• রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ (১৮তম পর্ব)

  রিফাত হোসেন

১০ নভেম্বর ২০১৯, ১৬:২৬
গল্প
ছবি : প্রতীকী

নিজের কেবিনে বসে ফাইলগুলো দেখছে ইতি। দুপুরের আগ পর্যন্ত ওকে এই ফাইলগুলোতেই চোখ বুলাতে হবে। এমনটাই নির্দেশ করেছে রোদ। সরি সরি, সে তো আবার এখন বস হয়ে গেছে।

ভুলটা শুধরে নিলো ইতি। ফাইল এ এমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু লিখা নেই, যা এতটা সময় নিয়ে পড়লে ও নতুন কিছু জানতে পারবে, বা শিখতে পারবে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই একই জিনিস বারবার বলা আছে ফাইলে। এইসব কিছু ইতি আগে থেকেই জানে। আর সেজন্যই চাকরিটা পেয়েছে ও। তবুও বস জোর গলায় বলেছে, একবারের জায়গায় দশবার পড়। তবুও হুট করে ভুলে গেছি কথাটা যেন না শুনি। খুবই বিরক্তি হচ্ছে ইতি। কিন্তু প্রকাশ করার মতো কেউ নেই আশেপাশে। অনেকের সাথেই ইতিমধ্যেই পরিচয় হয়েছে বটে। তবে কারোর সাথেই এখনো ফ্রি হতে পারেনি ও। এটাই স্বাভাবিক অবশ্য৷ এত তাড়াতাড়ি কেউ কারোর সাথেই ফ্রি হতে পারে না। আর সেজন্যই বিরক্তি কারণসহ এর থেকে বের হওয়ায় উপায় নিয়ে কারোর সাথে কথা বলতে পারছে না। - আচ্ছা ফাহাদ ভাইয়াকে ফোন দিলে কেমন হয়?

ইতি হঠাৎ ফোনটা হাতে নিয়ে কথাটা বলল। হুট করেই ফাহাদের কথাটা মনে পড়ে গেছে। শেষ কাল রাতে কথা হয়েছিল ফাহাদের সাথে। এরপর আর কোনোরকম যোগাযোগ হয়নি। ফাহাদ নিজেও যোগাযোগ করেনি অবশ্য। তবুও এই নিয়ে দু'জনে মধ্যে মনমালিন্য হয়নি একটুও। কারণ ইতি খুব ভালো করেই জানে ফাহাদ ব্যস্ত মানুষ। আর ফাহাদও জানে ইতি ওর ব্যস্ততার সময় ফোন দিয়ে বিরক্ত করবে না। একটা সম্পর্ক সারাজীবন টিকিয়ে রাখার মূলমন্ত্র হলো একে অপরের প্রতি আস্থাশীল হওয়া। এবং একে অপরের মনের কথা বুঝতে চেষ্টা করা। একে অপরের মধ্যেকার বন্ডিংটা ঠিক থাকলে সবরকম খারাপ পরিস্থিতিতেও একটা সম্পর্ক সুষ্ঠুভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। সময় দিচ্ছে না ভেবে সারাক্ষণ দু'জনের মধ্যে মনমালিন্য চলতে থাকলে শেষে দেখা যাবে বাকি জীবনটা, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলোরে’ বলেই কাটাতে হবে। 

ম্যাসেজ টুনের শব্দে নড়েচড়ে উঠল ইতি। রবি সিম কোম্পানি থেকে ম্যাসেজ এসেছে। ইতি সেদিকে নজর না দিয়ে সরাসরি কল লিস্টে চলে গেল। শুরুতেই আছে ফাহাদের নম্বরটা। গতকাল রাতে ফাহাদের সাথে কথা বলার পর আর কেউ ফোন দেয়নি এখন পর্যন্ত। দুপুর প্রায় হয়েই এসেছে। লাঞ্চের সময় খুব কাছাকাছি। এই সময় ফাহাদকে ফোন দেওয়াই যায়। ইতি মনে  কোনোরকম দ্বিধা না রেখে ফাহাদের নম্বরে ফোন দিয়ে দিলো। একবার রিং হওয়াতেই ফাহাদ রিসিভ করল। ইতিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফাহাদ বলল, ‘জীবনের নতুন এক অধ্যায় শুরু করার জন্য অভিনন্দন ইতি। এবং নিজের যোগ্যতায় যেন অনেকদূর পর্যন্ত যেতে পারো, তার জন্য পরিষ্কার মনে দোয়া করি।’

ইতির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। বিরক্ত ভাবটা মুহূর্তের মধ্যেই কেটে গেল। একজন প্রেমিক যে তার প্রেমিকাকে এভাবে দোয়া করতে পারে, সে সম্পর্কে ও অবগত ছিল না এতদিন। যদিও ফাহাদকে ও অন্যদের থেকে ভিন্ন মনে করে। অবশ্য সব মেয়েরাই তার ভালোবাসার মানুষের ভিন্নতা প্রকাশ করতে পছন্দ করে। ফোনের এপাশ থেকেও ফাহাদের নিঃশব্দ হাসি অনুভব করতে পারছে ইতি। চোখ বন্ধ করলে সেই শব্দ হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে। তবে সেই আঘাতে কোনো যন্ত্রণা নেই। আছে অফুরন্ত ভালোবাসার স্নিগ্ধতা। 

ইতি বলল, ‘ধন্যবাদ ফাহাদ ভাইয়া।’

- তা কেমন কাটছে প্রথম দিনের অফিস। বস, সিনিয়র অফিসারেরাসহ তোমার কলিগরা কেমন? আই মিন মানুষ হিসেবে কেমন সবাই।

ইতির বলতে ইচ্ছে করছে, ‘সবাই ভালো। তবে একটা বজ্জাত লোক আছে। যার হাবভাব আমার কাছে সুবিধার মনে হয় না। তার সাথে যতবারই চোখাচোখি হয়েছে, আমি ততবারই বিব্রত হয়েছি৷ লোকটা আমার দিকে অদ্ভুত এক চাহনিতে তাকায় বারবার। মনে হয় চোখ দিয়েই আমাকে গিলে খাবে।’

কিন্তু না। কথাটা এখন ফাহাদকে বলা একেবারেই ঠিক হবে না। ও উল্টো পাল্টা চিন্তা করবে। এর থেকে উত্তম হবে, বিকেলে দেখা করেই সবটা বলে দেওয়া। তাছাড়া রোদ শুধুমাত্র ওর দিকে তাকিয়েছে কয়েকবার। তাও আবার নিজের কেবিন থেকেই জানালা দিয়ে। তেমন খারাপ কোনো কথা বলেনি, যে এভাবে অভিযোগ করে বলতে হবে। তাই ইতি নিজেকে সামলালো। কথার প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলল, ‘বিকেলে দেখা করি চলো। সেই যে শাপলা ফুলওয়ালা পুকুরের পাশে। যেখানে প্রায়ই আমরা ঝালমুড়ি খেতে যেতাম।’

ফাহাদ বুঝতে পারল ইতি ওর প্রশ্নটাকে এড়িয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু কেন এড়িয়ে যেতে চাইছে সেটা বুঝতে পারল না। ফাহাদ ভাবছে, ‘এই নিয়ে কি এখন প্রশ্ন করা উচিত?’

কয়েক মুহূর্ত ভাবল ফাহাদ। ইতিও চুপ করেই আছে। কারণ ও অনুমান করতে পারছে সায়েমের ভাবনায় এখন কি চলছে। দু'জনের মনের মিল এবং উদ্দেশ্য এক থাকলে, একে অপরের অনেক অজানা কথা, অজানা ভাবনা খুব সহজেই বুঝতে পারা যায়। ইতিও বুঝতে পারল৷ সেজন্য নিঃসংকোচে ফাহাদের দ্বিধা হালকা করার জন্য বলল, ‘বিকেলে দেখা করো। তখন সব বলব। আপাতত রাখি।’

ফাহাদ মৃদু হাসি দিয়ে বলল, ‘ওকে।’

ইতি ফোনটা রেখে দিলো। চেয়ারে হেলান দিয়ে ভাবতে লাগল রোদের দ্বারা কি কি করা সম্ভব। আর ও কতরকম ভাবে রোদকে এড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু ভাবনাটা আর দীর্ঘস্থায়ী হলো না। বিরক্তিকর একটা রিংটোন বেজে উঠল টেলিফোনে। ইতি সোজা হয়ে বসল। ফোনটা তুলে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে রোদ বলে উঠল, ‘এক মিনিটের মধ্যে আমার কেবিনে আসো।’

রোদ ফোন কেটে দিলো কথাটা বলে। ইতি বলল, ‘অদ্ভুত তো! আমাকে কিছু বলার সুযোগই দিলো না।’

শরীরে ৩৬০ ডিগ্রি রাগ নিয়ে নিজের কেবিন থেকে বেরিয়ে রোদের কেবিনে যেতে লাগল ইতি। রোদের কেবিন আর ওর কেবিন পাশাপাশি। শুধু মাঝে কিছুটা ফাঁকা জায়গা আছে। ইতি রোদের কেবিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বিড়বিড় করে বলল, ‘উল্টো পাল্টা কিছু বললে উনার ১৩ টা বাজিয়ে দিবো আজকে।’

ইতি দরজা ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকল। রোদের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘বলুন কেন ডেকেছেন?’

রোদ ওঠে দাঁড়াল। ইতির দিকে তাকিয়ে রাগী একটা ভাব নিয়ে বলল, ‘বসের রুমে অনুমতি নিয়ে আসতে হয়, সেটা কি জানো না?’

ইতির এখন নিজের উপরই রাগ হচ্ছে। এইরকম কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ করার কোনো মানেই হয় না। নেহাত চুলগুলোতে দারুণ একটা স্টাইল করেছে আজ। নাহলে নিজের উপর হওয়া রাগটা কমানোর জন্য ও চুল টেনে ছিড়তো। ইতি নিজেকে বুঝানোর চেষ্টা করল, ‘ইতি, এটা তোর বস। একটু নয়, বরং অনেকটা সম্মান তার প্রাপ্য। সে যাই করুক না কেন? বস তো বসই থাকে। কি এমন ক্ষতি হতো রুমে ঢুকার আগে তার অনুমতি নিলে?’

- ভাববার জন্য সময় দেওয়া হয়নি তোমাকে। যেজন্য ডাকা, সেটা শোনো আগে।

- বলুন স্যার।

- তোমার কি মনে হয় অফিসটা প্রেম করার জায়গা, যে তুমি এখানে প্রেম করছেন।

রোদের কথা শুনে ইতির চোখমুখের অবস্থা পাল্টে গেল। কৌতূহলী হয়ে মনে মনে বলল, ‘লোকটা বলে কি? আমি আবার কখন প্রেম করলাম?’

ইতিকে চুপ থাকতে দেখে রোদ আবার বলল, ‘কি হলো চুপ করে আছ কেন? বল অফিস কি প্রেম করার জায়গা?’

ইতি মাথা নিচু করে বলল, ‘আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি না স্যার। স্পষ্টভাবে বললে আমার বুঝতে সুবিধা হতো।’

রোদ চেয়ার থেকে ওঠে এলো। ইতি ভয়ে কয়েক পা পিছিয়ে এলো। দরজাটা এখন লাগানো। ওর খুব ভয় করছে। রোদ ওর কাছে এসে একটা হাত ধরে ওকে কাছে টেনে নিলো। প্রথম দিন অফিসে এসেই কোনো ঝামেলায় জড়াতে চায় না ইতি। সেজন্য সয়ে যাচ্ছে এইসব। নাহলে এখুনি রোদের গালে ঠাসস করে একটা থাপ্পড় মেরে দিতো। ইতি নিঃশব্দে রোদের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু না, রোদ ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রেখে। ভয়ে ইতির বুক ধুক ধুক করছে৷ কিন্তু এভাবে চুপ করে থাকলে রোদ আরো পেয়ে বসবে। তাই ইতি সরাসরি রোদের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মিস্টার রোদ, আমার চুপ করে থাকাটাকে দুর্বলতা ভেবে নিজের বিপদ ডেকে আনবেন না। আপনি এই অফিসের সম্মানিত একজন ব্যক্তি। সেজন্য আপনাকে আমি এখনো কিছু বলছি না৷ কিন্তু আপনি নিজের সীমা অতিক্রম করলে আমি চুপ করে থাকবো না।’

রোদ ছেড়ে দিলো ইতিকে। ইতি সেভাবে দাঁড়িয়েই রোদের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টিতে আছে রাগ আর ঘৃণা। রোদ হঠাৎ হেসে দিয়ে বলল, ‘তুমি যখন অফিসের কাজ ফেলে প্রেমিকের সাথে কথা বল, তখন কোনো সমস্যা হয় না, তাই না?’

- আমি কার সাথে কথা বলব সেটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। আর আমি অফিসের কাজ ফেলে রেখে কারোর সাথে কথা বলছি না। আপনি যে কাজ দিয়েছেন, সেটা অনেকক্ষণ আগেই শেষ হয়ে গেছে। আপনার ফাইলের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমার মুখস্থ হয়ে গেছে। সুতরাং আপনি কোনোভাবেই বলতে পারেন আমি কাজ ফেলে ফোনে কথা বলেছি।

রোদ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, ‘ওরে বাবা। যতটা ভেবেছিলাম এ দেখি তার থেকেও বেশি।’

- আপনি কি ভেবেছিলেন সেটা জানার আগ্রহ আমার নেই। আপাতত আমার কাজটা আমাকে দিন। আর কাজ না থাকলে আমি নিজের কেবিনে যাচ্ছি।

রোদ কিছু না বলে নিজের জায়গায় গিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে রইল। ইতি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। এরপর মুখটা বাঁকা করে রাগে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে এলো রোদের কেবিন থেকে। 

বিকেলে ৪টা ১বাজে। সায়েম নিজের ডেস্ক থেকে ওঠে দাঁড়াল। ব্যাগ হাতে নিয়ে সারার ডেস্কের দিকে তাকিয়ে দেখল সারা নেই। আজ সারাদিন অনেক চেষ্টা করেও সারার সাথে কথা বলতে পারেনি সায়েম। সারা ব্যস্ততা দেখিয়ে ওকে এড়িয়ে গেছে। কিন্তু সায়েম হাল ছেড়ে দেয়নি৷ বারবার করে সারার কাছে গেছে। সারা যে ওকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য আগেই বেরিয়ে গেছে, তা ভালো করেই বুঝতে পারছে সায়েম। হয়তো বাসস্ট্যান্ডে আছে৷ তাই সায়েম আর সময় নষ্ট না করে অফিস থেকে বেরিয়ে এলো। আজ-ও আকাশে মেঘের ছুটোছুটি। মেঘেরা এ এক নতুন খেলায় মেতেছে। প্রতিদিন বিকেলে মেঘ বর্ষণ না হলে যেন ওদের পেটের ভাত হজম হয় না৷ যদিও ওদের সাথে পেট বা ভাত বলে কিছু আছে কি-না, সে নিয়ে বিরাট এক সন্দেহ আছে সায়েমের মনে। 

বাসস্ট্যান্ডে গিয়েও সারাকে পেলো না সায়েম। নিশ্চয়ই আগের বাসে চলে গেছে। সায়েম একরাশ হতাশা নিয়ে বাসে ওঠে পড়ল। ঘণ্টা খানিক এর মতো লাগল গন্তব্যে পৌঁছাতে। বাড়িতে গিয়ে কলিংবেল বাজানোর সাথে সাথে দরজা খুলে দিলো রাফা। সায়েম ভিতরে ঢুকলো নিঃশব্দে। প্রতিদিনের মতো আজকেও চেয়ারে বসে জুতোর ফিতে খোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আশেপাশে কী হচ্ছে, তা দেখার সময় ওর নেই। হঠাৎ কেউ পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল। সায়েম মৃদু হাসি দিলো শুধু। কার‍ণ ও ভাবছে ইতিই ওকে জড়িয়ে ধরেছে। ইতি প্রায়ই এই কাজটা করে। তাই সায়েম তেমন গুরুত্ব দিলো না। হঠাৎ গালে কারোর ঠোঁটের স্পর্শ চেপে চমকে উঠল সায়েম। হুট করে উঠে দাঁড়িয়ে পিছনে তাকালো। আর দেখল রাফা মিটমিট করে হাসছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য সায়েমের মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে গেল। যখক্ষণে বুঝল আসল ঘটনাটা কী, তখক্ষণে ও শরীরে দিয়ে আগুনের ধোঁয়া বের হতে শুরু করল। রাফার গালে থাপ্পড় দিতে গিয়েও থেমে গেল ও। রাফার হাতটা শক্ত করে ধরে হ্যাঁচকা টান দিলো। রাফা চলে এলো সায়েমের বুকে। সায়েম রাফার ঠোঁটের কাছে নিজের মুখ নিয়ে রাগী কণ্ঠে বলল, ‘এটা কোন ধরনের ফাজলামি?’

আকস্মিক ভাবে রাফা এবার সায়েমের ঠোঁটে চুমু দিয়ে নিজের সাথে সায়েমকে জাপটে ধরল। সায়েমের বুকে মাথা রেখে বলল, ‘তোমার এই ক্লান্ত মাখা মুখটা দেখে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলাম না৷ কোনো মানুষের ঘামে ভেজা কপাল, চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ আর শুকনো ঠোঁটে যে এতটা পবিত্র আর স্নিগ্ধ লাগে, তোমাকে না দেখলে আমি কখনোই জানতাম না। আমার এই ১৮+ বয়সের মধ্যে যতবার ভাত খেয়েছি, তার থেকেও বেশিবার তোমার প্রেমে পড়েছি। এটা বিজ্ঞানীদের গবেষণায় নয়, আমার ভালোবাসায় প্রমাণিত।’

সায়েমের চোখমুখ থেকে রাগের ছাপটা আস্তে আস্তে কমে যেতে লাগল। ড্রয়িংরুমের জানালা খোলা থাকা স্বত্ত্বেও আলো আসছে না ভিতরে। চারিদিকটা একটু একটু করে অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে। শীতল বাতাস সায়েমের শরীরে কাঁপুনি  ধরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। রাফা নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে সায়েমকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। সায়েমের প্রবলভাবে ইচ্ছে করছে রাফাকে জড়িয়ে ধরতে। প্রকৃতির এই শীতল বাতাস থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে। কিন্তু অজানা এক ভয়ে সেটা করছে পারছে না ও। সংকোচ হচ্ছে খুব। না পারছে রাফাকে ছাড়িয়ে দিতে, আর না পারছে রাফাকে জড়িয়ে ধরতে। এভাবেই বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। একসময় রাফা নিজেই সায়েমকে ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘আমি একটু আসছি।’

কথাটা বলে রাফা ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে সিড়ি দিয়ে উপরের দিকে দৌড় দিলো। সায়েম সেদিকে আর না তাকিয়ে জুতো খুলে নিজের ঘরে চলে এলো। ওদিকে রাফা সারাদের দরজা ধাক্কাতে লাগল। কিছুক্ষণ পরেই সারা এসে দরজা খুলে দিলো। রাফার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, ‘একি রাফা, তুমি এইসময় এখানে? কোনো সমস্যা হয়েছে?’

সারা কিছুক্ষণ আগেই বাড়িতে ফিরেছে। তা ওকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে। জামা-কাপড় চেঞ্জ করেছে কেবল মাত্র। আর তখনই রাফা দরজায় টোকা দিয়েছে।

- কী হলো বল? 

সারার কথার প্রতিউত্তরে রাফা বলল, ‘আগে ছাদে চল, তারপর বলছি।’

সারা অবাক কণ্ঠে বলল, ‘পাগল হয়েছ নাকি? আকাশে কেমন মেঘ করেছে দেখেছ, এক্ষুনি বৃষ্টি নেমে যাবে।’

- সেজন্যই তো যাচ্ছি।

- তোমার তো আবারও জ্বর হবে।

- আরে সারা আপু, তুমি কী জানো না আমার মতো কিউট একটা মেয়েকে স্পর্শ করার জন্য বৃষ্টি ছটফট করছে? আমি কীভাবে বৃষ্টিকে নিরাশ করব বল?

সারা খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল, ‘তোমার মাথার একটা স্ক্রু ঢিলে, বুঝেছ রাফা৷ সেজন্যই সবসময় এইরকম পাগলামি করো।’

রাফা সারার হাত ধরে বলল, ‘আচ্ছা মেনে নিলাম। এবার তো চলো প্লিজ।’

অগত্যা সারা রাজি হয়ে রাফার সাথে ছাদে যেতে লাগল। সিড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে সারা বলল, ‘আচ্ছা রাফা, কালকে রাতে আমাকে আর সায়েমকে ওভাবে দেখে তুমি খুব কষ্ট পেয়েছিলে, তাই না?’

- অনেস্টলি বলছি, কিছুটা কষ্ট অবশ্য পেয়েছিল। তবে এখন সামলে নিয়েছি।

সারা কিছু না বলে মৃদু হাসি দিলো। ছাদে গিয়ে দেখল গুড়গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। রাফা আগেই সারার হাত ছেড়ে দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে লাফাতে লাগল। এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। সারা হাসছে, আর মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখছে। মনে হচ্ছে একটা পরী বৃষ্টির জল গায়ে মাখতে মাখতে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটোছুটি করছে। আচ্ছা, পরী কী বৃষ্টিতে গোসল করার ক্ষমতা রাখে?

(চলবে...)

আরো পড়ুন ১৭তম পর্ব- ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড