• শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ১৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

গল্প : একলা বাবা (শেষ পর্ব)

  মুহাম্মদ বরকত আলী

১৭ নভেম্বর ২০১৯, ১৩:০৭
গল্প
ছবি : প্রতীকী

নিশুতি রাত। হয়তো বা পৃথিবীর সকল প্রাণী এখন ঘুমিয়ে গেছে, জেগে আছে শুধুমাত্র এই দুটি নিরীহ প্রাণ। ঘরে মধ্যে হারিকেনের নিভুনিভু আলো ছায়ার খেলা। ফুলবানু চিকন স্বরে বলল, ‘একটা কথা কমু?’ মনুমিয়া দুই হাতের উপর মাথা রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। মনুমিয়া নীরবতা কাটিয়ে বলল, ‘কি কথা?’ কথা বলার সুযোগ পেয়ে যায় ফুলবানু। এক হাতের কুনোই বালিশে ঠেকিয়ে তালুর উপর মাথা রেখে বলল, ‘কাজলের মা কইছিলো মেয়েরা নাকি তোমারে ঐ বাড়িতে নিবার চায়। তোমারে ভালো ডাক্তার দেখাইব। মেয়েরা শিক্ষিত। জামাইদেরও বেশ জানা শোনা আছে। তোমারে সুস্থ করনের জন্যি সব কিছুই করবে ওরা। তাই কইতাছি তুমি ঐ বাড়িতে চইলা যাও।’ 

ফুলবানু এভাবে অবিরাম বলে যায়। মনুমিয়া শুনতে থাকে। কিছুক্ষণ কথা থামায় ফুলবানু। নীরব হয়ে আসে ঘর। মনুমিয়ার কোনো উত্তর না পেয়ে আবারও শুরু করে ফুলবানু, ‘কথা কও না ক্যান? তোমার ভালোর জন্যিই বলছি গো।’ মনুমিয়া দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে কাঁপাকাঁপা শ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘জানি, তোমার খুব কষ্ট হইতাছে আমার জন্যি। তোমার বোঝা হইয়া গেছি তাই না ফুলবানু?’ 

ফুলবানু শোয়া থেকে উঠে বসে। পা দু’খানা সামনে মেলে দিয়ে বলে, ‘ছি ছি, ও কথা কও ক্যান? আমার পাপ হইব যে। তুমি কি আমারে পাপি করবার চাও? আমি চাই তুমি আগের মত সুস্থ হইয়া ওঠো। তোমার ভালোর জন্যি কইতাছি এসব। মেয়েরা তোমারে চিকিৎসা করাইবো। তুমি সুস্থ হইয়া উঠবা।’ 

মনুমিয়া হেঁয়ালি স্বরে বলে, ‘তাই নাকি? মেয়েরা আমারে কত্ত ভালোবাসে তুমি জানো? রাস্তায় দেখা হইলে আমারে দেইখা থুতু ফেলে। গালি দেয়। আমার মরণ কামনা করে। এই হইল মেয়েদের ভালোবাসার নমুনা। হাসপাতালে এক সপ্তাহ পইড়া ছিলাম একটিবারও চোখের দেখা দেখতে আইছে? দূর থেইকা একটিবার টুকি মারছে? ওদের স্বভাব হইছে মায়ের মত। কষ্ট কইরা বড় করছি, শিক্ষিত করাইছি, ভালো ঘর দেইখা বিয়া দিছি, এরপরও ওদের বাবা অকর্মা, বলদ, কাপুরুষ। এমন বাবাকে ওরা চায় না ফুলবানু। সব অভিনয়, মিথ্যে মায়া।’ 

ফুলবানু বোঝাতে থাকে মনুমিয়াকে। ‘রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন হয় না গো। এদ্দিন অভিমান ছিল ওদের। এখন হয়তো অভিমান কাটছে। বাবার অসুখ দেইখা কোনো সন্তান চুপ থাকবার পারে না গো। আমি তো তোমারে ভালো কইরা ডাক্তার দেখাইতে পারতাছি না। এখানে পড়ে থাইকা বিনা চিকিৎসায় ক্যান মরবা?’ 

মনুমিয়া এবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসে। ফুলবানুর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আমারে তাড়ায়া দিবার চাও ফুলবানু? আমি  কি সত্য সত্যই তোমার বোঝা হইয়া গেছি?’ ফুলবানু ফুঁপিয়ে ওঠে। আঁচল দিয়ে চোখ মুছে। কান্না ভেজা কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘না গো না, আমি তোমারে তাড়াইতে চাই না। আমি চাই তোমার রোগ মুক্তি। এছাড়া আমি যে আর কোনো উপায় দেখতাছি না।’ 

মনুমিয়া নীরব হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর বলেন, ‘আমি ঐ বাড়িতে গেলে তোমার কি হইব? না খাইয়া মরবা যে। এই বাড়িতে তোমারে দাসী কইরা রাখবো।’ ফুলবানু বলেন, ‘কিচ্ছুটি হইব না আমার। এই বাড়িতে না হয় ঝিয়ের কাম কইরা বাকি জীবন পার কইরা দিমু। কায়েসের বৌ লাথি ঝাঁটা মাইরা আমারে দুবেলা দু’মুঠো ভাত দিলেও তোমারে যে দিবার চায় না গো। ওরা শুধু একজনের খাবার দেয়। তোমারে একবেলা পেট ভোরে খাওয়াইতেও পারি না। এখানেই তো আমার মরণ।’ হঠাৎ মুখ ফসকে আসল কথা বের হয়ে যায় ফুলবানুর। কায়েসের বৌ যে খিটিমিটি করে তা মনু জানে। কিন্তু একথা জানা ছিল না যে, অসুস্থ মনুকে একবেলা খাবার দিতে তাদের বড্ড কষ্ট হয়। ফুলবানু কামলা খাটবে সেটাও পারে না। ছেলের অনেক জানা শোনা পরিচিত মানুষ আছে। তখন লোকে বলবে তোর মা কামলা খাটে? ছেলের অপমান হবে এই ভেবে যেতে পারে না। একবার রাস্তার মাটি কাটা কাজে যাওয়ার জন্য বলেছিল ছেলেকে। কামলা খাটার কথা শুনে কায়েসও কড়া গলায় বলে দিয়েছে, ‘এ বাড়িতে থাইকা ওসব হবে না।’ 
ফুলবানু বলেন, ‘এখন আমার কোনো উপায় নেই। কায়েস এখনো তোমারে মেনে নিতে পারে নাই।’ 

চুপ থাকে দুজন। একদম চুপ। মনুর ইচ্ছে হয় বেঁচে থাকতে। ইচ্ছে হয় আবারও আগের মত কাজ করে নিজের আয়ে সংসার চালাতে। কিন্তু সে অসহায়। কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে গেছে। যখন সুস্থ হতে মন চায় তখন ভাবে যাবে মেয়েদের কাছে। অসুখ ভালো হলেই ফিরে আসবে ফুলবানুর কাছে। আবার ভাবে, তাহলে কি সে শুধু অসুখ দেখাতেই যাবে ঐ বাড়িতে? মেয়ে, স্ত্রীর জন্য তার এতটুকুও ভালোবাসা নেই? বিবেকের কাছে প্রশ্ন করে। উত্তর পায় না। না, সে অভিনেতা নয়। এমন অভিনয় করতে পারবে না মনু। ফুলবানুর কান্নার শব্দ পাওয়া যায়। মনুমিয়ার হাত ধরে বলে, ‘ওগো তুমি আর না কইরো না। তোমারে পর কইরা দিবার জন্যি কইছি না, তোমার অসুখ ভালো হওয়ার জন্যিই আমার এই অনুরোধ।’

অনেক বোঝানোর পর রাজি হয় মনুমিয়া তার জন্মভিটায় শেষ আশ্রায় নিতে। এদিকে প্রথম স্ত্রী শর্ত জুড়ে দেয়, মনুকে এ বাড়িতে আসতে হলে ফুলবানুর সাথে কোনো প্রকার সম্পর্ক বা যোগাযোগ করতে পারবে না। এই শর্ত মেনেই তকে এই বাড়িতে ঢুকতে হবে। একথা শুনে মনুমিয়া আবার বেঁকে বসে। মনুমিয়া ভাবতে থাকে, একদিন যেমানুষটা তাকে এতটুকু ভালোবাসা দিয়ে আশ্রয় দিয়েছিল আজ কিনা নিজের স্বার্থের জন্য তার সাথে সম্পর্ক ছেদ করে চলে যেতে হবে? তাই যদি হয় তাহলে কখনোই সে ঐ বাড়িতে যাবে না। চিকিৎসার অভাবে আর অনাহারে এখানে পড়ে থেকে মরবে তবুও যাবে না ঐ বাড়িতে। ফুলবানু স্বর বদলায়। একপ্রকার বাধ্য হয়ে বলতে থাকে, ‘তোমার চিকিৎসা করাতে পারুম না। বসে বসে খাওয়াইতে পারুম না। আমি মেয়ে মানুষ হয়ে মাঠে ঘাটে কাজ করে তোমারে পুষতে পারুম না।’ কথা শেষ করেই মুখে কাপড় গুজে কান্না চেপে রাখে ফুলবানু। মনুমিয়াও জানে ফুলবানু কথা গুলো বলতে বাধ্য হয়েছে। তার কিছুই করার নেই। ছেলের সম্মান ক্ষুণ্ণ হয় এমন কাজ সে করতে চায় না। মনুর অসুস্থ তারপর ছেলের আশ্রয়ে থাকতে হয় তাদের। ছেলের সম্মানের কথা ভেবে অন্যের বাড়িতে কিংবা মাঠে ঘাটে কামলা খাটতে পারে না। ছেলেকে মনুমিয়াও কম ভালোবাসে না। ছোটবেলায় এই মনুমিয়ার উপার্জনেই খেয়ে, পরে বড়ো হয়েছে কায়েস। মোকামে দোকান করে দেওয়া, ভিটে বাড়ির জমি কেনা, ঘর তৈরি এসবই মনুর জমানো টাকায় হয়েছে। কিন্তু তবুও কায়েস মনুকে মেনে নিতে পারেনি, আপন ভাবেনি। 
মনুমিয়ার চোখে জল। ভাষা হারিয়ে গেছে। মনে মনে ভাবে তাহলে কি তার প্রথম স্ত্রী আর মেয়েদের কাছে সে হেরে যাবে? যেদিন বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল সেদিন ওরা বলেছিল, ‘একদিন এই আমাদের পা ধরতে হবে তোকে।’ তাহলে কি আজ সেই দিন?’ মনুমিয়ার মন সায় দেয় না। কিন্তু অন্য কোনো উপায়ও খুঁজে পায় না। শরীর চলে না। পৃথিবীর অন্য সব প্রাণিদের মত মনুও চায় বাঁচতে। বাস্তবতার কাছে হার মানে মনুর অভিমান, আবেগ। 

গোটা বিশ বছর পর যেদিন পা রাখল তার জন্ম ভিটেয় সেদিন শুধু ডুকরে ডুকরে কেঁদেছিল মনু। এই তার জন্ম ভিটে। এই বাড়িতেই তার নাড়ি পোতা, এই ভিটেতেই তার বেড়ে ওঠা। কিন্তু একদিন এই ভিটে ত্যাগ করেছিল একটু ভালোবাসার জন্য, একটু সুখের আশায়। সুখ সে পেয়েছিল ক্ষণিকের জন্য। শরীরে সেই সুখ মেনে নিতে পারল না। বাড়ির চারিদিকে চোখবুলায় আর ভাবে এই বাড়ি কি এখনো সেই নরক হয়েই আছে? নাকি তার শূন্যতায় কখনো কখনো হাহার করছে? কখনো কি মনুর অভাব বোধ করেছে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে বেশিদিন সময় লাগেনি। প্রথম উত্তরটা এসেছিল তার স্ত্রী শেফালির কাছ থেকে। প্রথম দিন রাতের বেলা ভাতের থালাটা এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘কইছিলাম না, একদিন এই শেফালির পা ধরতে হইব? আগে ছিলি শুধু অকর্মা, এখন অকেজো আর বোঝা ছাড়া কিছুই না। মনে করছিস তোর প্রসাব-পায়খানা সাফ করবার জন্যি নিয়ে আইছি? ভুল ভাবছিস, লোক লজ্জার ভয় তোর না থাকলেও আমার আছে।’ মনুমিয়া হা হয়ে যায় এসব কথা শুনে। যে বিশ্বাসের উপর ভর করে এখানে এসেছে সেই বিশ্বাসের ডানা মড়মড় করে ভেঙ্গে যায় মুহূর্তেই। তাহলে কি তার এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ফুলবানুকে ছাড়তে বাধ্য করেছে? ভাতের থালা পড়ে থাকে সামনে। ও ভাত গলা দিয়ে নামবে না। মনুমিয়া কোনো উত্তর করে না। চুপচাপ শুনে যায় সব।

দু’মাস অতিবাহিত হয়েগেল মনুমিয়ার উন্নত চিকিৎসার কথা দূরে থাক যেটুকু চিকিৎসা হচ্ছিল সেটুকুও আজ বন্ধ হয়েছে। ফুলবানুর সাথে দেখা হয় না। ফুলবানুর ইচ্ছে হলেও দেখা করার চেষ্টা করে না। লোক মুখে খবর নেয়। এখন আর মায়া বাড়াতে চায় না। সে চায় ভালো থাকুক মানুষটা। আসলে কি ভালো আছে মনু? কি করবে ভেবে পায় না মনু। বাড়ির বাইরেও বের হতে পারে না। শেফালি দু’বেলা দু’মুঠো ভাত দিয়ে বিদায় হয়। সেই পুরনো অভ্যাস এখনো যায়নি। মায়ের বাড়ি আর এপাড়া সেপাড়া করে দিন পার করে। মেয়েরা দুদিন অন্তর অন্তর আসে। মায়ের সাথে কি নিয়ে আলাপ করে। আবার চলে যায়। মনুর সামনেও আসে না। মনুর বুক ফাঁকা ফাঁকা লাগে। বুকের ভিতর কে যেন কুড়াল দিয়ে কোপাতে থাকে।

আজ সকালবেলা মনুমিয়া বিছানা থেকে উঠতে না উঠতেই দুই মেয়ে হাঁজির। মনুমিয়া বিছানায় উঠে বসে। পাশে বসে দুই মেয়ে। মনুর মুখ হাসিতে ভোরে ওঠে। কত দিন কথা হয় না। কত দিন বাবা ডাক শোনা হয় না মনুর। মনুমিয়া কিছু বলার আগেই বড় মেয়ে বলে, ‘ভিটে বাড়িটা আমাদের দুই বোনের নামে লিখে দাও, আমরা তোমার চিকিৎসা করাবো।’ মনুর মুখ মলিন হয়ে যায়। মেয়েদের কথা আর সে শুনতে পায় না। কিছুক্ষরণ চুপ করে থাকে। ভাবতে থাকে, এই সামান্য সম্পদটুকুর লোভ সামলাতে পারলো না। নাকি তার বাবাকে তাদের বিশ্বাস নেই? মনুর মনে কখনোই এই ভাবনা আসেনি যে, ভিটে বাড়িটা তার নামে আছে। মেয়েদের মতলব এবার  তার কাছে পরিষ্কর। তাদের ধারণা বাড়ির জমিটুকু যদি চিকিৎসার জন্য বিক্রি করে দেয় কিংবা কায়েসের নামে লিখে দেয়তো সর্বনাশ হয়ে যাবে। যদি তাই হতো তাহলে এই বিশ বছরের মধ্যে সে বিক্রি করেনি কেন? মনু কি তার বাপ দাদার ভিটে অন্যের কাছে বিক্রি করে দিবে? মনু শুধু এতটুকু বলে, ‘তোমাদের যা ভালো লাগে তা কর মা।’ 

পরের দিন কাগজ তৈরি করে মনুর সামনে ধরে সাক্ষর করতে। মনু শুধু এতটুকুই বলে, ‘তোমাদের অকর্মা বাবা সাত বিঘা জমি দিয়েছে সেই বিশ বছর আগে, এখন আবার এই ভিটেবাড়ির জমিটাও নিতে চাও? আমারে নিঃস্ব কইরা তোমরা সুখি তো? তোমাদের সুখের জন্য এটুকুও বিসর্জন দিলাম মা।’ 

নিকষ কালো রাতের অন্ধকার। বৃষ্টির তোড় কমেছে, তবে একেবারে ছাড়েনি। ঝিরঝির করে ঝরছে সারা রাত। বিকেল থেকে শুরু হয়েছিল বৃষ্টি। একটানা মাঝ রাত পর্যন্ত ঝুম বৃষ্টি। বাইরে বয়ে চলা কলকল পানির শব্দ। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মনুমিয়ার চোখে ঘুম নেই। সারারাত বারান্দার বিছানায় বসে আছে বাইরের দিকে তাকিয়ে। সকালবেলা জমি রেজিঃ করে মেয়েরা চলে গেছে। সেই থেকে মনু বিছানায় বসেছে, এখন অব্দি একবারের জন্যও ওঠেনি। স্ত্রী ও মেয়েরা কেউ আর দেখা করিনি। দুপুরে এক থালা ভাত দিয়ে গেছে। সেই ভাত পড়ে আছে পাশে। থালার চারিদিকে পিঁপড়ারদল লাইন ধরেছে। ভাতের থালার দিকে ফিরে তাকায়নি মনু। একফোটা পানিও স্পর্শ করেনি। কার জন্য দু’চোখ অপেক্ষা করছে তা মনুমিয়া ছাড়া দুনিয়ার কেউ যানে না। 

আন্দাজ করে বলা যায় কিছুক্ষণ পরেই  ফজরের আযান পড়বে। মনুমিয়া হঠাৎ কি মনে করে গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। পাশে পড়ে থাকা লাঠিটা হাতে নিয়ে পা বাড়ায় উঠানে। নিস্তব্দ রাত। ঝিরঝিরে বৃষ্টি এসে পড়ছে সারা শরীর। অন্ধকারেও বাড়িটার চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। এবার সামনের দিকে পা বাড়াল। বাড়ির বাইরে আসে। রাস্তায় জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে পা ডুবে যায়। সামনের দিকে পা বাড়ায়। তেমাথা রাস্তায় উঠতেই দোকানের ছাউনির তলে আশ্রয় নেওয়া কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করে উঠে। দু একবার ঘেউ ঘেউ করে নিরব হয়ে যায়। হয়তোবা মনুমিয়াকে চিনতে পেরে তার ডাক বন্ধ করে দিয়েছে। রাস্তায় শুধুমাত্র বৃষ্টির পানি গড়ানের দিকে নেমে যাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। লাঠিটায় ভর দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে মনু। একসময় এসে দাঁড়ায় ফুলবানুর বাড়ির উঠানে। চুপিচুপি একটা টোকা দেয় ফুলবানুর দরজায়।  দরজায় একটা টোকার শব্দে ঘুম ভাঙ্গে ফুলবানুর। মনুমিয়া আবারও টোকা দেয় আর বলে, ‘ফুলবানু।’ ফুলবানু এবার নিশ্চিত হয়। এতদিন কি তাহলে ফুলবানু এই একটা টোকার শব্দের অপেক্ষায় ছিল? দরজা খুলে দেয়, বাইরে আসে ফুলবানু। মনুমিয়া কাক ভেজা হয়ে গেছে। ফুলবানু মুখে কাপড় গুজে দিয়ে কান্না চাপার চেষ্টা করে। মনুমিয়া বলল, ‘ওরা আমারে চাই না ফুলবানু। ওরা চাই আমার সম্পত্তি। এখন আমি শূণ্য পথের পথিক। তুমি কি একটু আশ্রয় দিবে আমারে?’ 

ফুলবানু কোনো কথা না বলে ঘরের ভিতর ঢোকে। একটা পুটুলি হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসে। শিকল তুলে দেয় ঘরে। উঠানে এসে মনুর ভেজা হাত ধরে। বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে দুজন। এখনো বৃষ্টি পুরোপুরি ছেড়ে যায়নি। ফজরের আযান ভেসে আসছে বৃষ্টি ভেজা বাতাসে। মনুমিয়া জোরে পা চালাতে পারে না। ফুলবানু পিঠে তুলে নেয় মনুকে। মনুমিয়া দুই হাত ফুলবানুর কাঁধের উপর দিয়ে ফুলবানুর গলা জড়িয়ে ধরে থাকে শক্ত করে। মনুকে পিঠে ঝুলিয়ে হাটতে শুরু করে ফুলবানু। ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই ওদেরকে এ গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে কোথাও যেতে চলে যেতে হবে। যেখানে একজন স্ত্রী উপার্জন করে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা আর খাওয়ানো দায়িত্ব নিলে কেউ লজ্জা পাবে না, কেউ লজ্জা দিবে না।  

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড