• বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ১৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ধারাবাহিক গল্প : এক পলকের একটু দেখায় (৭ম পর্ব)

  সাবিকুন নাহার নিপা

১৯ নভেম্বর ২০১৯, ১৩:১৬
গল্প
ছবি : প্রতীকী

খুব সকালে সিদ্ধেশ্বরী গেল সৈকত। দরজা খুলে তাওসিফ ওকে দেখে ভুত দেখার মতো চমকে ওঠে। এই কয়দিনে কি চেহারা হয়েছে সৈকতের। আতঙ্কিত গলায় বলল, ‘এতদিন কোথায় ছিলি? তোর এই অবস্থা কেন?’
সৈকত স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বলল, ‘ভাই ভিতরে এসে বলি?’
ঘরে ঢুকতেই তাওসিফ আবারও বলল, ‘তোর সমস্যা কি বলতো?’
সৈকত আধ খাওয়া পানির গ্লাসটা টেবিলে রাখতে রাখতে বলল, ‘আমি অসুস্থ ছিলাম। জ্বর ছিলো খুব।’
তাওসিফ অবিশ্বাস্য গলায় বলল, ‘বাহ! আর মোবাইলে কি হয়েছিল?’
- মোবাইল নষ্ট হয়েছিল। 
তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে তাওসিফ বলল, ‘তুই কি ভাবিস সৈকত তোর এই কথাগুলো আমি বিশ্বাস করবো?’
সৈকত নির্লিপ্ত গলায় বলল, ‘আমি সত্যি বললেও তুমি বিশ্বাস করবে না আর মিথ্যে বললেও করবে না। এর আর নতুন কি!’
তাওসিফ কোনো উত্তর না দিয়ে কফি বানাতে গেল। কফির মগ সৈকতের হাতে দিয়ে বলল, ‘তারপর, বাড়ি পাল্টানোর অজুহাত হিসেবে কি মিথ্যে বলবি?’
সৈকত সেকথার উত্তর না দিয়ে কফিতে চুমুক দিলো। তারপর বলল, ‘তোমার কি খবর?’
- আপাতত আর কোনো খবর নেই।
- নেক্সট প্ল্যান কি?
- আপাতত যে করেই হোক মাকে খুঁজে বের করা।
- শুধুই মাকে?
তাওসিফ কফির মগ নামিয়ে সৈকতের মুখোমুখি বসে চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘একমাত্র সেই মানুষটা আমাকে একটু বোঝার চেষ্টা করেছিল। আর আমি তাকে জেনেশুনে আঘাত করেছি। তার জন্য অনুতপ্ত। ক্ষমা চাওয়ার জন্য হলেও তাকে আমার দরকার।’

সৈকতের মুখে তির্যক হাসি, যেটা তাওসিফের চোখ এড়ালো না। সৈকত জিজ্ঞেস করল, ‘যদি খালার সাথে দেখা হয়ে যায় আর খালা যদি ওই মেয়েটাকে বিয়ে করতে বলে তখন?’
তাওসিফের কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়ল। সৈকতের কথা ফেলে দেয়ার মতো না। সত্যিই যদি মা ওই মেয়েটাকে বিয়ে করতে বলে!


সিসিলিয়া আজও ইউনিভার্সিটি তে যায়নি। ঘুম থেকে উঠতে উঠতে প্রায় ১০টা বেজে গেছে। হাতমুখ ধুয়ে রান্নাঘরে যেতেই অনন্যা বলল, ‘লিয়া তোমাকে গরম গরম রুটি ভেজে দেই?’

সিসিলিয়া মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল ঠিকই কিন্তু ওর এখন রুটি খেতে একটুও ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে করছে ইলিশ মাছ ভাজা আর খিচুড়ি খেতে। 

সিসিলিয়া কে খেতে দিয়ে অনন্যা বলল, ‘বাবা কি কিছু বলেছে লিয়া?’
- না তেমন কিছু বলেনি।
- আমি একবার ভাবলাম ফোন করি, কিন্তু বাবা রেগে যাবে বলে করিনি।
সিসিলিয়া স্মিত হেসে বলল, ‘তুমি জানো না অনন্যা! আঙ্কেল তোমাকে অনেক পছন্দ করেন। কিন্তু ভাব করেন যে তোমাকে দেখতে পারেন না।’
অনন্যা একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, ‘অপছন্দ করাই তো স্বাভাবিক। বেকার ছেলের সাথে যে মেয়ে পালিয়ে আসে তাকে অপছন্দ করাই উচিত।’
সিসিলিয়া অনন্যার একটা হাত নিজের গালের সাথে চেপে ধরে বলল,
- জানো অনন্যা আমার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মেয়ে তুমি। যে প্রেমিকের দুর্দিনে শক্ত হাতে হাত ধরে রেখেছে৷ ভালোবাসা কে বাঁচিয়ে রাখতে যে নিজের ফ্যামিলি কে ছেড়ে এসেছে সে কখনো কারো অপছন্দের হতে পারেনা। 
অনন্যা হাসলো। সিসিলিয়া একটু উদাস গলায় বলল,
- অনেকেই আছে কথা দিয়ে কথা রাখে না। মাঝ নদীতে ছেড়ে দিয়ে একবারও পিছু ফিরে তাকায় না। নিজের  ভালো থাকার জন্য অন্য মানুষ কেও জীবন্ত লাশ বানিয়ে দেয়!
অনন্যা খেয়াল করল সিসিলিয়ার চোখে অশ্রু টলমল করছে। প্রসঙ্গ এড়াতে বলল,
- তোমার খাবার ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে লিয়া। তাড়াতাড়ি খাও। আর আজ কিন্তু আমার সাথে একটু কাজ করতে হবে হুম!
সিসিলিয়া চোখভর্তি পানি নিয়েই হাসল। অনন্যা মুগ্ধ নয়নে সেটা দেখল।

সৈকতের কথাটা তাওসিফকে খুব ভাবাচ্ছে। তাওসিফ শুকনো ঢোক গিলে বলল,
- সৈকত! 
- হু।
- এমন ও তো হতে পারে যে সেই মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে।
সৈকত হাই তুলতে তুলতে বলল,
- হতে পারে।
তাওসিফ প্রচণ্ডরকম বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আমার মাথায় দিলি তো টেনশন ঢুকিয়ে!’
চমকানোর ভান করে সৈকত বলল, ‘আমি কি করলাম? আমি তো আরও তোমার ভালোর জন্য বললাম।’
তাওসিফ দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘তুই শালা কতো ভালো যে আমার চাস সেটা আমার জানা আছে। কেন সেদিন তুই মেয়েটাকে বিয়ে করলি না! তুই তো আর তাওসিফ অনুভব না। মেয়েটা তোর লেভেলের ই তো ছিলো। তাহলে ভাব কি জন্য দেখালি সেদিন?’
- একটা মেয়েকে না দেখে মন্তব্য করা কি ঠিক! মেয়েটাকে তো তুমি দেখনি। তাহলে বুঝলে কি করে যে সে তোমার যোগ্য না? হতেও তো  পারে তুমি তার যোগ্য না!

তাওসিফ সৈকতকে দেখতে লাগলো ভালো করে। ওর চোখে এক ধরনের তাচ্ছিল্য, যেটা তাওসিফ স্পষ্ট বুঝতে পারছে।


বিকেলে সিসিলিয়া টুকটাক জিনিস কেনার জন্য দোকানে গেল। গলির মোড়ের চায়ের দোকানের কয়েকটা ছেলে উল্টা পাল্টা কথা বললে সিসিলিয়া উত্তর দেয়ার জন্য এগিয়ে যেতে গেলেই তখন পেছন থেকে সৈকত চিৎকার করে ডাকল, ‘ভাবি!’

সিলিলিয়া চমকে উঠে পেছনের দিকে তাকালো। সৈকতকে দেখেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সৈকতের এক হাতে বাজারের ব্যাগ অন্য হাতে ছবি আঁকার সরঞ্জাম। সিসিলিয়ার দিকে একটা ব্যাগ বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘একটু হেল্প করেন ভাবি। সদ্য জ্বর থেকে উঠেছি তো! গায়ে একদম শক্তি নেই। কয়েকদিন কমপ্ল্যান কিংবা হরলিক্স খাওয়া দরকার।’

সিসিলিয়া কিছু বলল না। রাগে ফুসতে ফুসতে ব্যাগটা হাতে নিলো। ব্যাগ হাতে নিতেই বুঝলো সৈকত ইচ্ছে করে ওকে ভারী ব্যাগ দিয়েছে। রাস্তাঘাটে কিছু বললে লোকজন দেখবে তাই সিসিলিয়া চুপ করে রইলো। কিন্তু সৈকত একটু সময়ও চুপ করে থাকলো না। 

বাড়িতে ঢুকতেই সৈকত বলল, ‘ভাবি আপনাকে তো বলাই হয়নি, আপনার পিঁপড়ে চা খুব কাজে দিয়েছে। একদম ক্লিন এন্ড ক্লিয়ার।’
সিসিলিয়া গমগমে গলায় বলল, ‘আপনি এত অসভ্য কেন?’
সৈকত কাচুমাচু মুখ করে বলল, ‘আমি আবার কি করলাম?’
- আপনি রাস্তায় বসে ভাবি কেন ডাকলেন?
- যা বাবা, রাস্তাঘাটে অন্য কিছু ডাকতে হবে! কি ডাকতে হবে আন্টি?
সিসিলিয়া রাগে কাপতে শুরু করল। চিৎকার করে বলল, ‘আপনি কি জানেন, আপনি একটা জাত অসভ্য?’
সৈকত দাঁত বের করে বলল, ‘বিশ্বাস করেন আগে সত্যিই জানতাম না। ভাগ্যিস আপনি বললেন। না হলে জানতাম কি করে?’ 
- আপনি একটা ছোটলোক। 
- ভাবি আপনি রেগে আছেন। আপনার উচিত কঠিন কিছু গালি দেয়া।
সিসিলিয়া এখনও রাগে কাঁপছে। আগের মতোই উঁচু গলায় বলল, ‘আপনি একটা ইতর।’
সৈকত একগাল হেসে বলল, ‘যাহ, এগুলো তো সব ভদ্র গালি।’
অনন্যা চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ শুনে ছুটে এসে শুনল সিসিলিয়া সৈকত কে বলছে, ‘তুই একটা কুত্তা। তুই ভাদ্র মাসের পাগলা কুত্তা।’ 
সৈকত হাসি হাসি মুখে বলল, ‘এইবার ঠিক আছে। কিন্তু ভাদ্রমাসের কুত্তা বলায় আমি কিন্তু একটু লজ্জা পাচ্ছি।’
সৈকত লজ্জা পাওয়ার অভিনয় করছে, ‘সিসিলিয়া তখনও রাগী চোখে তাকিয়ে আছে। আর অনন্যা বিস্মিত চোখে দু’জনকে দেখছে।’

(চলবে...)

আরো পড়ুন ৬ষ্ঠ পর্ব- ধারাবাহিক গল্প : এক পলকের একটু দেখায়

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড