• বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

গল্প : একলা বাবা (প্রথম পর্ব)

  মুহাম্মদ বরকত আলী

১০ নভেম্বর ২০১৯, ১৪:৩৯
গল্প
ছবি : প্রতীকী

সকালের মিষ্টি রোদ গায়ে লাগিয়ে একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে আছে মনুমিয়া। এই ক’মাসে শরীর শুকিয়ে চামড়া ঝুলে গেছে। গলার নিচে হাসুলিরটা চামড়ার সাথে লেগে উঁচু হয়ে আছে। সারা শরীরের শিরা উপশিরাগুলো ঢিলেঢালা চামড়ায় ঢেকে আছে। প্রত্যেকটি শিরা উপশিরা একটা একটা করে গোনা যাবে। মাথা ভর্তি উসকোখুসকো কাঁচা-পাকা চুল। মুখ ভর্তি খোঁচা খোঁচা আধা কাঁচাপাকা দাঁড়ি। পূর্বে কখনোই তাকে এত সহজে জ্বর সর্দিতে কাবু করতে পারেনি। মাঝে মধ্যে মাথার বা’পাশে কিট কিট করে যন্ত্রণা করতো বটে, কিন্তু চুপচাপ হেসে খেলে সেটাও সে সহজেই হজম করে ফেলত। যখন যন্ত্রণা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠত, তখন উপায় না দেখে গ্রাম্য ডাক্তার খ্যাত নিয়াজ হোসেনের দোকান থেকে একটা মাথা ব্যথা সারা বড়ি কিনে খেত। 

এতেই মোটামুটি আরাম পেত। কিন্তু এই মিথ্যে খেলা আর কত দিন? দিন দিন মাথার যন্ত্রণা বেড়েই চলেছিল। তার অসহ্য যন্ত্রণার কথা কেউ শুনতে চায় না, তাই মনু মিয়া কাউকে বলতোও না। তার অসুখের কথা শোনার মত এই বাড়িতে কেউ নেই। স্ত্রী ফুলবানু তার একমাত্র ভরসা। কিন্তু তাকে কীভাবে বলবে? সংসারের ঝামেলা সে বেচারাও নাজেহাল। এর মধ্যে আবার তার এই যন্ত্রণার কথা শুনিয়ে ফুলবানুর মাথা ব্যথা বাড়াতে চায় না। মাঠে এক খণ্ড জমি বর্গা নিয়ে মনুমিয়া নিজের জন্য চাষাবাদ করে। স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলে সকাল বিকাল এই জমিটুকুতে কাজ করে। কাক ডাকা ভোরে বের হয় মাঠে। চাষের জমিতে কিছুটা কাজ করে ছাগলের জন্য এক বস্তা ঘাস কেটে বাড়ি ফেরে। এরপর চলে যায় ব্যবসায়। ব্যবসা বলতে গ্রামের স্কুল গুলোতে ঘুরে ঘুরে বাদাম আর চলপাই বিক্রি করে। দু’পঞ্চাশ টাকা যা আয় হয় আল্লাহর রহমতে তাতেই সংসার চলে যায়। ফুলবানু কাজের অবসরে দুটো ছাগল পালন করে একটু স্বাবলম্বী হওয়ার আশায়। এই তাদের দুজনের ভাঙ্গা গড়া সংসার। 

বেশ চলছিল। সেদিন সকালবেলা ধান খেতে কাজ করছিল মনু মিয়া। হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যায়। চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে, ‘ধর ধর’। পাশের ক্ষেতে কর্মরত সামাদ দৌড়ে এসে ধরে মনু মিয়াকে। এরপর আর কিছুই মনে নেই তার। যখন চোখ খোলে তখন মনু মিয়া নিজেকে আবিষ্কার করে জেলা শহরের জেনারেল হাসপাতালের বেডে। পাশে বসে আছে ফুলবানু। বিপদ কাউকে জানিয়ে আসে না। তাই সব সময় প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন। প্রস্তুত বলতে অন্তত টাকা পয়সা ঘুচিয়ে রাখা। এখন এই আকালের বাজাতে বিকিৎশা খরচ মনুর মত গরিবদের জন্য অত্যন্ত কষ্ট সাধ্য ব্যাপার। এই অবস্থায় বিপাকে পড়ে যায় ফুলবানু। সামান্য কিছু জমে রাখা টাকা দিয়ে চিকিৎসা কারানো হয় জেনারেল হাসপাতালে। দু টাকা পাঁচ টাকা করে আর কতই বা জমে? 

সপ্তাহ খানেক হাসপাতালের বেডে পড়ে থাকে নিস্তব্ধ হয়ে। শরীরের কোনো উন্নতি দেখতে না পেয়ে বিচলিত হয়ে পড়ে ফুলবানু। চিকিৎসকেরা পরামর্শ দেন বাইরে কোথাও নিয়ে চিকিৎসা করাতে। কিন্তু ফুলবানু মেয়ে মানুষ হয়ে একা কীভাবে সামাল দেবে সব। হাতে পর্যাপ্ত টাকাও নেই। একমাত্র ছেলের ভরসাও করা যায় না। আজকালকার জামানায় ছেলেমেয়েরা জন্মদাতা পিতামাতার ভরণ পোষণ করতে চায় না, আর মনুমিয়া তো সৎ বাবা। হয় তো লোক লজ্জার ভয়ে ছেলেটা সামান্য কিছু হাত তোলা খচর দিবে, তাতে আর কতটুকু হবে? প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে সংগ্রাম করে আসছে এই ফুলবানু। কত ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে আজ তার এই জীবন। কিন্তু সংগ্রামী ফুলবানু জীবনের কাছে হেরে যেতে চায় না। ছাগলগুলো পালন করা হয়েছে একটু সুখের মুখ দেখার আশায়। এই বিপদের সময় তার সুখ প্রয়োজন কিসের? ছাগল বিক্রি করে যে ক’টাকা হাতে পায় তাই নিয়েই মনুমিয়ার চিকিৎসা করানো হয় রাজশাহীতে। ডাক্তার বলেছেন মাথার বাম পাশের শিরাতে রক্ত জমেছে।

ঔষধের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সেরে উঠবে। তবে সময় লাগবে কয়েক মাস। ডাক্তারের পরামর্শেই ঔষধ চালিয়ে যাচ্ছে। শরীরের উন্নতিও হয়েছে কিছুটা। প্রথম দিকে বাম হাত ও বাম পা উঠাতে পারতো না। চলাফেরা তো দুরের কথা সময় সময় মাথার তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করে কান্না করতো। মাথা ঘোরা আর শরীর কাঁপা ছিলো নিত্য সঙ্গী। যন্ত্রণাটা অন্তত সেরেছে। এক পা দু পা করে চলতেও পারে। মাথার কাঁপুনি আর যন্ত্রণা আপাত তো বিদেয় হয়েছে। তবে কাজ কর্মে যাওয়ার সামর্থ্য এখনো হয়ে ওঠেনি। দুপুর গড়িয়ে আসে। পাতার ফাঁক গলে দুপুরের কমলা রোদ এসে পড়ে মনুমিয়ার মুখে। ফুলবানু এসে মাথায় হাত রাখে মনুর। চোখ দুটো মেলে দেখে সামনে ফুলবানু দাঁড়িয়ে। চেয়ার থেকে উঠে পড়ে মনু। হাতে থাকা লাঠিতে ভর দিয়ে এক পা দু পা করে হাটতে থাকে বাড়ির দিকে। 

আজ যে সংসারে তারা আলাদা, সেই সংসার তিল তিল করে তাদেরই হাতের গড়া। মোকামে ছেলেটার বেশ বড়-সড় মুদির দোকান হয়েছে। দুটো কাঁচা পয়সাও হয়েছে। আজ যেটুকু হয়েছে একদিন সেটুকুও ছিলো না।  

ফুলবানুর একমাত্র বুকের ধর কায়েস। কোনো এক আশ্রয় দাতার এক খণ্ড জমিতে ছিলো ছোট্ট কুড়ে ঘর। ছেলে আর স্বামীকে নিয়ে ফুলবানুর সুখের সংসার। সেই সুখ বেশিদিন কপালে সয়নি। এক বর্ষায় বৃষ্টি মাথায় মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রাঘাতে মারা যায় স্বামী মিজান। আট বছরের  ছেলে কায়েসকে বুকে আগলে রেখে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বোনে চোখে। কিন্তু সমাজের কিছু মানুষ রূপি অমানুষের দল মাঝে মধ্যেই হানা দেয় ফুবানুর ঘরে। ফুলবানু বুঝতে পারে ওদের মতিগতি। ওরা চায় ফুলবানুকে রক্ষিতা হিসাবে। ওরা চায় তাকে ইচ্ছে মত ব্যাবহার করতে। ফুলবানু রাজি হয়নি। তাই তাকে সহ্য করতে হয়েছে নানান যন্ত্রণা। রাতে বেলা টিনের উপর ইট পাটকেল পড়েছে। এরই মধ্যে হঠাৎ ফুলবানুর জীবনে আসে মনুমিয়া। মনুমিয়ার গোটা একটা সংসার ছিলো। সেই সংসারে ছিল স্ত্রী ও দুই কন্যা। বাবা মায়ের এক মাত্র ছেলে মনু। লেখাপড়া করেনি দু’কলম। সারাদিন এপাড়া সেপাড়া ঘুরে বেড়ানো আর ঘুঘু ধরে দিন কাটাতো। বাবার কাজে কোনো দিন হাত লাগায়নি। 

মনুর ছিল বাউ বাউণ্ডুলিপনা স্বভাব। একটু বকাবকি করলেই কোথাও উধাও হয়ে যাওয়া ছিল তার সামান্য খেল। ছেলেকে হারানোর ভয়ে বকাবকি করতে পারতো না বাবা মা। এই বাউণ্ডলিপানা ছাড়াতে সংসারের হাল তুলে দেওয়ার কথা ভাবে মনুর বাবা মা। মনুকে সংসারী করতে বিয়ে দেওয়া হয় নিজ গ্রামের বংশীয়ও গেরস্ত বাড়ি দেখে। বিয়ের এক বছরের মাথায় মারা যায় মনুর বাবা। বাবার পিছনে পিছনে চলে যায় মনুর মা। বাবার রেখে যাওয়া আট বিঘা চাষাবাদি জমির দেখাশোনা করতে বাধ্য হয় মনু। তবুও নিজ গতরে খাটতে নারাজ মনুমিয়া। এই পৃথিবীতে সবাই খাটুনি করে না। কেউ গতর খাটিয়ে তৈরি করে আর কেউ বসে বসে খাবে। হয়তো এটাই নিয়ম। খাটুনি না করে বসে বসে খাওয়ার দলেই পড়ে মনুমিয়া। জমিগুলো অন্যের কাছে বর্গা দিয়ে বছর চুক্তিতে যা ফসল আসতো তাতেই মনুর সংসার বেশ চলে যেত। মানুষের উপরের বৈশিষ্ট্য বদলালেও ভিতরের চরিত্র হয়তো বদলায় না। আর তাই মনুমিয়াও বদলাইনি। 

মনুর সংসারের অতিথি হয়ে আসে দুই মেয়ে। বড় মেয়েকে দশ ক্লাস পর্যন্ত পড়িয়ে বিয়ে দেয় চাকুরীজীবী ছেলের সাথে। ছোট মেয়ের বিয়ে হয় গেরস্ত ঘরে। এই তার সংসার। কিন্তু এতেও মনুমিয়ার সুখ ছিল না। সারাদিন কবিতর আর ঘুঘুর পিছনে ঘুরে ফিরে বাড়ি ঢুকলে এক গ্লাস পানি কিংবা খাবার খাওয়ার জন্য হাঁকডাক দিয়ে খুঁজে পেত না স্ত্রীকে। গ্রামে শশুর বাড়ি হওয়ায় বৌ বাড়িতে থাকতো না। সকাল বিকেল সব সময় মায়ের বাড়ি যেয়ে বসে থাকতো। তাতেও আপত্তি ছিলো না মনুর। আপত্তি বাড়ে তখন, যখন পেটে টান ধরতো তাকে খাবার দেওয়ার মত মানুষ এই বাড়িতে একজনকেও পাওয়া যেত না। সংসারে কিছুটা অভাব ছিলো বটে, আর তাই ইচ্ছে থাকা স্বত্বেও মেয়ে জামাইকে তেমন খাতির-যত্ন আত্তি করতে পারেনি মনু। সময় মত বাজার-হাট হত না। এই নিয়ে মাঝে মধ্যেই ঝগড়া বেধে যেত। রাগের মাথায় বৌয়ের গায়ে হাত তুলে বসতো। বৌ ছুঁট দিতো মায়ের বাড়িতে। এই নিয়ে শশুর পক্ষের লোকেরা তেড়ে আসতো যখন তখন। কখনো সখনো মনুকে তাড়িয়ে বেড়াতো সারাপাড়া। আবার কখনো হাতের কাছে পেয়ে মার দিতো আচ্ছ করে। এভাবে চলতে থাকে। একদিন শশুর বাড়ির লোকজন এসে বেঁধে ফেলে মনুকে। ঘরে আটকিয়ে রেখে বলে, ‘তোর জমিজিরাত যা আছে সবটুকুই বৌয়ের নামে দিতে হবে। তানাহলে মেরে এখানেই পুতে রাখুম তোরে।’ মনু বাধ্য হয় বৌয়ের নামে আট বিঘা জমি লিখে দিতে। কিন্তু ভিটা বাড়িটা মনুর নামেই থেকে যায়। জমি গুলো হাত ছাড়া হওয়ারপর থেকে মনুর উপর অত্যাচার বেড়ে যায়। তার দোষ, সে গায়ে গতরে খাটে না। সারাদিন ঘুরে বেড়ানো তার স্বভাব। 

স্ত্রীর অকথ্য ভাষায় গালাগালি, মেয়ের খারাপ আচরণ মনুকে অতিষ্ঠ করে তোলে। ঠিক মত খেতে দেয় না। মেয়েরা মায়ের পক্ষ নিয়ে তেড়ে আসে মনুমিয়াকে মারতে। খারাপ ভাষায় গালি দেয়। ‘তোর মত বাপের দরকার নেই। তোর মত অকর্মা বাপের মরে যাওয়াই ভালো। যে বাপ মেয়ে জামাইরে দু’মুঠো ভালো মন্দ খাওয়াইতে পরাতেই পারে না, সেই বাপ কাপুরুষ। সংসার করার মত ক্ষমতা তোর নেই।’ এসব কথাও শুনতে হয় মনুমিয়াকে। মনুমিয়া বাড়িতে সুখ পায় না। মানুষ একটু সুখের আশায় কিনা করছে। মনুও একটু সুখের আশায় আশ্রয় খোঁজে ফুলবানুর ছোট্র ঘরে। ফুলবানুও ছেলেকে নিয়ে একটা শিকড় খুঁজে পায়। এক দিন দুদিন, এভাবে মাস যায়, বছর যায়। ফুলবানুর কাছে মনুমিয়া  হয়তো সুখ খুঁজে পায়, ফুলবানু পায় আশ্রয় আর ভালোবাসা। বিয়ে করে দুজনে।

একটা ভাইরাস ছড়াতে যতটা না সময় লাগে, তার চাইতে খুব কম সময়ে সারা গ্রাম ছড়িয়ে পড়ল ফুলবানু আর মনুর বিয়ের কথা। সকালের  আলো ফুটতে না ফুটতেই মনুর বৌ আর মেয়েদের কানে পৌঁছে গেল অকর্মা মানুষটার কর্মের কথা। বেধে গেল তুলকালাম। বৌ আর মেয়েরা মিলে প্রতিবেশীর সামনে মনুকে স্যান্ডেল পিটা করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। 

সেই যে মনু বের হয়েছে, সেদিন থেকে লজ্জায় অভিমানে তার জন্ম ভিটেয় পা পর্যন্ত রাখেনি কোনো দিন। বিশটা বছর কেটে গেল। একবারের জন্যেও মেয়েরা বাবার খোঁজ করেনি। রাস্তা ঘাটে মেয়েদের সাথে কখনো দেখা হলে মনুমিয়ার সাথে কথা বলাতো দূরের কথা, মনুকে দেখে থুতু ফেলত। মনুর বুকের ভীতরটা হাহাকার করে। কিন্তু কোনো উপায় ছিল না। মেয়োরা পেয়েছে মাকে আর সম্পত্তিটুকু। অকর্মা বাবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। মনুও ফুলবানুর কাছে খুঁজে নিয়েছে তার সুখ। সব সময় কায়েসকে নিজের ছেলে ভেবেছে মনু। নিজে খেটেখুটে যা জমিয়েছিল তা থেকেই কিনে ছিল এই ভিটেটা। ভিটে বাড়িটা কায়েসের নামেই কেনা। আজ নিজের বলতে মনুমিয়ার কিছুই নেই।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড