• শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ (১৫তম পর্ব)

  রিফাত হোসেন

০৬ নভেম্বর ২০১৯, ১৪:২৩
গল্প
ছবি : প্রতীকী

রাফার কথা শুনে সায়েম হাসতে লাগল। রাফার করুণ দৃষ্টিতে তাকালো সায়েমের দিকে। কিন্তু সায়েমের হাবভাব দেখে বুঝা গেল না ওর মাঝে এখন কোনো দয়ামায়া আছে কি না। রাফার ইচ্ছে করছে চিৎকার করতে। আশেপাশে কেউ নেই। ইতি নেই, ফাহাদ নেই, কেউই নেই। শুধু একটা আবছায়া আলোময় ঘরে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে ওরা দু’জন। সায়েম পৈশাচিক ভাবে হাসছে। আর ইতি নিঃশব্দে কাঁদছে। হাসি আর কান্নার শব্দের মিশ্রণে ঘরটায় এক অদ্ভুত প্রতিধ্বনির সৃষ্টি হয়েছে। রাফা চিৎকার করে কাঁদতে চাইছে। কিন্তু পারছে না। কেউ গলা আটকে ধরেনি, বা ও যে কথা বলতে পারে না, এমনটাও নয়। তবুও চিৎকার করে কাউকে ডাকতে পারছে না। এই মুহূর্তে ওর কেউ একজনকে প্রয়োজন। কিন্তু কেউ নেই। না থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ স্বপ্নে হাজার আকুতি-মিনতি করেও শয়তান ছাড়া অন্য কারোর সাহায্য পাওয়া যায় না।

শয়তানের কথা মনে পড়তেই বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠল রাফা। ভয়ার্ত ভাবে চারিদিকে চোখ বুলালো। কিন্তু না, চারিদিকে অন্ধকার ছাড়া কিছুই নেই। রাফা কাঁপা-কাঁপা হাতে চোখেমুখে হাত দিলো। এরপর নিজের মনে মনে বলল, ‘চোখেমুখে এত জল কেন? তাহলে কী সত্যিই সায়েম আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিলো? আর সেজন্যই আমি কাঁদছিলাম।’

কষ্ট রাফার বুক ফেঁটে যাচ্ছে। আশেপাশে কোত্থাও সায়েমকে দেখতে পাচ্ছে না ও। হঠাৎ করে যে কোথায় উধাও হয়ে গেল, তা কিছুতেই বুঝতে পারছে না রাফা। এখন সায়েমকে সামনে পেলে আরো অনুরোধ করা যেতো। না শুনলে জোর করতো। প্রয়োজন হলে হাত-পা সব বেধে রেখে দিতো। এতেও কাজ না হলে একেবারে খুন করার হুমকি দিতো। কিন্তু না, সায়েম হয়তো ডিভোর্স পেপারে সাইন করেই চলে গেছে। যে কারণে এইসবের কিছুই এখন করা যাবে না। তাই রাফা সেভাবেই গালে হাত দিয়ে বসে রইলো বেশ কিছুক্ষণ। গালে হাত দিয়ে বসে থাকলে অনেকেই বলে জামাই মরে গেছে। তাই শোকে কাতর হয়ে গালে হাত দিয়ে বসে আছে। কিন্তু সায়েমের তো কিছুই হয়নি। আচ্ছা, বিয়ের পর কী এই প্রথম আমি গালে হাত দিয়ে বসেছি, নাকি আগেও গালে হাত দিয়ে বসেছিলাম। কই মনে তো পড়ছে না। নিশ্চয়ই এটাই প্রথম। তাহলে কী আমার বরের বিপদের আশঙ্কা আছে?

বিড়বিড় করে কথাটা বলে গাল থেকে হাত সরিয়ে নিলো রাফা। ঘাপটি মেরে শুয়ে পড়ে পাশে হাত দিতেই কারোর শরীর স্পর্শ করল। তবে মাঝে কাঁথা নামক একটা বাধা আছে৷ তবুও বুঝা যাচ্ছে কেউ একজন পাশে শুয়ে আছে। - সায়েম নয়তো?

নিজেকে প্রশ্নটা করল রাফা। কৌতূহল, শঙ্কা আর ভয় নিয়ে ভাবতে লাগল কিছুক্ষণ। ভালো করে জড়িয়ে ধরতেই বুঝতে পারল এটা সায়েম হওয়া একেবারেই অসম্ভব। কারণ পাশের জনের শরীর খুবই নরম। সায়েম ছেলে মানুষ। ওর শরীর শক্ত থাকাটা বাধ্যতামূলক। পর্দার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আবছায়া আলো আসছে৷ চোখটা সয়ে গেলে আবছায়া আবছায়া দেখা যায় চারিদিকটা। দেখার থেকেও বেশি অনুভব করা যায়। রাফা দেখল পাশের নরম শরীরের মানুষটা কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। এমন ভাবে সোজা হয়ে শুয়ে আছে, যেন কোনো হুশজ্ঞান নেই৷ পাশের মেয়েটাকে যে তার স্বামী ডিভোর্স দিয়ে চলে গেল, সেদিকে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। 

রাফা কিছুক্ষণ গম্ভীরমুখে বসে থাকল। হঠাৎ বেড সুইচ চাপ দিয়ে পাশের মানুষটার শরীর থেকে কাঁথা টান দিয়ে সরিয়ে দিলো। 

হঠাৎ শরীর থেকে কাঁথাটা এভাবে সরে যাওয়ায় হকচকিয়ে উঠল ইতি। শোয়া থেকে ওঠে বসল। রাফা লক্ষ্য করল ইতির ফোন স্ক্রিনের আলো জ্বলছে। এবং ইতির দুই কানেই হেডফোন। ইতি এক কান থেকে হেডফোন খুলে অবাক দৃষ্টিতে রাফার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘কী হলো রাফা? হঠাৎ এইরকম করলি কেন?’

ইতির প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলো না রাফা। ওর কাছে যে এই প্রশ্নের উত্তর নেই, তেমনটা না। কিন্তু ও এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছে না এখন। কারণ এখন ও এর থেকেও বড় কাজ করছে। অন্যদিকে নজর না দিকে ও তীক্ষ্ণভাবে ইতির ফোনে স্ক্রিনটা দেখছে। স্ক্রিনের আলো অফ হয়ে যাওয়ার আগে ও দেখে নিলো ইতি এত রাতে ফোনে কী করছে? স্ক্রিনের আলো আর বেশিক্ষণ রইল না। অফ হয়ে গেল। রাফা মুচকি হাসি দিয়ে বলল, ‘আমি কিন্তু সবই বুঝেছি।’

ইতি আড়চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘কী বুঝেছিস?’

- তুমি ভাইয়ার সাথে চ্যাটিং করছিলে। এবং একটু আগেও কী করেছ? তা একেবারে পরিষ্কার আমার কাছে।

ইতি চমকে ওঠে পা গুটিয়ে বসল। হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছে আমতাআমতা করে বলল, ‘কি করেছি আমি?’

- ফোন স্ক্রিনে থাকা ভাইয়ার ছবিতে তুমি চুমু খাচ্ছিলে। যার প্রমাণ স্ক্রিনের উপর ভেসে ওঠা তোমার ঠোঁটের স্পর্শের ছাপ।

ইতি খপ করে রাফার মুখটা চেপে ধরে বলল, ‘প্লিজ লক্ষ্ণী বোন। আমার মান-ইজ্জতের ১৩ টা বাজিয়ে দিস না। তোর কী লাগবে বল? আমি প্রথম বেতন পেয়েই তোকে গিফট দিবো।’

রাফা বিরক্তির স্বরে বলল, ‘এখন তোমার আমাকে প্রয়োজন। অথচ তোমার ভাই যখন আমাকে ডিভোর্স দিলো, তখন তো আমি তোমাকে অনেক ডেকেও হেল্প পাইনি।’

ইতি যেন ধপাস করে আকাশ থেকে পড়ল। চোখ দু'টো বড়বড় করে তাকিয়ে রইল রাফার দিকে। রাফা কিছু না বুঝে আবারও বলল, ‘তবে চিন্তা করো না। আমি এখনো ডিভোর্স পেপারে সাইন করিনি। বিয়ে যখন দু’জন মানুষের সাইন ছাড়া অসম্পূর্ণ থাকে৷ তেমনি দু'জনের সাইন ছাড়া এই ডিভোর্স অসম্পূর্ণ হয়ে আছে। এ জীবনে আর এটা সম্পূর্ণ হবে না।’

ইতি নিজের "হা" করা মুখটা বন্ধ করে বলল, ‘তুই এইসব কী বলছিস রাফা? কীসের ডিভোর্স? আর এখানে আমার ভাই কোত্থেকে এলো? তুই কী ভুলে গেছিস, যে তুই আমার ঘরে আছিস।’

রাফা অবাক হয়ে চারিদিকে আবারও চোখ বুলালো। কিন্তু ও কিছুই বুঝতে পারল না৷ ওর মাথাটা খুব ব্যাথা করছে। ভালো করে তাকাতে পারছে না। মনে হচ্ছে মাথায় সাথে সাথে চোখ দু'টোও কেউ শরীর থেকে আলাদা করে নিচ্ছে। 

ওর অবস্থা দেখে ইতির আর বুঝতে বাকি রইল না কাহিনীটা কী? রাফা নিশ্চয়ই সায়েমকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছে। আর সেটা ডিভোর্স সংক্রান্ত কোনো ব্যাপার নিয়ে। আর সেজন্যই ও এইরকম বলছে। ইতি রাফাকে শান্ত করার জন্য বলল, ‘রাফা তুই স্বপ্ন দেখেছিস। ভালো করে তাকিয়ে দেখ তুই আমার ঘরে আছিস। সেই সন্ধ্যা থেকে ঘুমোচ্ছিলি। এখন একটা স্বপ্ন দেখে তোর ঘুমটা ভেঙে গেছে।’

রাফা এবারও কোনো উত্তর দিলো না। তবে ও মনে মনে কী যেন বিড়বিড় করছে। কথাগুলো স্পষ্ট বুঝতে না পারলেও ওর হাবভাব দেখে ইতি নিশ্চিত যে, রাফা কাঁপছে। ইতি রাফার কপালে হাত দিতেই চমকে উঠল। ভ্রু-কুঁচকে তাকিয়ে বলল, ‘তোর তো জ্বর এসেছে রাফা। সাংঘাতিক জ্বর।’

রাফা প্রতিউত্তরে অন্য প্রসঙ্গে বলল, ‘আমি সায়েমের কাছে যাবো ইতি আপু। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে সায়েম আমার থেকে দূরে চলে যাওয়ার প্ল্যান করছে। হয়তো সারা আপুর সাথে পালিয়ে যাওয়ার প্ল্যান করছে।’

ইতি রাফাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘প্লিজ রাফা শান্ত'হ একটু। ভাইয়া কোত্থাও যাবে না। যতদিন ভাইয়ার সাথে আমি আছি, ততদিন ভাইয়া আমাকে ছেড়ে কোত্থাও যাবে না। হ্যাঁ, আমার বিয়ে হয়ে গেলে আমি শ্বশুর বাড়িতে চলে যাবো। তখন হয়তো ভাইয়া কোথাও চলে যাওয়ার কথা ভাবতে পারে। কারণ ভাইয়ার নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কেউ কিছু করলে ভাইয়া সেটা সহ্য করতে পারে না। আর তুই সেটাই করেছিস। কিন্তু এখন যে এইরকম কিছুর প্ল্যান করবে না, তার গ্যারান্টি আমি লিখে দিতে পারি।’

রাফা কাঁদোকাঁদো স্বরে বলল, ‘তবুও আমি ওর কাছে যাবো এখন। প্লিজ আপু, আমাকে একটু বুঝার চেষ্টা কর। আমি জানি, আমি অন্যায় করেছি। কিন্তু কেন করেছি সেটা তো তোমরা জানো। আমি সত্যি সায়েমকে অনেক ভালোবাসি।’

- তোর শরীর ভালো নেই রাফা। তুমি শুয়ে পড়। আমি দেখছি তোর মাথায় পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারি কি-না।

- সেসব লাগবে না আপু। তেমন কিছু হয়নি আমার। আমি শুধু সায়েমের কাছে যাবো

- ভাইয়া এখন ঘুমোচ্ছে। আর তুই জানিস না ঘুমের সময় বিরক্ত করা ভাইয়া একেবারেই পছন্দ করে না। সে খুবই রাগী একজন মানুষ। এখন আমার জন্য একটু শান্ত আছে। আগে তো সারাক্ষণ মারামারি নিয়ে থাকতো। ইউনিভার্সিটিতে থাকতে পড়াশোনার থেকে মারামারি বেশি করতো সে। কোথাও কোনো ঝামেলা হলে সবার আগেই সায়েম ভাইয়া যেতো। সে এখন খুবই শান্ত হয়েছে বটে, তবে রাগটা তো আর সবক্ষেত্রে কন্ট্রোল করা যায় না। এই যেমন ঘুমের সময় ব্যাঘাত ঘটালেই ভাইয়া রেগে যাবে। তোকে আর আমাকে চারতলা থেকে ছুড়ে ফেলে দিবে।

- তবুও আমি যাবো। সায়েম আমার কিছুই করবে না। কারণ ও ফাহাদ ভাইয়াকে কথা দিয়েছিল।

- ভাইয়ার দূর্বলতার সুযোগ নিচ্ছিস রাফা। এটা ঠিক করছিস না। এতে তোরই বিপদ হবে।

- তবুও আমি যাবো। কথাটা বলে রাফা বিছানা থেকে নেমে ড্রয়িংরুমে চলে এলো। ইতিও ড্রয়িংরুমে এলো। কিন্তু আর সামনে না এগিয়ে দু'জনেই দাঁড়িয়ে রইল। কারণ সায়েমের ঘরে লাইট জ্বলছে। সায়েম সাধারণত লাইট নিভিয়ে ঘুমায়। ইতি আজ প্রথম দেখছে রাত ১ টার সময় সায়েমের ঘরে বাতি জ্বলছে৷ ব্যাপারটা ওর কাছে একটু আশ্চর্যজনক লাগল। কিন্তু রাফাকে সে ব্যাপারে কিছু না বলে সায়েমের ঘরের দরজার সামনে চলে গেল। 
আস্তে করে বলল, ‘ভাইয়া।’

ভিতর থেকে কোনো রেসপন্স করল না সায়েম। ইতি আবার বলল, ‘ভাইয়া দরজাটা খোলো।’

সায়েম দরজা খুলে দিলো। ইতির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এত রাতে এখানে? কোনো সমস্যা হয়েছে?’

ইতি কিছু বলতে পারল না৷ ভাইয়ের অবস্থা দেখে ওর বুকের ভিতরটা হাহাকার করে উঠল। হৃদস্পন্দনে আঘাত লাগলে মানুষ যেভাবে কাঁদে, তার থেকে গভীর ভাবে কাঁদতে ইচ্ছে করছে ইতির। অদ্ভুত এক যন্ত্রণা অনুভব করছে বুকের ভিতর। এক পা সামনে এগিয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকল। সায়েমের মুখের সামনের এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে দিয়ে চোখ-মুখ হাত দিয়ে মুছে দিয়ে বলল, ‘তোমার কী হয়েছে ভাইয়া? এইরকম করছ কেন তুমি?’

সায়েম চোখের পলক ফেলে শার্টের হাতা দিয়ে চোখটা মুছে নিলো। এরপর মৃদু হাসি দিয়ে বলল, ‘তেমন কিছু না ইতি। ঘুম আসছিল না। তাই একটু ছটফট করছিলাম৷ একটু হাঁটাহাঁটি করছিলাম রুমের ভিতর।’

ইতির বুকের ভিতরের অদ্ভুত ব্যাথাটা কমে যেতে লাগল। ওর মনে পড়ে গেল ছোটবেলার কিছু মুহূর্ত। তখন ওরা দু'জনেই খুব ছোট। মায়ের দুই পাশে দুই ভাই-বোন ঘুমাতো। হঠাৎ একদিন মাঝরাতে বিকট শব্দ পেয়ে স্তম্ভিত হয়ে যায় বাড়ির সবাই। সেদিন সায়েমের জন্মদিন ছিল। তাই বাড়িতে অনেক আত্নীয়স্বজন ছিল। অনুষ্ঠান শেষ হতে বেশি রাত হয়ে যাওয়ায় অনেকেই রাতটা থেকে গিয়েছিল। একটা শব্দ শুনে সবার ঘুম ভেঙে যায়। সায়েম মা, মিসেস অন্তরা দরজার দিকে তাকিয়েই থতমত খেয়ে যান। কারণ দরজাটা খোলা। আর তার পাশে সায়েম নেই। মুহূর্তের মধ্যেই তার মাঝে একটা ভয়ঙ্কর আতঙ্কের সৃষ্টি হয়৷ আর বাড়ির অন্যদের মনে সৃষ্টি হয় ভয়। সাংঘাতিক ভয়। সবাই ভেবেছিল বাড়িতে ডাকাতি হবে। কিন্তু শব্দটা এক বারই হয়ে থেমে যায়। একেবারে পুরো বাড়িতে শুনশান নীরবতা বিরাজ করতে থাকে তখন। রাত তখন তিনটারও বেশি বাজছিল। শব্দটা থেমে যাওয়ায় সবাই মনে মনে কিছুটা সাহস পেলেও অন্তরা বেগম এর ভয় কাটছিল না৷ তবুও সে মেয়েকে নিয়ে ঘর থেকে বের হতে থাকেন। ইতি সায়েমের থেকে ছোট ছিল। ফলে অতিরিক্ত ভয়ের কারণে কান্না করছিল। থমথমে এক বাড়িতে হঠাৎ কারোর কান্নার শব্দ আসলেই ভয়ানক। কান্নার শব্দটা যে উপর থেকে আস্তেধীরে ড্রয়িংরুমের দিকে আসছিল, তা ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবাই ভালো করেই বুঝতে পারছিল। সবার মনে তখন অদ্ভুত এক উত্তেজনা। মিসেস অন্তরা আর ইতি সিড়ি নিয়ে নামার সময় দেখল অতিথিরা সবাই ড্রয়িংরুমে জড়ো হয়েছে৷ আর অতিথিরা কান্নার মাধ্যমটা বুঝতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু মিসেস অন্তরার মনটা তখনও অশান্ত ছিল। তিনি ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছেন না৷ কিন্তু সিড়ির শেষ পর্যায় অতিক্রম করে ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই এক কোণায় ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বড় করে নিঃশ্বাস নেয়। কিন্তু ছেলের অদ্ভুত আচরণ তাকে ভাবাচ্ছিল। শুধু তাকেই ভাবাচ্ছিল না, বরং ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবাইকেই ভাবাচ্ছিল। বিকট শব্দটা কোত্থেকে হয়েছিল তা সবাই বুঝতে পারে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে কাঁচের টুকরো  দেখে৷ ড্রয়িংরুমের বড় লাইটটা ভেঙে পড়ে আছে৷ লাইটের টুকরোগুলো বেশি উপর থেকে পড়ায় শব্দটা একটু বেশিই হয়েছিল। কিন্তু সেদিকে কেউ ভ্রুক্ষেপ না করে সবাই সায়েমের দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর হাতে একটা ফুটবল। এক জায়গায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ও। আনিস উদ্দিন রেগেমেগে ছেলের দিকে এগিয়ে যেতে নিলে মিসেস অন্তরা বেগম বাধা দিয়ে নিজে এগিয়ে যান। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলেন, ‘কী হয়েছে বাবা? তুমি এইরকম করছ কেন? আর লাইটটা ভাঙলো কীভাবে?’

সায়েম কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘ঘুম আসছিল না বলে একটু ফুটবল খেলার জন্য এখানে এসেছিলাম। হঠাৎ বলটা একটু জোরে মারতেই উড়ে গিয়ে লাইটে লেগে গেছে। তারপরই একটা জোরে শব্দ হয়ে ভেঙে গেল।’

সায়েমের কথা শুনে তো অবাক সবাই। কারণ খেলাধুলো করলে চোখ থেকে ঘুম যেটুকু ছিল, সেটুকুও হারিয়ে যায়। আর এই ছেলে উল্টো কথা বলছে। মিসেস অন্তরা তখন বলল, ‘ফুটবল খেললে যে ঘুম আসবে, এ'কথা কে বলেছে তোমাকে? তোমার ঘুম আসছে না ভালো কথা। আমাকে ডাকতে পারতে। আমি তোমাকে গল্প শুনিয়ে ঘুম পারিয়ে দিতাম। একা একা এখানে আসতে গেলে কেন?’

- আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল, খেলাধুলো করলেই ঘুম আসবে৷ তাই এসেছি।

- ঠিক আছে ঘরে চলো। আমি তোমার ঘুম ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আর খবরদার, এইরকম পাগলামি কক্ষণো করবে না।

সায়েম সেদিন মায়ের নিষেধাজ্ঞা এক কান দিয়ে শুনেছিল, আরেক কান দিয়ে বের করে দিয়েছিল। এরপর থেকে সে প্রায়ই এইরকম কাজ করত৷ আর জিজ্ঞেস করলেই বলত, ‘আমার চোখের ঘুম আনার মন্ত্র এটা।’

- কিছু বললে তাড়াতাড়ি বল। নাহলে নিজের ঘরে যা। আমাকে আরো কিছু করতে হবে৷ নাহলে ঘুম আসবে না।" কড়া গলায় কথাটা বলল সায়েম। 

ইতি ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে হাসতে হাসতে বলল, ‘এখানে তো ফুটবল বা অন্যান্য খেলনা নেই, তাহলে ঘুম ফিরিয়ে আনার মন্ত্র হিসেবে কী ব্যবহার কর?’

সায়েম মলিন হাসি দিয়ে বলল, ‘আরো কিছু মন্ত্র আমার জানা ছিল। যা এখানে আসার পর থেকে এপ্লাই করছি৷ একবার বইপত্র বা ফাইল ফ্লোরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখছি। আবার নিজেই সেগুলো গুছিয়ে রাখছি। কখনো আবার ফ্লোরে গড়াগড়ি করছি। তবে লাফালাফি করাটা খুব রিস্ক হয়ে যাবে এখানে। কারণ লাফালাফি করলে নিচের তলার মানুষজন লাঠি নিয়ে আসবে আমাকে মারার জন্য। তাই লাফালাফিটা স্থগিত আছে।’

ইতি উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। সায়েম কিছুক্ষণ পর বলল, ‘তা এতরাতে এখানে কেন এসেছিস? কোনোপ্রকার শব্দ পেয়ে আসিসনি সেটা আমি নিশ্চিত। কারণ আমি যা করার নিঃশব্দে করেছি।’

- না ভাইয়া, আসলে রাফার জ্বর এসেছে। তার উপর আবার কি যেন স্বপ্ন দেখেছে৷ তোমার কাছে আসতে চাচ্ছে।

সায়েম তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, ‘নাটক শুরু করেছে। এইসব ওর নাটক।’

সায়েমের ভুলটা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ইতি জোর গলায় বলল, ‘ভুল ভাবছ তুমি। সত্যি সত্যিই রাফার খুব জ্বর এসেছে। বিকেলে বৃষ্টিতে ভিজেছিল একটু। সেকারণেই এমনটা হয়েছে৷ জানোই তো সিজন চেঞ্জ এর আবহাওয়া কতটা খারাপ৷ আর এই সময়ের বৃষ্টি তো আরো ভয়ঙ্কর।’

- কোথায় ও? ঘরে ঔষধ আছে। খাইয়ে দে।

- ও তোমার কাছে আসতে চাইছে৷ তুমি বরং ওকে ঔষধ খাইয়ে দাও৷ আর আজকের রাতটা এখানেই রাখো।

সায়েম রেগে গিয়ে বলল, ‘পাগল হয়েছিস নাকি৷ কোন দুঃখে ওকে এই ঘরে রাখবো আমি?’

- ভাইয়া প্লিজ, মাথাটা একটু ঠাণ্ডা কর। আমার এই অনুরোধটা একটু রাখো প্লিজ।

সায়েম কিছু না বলে দরজার সামনে থেকে সরে গিয়ে বিছানায় বসল। ইতি পিছনে তাকিয়ে দেখে রাফা ড্রয়িংরুমেই দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটার হাবভাব দেখে কিছুই বুঝতে পারে না ইতি৷ কখনো সাহস দেখিয়ে সায়েমের সাথে ঝগড়া করে। আবার কখনো ভয়ে কাচুমাচু করতে করতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে এক কোণে। ইতি আর সময় নষ্ট না করে রাফাকে ডাক দিলো। রাফা কাছে আসতেই ইতি বলল, ‘রাতটা এখানেই থাক। তবে সাবধান, ভাইয়াকে রাগিয়ে দিস না। আর ভাইয়া তোকে ঔষধ দিয়ে দিবে৷ সকালে বরং ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।’

রাফা শয়তানি মার্কা একটা হাসি দিয়ে "আচ্ছা" বলল। ইতি চলে এলো নিজের ঘরে৷ রাফা এক-পা, দু-পা করে ঘরের ভিতরে গেল। দরজাটা আটকে দিয়ে বিছানার কাছে গিয়ে সায়েমের পাশে বসল। সায়েম বিরক্তিকর মুখ নিয়ে রাফার দিকে তাকালো। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ ঠাস করে একটা থাপ্পড় মেরে দিলো রাফার গালে। রাফা হঠাৎ ঝটকা খেলো। জ্বরে শরীর দূর্বল থাকায় পড়ে যাচ্ছিল। তবে নিজেকে সামলে নিয়ে আবারও সোজা হয়ে বসল। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল, তবুও গালে হাত বুলিয়ে কাঁদোকাঁদো স্বরে বলল, ‘মারলে কেন আমাকে?’

সায়েম গম্ভীরমুখে কড়া গলায় বলল, ‘মেরেছি কারণ পাকনামি করে বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাধিয়েছে। সব ঝামেলা কেন যে আমার উপর এসে পড়ে আমি বুঝতে পারি না।’

রাফার চোখ থেকে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল। সায়েম তা দেখেও না দেখার ভান করে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। রাফা বলল, ‘যেদিন মরে যাবো, সেদিন তোমার জীবন থেকে একেবারে সব ঝামেলা দূর করে দিয়ে যাবো।’

সায়েম অদ্ভুত এক হাসি দিয়ে বলল, ‘নাটকীয় ডায়লগ আমাকে শোনাতে এসো না দয়া করে। এত কথা না বলে শুয়ে পড়।’

- তুমি শুবে না?

- আমার ঘুম আসছে না সেটা নিশ্চয়ই শুনেছ একটু আগে। তার পরেও বোকার মতো প্রশ্নটা করলে। যাই হোক, ঘুমালে ঘুমাও, না ঘুমালে বসে থাকো এভাবে। ভেবো না দরদ দেখিয়ে আমি তোমার সেবাযত্ন করব এখন। তোমার ভুলের জন্যই জ্বর এসেছে। সুতরাং এইটুকু কষ্ট তোমার প্রাপ্য।

রাফা কিছু বলল না। ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে৷ কিন্তু এভাবে প্রকাশ্যে কান্নাকাটি করে কারোর সহানুভূতি পাবার চেষ্টা ও করবে না। আর সায়েমের থেকে তো একেবারেই না। তাই এভাবে চুপ করে বসে থাকাই উত্তম। কিছুটা সময় এভাবেই পেরিয়ে গেল। হঠাৎ কপালে আর গালে কারোর হাতে স্পর্শ পেয়ে বিদ্যুতের শক্ খাওয়ার মতো চমকে উঠল রাফা। পুরো শরীরে অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে গেল। পরম যত্নে কেউ আলতো করে ওর গাল স্পর্শ করে দিচ্ছে। ভালোলাগার আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলল রাফা। হঠাৎ সায়েমের কণ্ঠ শুনে চোখ মেলে তাকালো। সায়েম বলল - জ্বর তো অনেক। ডাক্তার অবশ্য এই বিল্ডিংয়ে আছে একজন। তবে এত রাতে ডাকা ঠিক হবে কি-না বুঝতে পারছি না।

রাফা বলল, ‘ডাক্তার ডাকতে হবে না। মাঝে মাঝেই রাতেরবেলায় আমার জ্বর হয়৷ আবার সকালেই সব ঠিক হয়ে যায়।’

সায়েম হাতটা সরিয়ে নিয়ে বলল, ‘তাহলে প্লিজ শুয়ে পড় এবার। ওহ্ হ্যাঁ, ঔষধটা দিচ্ছি, খেয়ে নাও।’

- দুপুরের পর কিছু খাওয়া হয়নি আর। ইতি আপু ডেকেছিল রাতের খাবার খাওয়ার সময়। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বলে আর খাইনি।

সায়েম বসা থেকে ওঠে দাঁড়াল। নিজের অফিস ব্যাগ থেকে একটা কেকের প্যাকেট বের করে রাফার হাতে দিয়ে বলল, ‘তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। আমি মেডিসিন দিচ্ছি।’

রাফা নিঃশব্দে প্যাকেটটা হাতে নিয়ে খেতে লাগল৷ খাওয়া শেষে সায়েমের হাত থেকে মেডিসিন নিয়ে পেটে চালান করে দিলো। সায়েম বলল, ‘এবার প্লিজ শুয়ে পড়। আর জ্বালিও না আমাকে।’

রাফা মৃদু হাসি দিয়ে বলল, ‘আর একটু জ্বালানো বাকি আছে প্লিজ। মানে আমি আজকে নিচে শুতে পারব না।’

- আমি তোমাকে বিছানাতেই শুতে বলেছি। নিচে না।

- তোমাকেও আমার পাশে শুতে হবে।

সায়েম দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘বাড়াবাড়ি করছ রাফা৷ আমার মাথাটা আর গরম করিও না।’

- প্রয়োজনে ফ্যানটা অন করে দাও। মাথাটা ঠাণ্ডা করে তারপর শুয়ে পড়। প্লিজ প্লিজ প্লিজ। আমার এই একটা অনুরোধ রাখো। আমি কথা দিচ্ছি, কালকে সারাদিন আমি তোমাকে ভাইয়া বলে ডাকবো। ভেবে দেখ, একরাত আমার পাশে ঘুমোলেই একদিনের জন্য আমার কাছ থেকে বিশাল বড় সম্মান পাবে। এইরকম অফার আজ পর্যন্ত কোনো সিম কোম্পানিও দেয়নি।

সায়েম চুপ করে রইল। পরক্ষণেই হঠাৎ কী ভেবে যেন রাজি হয়ে গেল। আর সে আনন্দে রাফা হঠাৎ লাফিয়ে উঠল। আর তাতেই বিপত্তি হয়ে গেল।  রাফার শাড়ির কুচি'টা খুলে ফ্লোরে পড়ে গেল। সায়েম উল্টো দিকে ঘুরে বিড়বিড় করে বলল, ‘স্টুপিড কোথাকার।’

রাফা মুচকি হাসি দিয়ে মনে মনে বলল, ‘ভালোই হয়েছে।’

দু'জনেই বিড়বিড় করে কথা বলছিল। হঠাৎ বিড়বিড় থামিয়ে সায়েম রাগী কণ্ঠে বলল, ‘তোমাকে সকালেও বলেছি যেটা পারতে পারো না, সেটা পরতে যেও না। সাধারণ একটা শাড়ি যখন সামলাতে পারো না, তখন পরে আছ কেন এইসব? ইতির কোনো জামা পরে নিলেই তো হতো৷ তাছাড়া ফাহাদকে ফোন করে বলতে তোমার জামা-কাপড় এখানে নিয়ে আসতে। তোমার ওইরকম দামি দামি সব জামা-কাপড় কিনে দেওয়ার সামর্থ আমার এখনো হয়নি। সো তোমাকে ওখান থেকেই জামা-কাপড় আনতে হবে।’

- পাগল নাকি। তুমি কী জানো না, কম হলেও বিয়ের পরের একমাস পর্যন্ত নতুন বউকে শাড়ি পরে থাকতে হয়। নাহলে লোকজন বুঝবে কীভাবে আমি নতুন বউ?

- তাহলে নিজের শাড়ি নিজেই সামলাও। তোমাকে এভাবে দেখার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। সুতরাং কুচি'টা ঠিক করে নাও।

- উঁহু। কুচি’টার জন্য আমাকে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়৷ আমার সুড়সুড়ি লাগে।

সায়েম মুখটা ‘হা’ করে বলল, ‘হোয়াট?’

রাফা কিছুটা লজ্জা পেলেও তা প্রকাশ না করে বলল, ‘আসলে কুচি'টা ওভাবে গুজে রাখার অভ্যাস নেই তো। সেজন্য সুড়সুড়ি লাগে। তবে অভ্যাস হয়ে যাবে৷ রাতটা ওভাবেই ধরে রাখি। সকালে ইতির আপুর কাছে গিয়ে ঠিক করে নিবো।’

সায়েম হাসিটা চেপে রেখে বলল, ‘ঠিক আছে। যাও শুয়ে পড়।’

- তুমিও আসো।

-  হুম।

রাফা কুচি'টা হাত দিয়ে ধরে বিছানায় ওঠে পড়ল৷ একপাশ করে শুয়ে সায়েমের জন্য জায়গা করে দিলো। কালকে অফিস আছে। লাইট অন থাকলে আর ঘুম হবে না। তাই সায়েম বাধ্য হয়ে লাইটটা অফ করে দিয়ে রাফার পাশে শুয়ে পড়ল। তবে উল্টো দিকে মুখ করে। রাফা বেশ বিরক্ত হলো। তবে ঠাণ্ডা মাথায় খুব তাড়াতাড়ি এর সমাধানও বের করে ফেলল। গড়াগড়ি করতে করতে সায়েমের উপর দিয়ে, সায়েম যেদিকে মুখ করে শুয়েছিল, সেদিকে চলে এলো। সায়েম অবাক হয়ে বলল, ‘এটা কী হলো?’

রাফা সায়েমকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। সায়েমের বুকে চুমু দিয়ে, সায়েমের বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল। এরপর বলল, ‘এটা রাফার স্পেশাল টেকনিক।’

সায়েমের ইচ্ছে করছিল রাফাকে আরেকটা থাপ্পড় দিতে। কিন্তু ও অসুস্থ বলে সেটা করল না। এভাবেই কেটে গেল অনেকটা সময়। ঘড়ির কাটায় তখন রাতের মাঝামাঝি সময় দেখাচ্ছে। সায়েম লক্ষ্য করল রাফা গভীর ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছে৷ ওর শরীরের গরম উত্তপ্ততা স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে সায়েম। জ্বরটা যে মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাচ্ছে, সেটা বুঝতে পারছে সায়েম। কিন্তু আপাতত কিছু করার নেই৷ সকালের অপেক্ষা করতে হবে। 

রাফা পুরোপুরি ঘুমিয়ে যাওয়ার পর সায়েম ওর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বিছানা থেকে নেমে বারান্দায় এলো। হালকা শীতল বাতাস লাগছে শরীরে।  হঠাৎ পাশের বিল্ডিংয়ের দিকে নজর পড়তেই সায়েমের চোখটা স্থির হয়ে রইল। পাশের বিল্ডিংয়ের দেয়ালে যান্ত্রিক এক আলো পড়েছে৷ সম্ভবত এই বিল্ডিংয়ের কোনো ঘরের বারান্দা দিয়েই আলো বেরিয়ে পাশের বিল্ডিংয়ের দেয়ালে এসে পড়েছে। সায়েম ভালোভাবে লক্ষ্য করে দেখল ওর উপরের তলার ঘর থেকেই আলোটা আসছে। উপরের ঘরটা সারার। - তবে কী সারা এখনো জেগে আছে? 

কথাটা মনে মনে বলল সায়েম। হঠাৎ ঘরের ভিতরে এসে টেবিলের উপর থেকে ল্যাপটপটা হাতে নিলো। ল্যাপটপ অন করে সারাকে একটা মেইল করে দিলো। সারার রুমে ওয়াইফাই আছে৷ ফলে সারা সবসময় অনলাইনে এক্টিভ থাকে৷ মেইলটা করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে লাগল সায়েম। সারা জেগে থাকলে অবশ্যই মেইলটা দেখবে। সায়েম বারান্দায় আরো কিছুক্ষণ থেকে ঘরে এসে ল্যাপটপটা রাখল। ড্রয়িংরুমে এসে দরজাটা খুলে বাইরে এলো। দরজাটা আবার লক করে দিয়ে সিড়ি দিয়ে ছাদে যেতে লাগল। ছাদের দরজাটা খোলা দেখে মুচকি হাসি দিলো সায়েম। ছাদে গিয়ে পরিচিত একটা ঘ্রাণ অনুভব করল । চাঁদের আবছায়া আলো আর ৬০ ওয়াটেরর ছোট্ট বাল্বে দেখল ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে সারা। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। সায়েম সারার কাছে গিয়ে, সারাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল। আকস্মিক ভাবে কারোর স্পর্শ পেয়ে কেঁপে উঠল সারা। কিন্তু পরক্ষণেই সায়েমের শরীরের সেই পারফিউম এর ঘ্রাণটা পেয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল। পিছনে থেকে ঘুরে এসে সায়েমের দিকে মুখ করে দাঁড়াল। সায়েম দেখল সারার চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। হঠাৎ কোনোকিছু না ভেবে সায়েম সারার চোখে আর গালে চুমু দিতে লাগল। অদ্ভুতভাবে সায়েমের প্রতিটি স্পর্শে শিউরে উঠছে সারা। সায়েম নিজের ঠোঁট দিয়ে সারার চোখের জল শুষে নিতে লাগল। সারা ছটফট করছিল। হঠাৎ সায়েমকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘কি করছেন সায়েম? কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে। তাছাড়া আমি চাই না আমার স্বামী ছাড়া অন্য কোনো পুরুষ আমাকে এভাবে স্পর্শ করুক। এবার বলুন প্লিজ এত রাতে আমাকে এখানে ডাকলেন কেন? আর আপনাকে না বলেছি, কখনো কসম দিয়ে আমাকে কিছু করতে বলবেন না। এইসব ঠিক না সায়েম। পাপ হয়।’

সায়েম সারাকে আরো কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘কসম না দিলে তো আপনি আসতেন না। সেজন্যই বলেছি।’

- জ্বি বুঝতে পেরেছি। এবার তাড়াতাড়ি বলনু কেন ডেকেছেন এত রাতে? সকালে কী বলা যেতো না?

সায়েমের কথার প্রতিউত্তরে সারা কিছুই বলল না। ও ছাদের দরজার দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। সায়েম মুখাটা ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো। আর পিছনের মানুষটাকে দেখে সারাকে ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে গেল। বরফের মতো জমে গেল সারা আর সায়েম। 

(চলবে...)

আরো পড়ুন ১৪তম পর্ব- ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড