• রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ (১৬তম পর্ব)

  রিফাত হোসেন

০৭ নভেম্বর ২০১৯, ১৫:১১
গল্প
ছবি : প্রতীকী

৬০ ওয়াটের ছোট লাইটের আলোয় রাফাকে ভালো করে দেখার চেষ্টা করল সায়েম। সারা ওর পাশে দাঁড়িয়ে আছে। রাফা গেইটের কাছেই দাঁড়িয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। কোনোরকম শব্দ, বা নড়াচড়া করছে না। বেশ অদ্ভুত দেখতে লাগছে রাফাকে। মনে হচ্ছে কোনো এক রোবট দাঁড়িয়ে আছে। যার আবেগ, অনুভূতি, পিছুটান, কষ্ট, ভাবনা, কিছুই নেই। কিন্তু না, রাফা হঠাৎ নিজের হাতটা নাড়ালো। আর এতেই সায়েম বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। রাফা হাত দিয়ে নিজের চোখ মুছছে। সায়েম খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে কি হতে চলেছে। রাফা যে এখন চেঁচামেচি শুরু করে পুরো বিল্ডিংয়ের মানুষকে জাগিয়ে তুলবে, এ ব্যাপারে সায়েম নিশ্চিত। সায়েমের ভয় হচ্ছে এটা ভেবে যে, রাফা এই ব্যাপারটাকে আরো বিশ্রী করে তুলবে। যার পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর। সারার নামের পাশে একটা কলঙ্কের দাগ লাগবে। অফিসে আসা-যাওয়ার পথে অনেকেই আড়চোখে তাকাবে। এলাকার একদল বখে যাওয়া যুবক আবার খারাপ কিছু ইঙ্গিত করে খোঁচা মেরে কথা বলবে। কেউ কেউ আবার নিজেদের মধ্যে বিড়বিড় করে বলবে, ‘এই যে কলঙ্কিত একটা মেয়ে যাচ্ছে। যে মধ্যরাতে ছাদে দাঁড়িয়ে একটা যুবক ছেলের সাথে জড়াজড়ি করেছে।’ আর ব্যক্তির মুখ যদি আরো খোলামেলা হয়, তাহলে তো সরাসরি বলেই দিবে, ‘শুধু জড়াজড়ি নয়, চুমুচুমিও করেছে।’

সায়েম নিজের মাথাটা ঝাঁকালো একবার। নিজেকে সামলে নিয়ে মনে মনে বলল, ‘আগে থেকে এত নেগেটিভ কিছু ভাবা ঠিক হবে না। তাছাড়া কিছুক্ষণ আগের ঘটনাটায় সারার কোনো দোষ নেই। আমিই একটু বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলাম৷ যার ফলস্বরূপ কোনোকিছু না ভেবেই কাজটা করে ফেলেছি। যদিও সমাজ সারাকেই আগে কলঙ্কিত করবে। কিন্তু আমি তো জানি সারা নির্দোষ। অবস্থা বেগতিক হলে সারাকে বিয়ে করব আমি।’

সারার ডাক শুনে পাশে তাকালো সায়েম। সামনের দিকে আঙ্গুল তুলে সারা বলল, ‘ও পড়ে গেল কেন সায়েম?’

সায়েম ভ্রু-কুঁচকে সারার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে গেইটের দিকে তাকালো। রাফাকে পড়ে যেতে দেখে সায়েমের বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। সারার সাথে একবার চোখাচোখি হলো ওর। সারা কিছু বুঝতে পারল না, তবে এগিয়ে গেল রাফার দিকে৷ সায়েমও দৌড়ে রাফার কাছে এলো। রাফা ততক্ষণে ছাদে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়েছে। কিন্তু ওর শরীরে হাত দিতেই থতমত খেয়ে গেল সারা। সায়েমের দিকে তাকিয়ে অবাক আর বিস্মিত কণ্ঠে বলল, ‘ওর শরীর তো আগুনের তাপের মতো উত্তপ্ততায় ছেয়ে আছে।’

সায়েম রাফার কপালে একটা হাত রাখলো। ও নিজেও মাত্রাতিরিক্ত তাপ অনুভব করল। যদিও সায়েম জানে জ্বরটা আরো বেড়ে যাওয়ায় টেম্পারেচার এত হাই হয়ে আছে। কিন্তু ভয়টা যেন ক্রমশই আকাশ সমান উঁচু হতে লাগল। সারার দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত গলায় বলল, ‘ওর জ্বর এসেছে। বিকেলে নাকি বৃষ্টিতে ভিজেছিল।’

- সে তো ওর শরীরের তাপমাত্রা দেখেই বুঝতে পারছি। কিন্তু এখন কি করবেন? এত রাতে হাসপাতালে নিবেন কীভাবে? গাড়ি-টাড়ি তো কিছুই পাওয়া যাবে না।

- ঢাকা শহরে কাউকে হাসপাতালে নেওয়ার গাড়ির অভাব হবে না সারা।  বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারলেই  কোনো না কোনো ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আমি ভাবছি অন্য কথা। রাফা অজ্ঞান হয়ে গেছে। প্রাথমিক চিকিৎসার মাধ্যমে আগে ওর জ্ঞান ফেরানো প্রয়োজন। গাড়ি রেডি করা থেকে শুরু করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া অনেকটা সময়ের ব্যাপার।

- বাড়িওয়ালার ছেলেকে ডাকলেই তো হয়। সে তো মেডিকেল কলেজের ফাইনাল ইয়ারের মেধাবী স্টুডেন্ট। তিনি নিশ্চয়ই আমাদের সাহায্য করতে পারবেন।

সায়েম রাফাকে কোলে তুলে নিলো। শক্ত করে রাফাকে ধরে সিঁড়ি নিয়ে নামতে নামতে বলল, ‘আমিও সেটাই ভাবছিলাম। আগে রাফাকে ঘরে নিয়ে যাই৷ এরপর উনাকে ডেকে আনার ব্যবস্থা করছি আমি।’

সারা কিছু বলল না। ও আসলেই চিন্তিত। নিজেকে অপরাধীর ভাবছে ও৷ সেই সাথে যতসব নেগেটিভ চিন্তাভাবনা মাথায় চলে আসছে৷ সারার বিশ্বাস ওর ‘নেগেটিভ রোগ’ হয়েছে৷ যদিও এর আগে এইরকম কোনো রোগের নাম ও শুনেছি। আধো এই পৃথিবীতে ‘নেগেটিভ রোগ’ নামের কোনো কিছু আছে কি-না, তা ওর অজানা। কিন্তু কি আর করার, মনের উপর জোরজবরদস্তি করার মতো সাহস না ক্ষমতা সারার নেই। তবুও নেগেটিভ চিন্তাভাবনা মাথায় এলেই নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে এটা ভেবে যে, সামনে ভালো কিছু হতে চলেছে। এই যেমন এখন ভাবছে, রাফা সকালের আগেই সুস্থ হয়ে যাবে৷ একেবারেই ফিটফাট হয়ে যাবে ও। 


সায়েম নিজের বিছানায় রাফাকে শুইয়ে দিলো। লাইট অন করে সারার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি ওর জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করুন৷ আমি বাড়িওয়ালার ছেলেকে ডেকে নিয়ে আসছি।’

সায়েম চলে গেল। সারা রাফার দিকে তাকালো। বিছানার মতো একটা রাজ্যে ছোট্ট পরী ঘুমিয়ে আছে। সারার বলতে ইচ্ছে করছে, ‘তুমি এত অপরূপা সুন্দরী কেন রাফা? তোমার অপ্সরীর মতো রূপ দেখে তো আমি বারবার প্রেমে পড়ে যাচ্ছি৷ সত্যি বলছি, আমি যদি ছেলে হতাম, তাহলে এক্ষুনি তোমাকে বিয়ে করে ফেলতাম৷ প্রয়োজনে মহাযুদ্ধ করে হলেও তোমাকে নিজের করে নিতাম।’

সারা ভাবনা স্থগিত রাখল। রাফার পরনের শাড়ি এলোমেলো হয়ে আছে। বিছানায় ওঠে নিজের হাতে রাফার শাড়িটা ঠিক করে পরিয়ে দিলো। টেবিলের উপর দেখল পানির জগ। সারা বিছানা থেকে নেমে পানির জগ হাতে আবারও রাফার কাছে এলো। জগ থেকে কিছুটা পানি হাতে নিয়ে রাফার মুখে ছিটিয়ে দিলো। রাফা কোনো নড়াচড়া করল না। সারা আবারও হাতে পানি নিয়ে রাফার মুখে ছিটিয়ে দিলো। সাথে সাথে রাফা কেঁপে উঠল। সারার ঠোঁটের কোণে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। জগটা পাশে রেখে রাফার মুখটা ভালো করে ভিজিয়ে দিতে লাগল৷ রাফা কাঁপতে কাঁপতে আধো-আধো ভাবে চোখ মেলে তাকালো৷ হঠাৎ খপ করে সারার হাত ধরে ফেলল। রাফার উত্তপ্ত হাতের স্পর্শ সারার হৃৎস্পন্দনে আঘাত করল। রাফার দিকে আরো কিছুটা এগিয়ে এলো, যাতে রাফা ওর হাতটা আরো ভালো করে ধরতে পারে। কাঁথাটা ভালো করে রাফার শরীরে দিয়ে দিলো। হঠাৎ রাফা কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল, ‘আমাকে ছেড়ে চলে যেওনা সায়েম। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। সারা আপুর সাথে তোমাকে ওভাবে দেখে সহ্য করতে পারিনি আমি। মাথায় খুব যন্ত্রণা হচ্ছিল। কিছু বলার আগে হঠাৎ চারিদিকে অন্ধকারে ছেয়ে এলো। মনে হচ্ছিল, আমাকে যেন অন্ধকারে আকড়ে ধরছে।’

রাফা আর কিছু বলতে পারল না। কাঁপতে কাঁপতে আধো-আধো চোখটা আবারও নিভিয়ে নিলো। তবে নিঃশ্বাস নিচ্ছে ঘনঘন। সারার অপরাধবোধ যেন আরো গাঢ় হয়ে গেল। চোখের কোণে জল জমতে শুরু করেছে। রাফা নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে৷ হাত-পা সব একত্র করে শুয়ে আছে। সারার ইচ্ছে করছে ওকে জড়িয়ে ধরতে। এতে যদি রাফার কাঁপুনি কিছুটা কমে। 

ঠিক তাই করল সারা। রাফার পাশে শুয়ে রাফাকে জড়িয়ে ধরল। রাফার মুখটা কেমন যেন নিষ্প্রাণ লাগছে। সারা হঠাৎ রাফার কপালে একটু চুমু খেলো। এরপর রাফার কপালে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, ‘এই মেয়েকে কষ্ট দিয়ে আমি কী কখনো সুখী হতে পারব?’

প্রশ্নটা নিজেকে করল সারা। কিন্তু এই প্রশ্নের কোনো উত্তর ওর জানা নেই। এটা শুধুমাত্র নিয়তিই বলে দিতে পারবে। 

- কী ব্যাপার, মাঝ রাতে দরজা ধাক্কাছ কেন? মনে হচ্ছে বাড়িতে ডাকাত পড়েছে।
অনেক্ষণ দরজা ধাক্কানোর পর অবশেষে দরজাটা খুললেন বাড়িওয়ালা। সেই সাথে তার চোটে যাওয়া মেজাজে সায়েমকে ধমকালো। সায়েম ঠাণ্ডা মাথায় বলল, ‘বিপদে পড়ে এত মাঝে আপনাদের বিরক্ত করতে এলাম আঙ্কেল। এর জন্য আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।’

লোকটা নিজের মুখ বাঁকা করে বলল, ‘বিরক্ত তো অলরেডি করেই ফেলেছ। তার উপর বিরক্ত করার পরে বলছ আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। ঠিক আছে বল কীজন্য এসেছ?’

সায়েম হালকা কাশি দিয়ে করুণ স্বরে বলল, ‘আপনার ছেলে কি বাড়িতে আছে আঙ্কেল?’

কথাটা বলে সায়েম বিশাল অপরাধ করে ফেলেছে। বাড়িওয়ালা লোকটা প্রথমে ভ্রু-কুঁচকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর কপাল কুঁচকালো। সায়েম ভয়ে ভয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। বাড়িওয়ালা লোকটা হঠাৎ ভ্রু আর কপাল কুঁচকানো বন্ধ করে রাগান্বিত স্বরে বলল, ‘আমার ছেলে কী ডাকাত চোর? যে রাত-বিরেতে চুরি-ডাকাতির উদ্দেশ্যে রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে।’

সায়েমের ইচ্ছে করছে লোকটার মাথা ফাটিয়ে দিতে। কিন্তু লোকটা বয়স্ক৷ যদিও কূ-কর্মে আর মানুষকে হেয় আর অপদস্ত করার যে দেশের নাম্বার ওয়ান ব্যক্তি। তবুও বয়স তো সেই বুড়োই আছে৷ সায়েম নিজেকে সামলালো। এরপর বলল, ‘আমি ঠিক সেটা বলতে চাইনি আঙ্কেল। আসলে একজন রুগী আছে৷ আপনার ছেলেকে একটু প্রয়োজন।’

- প্রয়োজন একটু না বেশি, সেটা নিয়ে পরে কথা বলছি। আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও৷ তোমার কী মনে হয় আমার ছেলে ডাক্তার? আরে বাবা, ও এখনো পড়াশোনা করছে। উল্টো পাল্টা চিকিৎসা করতে গিয়ে যদি তোমার রোগীকে মেরে ফেলে, তখন এর দ্বায় কে নিবে?

- মরবে না আঙ্কেল। জ্বর হয়েছে শুধু। অজ্ঞানও হয়ে গেছে। প্রাথমিক চিকিৎসার প্রয়োজন আপাতত। সকালে আমি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো ওকে।

লোকটা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তা রোগীটা কে? থাকো তো মাত্র দু'জন। কিন্তু তোমার বোনকে তো তখন দেখলাম ড্রয়িংরুমে ড্যাংড্যাং করে লাফাচ্ছে আর গুনগুন করে গান গাইছে। মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে কী এমন হলো? যে মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে গেল। আর তোমার বোনের সাথে শাড়ি পরা আরেকটা মেয়েকে দেখেছিলাম আমি। তখন জিজ্ঞেস করিনি। তবে এখন জিজ্ঞেস করছি মেয়েটা কী? ওই মেয়েটাই নিশ্চয় অসুস্থ, তাই না? তখন দেখলাম কেমন ঝুম মেরে বসে ছিল।’

সায়েম বিরক্তে নিয়ে বলল, ‘হুম। ওই মেয়েটাই অসুস্থ।’

- সেটা আমিও বুঝতে পারেছি৷ কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো মেয়েটা কে?

সায়েম বিব্রত হলো। রাফার ব্যাপারটা এই লোকটার কাছে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল ও। কিন্তু পারল না৷ ঠিকই চেপে ধরেছে।

সায়েম নিজের মনে মনে ভাবতে লাগল, ‘এখন যদি বলি মেয়েটা আমার বন্ধুর বোন , তাহলে তো হুলুস্থুল কাণ্ড হয়ে যাবে এখানে। লোকটা তো প্রশ্নের লিস্ট বানিয়ে আমার হাতে ধরিয়ে দিবে। লোকটা যা ঘাড়ত্যাড়া, সে খিটখিটে মেজাজে বলবে, বন্ধুর বোনকে রাতে নিজের বাড়িতে রেখেছ কেন? তুমি কী জানো না বন্ধুর বোনের থেকে সবসময় দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হয়৷ এরা খুবই সাংঘাতিক মানুষ। একবার কাছে আসতে থাকলে আর দূরে যেতে চায় না। সময়-অসময়ে প্রেমে পড়ে শুধু।’

সায়েম নিজেই নিজের মাথায় টোকা দিলো। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। সারার স্বভাবটা দিনদিন ওকে পেয়ে বসেছে। সবসময় শুধু নেগেটিভ চিন্তাভাবনা করে। কেন, এটা কী ভাবা যায় না? বন্ধুর বোনের কথা শুনে লোকটা বলবে, ‘বন্ধুর বোন! সে তো নিজের বোনের মতোই। কোনো সমস্যা নেই।’

সায়েমকে চুপ থাকতে দেখে বাড়িওয়ালা নিজের হাই ভোল্টের গলা ঝেড়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘কী হলো? চুপ করে আছ কেন? বল কে মেয়েটা?’

সায়েম চমকে ওঠে অপ্রস্তুত স্বরে বলল, ‘বউ, বউ। মেয়েটা আমার বউ।’

‘বউ’ শব্দটা বলে সায়েম নিজেই যেন আকাশ থেকে পড়ল। ও ভাবছিল কী বলা যায়, আর ঠিক সেই সময়েই লোকটা ঝাড়ি মারল। আর সায়েমের মুখ দিয়ে বউ শব্দটা বেরিয়ে গেল। সায়েম ভেবেছিল বাড়িওয়ালা নিজের ভ্রু আগের থেকেও বেশি কুঁচকাবে। অবাক আর বিস্ময় নিয়ে সায়েমের দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকবে। প্রশ্নের লিস্টে আরো একঝাঁক প্রশ্ন যোগ হবে৷ কিন্তু না, সেরকম কিছুই হলো। অদ্ভুতভাবে লোকটা স্বাভাবিক ভাবেই তাকিয়ে আছে ওর দিকে৷ বিষয়টি সায়েমকে খুবই ভাবাচ্ছে। কিন্তু বেশিক্ষণ লাগল না ভাবনার অবসান ঘটতে। বাড়িওয়ালা লোকটা নিজেই বলল, ‘অবাক হওয়ার মতোই কিছুই বলোনি তুমি। কারণ মেয়েটা যে তোমার বউ, তা আগে থেকে জানতাম আমি। এবার প্রশ্ন করো না কীভাবে জানলাম। কারণ আমাকে প্রশ্ন করার মতো যোগ্যতা তোমার এখনো হয়নি।’

সায়েম আবারও বিব্রত হলো। কিছু বলতে গিয়েও বাড়িওয়ালার ছেলেকে দেখে থেমে গেল। বাড়িওয়ালার ছেলে সায়েমের দিকে তাকিয়ে প্রসন্ন এক হাসি দিলো। ঘুমন্ত কণ্ঠে বলল, ‘সায়েম ভাই যে। কী ব্যাপার, এত রাতে আপনি এখানে? আপনাদের গলার আওয়াজে তো আমার ঘুমটাই ভেঙে গেল।’

- বিরক্ত করার জন্য আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত ভাই। আসলে একটা বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি।

ছেলেটা কিছু বলার আগেই বাড়িওয়ালা নিজের ঘাড়ত্যাড়া করে বলল, ‘একবার তো ক্ষমা চাইলে। আমার চাওয়ার কী প্রয়োজন? "ক্ষমা" বেশি হয়ে গেলে বাংকে জমা করে রাখো। জানো না, অপচয় আল্লাহও পছন্দ করেন না।’

সায়েম প্রচণ্ড বিরক্ত হচ্ছে। লোকটার চুলহীন মাথাটা ফাটানোর জন্য ওর শরীরের রক্ত টগবগ করছে। বাড়িওয়ালার ছেলে সায়েমের অবস্থা বুঝতে পেরে নিজের বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আরে বাবা। তুমি উনার সাথে এইরকম করছ কেন? মা ডাকছে, যাও তো তুমি। এদিকটা আমি দেখছি।’

লোকটা চলে যাচ্ছিল। সায়েম হাফ ছেড়ে বাঁচলো। কিন্তু কিছুদূর যেয়ে আবারও পিছন ফিরে তাকালো। তবে এবার সায়েমের দিকে নয়, নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কলেজে আর হাসপাতালে প্রাক্টিসের বাইরে এই প্রথম কোনো রোগীর চিকিৎসা করতে যাচ্ছিস। ভুলেও ফ্রি-তে করবি না। নাহলে সারাজীবন ফ্রি-তেই চিকিৎসা করে যেতে হবে।’

লোকটা কথাটা বলে হনহনিয়ে চলে গেলেন। তার ছেলে সায়েমের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিছু মনে করবেন না। বয়স হয়েছে তো, সেজন্য সারাক্ষণ খিটখিটে মেজাজে থাকে।’

সায়েম মৃদু হাসল। তবে মনে মনে বলল, ‘বয়স হলেও কী হবে? বাঁদরামি তো এখনো যায়নি। দিনদিন যেন বেড়েই চলেছে।’

- এবার বলুন তো কী হয়েছে? যদিও পুরোপুরি ডাক্তার হইনি এখনো। তবে হাফ ডাক্তার ভাবতেই পারেব। বলুন কার কী হয়েছে?

হাফ ডাক্তারের প্রশ্নে ঘুরে তাকালো সায়েম। মলিন হাসি দিয়ে বলল, ‘আমার রুমে একজন আছে। অতিরিক্ত জ্বরের কারণে অজ্ঞান হয়ে গেছে৷ আসলে বিকেলে বৃষ্টিতে ভিজেছিল তো, সেজন্যই এমনটা হয়েছে।’

হাফ ডাক্তার সায়েমকে আশ্বাস দিয়ে বলল, ‘চিন্তা করবেন না। আমি দেখছি কী করা যায়। আপনি ঘরে যান, আমি আমার ব্যাগটা নিয়ে আসছি।’

সায়েম হাফ ডাক্তারকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে এলো উপরে। ঘরে গিয়ে দেখে রাফার জ্ঞান ফিরেছে। শুধু জ্ঞানই ফিরেনি, সে আধো-আধো তাকিয়ে কথা বলছে সারার সাথে। পাশে ইতিও আছে। হয়তো এত কোলাহলের শব্দে ওরও ঘুম ভেঙে গেছে। আবার এমনটাও হতে পারে সারা ওকে ডেকে তুলেছে। যাই হোক, এইসব ভাবার সময় নেই এখন। রাফার জ্ঞান ফিরেছে ঠিকই, তবে জ্বর এখনো আছে। 

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই হাফ ডাক্তার চলে এলো। তিনি এসে রাফাকে দেখলেন। সেই সাথে বেশ কিছু পরামর্শও দিলেন। সায়েমকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘জ্বরটা এখনো আছে। কিছুক্ষণ জলপট্টি দিন। আশা করি সকালের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে।’

ছেলেটা চলে যেতে চাচ্ছিল। সায়েম তাকে একটু দাঁড়াতে বলে। কিন্তু সে উল্টো সায়েমকে বাধা দিয়ে বলে, ‘বাবার কথা ধরে বসে আছেন সায়েম ভাই৷ বাবা মজা করে কথাটা বলেছে। আমাকে টাকা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আপনারা তো আমাদের বাড়ির শুধু ভাড়াটিয়া নন, নিজেদেরই লোকজন।’

সায়েম মৃদু হাসল শুধু। হাফ ডাক্তার চলে গেল। সারাও নিজের বাড়িতে চলে গেল। ইতিও নিজের ঘরে চলে গেল ঘুমাতে। রাত প্রায় শেষের দিকে। সায়েম জানে এখন আর ঘুম আসবে না। তাই ল্যাপটপে কাজ করতে বসছিল। কিন্তু ওকে জ্বালানোর জন্য একজন প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন। সায়েম যখন ল্যাপটপ ওপেন করে কাজ করছিল, তখনই হঠাৎ রাফা বিছানা থেকে নেমে আসে। সায়েমের কাছে এসে বলল, ‘তুমি কী আমার উপর রেগে আছ?’

সায়েম ল্যাপটপের দিকে চোখ রেখেই বলল, ‘এখন এইসব বলার সময় না রাফা। তোমার কী কোনোদিনও বুদ্ধি হবে না? চুপচাপ বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড় তো।’

রাফা বিছানায় গেল না। বরং সায়েমের সাথে একেবারে গা ঘেষে বসল। সায়েম বিরক্ত হলো। রাফা নিজের শাড়ির দিকে তাকিয়ে জোর গলায় বলল, ‘কুচি’টা যে ঠিক করে দিয়েছে, তাকে সামনে পেলে খুন করে ফেলতাম।’

সায়েম অবাক হয়ে বলল, ‘কেন? আবারও সুড়সুড়ি লাগছে। লাগুক, তবুও ভালো কাজই করেছে সে।’

- কচু ভালো কাজ করেছে। আগে হুটহাট করে কুচি'টা খুলে যেতো। বেশ ভালোই লাগতো। কিন্তু এখন টেনেটুনেও খুলতে কষ্ট হচ্ছে। কষ্টের থেকেও বেশি অসহ্য লাগছে।

সায়েম ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে রাফার দিকে তাকালো। ধমক দিয়ে বলল, ‘বেশি বকবক করতে ইচ্ছে চলে ইতির ঘরে যাও। আর না যেতে চাইলে চুপচাপ ঘুমাও। আর আমাকেও একটু শান্তিতে থাকতে দাও। সকালে আবার অফিস আছে। এখন কিছু কাজ করে রাখতে পারলে অফিসে গিয়ে কাজের চাপটা কম হবে।’

রাফা কিছু না বলে বিছানায় চলে এলো। সায়েমের দিকে তাকিয়ে মুখটা বাঁকা করল একবার। এরপর চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। 

সায়েমের ঘরের সামনে গিয়ে দরজা ধাক্কাতে লাগল ইতি। কিছুক্ষণ পরই রাফা দরজা খুলে দিলো। রাফাকে দেখে ইতি বলল, ‘কীরে এখন কেমন আছিস? জ্বর কী এখনো আছে?’

রাফা হেসে দিয়ে বলল, ‘কী যে বল আপু। সাধারণ একটু জ্বর কী আর আমাকে কাবু করতে পারবে? এত সাহস কী আর জ্বরের আছে?’

- বেশি পাকনামি করিস না। তা ভাইয়া কোথায়, অফিস যাবে না?

- ঘুমোচ্ছে এখনো।

- আমার আজকে অফিসে প্রথম দিন। তাই একটু তাড়াতাড়ি যাচ্ছি। সারারাত ঘুমোতে পারেনি ভাইয়া৷ তাই আর ডাকলাম না। আমি পরে ফোন করে নিবো। তুই আধা ঘণ্টা পর ভাইয়াকে ডেকে দিস। ঘন ঘন অফিস কামাই দিলে চাকরিটাই চলে যাবে শেষে। আর ভাইয়াকে বলিস, তোকে যেন সারা আপুর মায়ের কাছে রেখে যায়। সারাদিন একা-একা তুই থাকতে পারবি না।

রাফা ‘হ্যাঁ’ বলল। ইতি চলে যাওয়ার আগে বলে গেল, ‘দরজাটা আটকে দে৷ আর শোন, খাবার-দাবার সব রেডি করে রেখে দিয়েছি আমি। সকালের খাবার খেয়ে বাকিগুলো ফ্রিজে রেখে দিস। দুপুরে মনে করে খেয়ে নিবি। বিকেলে ফেরার সময় আমি মেডিসিন নিয়ে আসবো তোর জন্য।’

রাফার রাগ হলো। সবাই ওকে এখনো বাচ্চা মেয়েই ভাবছে। অথচ ও যে অলরেডি বাচ্চা নেওয়ার প্ল্যান করছে, সে খবর কেউ রাখে না।


আজ ইতির অফিসের প্রথম দিন। নতুন এক অনুভূতি। নতুন এক অভিজ্ঞতা। বেশ ভালোই লাগছে। অফিসে গিয়ে দেখল বস অলরেডি চলে এসেছে। মনে মনে বলল, ‘এই না হলে বস। সবসময় আগে আগে থাকবে।’

কিন্তু ইতি বসের রুমে গিয়ে শুনল ওটা ওর বস না। বস বটে, তবে পুরো অফিসের। মালিক ছাড়াও ইতির আরেকজন বস আছে। ইন্টারভিউ এর দিন সে ছিল না। তাই ইতির সাথে দেখা হয়নি। ইতি নিজের কেবিনে বসে অপেক্ষা করছিল বসের জন্য। কারণ ইতি তার দায়িত্বে কাজ করবে। সে না আসা অব্দি ইতির কোনো কাজ নেই। তাই বসে বসে এসির হাওয়া গায়ে লাগাচ্ছিল। তখনই  একজন এসে বলল নতুন বস তাকে ডাকছে। ইতি একপ্রকার উত্তেজিত হয়েই বসের রুমে গেল। ও জানে না এই নতুন বস মানুষ হিসেবে কেমন। তবে আশা করছে ভালোই হবে৷ কিন্তু বসের রুমে গিয়ে ও যা দেখল, সেটার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। 

(চলবে...)

আরো পড়ুন ১৫তম পর্ব- ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড