• বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০, ১৭ আশ্বিন ১৪২৭  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ (১৪তম পর্ব)

  রিফাত হোসেন

০২ নভেম্বর ২০১৯, ১৩:৫৮
গল্প
ছবি : প্রতীকী

সায়েম ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে এলো। ড্রয়িংরুমে রাফাকে বসে থাকতে দেখে থেমে গেল সে। চোখেমুখে একটু রাগী রাগী ভাব এনে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হঠাৎ তাকে ধমক দিয়ে ওঠে দাঁড়াতে বলল সায়েম। রাফা অপ্রস্তুত ভাবে দাঁড়াতে গিয়ে চেয়ারটা ধপাস করে পড়ে গেল। হঠাৎ এত জোরে শব্দ শুনে ইতি নিজের ঘর থেকে দৌড়ে এলো ড্রয়িংরুমে। অস্থির কণ্ঠে বলল, ‘কি হয়েছে ভাইয়া? এত শব্দ হলো কিসের?’

সায়েম রাফার দিকে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘তেমন কিছু না। চেয়ার পড়ার শব্দ হয়েছে।’

ইতি বুকে হাত দিয়ে বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। এমন ভাবে নড়েচড়ে দাঁড়াল, যেন কথাটা শুনে হাফ ছেড়ে বাঁচল। ঢোক গিলে রাফার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি আরো কত কি ভেবে বসেছিলাম।’

- কি ভেবেছিলি?

ইতি তোতলাতে তোতলাতে বলল, ‘ভাবছিলাম তুমি রাফাকে মারছ।’

- হোয়াট? সায়েম স্তম্ভিত হয়ে কথাটা বলল। ইতি আবারও বলল, ‘না মানে, ভাবছিলাম শুধু। আসলে এমনিতেই তুমি ওর উপর রেগে ছিলে, তার উপর এইরকম একটা শব্দ হলো। এই জন্যই...’

- তাই বলে এত জোরে শব্দ করে ওকে মারবো নাকি?

ইতি কিছু বলার আগেই পাশ থেকে রাফা বলল, ‘তাহলে কি কম শব্দ করে করে মারবে? যেমন ভাবে এর আগে তিনটে থাপ্পড় মেরেছিলে, নিঃশব্দে? অবশ্য আস্তে করে ঠাস শব্দ হয়েছিল। তবে কেউ শুনতে পায়নি। তুমি চাইলে আমার মুখ বেধে মারতে পারো। আই ডোন্ট মাইন্ড। আর তৃতীয় কোনো ব্যক্তিও শুনতে পাবে না।’

রাফার কথা শেষ হতেই ইতি সায়েমের কাছে এসে রেগেমেগে বলল, ‘তুমি ওকে আগেও মেরেছিলে ভাইয়া? এটা কিন্তু একেবারেই ঠিক কাজ করোনি।’

সায়েম আমতাআমতা করে বলল, ‘সেভাবে মারিনি তো। জাস্ট বুঝিয়েছি একটু।’

- মুখ কি তালা মারা ছিল? যে হাত দিয়ে বুঝিয়েছ। শোন, কথায় বুঝানোর চেষ্টা করবা। আর মারবা না। ভুলে যেওনা ও কিন্তু আমার হবু সিস্টার ইন ল।

- মানে কি?

- মানেটা বুঝে নাও। তুমি তো নিজেকে খুব বুদ্ধিমান ব্যক্তি ভাবো। এই সাধারণ মিস্ট্রিটুকু বুঝতে পারছ না।

সায়েম শার্টের কলার ঠিক করে বলল, ‘আমি কিন্তু আসলেই বুদ্ধিমান। আসলে এখনো পেটে কিছু পড়েনি তো, সেজন্য সহজ জিনিসও ক্যাচ করতে পারছি না। তবে খাওয়াদাওয়া শেষে সব ঠিক হয়ে যাবে৷ আর আমিও বুঝতে পারব সবটা।’

রাফা ঠোঁট বাঁকা করে তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো। সায়েম সেদিকে তাকিয়ে দেখল। তবে বিষয়টি এড়িয়ে গেল। কিন্তু রাফা এতে সন্তুষ্ট নয়। ও নিজের শাড়ি ঠিক করার ভান করে সায়েমকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘যারা প্রকৃত বুদ্ধিমান। তাদের মাথা সবসময়ই পরিষ্কার থাকে। উদাহরণ হিসেবে আমি নিজেকেই দেখাবো। বিকজ মাই হেড ইস অলওয়েজ ক্লিন।’

সায়েম ভ্রু-কুঁচকে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি কি আমাকে উদ্দেশ্য করে কিছু বললে?’

- সেটা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে মিস্টার সায়েম? এখান থেকেই বুঝা যায় তোমার বুদ্ধি কতটা প্রখর। আমি পুরোপুরি নিশ্চিত তোমার মাথায় গোবর ছাড়া কিছুই নেই। নাহলে এই সহজ কথাটার মানে ঠিকই বুঝতে পারতে। মিস্টার সায়েম, তোমার বোন আমার ভাইয়ের সাথে প্রেম করছে। আর সেই হিসেবেই আমাকে হবু ননদিনী বানিয়ে দিয়েছে।’

সায়েম মুখটা ‘হা’ করে ইতির দিকে তাকালো। ইতির এখন লজ্জা পাওয়ার কোনো দরকারই ছিল না। কারণ, সায়েম ব্যাপারটা আগে থেকেই জানতো। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে সায়েম ভুলে গেছে ব্যাপারটি। সেজন্যই এভাবে অবাক হয়ে বিস্ময় নিয়ে তাকাচ্ছে ওর দিকে। ফাহাদ আর ওর ব্যাপারটি যেদিন প্রথম সায়েম জানতে পারে, সেদিন ইতি খুব লজ্জা পেয়েছিল। অবশ্য সেদিন লজ্জা পাওয়াটা বাধ্যতামূলক ছিল। কারণ, ছোট বোনের প্রেমের আগামাথা সব জেনে গিয়েছে বড় ভাই। কিন্তু আজ ইতি সেদিনের থেকেও বেশি লজ্জা পাচ্ছে। ইতি মাথা নিচু করে মুচকি হাসতে হাসতে বলল, ‘কি একটা ভুল কাজ করলাম। ভাইয়া যে সেসব ভুলে গিয়েছে আমি বুঝতেই পারিনি। নাহলে ওর সামনে রাফাকে ননদ বলতাম না।’

রাফার কথায় মাথা তুলে তাকালো ইতি। রাফা বলল, ‘আরে আপু এত লজ্জা পাচ্ছ কেন? এই যে এটাই তোমাদের সমস্যা। মেয়ে হয়ে জন্মেছ বলে কি সবসময় শুধু লজ্জাই পেতে হবে নাকি? কে যেন বলেছিল লজ্জা নারীর ভূষণ। তাকে সামনে পেলে আমি কাঁচা চিবিয়ে খেতাম। কারণ, তার জন্যই আজ পদে পদে নারীদের লজ্জা পেতে হচ্ছে। এই একটা কথার উপর ভিত্তি করেই অধিকাংশ নারী নিজের মনের ভিতর লজ্জা জিনিসটা পুষে রাখে। আর সময়-অসময় লজ্জা পেয়ে বসে। অথচ দেখ, পুরুষরা সবসময় মনে করে লজ্জা তো নারীদের জন্য। লজ্জা জিনিসটা ঠিক পুরুষদের সাথে যায় না। সুতরাং কোনোভাবেই লজ্জা পেলে চলবে না। একবার ভেবে দেখ ইতি আপু, শুধুমাত্র একটা বাণীর জন্য নারীরা লজ্জা শব্দটার সাথে গভীর ভাবে মিশে গেছে। অথচ যে মানুষটা শুধুমাত্র কলম চালিয়ে একটা কথা লিখেছে, কোথাও না কোথাও তার ও লজ্জার কারণ আছে, বা ছিল। তাহলে তার কথাটাকে এত গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন কী? যেখানে তিনি নিজেও লজ্জা জিনিসটার সাথে জড়িয়ে আছে। সবশেষে একটাই কথা বলব ইতি আপু, লজ্জা সবার মাঝেই আছে। তবে সেটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। যেমনটা পুরুষেরা করে থাকে। তারাও কিন্তু লজ্জা পায়। তবে প্রকাশ করে না। এই যে দেখ, সায়েম সারা আপুকে ভালোবাসে। এটা শুধু তোমার আর আমার সামনে না, গুরুজনদের সামনেও বলতে পারবে। ক্ষানিকটা লজ্জা পেলেও সে প্রকাশ করবে না। কারণ সে ভাবছে, ছেলেদের লজ্জা পেতে নেই। তোমার মনেও এই কথাটা গেঁথে নাও আপু। তুমিও নিজের ভালোবাসার মানুষের কথা বলতে লজ্জা করবে না। সবসময় মনে রাখবে, লজ্জা মেয়েদের বেমানান। প্রতিটি মুহূর্ত যদি আপডেট হতে পারে, তাহলে প্রতিটি মানুষের চিন্তাধারা কেন আপডেট হবে না?’

কিছুক্ষণ সব কিছু নিস্তব্ধ সময় কাটার পরে রাফা বলল, ‘কি হলো, এভাবে তাকিয়ে আছ কেন তোমরা?’ ইতি আর সায়েমকে হাবলার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে কথাটা বলল রাফা। রাফার ইচ্ছে করছিল সায়েমকে একটু খোঁচা দেওয়ার মতো করে কথাটা বলবে৷ কিন্তু কেন জানি ইচ্ছেটা গোপনেই রেখে দিলো। ইতি রাফার কাছে গিয়ে রাফার পুরো শরীরটাকে তীক্ষ্ণ ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। বিষয়টি বুঝতে পেরেও কিছু বলল না রাফা। ইতি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলল, ‘তুই কি আসলেই বড় হয়ে গেছিস, নাকি বিয়ে হয়েছে বলে এইরকম কথা বলছিস।’

- হঠাৎ এই কথা বললে কেন?

- না মানে, তোর কথা শুনে তো আমাদের চোখ কপালে ওঠে গেছে।

- কই দেখি। রাফা ইতির কপাল দেখতে লাগল। ইতি হেসে দিয়ে বলল, ‘আরে ধুর, এটা তো জাস্ট কথার কথা। আমি বুঝাতে চেয়েছি তোর কথা শুনে আমরা হতভম্ব। বিশেষ করে আমি। এত অবাক শেষ হবে হয়েছিলাম আমার মনে নেই। সত্যি করে বল তো কাহিনীটা।’

রাফা মুচকি হাসি দিয়ে বলল, ‘কাহিনী কিছুই না আপু। বিয়ের পরে সব মেয়েরই চিন্তাধারায় ভিন্নতা আসে। এ আর নতুন কিছু নয়। তুমি বিয়ে কর, তখন নিজেই উপলব্ধি করতে পারে। তাছাড়া দেখছ না আমাকে কেমন অদ্ভুত দেখাচ্ছে। চিন্তাভাবনা একটু বড়দের মতো তো হবেই। আগে কখনো শাড়ি পড়িনি জানো তো।’

- সেটা তোর শাড়ি সামলানোর পদ্ধতি দেখেই বুঝতে পারছি। এক হাতে কুচি ধরে রেখেছিস। মনে হচ্ছে কুচি'টা একটু হাত ছাড়া হলেই নিচে পড়ে যাবে। আচ্ছা, এভাবে ওই বাড়ি থেকে এই বাড়িতে এলি কীভাবে বলতো?

- তোমার কোনো এক আত্নীয় সকালে বের হচ্ছিল। তোমার মা বলল তার সাথেই আসতে। তাই চলে এলাম গাড়িতে। একেবারে গেইটের কাছে এসে নামিয়ে দিয়ে গেল।

ইতি মুখটা গোল করে বলল, ‘মা নিজে বলেছে তোকে গাড়ি দিয়ে এখানে নিয়ে আসতে?’

রাফা শয়তানি হাসি দিয়ে বলল, ‘পাগল নাকি। সে তো আমার সাথে কথাই বলছিল না। খুব রেগে গিয়েছিল তাদের সাথে মিথ্যাচার করেছি বলে।’

- তাহলে?

আমিই বলেছিলাম, ‘বাড়িতে যাবো। সে মনে হয় খুব খুশিই হয়েছিল। তাই তো এক মহিলাকে ডেকে বলল যাওয়ার সময় আমাকে যেন সাথে নিয়ে যায়। সবাই ভেবেছিল আমি নিজের বাড়িতে যাবো। কিন্তু বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে তোমার মায়ের কানে কানে বলে এলাম, আমি বাড়িতে যাচ্ছি বটে তবে নিজের মায়ের বাড়িতে নয়, স্বামীর বাড়ি। সত্যি বলছি আপু, তোমার মায়ের মুখটা তখন যে আকার ধারণ করেছিল না, জাস্ট দেখার মতো ছিল। পুরো মুখটাই দুঃখী ভাল্লুকের মতো হয়ে গিয়েছিল। না পারছিল কিছু বলতে, আর না পারছিল সহ্য করতে।’

কথাটা বলে হো হো করে হেসে উঠলো রাফা। ইতিও শব্দ করে হেসে দিলো। সায়েম অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। হঠাৎ ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘চুপ কর দু’জন।’

সায়েমের এইরকম কণ্ঠ শুনে থতমত খেয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল দু’জন। সায়েম আবারও বলল, ‘এভাবে আর হাসাহাসি করলে মারতে মারতে দু’জনেই বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দিয়ে আসবো।’

তাপরা দু’জনেই একদম চুপ হয়ে গেছে। চোখ জোড়ার দৃষ্টি পায়ের দিকে রেখে স্ট্যাচু এর মতো দাঁড়িয়ে আছে। সায়েম পিছন ঘুরে আবার থেমে গেল। এরপর বলল, ‘রাফা, শাড়িটা চেঞ্জ করে অন্যকিছু পড়ে নাও। তোমাকে শাড়ি পরা অবস্থায় দেখে আমার কেমন যেন লাগছে।’

রাফা উৎফুল্ল হয়ে বলল, ‘বউ বউ লাগছে, তাই না? আমি জানতাম তুমি আমার প্রেমে পড়ে গেছ। আমি কিন্তু সারা আপুর থেকে একটু হলেও বেশি সুন্দরী। সো আমার প্রেমে পড়াটা স্বাভাবিক।’

সায়েম পিছন ঘুরে আবার রাফার দিকে তাকালো। চেঁচিয়ে বলল, ‘জাস্ট শাট আপ রাফা। কানের নিচে এমন জোরে একটা থাপ্পড় মারব যে, আগামী এক বছরের জন্য কানে শোনা বন্ধ হয়ে যাবে।’

রাফা কাঁদোকাঁদো স্বরে, ‘এভাবে বকছ কেন? আমি তো তোমারই বউ, তাই না?’

- কিসের বউ তুমি? আর তোমাকে শাড়ি পরা অবস্থায় দেখে আমার খুবই বিরক্ত লাগছে। তোমার সাথে শাড়িটা মানায় না রাফা। আর এই বউ শব্দটাও তোমার পাশে বেমানান।

- অথচ আমার ফ্রেন্ড সার্কেলের কয়েকজনের বিয়ে হয়ে বাচ্চাকাচ্চা হয়ে গেছে। আই এম এ এইন্টিন প্লাশ মিস্টার সায়েম। তোমরা আমাকে যতটা ছোট ভাবছ, আমি ততটাও ছোট না।

- বাট আমার কাছে তুমি এখনো ছোট। তোমার কাছ থেকে আমি দূরে সরে গেলে তোমার যতটা কষ্ট হবে। আমার কাছ থেকে সারা দূরে চলে গেলে আমারও ঠিক ততটাই কষ্ট হবে। সারা অলরেডি দূরে সরে যাচ্ছে। আমার মনের অবস্থাটা একটু বুঝার চেষ্টা কর।

রাফা নিচু স্বরে ‘সরি’ শব্দটা বলে ইতির ঘরের দিকে চলে গেল। সায়েম সেদিকে পাত্তা দিয়ে ইতিকে বলল, ‘দরজাটা আটকে দে। আর আমার আসতে দেরি হবে। তুই আর রাফা খেয়ে নিস।’

ইতিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সায়েম বেরিয়ে এলো।

সায়েম সামনে এগিয়ে দেখল জাবির মুক্তমঞ্চের ঠিক মাঝখানেই বসে আছে জয়। পরনে হলুদ রঙের শার্ট। আর কালো প্যান্ট। চুলগুলো কেমন যেন হয়ে গেছে ওর। অথচ একটা সময় এই জয় এর চুলই ডিপার্টমেন্টের অনেক মেয়ের ক্রাশ ছিল। অদ্ভুত এক স্টাইল করে রাখত চুলগুলোর। ওইরকম স্টাইল অন্য কারোর চুলে হতো না। অনেকে অনেক চেষ্টা করেও পারেনি। ফ্রেন্ড সার্কেলের মধ্যেকার অধিকাংশ মেয়েই ক্যাম্পাসে এসে প্রথমেই জয় এর চুলে হাত বুলাতো। আর বলল, দোস্ত, তোর চুলে স্পর্শ না করলে দিনটাই যেন ভালো কাটতে চায় না।" সবার কথা শুনে জয় খুব মজা পেতো। মুচকি মুচকি হাসিও দিতো। অথচ আজ সেই জয় এর চুলের অবস্থা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে। একবার তাকালে পরেরবার আর তাকানোর ইচ্ছে থাকে না। কোনো আগ্রহই নেই। সত্যি, দায়িত্ব কাধে পড়লে আয়নায় নিজের মুখটা পর্যন্ত দেখার সুযোগ হয় না মানুষের৷ শুধু মনে হয়, আয়নায় সামনে দাঁড়িয়ে যে সময়টা নিজেকে দেখব, সেই সময়টা পরিবারের মানুষদের সাথে হাসিমুখে দু'টো কথা বলব। তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, চাহিদাগুলো জানার চেষ্টা করবো। এতে তারাও খুশি, আর আমিও খুশি। যদিও প্রকৃত অর্থে সে খুশি নয়। কিন্তু খুশি থাকার অভিনয় করতে হয়। এতে বিশাল কোনো অপরাধ হয়ে যায় না। সেই স্টুডেন্ট লাইফটা যদি আর একবার ফিরে পাওয়া যেতো, তাহলে হয়তো এই দায়িত্বশীন মানুষগুলোর থেকে বেশি আনন্দ আর কেউ পেতো না।

হঠাৎ কারোর ধাক্কায় নড়েচড়ে দাঁড়ালো সায়েম। পাশে তাকিয়ে দেখে আবির দাঁড়িয়ে আছে। সায়েম চোখটা মুছে আবিরকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘কেমন আছিস বন্ধু?’

আবির সায়েমের পিঠ চাপড়াতে চাপড়াতে বলল, ‘আমি তো ভালোই আছি। তুই কেমন আছিস? দিনদিন তো পুরো চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছিস দেখছি। সেই আগের সায়েম আর এখনকার সায়েমের মাধ্যে যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। অবশ্য ভালোই লাগছে তোকে।’

সায়েম আবিরকে ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘মেরা দোস্ত, সময় যে ফুরিয়ে আসছে। এবার তো সচেতন হতে হবে। নিজের দায়িত্ব, নিজের কর্তব্য, আর নিজের কাজটা যে নিজেকেই করতে হবে।’

- হুম। তা তো বুঝলাম। বাট মিস্টার জয় কোথায়? অনেকদিন তো দেখা হয় না। চিনতে পারলেই হয়।

সায়েম মুক্তমঞ্চের দিকে হাত তাক করে জয় কে দেখিয়ে বলল, ‘ওই যে ল্যাপটপ আর ফাইল হাতে বসে আছে রৌদ্রের মধ্যে। মনে হচ্ছে সে ফাইল দেখা এবং বসকে মেইল করায় ব্যস্ত। চল গিয়ে দেখি।’

সায়েম আর আবির হাঁটতে হাঁটতে জয় এর পাশে গেল। জয় ওদের দেখে জোর করে হাসার চেষ্টা করল। হাসিতে ক্লান্তির ছাড়া স্পষ্টতর। কোনো জোর নেই এই হাসিতে। তবুও জয় হাসি মুখটা ধরে রাখার চেষ্টা করল। ল্যাপটপ আর ফাইল রেখে দিয়ে সায়েম আর আবিরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কেমন আছিস তোরা?’

- ভালো তুই? দু’জনে একসাথে বলরে উটলো।

- ভালোই। দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বস। আর সায়েম এবার বল এত জরুরি তলব কেন? তুই তো জানিস আমার অবস্থাটা। তোর সাথে তো প্রায়ই ফোনে কথা হয় আমার। যাই হোক, একটু তাড়াতাড়ি বল প্লিজ। অফিস থেকে মাত্র ১ ঘন্টার ছুটি নিয়ে এসেছি।

- ছুটি আর কোথায় পেলি বলতো? সেই তো দেখলাম কাজ করছিলি।

জয় মৃদু হাসি দিলো। পাশ থেকে আবির বলল, ‘আমারও দু'টো ক্লাস বাকি আছে সায়েম। এখান থেকে তাড়াতাড়ি যেয়ে আবার ক্লাস নিতে হবে। তারপর তো একটু শান্তি।’

সায়েম মুক্তমঞ্চের সিঁড়িতে মুখের হাওয়া মেরে ধুলোবালি সরিয়ে দিয়ে বসে পড়ল। পাশে আবির। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সায়েম বলল, ‘অনেকদিন তোদের সাথে দেখা হয় না। যদিও আবির আর আমার দেখা হয়েছিল মাঝে দুই একবার। বাট জয় তো নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় পায় না। দেখা করা তো দূরে থাক।’

পাশ থেকে জয় হেসে দিয়ে বলল, ‘আর বলিস না। আমাদের বস দু'দিন পরপরই বউকে নিয়ে হানিমুনে যায়। আর অফিসের প্রায় অর্ধেক কাজ আমার দায়িত্বে রেখে যায়। বুঝতেই পারছিস আমার অবস্থাটা কেমন হয়।’

সায়েম আর আবির হেসে দিলো। জয় আবার বলল, ‘আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না এক বউকে নিয়ে এতবার হানিমুনে যাওয়ার কী আছে? আরে ভাই বউ তো মাত্র একটা। হানিমুনে একবার গেলেই তো এনাফ।’

আবির আর সায়েম এবার আরো শব্দ হেসে দিলো। জয় ওদের থামতে বলে বলল, ‘হাসিহাসি পরে করিস। এখন কাজের কথা বল।’

আবির বলল, ‘হুম সেটাই।’

সায়েম দাঁত, মুখ চেপে ধরে বলল, ‘আমার বিয়ে হয়ে গেছে।’

কথাটা বলে সায়েম চুপ করে জয় আর আবিরের ক্ষিপ্ত কণ্ঠটা শোনার অপেক্ষায় রইল। কিন্তু না। অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও কারোর কোনো শব্দ শোনা গেল না। তাই আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকালো। জয় আর আবির দু'জনেই দাঁড়িয়ে গেছে। ওর দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যেন চোখ দিয়েই খেয়ে ফেলতে চাইছে সায়েমকে। সায়েম নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, ‘আমার পুরো কথাটা শোন প্লিজ। ফাহাদের বোন আমাকে পছন্দ করতো। আর আমি পছন্দ করতাম সারাকে। এটা তো তোরা জানিসই। তাই না?’

আবির আর জয় তীক্ষ্ণ ভাবে চেয়ে আছে ওর দিকে। কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনার জন্য আবারও বসে পড়ল দু'জন৷ জয় ল্যাপটপটা ব্যাগের ভিতর ঢুকিয়ে নড়েচড়ে পা দু'টো নিচে মেলে দিয়ে বসল। আবির পা দু’টো তুলে আড়মোড়া হয়ে বসে পড়ল। কিছু কিছু শিক্ষক মানুষের এই এক অভ্যাস। এরা যেখানেই থাক না কেন, হাত-পা একেবারে গুটিয়ে বসে থাকে। মুরুব্বি-মুরুব্বি একটা ভাবে চলবে সবসময়।

- আগ্রহটা কমে যাওয়ার আগে কথাটা শেষ কর সায়েম। এমনিতেই রাগে শরীরের সব রক্ত লাফালাফি করছে। ভেবেছিলাম চার বন্ধু একসাথে বিয়ে করব৷ কিন্তু না, তুই আর ফাহাদ বেঁকে বসলি। অতঃপর বাধ্য হয়েই আমি আর জয় বিয়েটা করেই ফেললাম। অথচ তুই এখন আমাদের না জানিয়েই বিয়ে করে ফেললি। আবির রাগে গজগজ করতে করতে কথাটা বলল।

আবিরের কথা শুনে সায়েম আর জয় হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারল না। রক্ত যে কিভাবে লাফালাফি করে তা বুঝার বোধগম্য হলো না ওদের। কিন্তু কথাটা এখন এড়িয়ে যাওয়াই উত্তম। শিক্ষক মানুষ, তার ভুল এত সহজে ধরা যাবে না। কোন দিক দিয়ে আবার যুক্তি শুনিয়ে দিবে৷ তখন নিজেই ‘আহত চিপায়’ পড়তে হবে।

জয় সায়েমকে তাগাদা দিয়ে বলল, ‘আহা, তুই থেমে আছিস কেন? কন্টিনিউ বলে যা।’

সায়েম পরপর সব ঘটনা বলল ওদেরকে। জয় আর আবির একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে বারবার। হঠাৎ জয় বলল, ‘আমার তো সবকিছু কেমন যেন অবিশ্বাস্য লাগছে। এত নিখুঁত প্ল্যান কেউ কিভাবে করতে পারে? এরা তো প্রফেশনালদের থেকেও এক্সপার্ট। আর ফাহাদের সেই ছোট্ট বোন এত শয়তানি বুদ্ধি মাথায় নিয়ে ঘুরেবেড়ায় কি ভাবে? কলেজে থাকতে মাঝে মাঝে ফাহাদের বাড়িতে যেতাম। রাফা তখন ছোট্ট ছোট্ট পা দিয়ে হেঁটে আমাদের কাছে আসতো। ছোট্ট হাত দু’টো দিয়ে ভাইয়া ভাইয়া বলে আমাদের জড়িয়ে ধরতো। সেই মেয়ে মাত্র কয়েক বছরে এত বড় হয়ে গেছে।’

সায়েম বিরক্তির স্বরে রাফার নামটা উচ্চারণ করে বলল, ‘রাফা মেয়েটা এখন কলেজে পড়ে। মেয়েলি কোনো ব্যাপার নিয়ে আমি আলোচনা করতে চাই না। তবে এইটুকুই বলল, সাধারণ জ্ঞানটুকু মাথায় ধরে রাখার মতো বয়স ওর হয়েছে। ওর থেকেও কম বয়সের মেয়েরা বিয়ে করে। সেটা কোনো ব্যাপার না। কারণ সেদিক দিয়ে ওকে ছোট বলা যাবে না। আঠারো বয়স হয়েছে ওর। কিন্তু আমার সাথে আসলেই বেমানান। ওর জন্মের দিনও ফাহাদের সাথে আমি হাসপাতালে ছিলাম। তখন আমি আর ফাহাদ একসাথে স্কুলে পড়তাম। একবার ভেবে দেখ, যাকে আমি জন্মের দিন থেকে বোনের নজরে ছাড়া অন্যভাবে দেখিনি, তাকে কিভাবে বউ হিসেবে মেনে নিবো?’

আবির জ্ঞানী জ্ঞানী একটা ভাব নিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল। মুরুব্বিদের মতো করে বলল, ‘কি আর করার বল? মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। তাছাড়া অনেক তো হয়, যারা বিয়ের পর প্রেম করে। বিয়ের পর অচেনা-অজানা দু’জন মানুষের মধ্যেও ভালোবাসা সম্পর্ক হয়ে যায়। তোরাও চেষ্টা কর। মেয়েটাকে মেনে না নিয়ে কষ্ট দিয়ে কি লাভ? শত হলেও ওকে ছোট থেকে দেখে এসেছিস তুই। আমার বিশ্বাস ওকে কষ্ট দিয়ে তুই ভালো থাকতে পারবি। বন্ধুর বোন হিসেবে হোক বা নিজের বউ হিসেবেই হোক, ওর প্রতি তোর একটা দূর্বলতা কাজ করবেই। তাই বলছি, শুধুশুধু ঝামেলা না করে ওকে মেনে নিয়ে সুখে শান্তিতে সংসার কর।’

- আমি সারাকে ভালোবাসি সেটা কি জানিস না তুই?

- জানি, বাট আল্লাহ তোর ভাগ্যে সারাকে লিখে রাখেননি। রাফাকে লিখে রেখেছেন তোর ভাগ্যে। সেজন্য অদ্ভুতভাবে রাফার সাথে বিয়ে হয়েছে।

- জানি, আল্লাহ তোর ভাগ্যে সারাকে লিখে রাখেননি। রাফাকে লিখে রেখেছেন তোর ভাগ্যে। সেজন্য অদ্ভুতভাবে রাফার সাথে বিয়ে হয়েছে।

সায়েম রেগে গিয়ে বলল, ‘বাল, আমি তোর জ্ঞান শোনার জন্য আসিনি। তোদের সাহায্যের জন্য এসেছি। অথচ তুই বলছিস আমি সারাকে ভুলে গিয়ে রাফাকে মেনে নিই। আরে ভাই, তোর বউকে যদি একজন কেড়ে নেয়, তাহলে তোর কেমন লাগবে বল তো? রাফা আমাকে বিয়ে করে সারাকে কেড়ে নিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে বললে ভুল হবে। বরং দূরে সরিয়ে দিয়েছে।’

- বউ এর সাথে প্রেমিকার তুলনা করছিস কোন আক্কেলে?

- তোর বউ বিয়ের পর তোর প্রেমিকা হয়েছে। আর আমার বউ বিয়ের আগেই আমার প্রেমিকা হয়েছে। দু’টো বিষয় একই। অনেকটা লাউ, আর কদুরমতো।

- কত মেয়ের সাথেই তো আমাদের রিলেশন ছিল। কই তাদের সাথে তো আমাদের বিয়ে হয়নি। তাই বলে কী আমরা অসুখী নাকি? বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তান নিয়ে তো বেশ আছি। দেখ সায়েম, আমরা যেমন একে অপরের প্রিয় বন্ধু। তেমনি ফাহাদও আমাদের প্রিয় বন্ধু। আমি চাই এই ঘটনার কোনো প্রভাব এই বন্ধুত্বের মধ্যে যেন না পড়ে। সেজন্যই বলছি ঝামেলা না করে রাফাকে মেনে নে। আমার একটাই ইচ্ছে, আমরা এই চার বন্ধু যেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এক সাথে থাকতে পারি। এই ঘটনার পর থেকে হয়তো তুই বা ফাহাদ, কেউ কারোর সাথে স্বাভাবিক হতে পারবি না। কারোর না কারোর মাঝে অপরাধবোধ কাজ করবেই। তাই আমি অনুরোধ করছি, এমন কিছু করিস না, যার প্রভাবে বন্ধুত্বের সম্পর্কে ভাঙনের সৃষ্টি হয়।

সায়েম দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘আমি কিন্তু এইসব বিষয়ে আলোচনার জন্য আসিনি এখানে। তোদের সাহায্যে জন্য এসেছিমাত্র। আর আমি কথা দিচ্ছি, এই ঘটনার প্রভাবে বন্ধুত্বের সম্পর্কে ভাঙনের সৃষ্টি হবে না। তবে প্লিজ সারাকে ভুলে যাওয়ার কথাটা আমাকে বলিস না।’

জয় আবিরকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আবির তুই চুপ কর প্লিজ। সায়েমের কথাটা শুনতে দে।’

আবির কিছু বলল না। সায়েম বলল, ‘তোর ল্যাপটপটা একটু দে জয়।’

জয় নিজের ল্যাপটপটা এগিয়ে দিলো সায়েমের দিকে। সায়েম ল্যাপটপ অন করে ফেসবুকে ঢুকল। কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটি করে একটা ছবি বের করে বলল, ‘এই ছবিটা ভালো করে দেখ তোরা।’

জয় আর আবির স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছবিটা দেখতে দেখতে বলল, ‘এই লোকটাকে কোথায় যেন দেখেছিলাম।’

সায়েম ওদের কথার জোর আরেকটু বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য বলল, ‘হ্যাঁ আমার বাড়িতেই দেখেছিস।’

- শেষবার যখন তোর বাড়িতে গিয়েছিলাম, তখনই দেখেছিলাম। সম্ভবত তোর বাড়িতে কাজ করে এই লোকটা।

- হ্যাঁ। ওর নাম কাশেম। রাফার আর আমার বিয়ের প্ল্যানকারীর সাথে এই হারামজাদাটাও যুক্ত আছে। অনেক গোপনীয় কিছু জানে এই কাশেম। তবে দু'দিন ধরে নাকি বাড়িতে আসেনি কাজে। মনে হয় এই অঘটন ঘটিয়েই পালিয়েছে। ওকে খুঁজে বের করতে হবে।

- বাট ওকে খুঁজে তোর কী লাভ?

- আমার মনে হয় ওকে কেউ টাকা দিয়েছে এইসব কাজ করতে। ও আমার বিরুদ্ধে চক্রান্তকারীর সাক্ষী। এবং ওই দলেরই একজন। সুতরাং এই কাশেমকে হাতের নাগালে পেলে মেইন ষড়যন্ত্রকারীকেও ধরতে পারব। আমাকে জানতে হবে, আমার এইরকম শত্রু কে? তার উদ্দেশ্যই বা কী? তবে আমার সন্দেহের তালিকায় কয়েকজন আছে।

আবির আর জয় একসাথে বলে উঠল, ‘কারা?’

সায়েম হাতের আংগুল গুনে বলতে শুরু করল, ‘আমার বসকে সন্দেহ করছি আমি। কারণ রাফা আমার অফিসের গিয়ে একদিন বসের রুমে পৌঁছে গিয়েছিল। এছাড়াও অফিসে সারাক্ষণ আমার উপর নজর রাখা হতো। বেশ কয়েকটা ছবি-ও আছে। যা অফিসের বাইরের কেউ তুলতে পারবে না।’

জয় ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘একেবারেই অসম্ভব। তোর অফিসের বসকে আমি খুব ভালো করেই চিনি। আমাদের অফিসের সাথে তোদের অফিসের যোগাযোগ আছে৷ সেভাবেই তোর বস আমার পরিচিত। তাছাড়া সে বাবার বয়সী। এইসব করে তার লাভটা কী?’

- আমি জানি না। জাস্ট আমার সন্দেহ এটা।

- এরপর কে?

- সারার পরিচিতি কেউ। কারণ সারাকে আমার কাছ থেকে আলাদা করে দেওয়ার জন্য কেউ এইরকম করতেই পারে। সে হয়তো সারাকে পছন্দ করে।

আবির গভীর চিন্তা থেকে বলল, ‘এই সন্দেহটা গুরুত্ব দেওয়া যায়। কারণ এটা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আচ্ছা আরো কেউ কী আছে?’

- হুম। রাফার বন্ধুবান্ধবদের সন্দেহ করা যায়। কিন্তু এটার সম্ভাবনা খুব কম। এর কোনো যুক্তি আমার কাছে নেই। আর একজন আছে।

- কে?

- রোদ।

আবির হেসে দিয়ে বলল, ‘আসলেই আজ খুব রোদ পড়েছে। গরম লাগছে খুব।’

সায়েম ওকে ধমক দিয়ে থামিয়ে বলল, ‘ফাজলামি করিস না আবির। আমি সিরিয়ার। এই রোদ প্রকৃতির রোদ না। এটা একজন ব্যক্তির নাম। তোদের মনে আছে ইতির বিয়ের দিনের ঘটনাটা?’

আবির ভাবতে লাগল। এর মধ্যেই জয় বলে উঠল, ‘হ্যাঁ। আমার মনে পড়েছে। ইতির সাথে যেই ছেলেটার বিয়ে ভেঙে গিয়েছিল। সেই ছেলেটার নামই ছিল রোদ। কিন্তু তোর জীবনের ষড়যন্ত্রের সাথে রোদের সম্পর্ক কী? ওর খারাপ কোনো উদ্দেশ্য থাকলে সেটা ইতির উপর এপ্লাই করবে৷ কারণ ইতির উপর ওর একটা রাগ আছে।’

- উঁহু। এর থেকেও আমার উপর ওর রাগ বেশি৷ কারণ সেদিন আমিই বিয়েটা ভেঙে দিয়েছিলাম৷ ওর বন্ধুবান্ধব সহ আত্নীয়দের সামনে ওকে অপমান করেছিলাম আমি। ইতির পাশে আমি দাঁড়িয়েছিলাম৷ ওকে সাহস দিয়েছিলাম। সেজন্যই তো ইতি বিয়ে করবে না কথাটা বলতে সাহস পেয়েছিল।

- হুম। এটা হওয়ার সম্ভবও প্রবল। আচ্ছা, এখন আমরা কী করব সেটা বল?

- কাশেম কে খুঁজে বের করতে হবে। আর এটা আমি একা পারব না। আমার ফেসবুক আইডিতে ওর দুই একটা পিকচার আছে শুধু। অনেকদিন আগে আমিই দিয়েছিলাম। তাও জয়েন্ট পিক। পরিবারের সবাই ছিল। এছাড়া ওর কোনো ডিটেইলস আমার কাছে নেই৷ শুনেছি আশেপাশে কোথায় যেন ভাড়া থাকতো। দিনে শুধু আমাদের বাড়িতে কাজ করতো। ওর ভাড়ার বাড়িতে ওকে পাবো না এটা আমি নিশ্চিত। আমি পুলিশের কাছে যেতে পারতাম। কিন্তু এতে রাফা জড়িয়ে পরবে। সেজন্য ওইসব কিছু করিনি। যা করার আমাদেরই করতে হবে।

আবির বলল, ‘ঠিক আছে। এই ছবিটা পত্রিকায় দেওয়ার ব্যবস্থা আমি করছি। এছাড়াও আমার স্টুডেন্টদের সাহায্য নিবো।’

- আমার মনে হয় ও আশেপাশেই আছে কোথাও। তবে লুকিয়ে। আবার হতেও পারে আবার ওকে কেউ আটকে রেখেছে। প্রমাণ রিমুভ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। - আমার মনে হয় ও আশেপাশেই আছে কোথাও। তবে লুকিয়ে। আবার হতেও পারে আবার ওকে কেউ আটকে রেখেছে। প্রমাণ রিমুভ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে।

জয় উঠতে দাঁড়াল। ল্যাপটপ আর ব্যাগ হাতে নিয়ে বলল, ‘আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব তোকে সাহায্য করার।’

- " ধন্যবাদ বন্ধু।"

- ঠিক আছে এবার তাহলে যাই আজ। অনেক কাজ আছে।

সায়েম ওঠে দাঁড়াল। এরপর বলল, ‘ওকে।’

জয় আর আবির চলে এলো। কিছুক্ষণ পর সায়েমও।

সায়েম ডিভোর্স পেপারে সাইন করে রাফার দিকে এগিয়ে দিলো। ওর ঠোঁটের কোণে পৈশাচিক এক হাসি স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। রাফা থরথর করে কাঁপছে৷ আর কাঁদছে। সায়েম ওর দিকে এগিয়ে এসে বলল, ‘সাইনটা করে দাও রাফা। এতে তোমারই ভালো হবে। নাহলে আমার খারাপ রূপটা দেখতে পাবে।’

রাফা কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘আমি সাইন করব না। তাছাড়া একদিনের ভিতরে তুমি ডিভোর্স পেপার কীভাবে জোগাড় করলে?’

- তুমি যদি একদিনে আমাকে বিয়ে করতে পারো। তাহলে আমি কেন একদিনে তোমাকে ডিভোর্স দিতে পারব না? তুমি যেমন আমাকে জোর করে বিয়ে করেছ। তেমনি আমিও তোমাকে জোর করে ডিভোর্স দিচ্ছি। কেইস ডিশমিশ।

- এটা ঠিক কাজ করছ না সায়েম।

রাফার কথা শুনে সায়েম হাসতে লাগল৷ রাফার করুণ দৃষ্টিতে তাকালো সায়েমের দিকে। কিন্তু সায়েমের হাবভাব দেখা বুঝা গেল না ওর মাঝে এখন কোনো দয়ামায়া আছে কি-না।

(চলবে...)

আরো পড়ুন ১৩তম পর্ব- ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ

jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: +8801721978664

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড