি আমাকে ভুল বুঝছ বাবা। আমি তো তোমার কাছ থেকেই ট্রেনিং প্রাপ্ত। তাই ভাইয়া ভুল কিছু শিখালেও আমি ইচ্ছে করেই সেগুলো ভুলে যাই। আসলে ভাইয়ার নতুন নামটা শুনে একটু হাসি পেয়ে গেল।

- ওর কু-কর্মের জন্যই ওর এত এত কুৎসিত নাম। শোন, যা হওয়ার হয়েছে। বাদ দে সেগুলো। আমি একটা জরুরি কাজে এসেছি।

ইতি আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘কী জরুরি কাজ বাবা?’

আনিস উদ্দিন কিছু বলার আগেই সায়েম চা নিয়ে চলে এলো। আনিস উদ্দিন চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সায়েমকে বলল, ‘এখানে দাঁড়িয়ে থেকে অন্যের কথা না শুনে কাজ করলেও তো পারিস। নিচে গিয়ে দেখ গাড়িতে মিষ্টি রাখা আছে।’

- ড্রাইভারকে ফোন করে বল নিয়ে আসতে।

- ড্রাইভার নেই। আমিই ড্রাইভ করে এসেছি।

সায়েম অবাক হয়ে বলল, ‘মানে! তুমি না অসুস্থ? তাহলে ড্রাইভ করলে কীভাবে? আর মা তোমাকে ছেড়ে দিলো?’

- এত কথা বলিস কেন? আমার গাড়ি কে ড্রাইভ করবে, সেটা কী তুই ঠিক করবি? চুপচাপ গাড়ি থেকে মিষ্টি নিয়ে আয়।

- তুমি আমার বাড়িতে মিষ্টি নিয়ে এসেছ, ব্যাপারটা কেমন যেন লাগছে আমার কাছে।

- আমি কী মিষ্টি তোর জন্য এনেছি নাকি? আমি একটা জায়গায় যাবো, সেজন্য মিষ্টি এনেছি।

- তাহলে ওগুলো এখানে আনার কী দরকার? গাড়িতেই থাক।

- এত অলস কেন তুই? অন্যের আলোচনা শোনা ঠিক না, সেটা কী জানিস না? মিষ্টির একটা প্যাকেট এখানে নিয়ে আয়। প্রয়োজন আবারও সেটা তুই নিচে নিয়ে যাবি। কাজ করলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে। সারাজীবন তো বাপের হোটেলে খেলি। এবার একটু খাটাখাটুনি কর।

- বাবা, তুমি কিন্তু আমার বাড়িতে এসে আমাকেই বকছ। এটা কিন্তু ঠিক না।

আনিস উদ্দিন বসা থেকেই বলল, ‘ঠিক আছে। তাহলে চলে যাচ্ছি। থাক রে মা, জরুরি কাজটা আর করা হলো না। তোর ভালোর জন্যই তো এসেছিলাম। কী আর করার? চলে যাই।’

আনিস উদ্দিন বসা থেকে উঠলেন না। সায়েম জানে তিনি উঠবে না এখন। ইতিও জানে অবশ্য। তবুও বলল, ‘আরে ভাইয়া থামো তো তুমি। বাবা প্লিজ রাগ করো না। তুমি প্লিজ বল কী হয়েছে।’

আনিস উদ্দিন সায়েমের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে তুইও বোস। তবে কথার মাঝে গলাকাটা মুরগীর মতো লাফালাফি করবি না বলে দিলাম। নাহলে থাপ্পড়িয়ে সব দাঁত ফেলে দিবো।’

সায়েম রাগী রাগী ভাব করে বসল বাবার পাশে। আনিস উদ্দিন বলতে শুরু করলেন, ‘শোন, যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। আমি তোদের বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছি। তোদের জন্য, তোদের মা-ও কান্নাকাটি করে মাঝে মাঝে।’

ইতি হঠাৎ বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ইয়াহু! থ্যাঙ্কিউ বাবা। আমিও ভাইয়াকে বলেছিলাম বাড়ি ফিরে যেতে। কিন্তু ভাইয়া ফিরতে চায়নি। এমনকি তোমাদের সাথে যোগাযোগ ও করতে দেয়নি ভাইয়া। ভাইয়া তো সবসময় তোমার নামে বাজে কথা বলে আমার কাছে।’

সায়েম মুখটা ‘হা’ করে ইতির দিকে তাকিয়ে রইল। আনিস উদ্দিন উঁচু গলায় বলল, ‘রাম ছাগলদের কাজ-ই তো এটা। এরা নিজে তো ভালো কিছু করবেই না, উল্টো যে ভালো কিছু করতে যাবে, তাকেও বাধা দিবে।’

সায়েম ইতিকে চোখ রাঙিয়ে বলল, ‘কাজটা কিন্তু ঠিক করলি না ইতি। আমাকে ভিলেন বানিয়ে দিলি। এর শোধ আমি নিবো। মাথায় যে কয়টা চুল আছে, সেগুলোও আজকে শেষ করব। নিজে সবসময় বাবার নামে উল্টো পাল্টা কথা বলিস। অথচ এখন আমাকে দোষারোপ করছিস। বাবাকে বজ্জাত বাপ উপাধি'টা তো তুই-ই দিয়েছিলি, তাই না?’

ইতি বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখেছ বাবা, তোমার ছেলে এইসব কী বলছে? তুমি বল, আমি কী কখনো তোমার নামে খারাপ কথা বলতে পারি?’

সায়েম চোখ পাকিয়ে ইতির দিকে তাকালো। আনিস উদ্দিন দু’জনের দিকে একবার তাকালো। এরপর বলল, ‘যার যেমন স্বভাব, সে তো সেই কাজ করবেই, তাই না-রে মা। আমি তো জানি ও কেমন। আমার ছোট্ট মেয়েটাকে যতসব কূ-বুদ্ধি তো ও-ই দিয়েছে। নাহলে আমার সেই ছোট্ট মেয়েটা এতবড় হয়ে গেছে যে, সে এখন প্রেম করে।’

সায়েম মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল। ইতি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বাবার পিছনে মুখ লুকালো। আনিস উদ্দিন কড়া গলায় বলল, ‘হয়েছে হয়ছে। আর লজ্জা পেতে হবে না।’

ইতি মুখটা সামনে আনলেও লজ্জায় মাথা তুলে তাকাতে পারছে না। আনিস উদ্দিন বলল, ‘দু’জনেই রেডি হয়ে নে। আমরা এক্ষুনি যাবো।’

ইতি আর সায়েম একে অপরের দিকে তাকালো একবার। এরপর বলল, ‘কোথায়?’

-  ফাহাদদের বাড়িতে। যার সাথে ইতি প্রেম করছে।  ওর সাথে ফাহাদের বিয়ে দিবো আমি।

সায়েম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এতকিছু কীভাবে জানলে তুমি?’

- খোঁজখবর নিয়েছি আমি। সবই আমার জানা আছে, বুঝেছিস।

- কিন্তু বাবা আমরা কিছুক্ষণ আগে ইতির অফিসের একটা কাজ থেকে ফিরলাম। আমিও ইতির সাথে গিয়েছিলাম। সারারাত কাজের চাপ ছিল বলে ঘুমাতে পারিনি একটুও।

- মিথ্যে বলছিস কেন?  আমি সবটাই জানি। রোদ কী কী করেছে, সেসবই। কাশেম আমাকে ফোন করে সব বলেছে।

সায়েম রাগী কণ্ঠে বলল, ‘ওর কথা তুমি আমার সামনে বলবে না বাবা। ওর জন্যই এতকিছু হলো। প্রথমে আমার জীবনটা শেষ করল, এরপর ইতিরটা শেষ করার চেষ্টা করল।’

- তবুও ছেলেটা অনেক কান্নাকাটি করে ক্ষমা চাইলো। কী আর করব বল, ছোট থেকে তো আমার কাছেই মানুষ হয়েছে। ওর মা তো ওকে আমার দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছিল। অথচ আমাকেই ওর দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। ছেলেটার প্রতি মায়া জন্মে গিয়েছিল। দেখ বাবা, আমি তোদের সাথে যতই খারাপ আচরণ করি না কেন? সেসব মোটেও মন থেকে করি না। আমি তোদের বাবা। তোদের আমি ভালোবাসি। আসলে তোদের জেনারেশন এর সাথে আমাদের জেনারেশনের মিল নেই। তাই তোদের মতো করে আমি এত ভাবতে পারি না। তবুও আমি চেষ্টা করি। আর চেষ্টা করি বলেই এভাবে মেয়েকে সরাসরি বলতে পেরেছি "তোকে তোর প্রেমিকের সাথেই বিয়ে দিবো।" আমাদের সময়ে কিন্তু এতকিছু ভাবা হতো না। প্রেম করাটাই তখনকার সময় অন্যায় ছিল। তবুও ভুল করে হোক, বা ইচ্ছাকৃতভাবে হোক, সরাসরি বলতো ভুলে যাও তাকে। আমাদের ঠিক করা ছেলেকেই বিয়ে করতে হবে। আমাদের কিছুই করার ছিল না। বাধ্য হয়েই বিয়ে করতে হতো। তখনকার সময়ে প্রেম ভালোবাসা যতই গাঢ় হোক না কেন, এই প্রেম ভালোবাসার জন্য কখনোই গুরুজনদের মুখের উপর কথা বলতো না কেউ। নীরবে সহ্য করত অধিকাংশ মানুষ। কেউ মৃত্যুর পথ-ও বেছে নিতো না, কারণ তারা বুঝতে জীবনটা এই পৃথিবীর কারোর জন্য নয়। জীবনটা ওই সৃষ্টি কর্তার জন্য। সেদিন তোরা বিয়ে ভেঙেছিলি বলে আমি কষ্ট পাইনি। কষ্ট পেয়েছিলাম তোরা আমার মুখের উপরে কথা বলেছিলি বলে। আমি জানি তোদের ভালো কথা আমি শুনিনি। তাই তোরা বাধ্য হয়েই রাগারাগি করেছিলি। কিন্তু কী করব বল, আমরা তো সেভাবেই বড় হয়েছি, যেভাবে গুরুজনদের কথাই ছিল শেষ কথা। অথচ তোরা আমার অবাধ্যতা করেছিলি। তবুও আমি তোদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কাশেমের কাছ থেকে আমি শুনেছি ইতির সাথে কী কী হতে যাচ্ছিল৷ সত্যি বলতে, এটা শোনার পর আমি আর রাগ করে থাকতে পারিনি। তাই তো অসুস্থ শরীর হলেও চলে এসেছি তোদের দেখতে। আমি যে তোদের খোঁজখবর নেইনি তেমনটা নয়। কাশেমকে বেতন দিয়ে আমি তোদের খোঁজখবর নিয়েছি। তোরাও যে আমার খোঁজখবর নিয়েছিস তা কাশেম আমাকে বলেছে। আর সেজন্যই তোদের প্রতি স্নেহ আর ভালোবাসা আমার বেড়েছে। শোন, মাঝে মাঝেই আমি রাগারাগি করি। আসলে তোরা ঠিকই বলিস, রাগারাগি করাটা আমার স্বভাব হয়ে গেছে। ওই যে বলে না, ‘জাত যায় না কইলে, আর স্বভাব যায় না ধুইলে"। ব্যপারটি ঠিক এইরকমই। তাই বলছি, আমার রাগান্বিত ভাবটার জন্য মন খারাপ করিস না। সবসময় ভাববি এইসব আমার মনের কথা না। বাবা-মায়েরা কখনোই সন্তানের সাথে মন থেকে খারাপ আচরণ করে না।’

কথা বলা শেষ করে আনিস উদ্দিন চোখ মুছলেন। সায়েম আর ইতি এতক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল বাবার দিকে। এই বাবাকে যেন ওরা চিনতেই পারছে না। সায়েম তো মনে মনে একবার বলেছিল, ‘নতুন এক বাবা এটা।’ এই লোকটা সারাজীবন মানুষজনকে ধমকিয়েই চুপ করিয়ে রেখেছেন৷ আজকেও ইতি আর সায়েমকে চুপ করিয়ে দিয়েছেন। তবে ধমকিয়ে না, ইমোশনালি আঘাত করেছে সরাসরি। 

সায়েম আর ইতিকে চুপ থাকতে দেখে আনিস উদ্দিন চটে যাওয়া গলায় বলল, ‘মুখে কী গ্লু লাগিয়ে রেখেছিস দু'জনে? নাকি একটু ভালো আচরণ করেছি বলে মাথায় ওঠে বসেছিস দু’জনে।’

ইতি হেসে দিয়ে বলল, ‘এখন আর যতই মেজাজ দেখাও না কেন? আমরা ভয় পাচ্ছি না।’

আনিস উদ্দিন চোখ গরম করে তাকালো ইতির দিকে। সায়েম বলল, ‘একদম ঠিক। এতদিন শুধু শুধু ভয় পাচ্ছিলাম।’

- ঠিক আছে। ঠিক আছে। এত পাকনামি করতে হব না। রেডি হয়ে নে দু'জনে। ফাহাদের বাড়িতে যেতে হবে।

- কিন্তু বাবা ফাহাদের মনটা এখন ভালো নেই। ও, ওর বোনের সাথে অনেক রাগারাগি করেছে।

- বাট রোদকে আমি বিশ্বাস করতে পারছি না৷ ও যদি আবারও ইতির সাথে খারাপ কিছু করার চেষ্টা করে। বারবার তো আর ইতি বেঁচে যাবে না। সুতরাং আমি চাই খুব তাড়াতাড়ি ফাহাদের সাথে ওর বিয়েটা সেড়ে ফেলতে।

সায়েম ইতির দিকে তাকালো। ইতি সম্মতি জানালে ফাহাদও রাজি হয়ে গেল।

সায়েম, ইতি, আর আনিস উদ্দিন ড্রয়িংরুমে বসে আছে। আর ওদের সামনে বসে আছে ফাহাদের মা। ফাহাদ পাশেই দাঁড়িয়ে আড়চোখে ইতিকে দেখছে। ইতির পরনে আকাশী-নীল রঙের শাড়ি, আর ফাহাদের পরনে একটা পাঞ্জাবি। ইতি মুচকি হাসি দিয়ে ফাহাদের দিকে তাকালো। ফাহাদ ইশারায় বলল দু’তলায় আসতে। ইতি সায়েমকে বলল, ‘ভাইয়া, আমি একটু রাফার সাথে দেখা করে আসি।’

সায়েম আড়চোখে ফাহাদের চোখের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘শালা হারামি, এত অধৈর্য হলে কীভাবে চলবে?’

ইতি আবারও বলল। সায়েম সম্মতি জানালো। ইতি বসা থেকে ওঠে দু'তলায় যেতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর ফাহাদ-ও দু'তলায় চলে গেল। কয়েকটা ঘর খুঁজেও পেলো না ইতিকে। হঠাৎ কেউ একজন হাত ধরে টান দিয়ে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল ফাহাদকে। ফাহাদ চমকে ওঠে সামনে তাকিয়ে দেখল ইতি মুচকি মুচকি হাসছে। ফাহাদকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ইতি ওকে জড়িয়ে ধরল। ফাহাদের বাহুডোরে এলোপাতাড়ি চুমু দিতে লাগল ইতি। ফাহাদ ইতিকে জাপটে ধরে কানের কাছে মুখটা নিয়ে বলল, ‘আস্তে ইতি।’

ইতি থেমে গেল। ফাহাদ ইতির কানের নিচে চুমু দিয়ে ইতিকে পিছনে ঘুরিয়ে নিলো। পিছন থেকে ইতিকে জড়িয়ে ধরে, শাড়ি সরে যাওয়া ইতির উন্মুক্ত পেটে হাত বুলাতে লাগল। ইতি কেঁপে ওঠে বলল, ‘প্লিজ আমাকে পাগল করে দিও না। এমনিতেই তোমার প্রেমে আমি প্রেমাতাল হয়ে গেছি। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে তোমাকে খেয়ে ফেলি। তোমার ঠোঁট, তোমার ঘন কালো চোখ, তোমার মায়াবী কণ্ঠ, আর তোমার পার্সোনালিটি, এসব আমাকে চম্বুকের মতো টানতে থাকে।’

ফাহাদ তবুও ইতির পেট থেকে হাত সরালো না। ইতিকে আরো আকড়ে ধরে ফিসিফিস করে বলল, ‘তোমাকে শাড়ি পরে জাস্ট অসাধারণ লাগছে৷ কখনো সেভাবে ভাবিনি যে, তোমাকে এতটা কাছে পাবো। তোমায় খুব ভালোবাসি ইতি।’

নিজের পেটের উপরে থাকা ফাহাদের হাতের উপর হাত রাখল ইতি। ফাহাদ ইতির পেটটা আরো চেপে ধরল। ইতি শিউরে ওঠে বলল, ‘আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি ফাহাদ ভাইয়া।’

ফাহাদ কিছু বলার আগেই কেউ একজন বলে উঠল, ‘তোমাদের কী মনে হচ্ছে এটা টাংকি মারার জায়গা?’

হঠাৎ কারোর কণ্ঠ শুনে চমকে ওঠে দু'জনে দু'দিকে সরে গেল। ফাহাদ সামনে তাকিয়ে দেখে রাফা দাঁড়িয়ে আছে। একহাতে ফোন, আর অন্য হাতে তোয়ালে। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে আবারও বলল, ‘ফষ্টিনষ্টি করায় এতই ব্যস্ত ছিলে যে, ঘরে কে এসেছে, সেটাও দেখার সময় পাও না।’

ফাহাদ কড়া গলায় বলল, ‘এগুলো কোন ধরনের কথা রাফা? ফষ্টিনষ্টি মানে? আর টাংকি মারছি মানে কী?’

- তোমরা কী তাহলে লুডু খেলছিলে এতক্ষণ? ওই যে সাপের লুডু গেমস টা। ফুস করে সাপ একজন একজন করে খেয়ে ফেলে। অবশ্য তোমরা তো নিজেরাই নিজেদের খেয়ে ফেলার কথা বলছিলে, তাই না?

ফাহাদ ধমক দিয়ে বলল, ‘বড়দের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় সেটা ভুলে গেছিস? আর তুই এখানে কী করছিস?’

- আমার ঘরে আমি থাকবো না তো কে থাকবে শুনি? আর আমার ঘরে এইসব করার সাহস পেলে কোথায়?

ফাহাদ ঘরের চারদিকে তাকালো। বিড়বিড় করে বলল, ‘ধ্যাত!’

ইতি পাশ থেকে বলল, ‘সরি রাফা। আমি আসলে বুঝতে পারিনি এটা তোমার ঘর। আসলে ঘরটা ফাঁকা দেখে ঢুকে পড়েছিলাম।’

- আজ ঘর ফাঁকা দেখে ঢুকে পড়েছ। কাল তো আমার ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দেওয়া শুরু করবে।

ফাহাদ রাফার কাছে গিয়ে বলল, ‘এইসব কী বলছিস রাফা? যে মেয়েটা কিছুদিন পর তোর ভাবী হতে চলেছে, তার সাথে এইরকম ব্যবহার করছিস। আমার ভিষণ অবাক লাগছে তোকে।’

রাফা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, ‘এই মেয়েটা আমার ভাবী! হাও ফানি। এ তো আমার চির শত্রু।’

- রাফা, ভুলে যাস না ওর জন্যই তুই এতদিন সায়েমের সাথে থাকতে পেরেছিলি।

- আর এটাও ভুলে যাইনি এই মেয়েটার জন্যই সায়েমের থেকে আমি দূরে আছি। সেদিন যদি এই মেয়েটা রোদকে বিয়ে করতো, তাহলে সায়েম আর সারার কোনোদিন দেখাই হতো না। সম্পর্ক তো দূরে থাক। সায়েম তখন আমাকে নিঃশব্দে মেনে নিতো।

- সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হয় না রাফা। জীবনটা সবসময় নিজেদের চাওয়া-পাওয়ার উপর নির্ভর করে চলে না। কার জীবন কোনদিকে মোড় নেয়, সেটা স্রষ্টা ছাড়া কেউ জানেন না।

রাফা মোবাইলটা ওদের দু’জনের দিকে ঘুরিয়ে বলল, ‘এইসব বলে কোনো লাভ নেই। বিয়ের আগেই তোমাদের এই কাছাকাছি আসার বেশ কিছু ছবি আমি তুলে নিয়েছি। এখন এগুলো আমি ড্রয়িংরুমের সবাইকে দেখাবো। তারাও দেখুক, তাদের ছেলে-মেয়েরা কেমন। আমার মা ভাববে, যে মেয়ে বিয়ের আগে এইসব কিছু করতে পারে, সে মেয়ে সবই পারে। না জানি স্টুডেন্ট লাইফে আরো বয়ফ্রেন্ড এর সাথে কী কী করেছে। সায়েমের বাবা-ও আমার ভাইয়াকে নিয়ে এইসব ভাববে। শেষে দেখা যাবে, এই বিয়েটাই আর হবে না।’

ইতি কাঁদোকাঁদো চোখে রাফার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি আমার সাথে এইরকম কেন করছ রাফা? এইসব শুনলে আমার বাবা কষ্ট পাবে। আমি তোমাকে কখনো অবহেলা করিনি। বরং তোমাকে আমি ভালোবেসে ছিলাম নিজের বোনের মতোই। এরপর যা যা হয়েছে সবটাই তোমার কর্মের জন্য।’

রাফা খিলখিল করে হেসে দিয়ে বলল, ‘বিষয়টা আসলেই হাস্যকর। কাঁদো ইতি আপু, কাঁদো তুমি। তোমাকে দেখে আমার শান্তি লাগছে খুব। তোমরা যেমন আমাকে শান্তিতে থাকতে দেওনি, তেমনি আমিও তোমাদের শান্তিতে থাকতে দিবো না।’

ফাহাদ বলল, ‘তার মানে এখন থেকে আমাকে ভাবী আর ননদের মধ্যেকার মনমালিন্য, রাগ, ঝগড়া দেখে দিন পাড় করতে হবে। প্লিজ রাফা, এবার এই ঝামেলার ‘ইতি’ টেনে দে। এর সমাপ্তি আমি চাই প্লিজ। তোর কাছে এটাই আমার অনুরোধ। এক জীবনে এই গল্প নিয়ে আর চলতে পারছি না আমি।’

- হুম দিবো তো। খুব শীঘ্রই এর ‘ইতি’ টেনে দিবো। আর আমি ট্রিপিকাল বাঙালিদের মতো নই, যে বাকি জীবনটা একজনের সাথে ঝগড়া করে কাটাবো। ভাবী আর ননদের ঝগড়া আমিও চাই না। এটা তো কাকীদের সময়ের মূলমন্ত্র ছিল। তারা ভাবতো এভাবেই স্বাধীনতা আসবে। বাড় এখন তো মানুষ এবং সময়, দু'টোই আপডেট হয়েছে, তাই না? সেজন্যই তো এর সমাপ্তির ব্যবস্থা আমি করছি। তবে এইরকম সাদামাটা ভাবে না। সাংঘাতিক একটা ধামাকা দিয়ে এই গল্পের ‘ইতি’ টানবো। এমন একটা ধামাকা হবে যে, সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে। শুধু একটু অপেক্ষা কর। খুব বেশি দেরি নেই। ধামাকা শেষে সব এই গল্পের সব শেষ। নতুন এক গল্প শুরু হবে।

ফাহাদ ভীত গলায় বলল, ‘তুই কী ইতি বা ফাহাদের কোনো ক্ষতি করার প্ল্যান করছিস রাফা? প্লিজ, আমি তোর পায়ে পড়ি।’

রাফা রহস্যময় একটা হাসি দিয়ে বলল, ‘জাস্ট ওয়েট এন্ড সি।’

হঠাৎ রাফার হাতের ফোনটা বেজে উঠল। ফাহাদ আড়চোখে রাফার ফোন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই স্তব্ধ হয়ে গেল। বড় বড় করে ঢোক গিলে ইতির দিকে তাকালো। ইতি কৌতূহলী হয়ে তাকাচ্ছে ফাহাদ আর রাফার দিকে।

(চলবে...)

আরো পড়ুন ২৯তম পর্ব- ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড