• সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ (১৯তম পর্ব)

  রিফাত হোসেন

১১ নভেম্বর ২০১৯, ১৫:১২
কবিতা
ছবি : প্রতীকী

রাফা বেশ কিছুক্ষণ বৃষ্টিতে থাকার পর সারার কাছে এলো। সারা গেইটের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে এখনো। হালকা করে দেয়ালের সাথে শরীরটা এলিয়ে রেখেছে। মুহূর্তটা বেশ ভালো ভাবেই উপভোগ করছে ও। রাফার পাগলামিগুলো ওকে আকর্ষণ করছে। ওর মায়ার ফেলে দিচ্ছে বারবার। কিন্তু মানুষ কী আর এত সহজে নিজের ভয়ঙ্কর রূপ পাল্টাতে পারে? হ্যাঁ পারে অবশ্য। তবে সেটা শুধুমাত্র বাইরে থেকেই। যাকে বলে লোক দেখানো। ভিতরে ভিতরে সে ঠিকই আগের ভয়ঙ্কর রূপে থাকে। কথায় আছে না, মানব জাতি বড়ই অদ্ভুত প্রাণী। এই মানব জাতির মনে যে কখন কী  দৌড়াদৌড়ি করে সেটা কেউ জানে না। মেঘ আর বৃষ্টির রহস্য বুঝা গেলেও মানব জাতির রহস্য বুঝা যায় না।

রাফা হঠাৎ গেইটের সামনে এসে সারাকে চমকে দিলো। সারা ক্ষণিকের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল। আর সেই সুযোগে রাফা ওকে চমকে দিলো। সারা বুকে হাত দিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে নড়েচড়ে দাঁড়াল। এরপর বলল, ‘আরেকটু হলে তো আমি স্ট্রোক করতাম। এভাবে কী কেউ চমকে দেয়?’

সারার কথা শুনে রাফা শরীর ঝাঁকিয়ে হাসতে লাগল। বৃষ্টির পানির টুপটুপ ফোটা রাফার চুল বেয়ে পড়ছে। বিন্দু বিন্দু জলে ভেজা ঠোঁট দু’টোয় কেমন রহস্যময় হাসি। শরীর ঝাঁকানোতে মাথার চুল থেকে ছিটকে পড়ছে পানি। রাফা নিজের শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে বলল, ‘মৃত্যু খুবই যন্ত্রণার, তাই না সারা আপু?’

সারা কিছুই বলল না। রাফা হঠাৎ এই কথাটা কেন বলল, সে নিয়ে সারার মনের মধ্যে একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।

সারাকে চুপ থাকতে দেখে রাফা আবারও বলল, ‘তোমাকে যদি আমি এই ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেই, তহলে কেমন লাগবে তোমার?’

রাফার কথাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য সারা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, ‘মনে হচ্ছে তোমার জ্বরটা বেড়ে গেছে রাফা। চলো ঘরে যাই এবার।’

রাফা রাগী কণ্ঠে বলল, ‘সে তো যাবোই। তার আগে বলো তুমি সায়েমের জীবন থেকে সারাজীবনের জন্য চলে যাচ্ছ কবে? সত্যি বলতে, আমি আর এক মুহূর্তও সহ্য করতে পারছি না।’

সারা এবার সিরিয়াস ভঙ্গিতে তাকালো। রাফার কথাগুলো ওকে ভাবাচ্ছে কেন জানি। যদিও ও বিড়বিড় করে বলছে, ‘রাফা মজা করে এইসব বলছে। এইরকম কথা বলার মতো মেয়ে রাফা নয়। ও অত্যন্ত ভালো মনের একজন মানুষ।’

কিন্তু না। রাফা মজা করছে না। রাফা সারার একটা হাত খপ করে ধরে ফেলল। এরপর অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে  বলল, ‘তুমি কী ভেবেছ আমি তোমার হাবভাব বুঝতে পারি না? আরে ভাই, আমি মানুষটা ছোট হতে পারি, বাট আমার বুদ্ধি আর চিন্তাধারার তীক্ষ্ণতা সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা নেই। সায়েমকে পাওয়ার জন্য আমি কী কী করতে পারি, সেটা আস্তেধীরে টের পাবে তুমি। আচ্ছা, এখন তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ, আমার উদ্দেশ্য যদি এতটা নীচ-ই হয়ে থাকে, তাহলে আমি তখন অতটা স্বাভাবিক ভাবে কথা থেকে শুরু করে তোমার সাথে এত ভালো আচরণ কেন করলাম। তাই তো?’

সারা বিস্ময়ে তাকিয়ে বলল, ‘আমি জানি তুমি মজা করছ রাফা। তুমি খুব ভালো একটা মেয়ে। এইরকম কথা তোমাকে মানায় না।’

রাফা মৃদু হাসি দিয়ে বলল, ‘এটা তো তোমার মুখের কথা। কিন্তু মনে মনে তুমি ঠিকই ভয় পাচ্ছ। এক মিনিটের জন্য চোখটা বন্ধ করে নিজেকে প্রশ্ন কর যে, রাফা কী আসলেই খারাপ মেয়ে? নাকি এইসব ফাজলামি করছে। দেখবে, তুমি খুব শীঘ্রই উত্তর পেয়ে যাবে। তবুও আমি তোমাকে একটু সাহায্য করি। আচ্ছা, তোমার মনে কী খটকা লাগেনি, যে রাফা শুধুমাত্র সায়েমকে বিয়ে করার জন্য এতসব কাণ্ড করল, সেই রাফা তোমাকে আর সায়েমকে একসাথে দেখার পরও এত চুপচাপ থাকে কেন? এত স্বাভাবিক ভাবে সবকিছু কেন মেনে নিচ্ছে, এই নিয়ে কী তোমার মনে প্রশ্ন জাগেনি?’

সারা কিছু বলল না। ও একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে চারিদিক থেকে কেউ ওকে চাপ দিচ্ছে। মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। রাফা আবার বলল, ‘তুমি খুবই বোকা, জানো তো সারা আপু। নাহলে তোমার বুঝা উচিত ছিল, যেখানে কোনো স্ত্রী-ই তার স্বামীর প্রেমিকাকে সহ্য করতে পারে না, সেখানে আমার মতো একজন কীভাবে স্বামীর প্রেমিকাকে সহ্য করবে? তবুও আমি সহ্য করে যাচ্ছি সব। এর পিছনেও একটা কারণ আছে৷ তা হলো সায়েম। আমাকে নিয়ে সায়েমের মনে অনেক খারাপ ধারণা ছিল। যা আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছে। এর মূল কারণ হলো আমার এই ভালোমানুষি। সায়েমকে একটু একটু করে আমার প্রতি দূর্বল করে তুলছি। এবং আমি জানি, আমি সফলতার দিকেই এগোচ্ছি।’

সারা ঘৃণা আর রাগের দৃষ্টিতে তাকালো রাফার দিকে। এরপর বলল, ‘ছি: রাফা। তুমি যে এতটা নীচ মানসিকতার মানুষ, তা আমি ভাবতেও পারিনি। আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম। ছোট বোনের মতো ভালোবেসে ছিলাম তোমাকে। আর তুমি এইসব করলে আমার সাথে। এত জঘন্য কাজ কীভাবে হতে পারলে তুমি?’

রাফা হেসে দিয়ে বলল, ‘আমি নীচ মানসিকতার মানুষ না সারা আপু। আর আমি জঘন্য-ও না। আমি যা করেছি, শুধুমাত্র নিজের ভালোবাসার মানুষকে সারাজীবনের জন্য পাওয়ার উদ্দেশ্যে।’

- বাট সেটা আমি হতে দিবো না। আমি সায়েমকে ভালোবাসি।

কথাটা জোর গলায় আর দৃঢ়তার সাথে বলল সারা। রাফার দিকে আর না তাকিয়ে পিছন ঘুরে চলে যেতে চাচ্ছিল। আর তখনই রাফা ওর হাতটা ধরে ফেলল। সারা অবাক হয়ে তাকালো রাফার দিকে। রাফা বলল, ‘এখন যদি জানতে পারো আমার এতক্ষণ বলা কথাগুলো জাস্ট ফাজলামি ছিল। তাহলে তোমার চোখ-মুখের প্রতিক্রিয়াটা কেমন হবে তা দেখতে খুব ইচ্ছে করছে।’

সারা রাগটা সামলাতে পারল না। নিজের হাতটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে ছাড়িয়ে নিলো। রাফার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সায়েম ঠিকই বলে, তুমি আসলেই একটা সাইকো। আমার এই হাতের থাপ্পড় খাওয়ার পর তোমার চোখ-মুখের রিয়েকশন কেমন হবে, সেটাও দেখতে খুব ইচ্ছে করছে আমার। কিন্তু তোমার সৌভাগ্য, আর আমার দূর্ভাগ্য যে, যাকে তাকে মেরে নিজের ব্যক্তিত্বকে অপমান করতে চাই না আমি।’

রাফা কিছু না বলে রাগে ফুসতে ফুসতে সিড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল। সারা সেখানেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে রাগটাকে সামলানোর চেষ্টা করছে। রাফার আকস্মিক পরিবর্তন ওকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। সারা এখন কী করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। একবার ভাবল সায়েমকে এইসব বলবে। কিন্তু পরক্ষণেই মত পরিবর্তন করে ভাবল, ‘সায়েমকে এভাবে বলা ঠিক হবে না। এতে সায়েমের রাগের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যাবে। ফলস্বরূপ উল্টো পাল্টা কিছু করে বসবে।’

সারা বৃষ্টির ফোটা ভেদ করে দৃষ্টির শেষ সীমানায় তাকালো। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকার পর বলল, ‘সত্যিই কী বৃষ্টি শুধুমাত্র রাফাকে স্পর্শ করার জন্য এসেছিল? তাহলে এই বৃষ্টির ফ্রেশ পানি কী পারবে না রাফার জঘন্য মনটাকে ধুয়ে মুছে ফ্রেশ করে দিতে?’

ওড়নাটা দিয়ে চোখ মুছল সারা। রাফা মেয়েটা দু'দিনের মধ্যেই ওর হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল। কিন্তু আজ যেটা হলো, সেটার জন্য রাফার প্রতি ভালোলাগাটা কেমন যেন ফেকাশে হয়ে গেল। একটা মানুষ এতটা নিখুঁত অভিনয় কীভাবে করতে পারে তা ভেবে পায় না সারা। 


রাস্তায় একপাশ করে গাড়িটা থামালো ফাহাদ। অনেকগুলো গাড়ি এখানে সিরিয়াল করে রাখা। ফাহাদ ছাতাটা সাথে নিয়ে গাড়ি থেকে নামল। পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে ইতি। এতক্ষণে ভিজে একাকার হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। ফাহাদ বলেছিল ওকে বাড়িতে চলে যেতে। আজ দেখা করতে হবে না। কিন্তু ইতি বলেছিল এসে যখন গেছি, তাহলে দেখা করতে অসুবিধা কী? ফাহাদ সম্মতি জানায় ওর কথায়।

ফাহাদ দূর থেকে ইতিকে দেখতে পেলো। পুকুর পাড়ের সামনের গাছের নিচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ফাহাদ দ্রুত ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ইতি ফাহাদকে দেখে অভিমানী কণ্ঠে বলল, ‘এতক্ষণ লাগল তোমার আসতে। সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি আমি। ভিজে  জামা-কাপড়ের কী অবস্থা হয়েছে দেখেছ?’

ফাহাদ ইতির হাত ধরে কাছে টেনে নিয়ে এলো। এক ছাতায় দু'জন পাশাপাশি দাঁড়াল। ফাহাদ অপরাধীর মতো করে বলল, ‘আই এম সরি ডেয়ার। জানোই তো বৃষ্টির সময় রাস্তাঘাটের অবস্থা কেমন থাকে। তাই বেশি জোরে গাড়ি চালানো সম্ভব হয় না।’

ইতি মুচকি হাসি দিলো। ফাহাদ বলল, ‘এভাবে বৃষ্টিতে ভিজে দাঁড়িয়ে না থেকে কোনো ছাউনির নিচে দাঁড়াতে পারতে।’

- উঁহু, এভাবেই বেশ মজা লাগছে। এতক্ষণ তো ঝালমুড়ি খাচ্ছিলাম। বৃষ্টির তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় ঝালমুড়িওয়ালার ছাতাও হার মেনে গেছে। তাই সে তাড়াতাড়ি করে সব চলে গেছে৷ কিন্তু আমি তো বৃষ্টির তীব্রতার কাছে হার মানিনি। সেজন্য আমি রয়েই গেছি।

ফাহাদ শরীর ঝাঁকিয়ে হাসতে লাগল। ফাহাদের শরীরের উষ্ণ স্পর্শে শিউরে উঠল ইতি। ফাহাদের একটা হাত খামচে ধরল ও। ফাহাদ ঘটনাটা বুঝতে পেরে মুচকি হাসি দিলো শুধু। দু'জনেই নীরবে রইল খানিক্ষন। ফাহাদের উষ্ণ আর্দ্রতায় লোভে ইতি আরো কাছাকাছি চলে আসছে । ফাহাদ সবটা বুঝতে পেরেও চুপ করে আছে। আর পরম আবেশে উপভোগ করছে ভালোবাসার মানুষের এই গভীর স্পর্শ। কাকভেজা ইতি শীতে কাঁপছে। ফাহাদের বুকটা ওকে ক্রমশ টানছে। ইতি স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারছে ফাহাদের আর ওর হৃদস্পন্দন দু’টোর কথোপকথন। কথোপকথন গুলো এইরকম - ইতির হৃদস্পন্দন বলছে, ‘আমার যে প্রবলভাবে ইচ্ছে করছে তোমার আরো কাছাকাছি যেতে। তোমার বাহুডোরে নিজেকে আবদ্ধ করে নিতে। যাতে প্রকৃতির এই শীতলতা আমাকে স্পর্শ করতে না পারে। আমি জানি, প্রকৃতির এই শীতল স্পর্শের থেকেও তোমার বাহুডোরের উষ্ণতা বেশি গভীর। আমার শরীরের কাঁপুনি বন্ধ করার জন্য তোমার বাহুডোর যথেষ্ট। তোমার ওই বাহুডোরে কী আমার জন্য একটু স্থান হবে? যেখানে আমি নির্বিঘ্নে একটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারব।’

হঠাৎ হাত তালির দেওয়ার মতো বিরক্তিকর শব্দে ফাহাদের হৃদস্পন্দন এর কথা শুনতে পেলো না ইতি। এভাবে ওদের কথপোকথন এর মাঝে ব্যাঘাত ঘটালো কে বুঝতে পারল না? ইতি মুখের কাছ থেকে ছাতাটা সরিয়ে সামনের দিকে তাকালো। হঠাৎ বুকটা ধুক করে উঠল ওর। আড়চোখে ফাহাদের দিকে তাকিয়ে দেখে, ফাহাদ নিজেও ‘হা’ করে তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকে। অন্য কেউ নয়, লোকটা হলো রোদ। ইতি ভয় পাচ্ছে খুব। নানানরকম কূ-চিন্তা ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। রোদকে ভালো করেই চিনে ফাহাদ। ইতির বিয়ের দিন ফাহাদ উপস্থিত ছিল সেখানে। সবই নিজের চোখে দেখেছে। কিন্তু সেই রোদ যে বর্তমানে ইতির অফিসের বস, সেটা ফাহাদ এখনো জানে না। ইতির এটা ভেবেই ভয় লাগছে যে, রোদ যে লেভেলের শয়তান। ও না আবার ফাহাদকে উল্টো পাল্টা কিছু বলে দেয়। ইতি বিড়বিড় করে বলল, ‘হায় আল্লাহ, রোদের কোনো কথার প্রভাবে যেন আমার আর ফাহাদ ভাইয়ার মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি না হয়।’

রোদ হাততালি দেওয়া বন্ধ করে ইতির দিকে তাকালো। ইতি ফাহাদের হাতটা আরো জাপটে ধরল। রোদ বলল, ‘এই জন্যই কী তখন আমার গাড়িতে না ওঠে বাসে করে এখানে এলে ইতি?’

রোদের কথা শুনে ইতির মনে পড়ল অফিস থেকে বেরিয়ে আসার সময়ের মুহূর্তটা। ইতি যখন নিজের কেবিন থেকে বের হচ্ছিল, রোদও তখন ওর সাথে বের হচ্ছিল। রোদকে দেখেও যখন না দেখার ভান করে যখন চলে যাচ্ছিল ইতি, তখন রোদ ওকে বাধা দিয়ে বলে, ‘বৃষ্টি আসবে মনে হচ্ছে, চলো তোমাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আসি।’

ইতি তখন বলল, ‘সেটার কোনো প্রয়োজন হবে না স্যার। আমার একটা কাজ আছে। সেটা শেষ করেই বাড়িতে ফিরবো। আপনার বাড়ি উল্টো পথে, শুধুশুধু আমার জন্য আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করতে হবে না। তাছাড়া আমি কখনোই আপনার গাড়িতে উঠব না। আমার জন্য বাসই ঠিক আছে।’

রোদকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ইতি হনহনিয়ে চলে আসে সেখান থেকে। 

ফাহাদের কথায় বাস্তবে ফিরল ইতি। ফাহাদ বলল, ‘ইনি এখানে কী করছে ইতি?’

ইতি ভয়ে ভয়ে ফাহাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার বস হিসেবে ইনিই আছেন। বিশ্বাস কর, আগে জানলে এই চাকরিটা আমি করতাম না। উনার কথাটা বলার তোমাকে জন্যই দেখা করার কথা বলেছিলাম আমি। ফোনে বলা যাবে না বলে বৃষ্টিতে ভিজেই দাঁড়িয়ে ছিলাম এখানে। তবে অনেস্টলি আমি জানি না ইনি এখানে কেন এলেন?’

ফাহাদ ডান হাত থেকে বা হাতে নিলো ছাতাটা। ডান হাত ইতির পিছন দিকে দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে কাছে টেনে নিলো ইতিকে। এরপর বলল, ‘আমি এতকিছু শুনতে চাইনি ইতি। আর তোমাকে অবিশ্বাস করার মতো কিছুই হয়নি। সুতরাং এত ভয় পেওনা।’

ইতি মলিন হাসি দিলো। ফাহাদ এবার রোদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মিস্টার রোদ, ইতি কেন আপনার গাড়িতে না ওঠে বাসে করে এখানে এলো, সেটা জানার জন্যই কী আপনি এখানে এসেছেন? আপনার মতো দায়িত্বশীল সিনিয়র অফিসার আছে বলেই অফিসের অন্যান্য কর্মচারীরা বডিগার্ড ছাড়াই এতটা শান্তিতে আছে। আপনি আসলেই গ্রেট। তবে আমার মনে হয় ইতির ক্ষেত্রে এই দায়িত্বটা আপনার পালন না করলেও চলবে। কারণ ওর জন্য আমি আছি।’

ফাহাদের কথাটা রোদের ইগো স্পর্শ করল। শরীরের রক্ত হঠাৎ গরম হয়ে গেল। কিন্তু ও জানে, মাথা গরম করলেই সব হাতের বাইরে চলে যাবে। তাই কিছুক্ষণ নীরব থেকে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর রোদ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, ‘আপনি কী জোর করেই ইতির দায়িত্ব নিতে চাচ্ছেন মিস্টার ফাহাদ?’

ইতি অনুমান করতে পারছে রোদ কোনো কু-মতলবে এইসব করছে। নাহলে ওর পিছু নিয়ে এখানে চলে আসতো না। এবং রোদের উদ্দেশ্য খুবই খারাপ। সেজন্যই এতক্ষণ আড়ালে থেকে ওকে নজরে রেখেছে। আর যেই ফাহাদ এসেছে, তখনই ও সামনে এসেছে। ইতি চাচ্ছে রোদকে একটু শিক্ষা দিতে। ও যা চাইছে, সেটা যে পাবে না, তা একটু প্রাকটিক্যাল ভাবে বুঝিয়ে দিতে। কিন্তু কাজটা করতে ও খুব লজ্জা পাচ্ছে। হঠাৎ মনে পড়ে গেল রাফার বলা কথাগুলো। লজ্জা নারীর ভূষণ নয়, এই কথাটা সকল নারীকে মনের ভিতর গেঁথে ফেলতে হবে। অতঃপর ইতি সব লজ্জা ভুলে গিয়ে ফাহাদকে সরাসরি জড়িয়ে ধরল। ফাহাদও হাত থেকে ছাতাটা ফেলে দিয়ে ইতির দুই হাতে জপটে ধরল। ইতির কপালে একটা চুমু দিয়ে রোদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখলেন মিস্টার রোদ, ইতি নিজেই চায় আমি ওর দায়িত্ব নেই। কারণ ও জানে, আমার এই বুকেই ও সুরক্ষিত।’

ইতি মাথাটা উঁচু করে ফাহাদের দিকে তাকালো। একটা অন্য লোকের সামনে ফাহাদ ওর কপালে চুপু দিলো। ইতি লজ্জা পাবে না বলেও লজ্জায় ওর চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল। লজ্জায় মরে যাচ্ছে ও। অথচ ফাহাদ বেশ স্বাভাবিকই আছে। ছেলেরা আসলেই অদ্ভুত। এরা লজ্জা প্রকাশ না করার জন্য এক্সট্রা একটা ক্ষমতা রাখে। যা মেয়েরা রাখতে পারে না। কোনোভাবেই না। ইতির এখন মনে হচ্ছে রাফার কথাটা ভুল। লজ্জা আসলেই নারীর ভূষণ। একজন নারী যতই নিজেকে লজ্জা শব্দটার থেকে দূরে রাখুক না কেন, কোনো না কোনোভাবে সে লজ্জা পাবেই। রোদের সামনে থাকায় লজ্জাটা যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেল ইতির। মুখটা ফাহাদের বুকের ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে ও। কোনোভাবেই কারোর দিকে তাকাবে না। এমনকি ফাহাদের দিকেও না। 

ফাহাদ আবার বলল, ‘এখনো নির্লজ্জের মতো এখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন, নাকি আরো কিছু দেখবেন। ফ্রিতে অন্যের রোমান্স দেখার খুব শখ আপনার।’

রোদ রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেল। ফাহাদ ইতির মাথায় নিজের থুতনিটা ঠেকিয়ে বলল, ‘হঠাৎ এত সাহস কোত্থেকে এলো তোমার?’

ইতি ফাহাদের বুকে মাথা রেখেই অদ্ভুত এক কণ্ঠে বলল, ‘কীসের সাহস?’

- এই যে আমাকে জড়িয়ে ধরলে। আগে তো নিজে থেকে আমার হাতটাও ধরার সাহস পেতে না।

- সব দোষ তোমার বোনের। ওর কথা শুনেই আমি সবরকম লাজ-লজ্জা ভুলে গিয়ে তোমাকে জড়িয়ে ধরেছি। কিন্তু তুমি যখন আমার কপালে চুমু দিলে, তখন আমি বুঝতে পারলাম রাফার কথা কতটা ভূল ছিল। নারী-রা হাজার চেষ্টা করলেও লজ্জা পাওয়া থেকে নিজেকে আড়ালে রাখতে পারবে না। তারা যেভাবেই হোক, লজ্জা পাবেই।

ইতির কথা শুনে ফাহাদ শব্দ করে হেসে দিলো। ইতি ফাহাদের বুক থেকে মাথা তুলে বলল, ‘একদম হাসবে না। তুমি বরং থাকো, আমি গেলাম বাড়িতে।’

ফাহাদ হাসি থামিয়ে বলল, ‘বাইরে গাড়ি রাখা আছে। তোমাকে নামিয়ে দিয়েই আমি বাড়িতে যাবো।’

ইতি মাথা নিচু করে বলল, ‘আচ্ছা।’

ফাহাদ ছাতাটা হাতে তুলে নিলো আবার। ইতির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল, ‘রাফার একটা কথায় ক্ষণিকের জন্য হলেও তোমাকে এতটা কাছাকাছি পেলাম আমি। এরজন্য রাফার একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য।’

ইতি রাগ দেখিয়ে বলল, ‘এটা একটা দূর্ঘটনা ভেবে ভুলে যাও।’

- এই ঘটনা কী আর ভুলা যায় বলো? এই প্রথম তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরলে। পারলে তো ফ্রেমে বন্দী করে রাখতাম মুহূর্তটা।

- ফাহাদ ভাইয়া, চুপ কর প্লিজ।

- আল্লাহর কাছে দোয়া করব, এবার এমন কিছু হোক, যার প্রভাবে তুমি এই ফাহাদ ভাইয়া না ডেকে শুধু ফাহাদ বলে ডাকতে বাধ্য হবে।

ইতি বিরক্তির স্বরে বলল, ‘উফ্, আমি কিন্তু এবার একাই চলে যাবো।’

ফাহাদ সামনে এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘আচ্ছা আর বলব না। চলো এবার।’

রাতে ডিনার শেষে ড্রয়িংরুমে বসে কিছুক্ষণ টিভি দেখল সবাই। প্রায় ১০.০০ বেজে গেছে, অথচ রাফার চোখ টিভি স্ক্রিন থেকে সরছেই না। একসময় সায়েম বিরক্ত হয়েই বলল, ‘ইতি, এবার ঘরে যা তোরা। এখন না ঘুমালে সকালে অফিসে যেতে পারবি না।’

রাফা হঠাৎ লাফ দিয়ে সোফা থেকে ওঠে দাঁড়াল। সায়েমের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি তোমার ঘরে ঘুমাবো।’

সায়েম তেড়ে এলো রাফার দিকে। ভ্রু-কুঁচকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার ঘরে ঘুমাবে মানে কী?’

- কালকে যেভাবে ঘুমিয়েছিলাম, আজকেই সেভাবেই ঘুমিয়ে থাকবো।

- কালকে তুমি অসুস্থ ছিলে বলেই আমি রাজি হয়েছিলাম। বাট আজকে আর সেটা সম্ভব না৷ তাই প্লিজ রাফা, আমাকে বিরক্ত করো না। তোমার জন্য কালকে ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি আমি।

রাফা মৃদু হাসি দিয়ে বলল, ‘আমি তো তোমার ঘরেই থাকবো। তুমি রাজি না হলে জোর করে থাকবো। তোমাকে বাধ্য করব রাজি হতে।’

পাশ থেকে ইতি রাফার দিকে এগিয়ে এসে বলল, ‘এইসব কী বলছিস রাফা? চুপচাপ আমার সাথে আয় তুই।’

-  উফ্ ইতি আপু, তুমি অন্তত আমাকে একটু সাপোর্ট কর। তোমার আর ভাইয়ার বিয়েতে কিন্তু আমি অনেক সাহায্য করতে পারব। জানোই তো আমার লাজ-লজ্জা কিচ্ছু নেই। তাই সরাসরি তোমার বাবা-মাকে, আর আমার মাকে গিয়ে বলে দিতে পারব। তোমরা কিন্তু এটা পারবে না। সুতরাং নিজের ভালো চাও তো আমাকে সাপোর্ট কর এখন।

ইতি বিড়বিড় করে বলল, ‘অসভ্য মেয়ে একটা।’

রাফা আবারও সায়েমের দিকে তাকালো। এরপর বলল, ‘তোমাকে একটু চমকে দেই, কী বলো মিস্টার সায়েম?’

সায়েম জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকালো রাফার দিকে। রাফা আবার বলল, ‘ওয়েট দেখাচ্ছি।’

রাফা ফোনটা হাতে নিলো। কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটি করার পর ফোনটা সায়েমের দিকে তাক করে বলল, ‘সি দিস মিস্টার সায়েম।’

সায়েম চোখ পাকিয়ে ফোন স্ক্রিনের দিকে তাকালো। রাফা শব্দ করে হেসে দিয়ে বলল, ‘এগুলো যদি তোমার বাবা-মা আর আমার মাকে দেখাই, তাহলে একবার ভেবে দেখ তো, তোমার ইজ্জতের কী অবস্থা হবে।’

সায়েম কিছু বলল না। মুখটা হা করে তাকিয়েই আছে ফোন স্ক্রিনের দিকে। আর রাফা অনবরত উচ্চস্বরে হেসে যাচ্ছে।

(চলবে...)

আরো পড়ুন ১৮তম পর্ব- ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড