• সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩ আশ্বিন ১৪২৭  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বই আলোচনা

যৈবতী কন্যা ইশকুলে : প্রচ্ছন্নতার বেড়াজালে ভাবাবেগের ছড়াছড়ি

  সৌমেন দেবনাথ

১৫ মার্চ ২০২০, ১৪:৩২
কবিতা
প্রচ্ছদ : কাব্যগ্রন্থ ‘যৈবতী কন্যা ইশকুলে’

কবি বঙ্গ রাখাল যুগচৈতন্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিল্প কৌশলকে অবলম্বন করে কর্মের প্রহারে দীর্ণ সময়ে বসে কবিতার অবয়ব নির্মাণ করেন। গতানুগতিক ধারার বাইরে যেয়ে মননবিলাসীদের কল্পলোকের বিষয়কে উপেক্ষা করে বাস্তবতার আঙ্গিকে উত্তম শব্দচয়ন করে মনোরম উপস্থাপনায় দার্শনিক আবেগ আর মেজাজে কবিতা রচনা করেন। তার কবিতায় মানুষের অস্তিত্ব ভাবনার প্রাঞ্জচিন্তার প্রকাশ যার বিষয়াংশ, ভাব পরিমণ্ডল এবং প্রকরণ প্রকৌশলের বিবেচনায় বাংলা সাহিত্য ধারায় নিঃসন্দেহে স্বতন্ত্রের পরিচয়বাহী। তার কবিতার শাণিত ভাষায় রয়েছে জাতিসত্তা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, রয়েছে ব্যক্তি জীবনের সংঘাত, সংগ্রাম, সমস্যা, সংকট, দহন পীড়নের পোড় খাওয়া অভিজ্ঞতা, প্রেম, শরণার্থী সমস্যা, বঙ্গবন্ধু, প্রকৃতি, নস্টালজিক, আন্দোলন ও প্রতিবাদ। তার কলমের ক্ষুরধারতার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে দেশপ্রেম, রাজনীতি, প্রেম-ভালোবাসা, দ্বিধাদ্বন্দ্ব, কলহ, হতাশা ও অসাম্প্রদায়িকতা। আঙ্গিক কল্পনায় অভিনবত্ব ও নজরকাড়া ভাষা প্রতিভায় কবিতা ভিন্ন দ্যোতনায় বহুমাত্রিকার দ্যুতি ছড়াচ্ছে। কাব্যগ্রন্থটিতে ৫৭টি কবিতা আছে, কবিতাগুলোতে রয়েছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, প্রেম-যৌনতা, জীবনের ব্যর্থতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিকার ও ব্যক্তিক দ্বিধা। আমার সীমাবদ্ধ জ্ঞানে কবিতাগুলি পড়ে যতটুকু উদ্ধার করতে পেরেছি তা তুলে ধরছি। সুখস্নানে প্রেয়সীর শীৎকার পৃথ্বলদেহী অজগরকে আরও করিৎকর্মা করে তোলে। সময় হন্তারক সুসময়কে স্বীয় মুষ্টি থেকে কেড়ে নিলে বিষবৃক্ষ বিষহীন হয়ে পড়ে। তখন বিষণ্ণ সময় অবসন্নে উচ্ছিষ্ট হয়ে পড়ে। কবির কলমে- ‘এখন আমি খেলার সাথী খুঁজি না/ মৃতের মতো ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে প্রস্থান করি।’ (বৈরি সময় আমার)

বিপ্লবের ঋত্বিকহীন রামরাজ্যে রাবণসদৃশ রাক্ষসের ক্রিয়াদি বৃদ্ধি পতঙ্গের মতো। শাসন অপশাসন দুঃশাসন স্বভাবজাত আমরা অতীত ধারাবাহিকতার ফসল। পূর্বপুরুষদের শোষণের ছায়া প্রত্যেকের মাঝে বিরাজ করে। কবি লেখেন, ‘নম্রতার জালে আবদ্ধ-শোষণের ক্ষুধার্ত উন্মাদনা।’ (শোষণের ছায়া)

সঙ্গমহীন, উষ্ণ সংস্পর্শহীন প্রতিটি রাত বিধবাসমান। নিরানন্দ নিঃস্বের সংরাগ অর্থহীন ও নিরাবেগের। বীর্যদীপ্ত বালকের দাম্ভিকতা ক্ষয় হয় স্বীয় বিবেকের অনিচ্ছাতেই। কবির কলমে- ‘প্রাপ্তবয়স্ক এক নির্ঘুম রাত বিধবা হলে রাত্রির অনন্তে যাপিত হয় স্থুলকাল...’ (বিধবা) ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ শ্বাপদসংকুল জীবন জঞ্জালে কল্পনার দাপাদাপি খুব। কল্পনাবিভোর মন আকাশের রঙের মতো কখন কি করে বলা মুশকিল। হাসি-কান্না, তাপ-অনুতাপের জীবন জটিল পদ্মাজলপ্রবাহ। কান্নারও কত রং বলতে গিয়ে কবি বলেন- ‘কান্নার কি অন্তর্বাসে কোনো নারী থাকে যে নারী মুক্তির নেশায় অ্যাবসার্ডজীবন আঁকে।’ (নামতা জীবন)

নারীশাসন নকশায়ী চাঁদের মত না হয়ে হয় বীভৎস, সাংসারিক আধিপত্য অনলে ঘি নিক্ষেপণ সামাজিক প্রেক্ষাপটে। পরিবারের প্রধান প্রশাসনিক পদ পিতার মৃত্যুকেও তাই বরণ করলে সন্তানও হয় আত্মঘাতী। কবির চয়ন- ‘হারিয়ে যাওয়া ছায়ার ভেতরে সন্তান-পিতার লাশ কাঁধে তুলে-আত্মঘাতী হয় নিজে।’ (আত্মঘাতী)

‘কাঁকনবেবি’ কবিতায় কবি লেখেন- ‘মধ্যদুপুরে রেবাদীর আরেকটি আততায়ী সকাল রুদ্রের বাঁকা হাসিতে রক্তশূন্য হয়।’ শ্রেষ্ঠ জীবের বিবেক বিবর্জিত কাণ্ড নগ্ন নারীর শৈল্পিক চিত্রের মতো, মেনে নেয়া যায় না, আবার দেখতেও দর্শনীয়। বড়সড় শিশ্নধ্বজাধারীদের বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নিষ্প্রয়োজন। কবির ক্ষোভ মশাল- ‘প্রভাতিসন্ধ্যায় যে কিশোর জ্বালিয়ে ছিলো কামনার দীপ্তপ্রদীপ-সে আজ জাতি-গোষ্ঠীর শোষিত নাবিক’ (শরীরনগ্নতার বোধি)

স্বাধীনচেতার আবদ্ধ বন্দিত্বে যে দশা তা দুর্দশাসমান। আপনাদেহে যৌবন ভর করলে যেতে হয় স্বামীগৃহে। স্বামীত্বে শিকার শীৎকার প্লাবনে আপনালয় প্রতিধ্বনিত। দেহবল্লবীর ভাজে ও খাঁজে কামুক পুরুষ বুনো শুয়োর জ্যামিতিক রেখা টেনে শিশ্নাগ্রের তৃপ্ততা নেয়। খোঁয়াড়ে আবদ্ধ রাত বিছানায় সঙ্গিনী হতে থাকে উড়ন্ত সে ঘুড়ি। সোমত্তা পদ্মার গর্ভাতলে জমে নতুন জীব। কবির কলমে- ‘নবীনরাতেও জমা হয়-প্রজাতিক হাসি-পোয়াতী সোমত্ত মেয়ে। সরষে মরিচের পেটে আজ নীল বৃক্ষের বিপন্ন চিরকুট...’ (যৈবতী কন্যা ইশকুলে) ‘আত্মকামী’ কবিতায় কবি লেখেন- ‘কেউ বা ভোররাতে আত্মকামী হয়ে ওঠে নিজেকে নিজেই কামড়ে খেতে কিংবা পাশের জনকে।’

অস্তিত্ব ভূ-ভাগ বিরাণ হলেও মরীচিকাপ্রীতি মনে উর্বশীর উষ্ণস্পর্শাকাঙ্ক্ষা কমে না। কবির কলমে- ‘যৌনতায় কিনে রাখি নির্বাসিত প্রেম নারীর অবিরাম আতাজলে নিমগ্নরাত...’ (নিমগ্নরাত)

বৈপরীত্যে আগ্রহ, নিষিদ্ধে উত্তেজনা, অপ্রাপ্তিতে দুধশাদা জ্যোৎস্নাও অমানিশা। চুম্বন দূরত্বে কামুকী উগ্র উদগ্র ঘ্রাণ দিলেও অন্তঘর শূন্যসমান। সুডৌল উরুর কামগন্ধী অপ্সরীহীন নরউন্মাদ হয়ে ওঠে সমকামী। কবির কথায়- ‘নারী ছিলো ভেলকীবাজী, পুরুষ সমকামী চাঁদনী মুখে চাঁদের হাসি করে কানাকানি।’ (সমকামী)

জীবনের মধ্যাহ্ন উর্বর উৎপাদনশীল শিশ্নদণ্ড। রতিক্রিয়া নিমগ্নকালে চাষ বালিয়াড়িতে হলে ক্ষুধার্ত চন্দ্র অতৃপ্ত হয়। যৌবন হয় কলঙ্কিত। কবির কলমে-, ‘বেহালার সাথে বুকেও বাজে অঙ্কুরিত সুর-কলঙ্কিত হয় মধ্যদুপুর।’ (কলঙ্কিত দুপুর)

ভাগ্যবিধাতার নির্মম নিষ্ঠুর কষাঘাতে সুখরেণুর সংসার ছেড়ে হতে হয় নিরুদ্দেশী। সংসার মায়া ছিন্ন রক্তজবা কোনো নারী নিয়তির নির্মম পরিহাসে হয়ে যায় পতিতালয়ের দেবী। নিজ স্বদেশও দুর্ভিক্ষ বা নির্যাতনের কবলে হয় পরদেশ। অনিচ্ছার শরীরী যোগাযোগ সর্পফণার কামুক উষ্ণতা পেলেও বেসামাল যৌবনা পায় স্বেচ্ছামৃত্যুর স্বাধীনতা। শূন্যস্তনে মরণপ্রায় শিশু সান্ত্বনা খোঁজে, অপুষ্ট আর নিথর দেহে পিতার ছানীপড়া চোখ। শরণার্থী-৪ এ কবি লেখেন, ‘ঝুলন্ত গোঁফে তুমি-ছিঁড়ে খেলে আমার দেহ/জননেন্দ্রিয় ছেদনে মুক্ত স্বদেশ পেলাম নির্বিকার স্বাধীনতা।’ (শরণার্থী সিরিজ)

অকালবোধনে জমিদার সেজে শোষণ করে, শোষিত সমাজ কাঁথা বালিশ মুড়িয়ে দর্শকী হয়। মৃদঙ্গ বাজিয়ে জেগে ওঠে না কোনো সাহসী দেশপ্রেমিক। কবির কথায়- ‘গ্রামে হৈলো কি- স্বরলিপির নেশা আশ্চর্য দৃষ্টিতে/কেড়ে নেয় সুদীর্ঘ আমনের মাঠ’ (ওগো প্রেমিক তোমাকে...)

উঠন্তি মুলা গোড়া পত্তনেই বোঝা যায়। যে বড় হয়ে আলো জ্বেলে অন্ধকার দূর করবে প্রতি সময়ই তার কর্মে দৃশ্যত হয়। কবির কথাতে-, ‘তুমি আজ নিজেই নিজের বাতিঘর। হলুদের রঙ প্রাচীর ধরে দাঁড়িয়ে আছে গতিধারা...তুমি এক অবিশ্রামী যুবক।’ (নিজেই যিনি জ্বালিয়ে দেন আলো)

ভাটফুলের ঘ্রাণে বড় হওয়া গ্রাম্য নারীরা বা কর্পোরেট হাউজের লাস্যময়ী নারী সবার মাঝে যে আগ্নেয়গিরির বাস তাতে লোলুপ ঠোঁট সমান তালে আগ্রাসী হয়। কবি লেখেন- ‘বালিশ বুকে যে মেয়েটি বিকেলের কথা ভেবে আলস্য চোখে ফোটায় বৃষ্টিফুল তাকেই শরীরবিদ্যায় মেলে দিতে হয় গোপন নগ্নতায় আগ্রাসীদেহ’(নারী অথবা গোপন বালিশ)

যৌবন জোয়ারে টলমলত্ব দুজন মা বাবা হয়। ও যৌবন কিন্তু অপশক্তির লাগাম টানে না, নীরব দর্শক হয়ে সহ্য করে। মায়ের সর্বস্ব শুষে নিলেও আপনা প্রাণ ভয়ে দুপুরের ঠাঁই সূর্যও স্তমিত থাকে। কবির কলমে,- ‘ভেবে দেখো ভ্রূণের শীৎকার কি করে ল্যাপ্টে যাওয়া যৌবন চুষে নেয় অবলুপ্তির সীমারেখা।’(মা অথবা পিতৃকালীন ধানশীষ)

বালিকার বুকের মাংশস্তরে শকুনসদৃশের কৌণিক চোখ। যৌবনা অঙ্গের বন্যা, দেহের ভাষা গভীর চাহিদার উদ্রেক করে। বাবু ফলদ বৃক্ষকে এটো করে চলে যায়, ফলদ বৃক্ষও ফল ফেলে পালায়। ফলের কি দোষ। কবির কথায়-, ‘জুঁই ফুলের লাজ নাই। বালিশ বুকে চেপে-এখনো খুঁজে ফেরে হারিয়ে ফেলা মায়ের মুখ; বাবা অজানা মনে সুতোকাটা ঘুড়ি।’ (শিল্পীর লাজ: লজ্জাতে বালিকাজীবন)

অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নাবিক দিক ভুলে পতঙ্গের মতো ঘুরপাক খায়। মিথ্যার বেসাতিতে মেতে মানুষ নগ্ন উন্মাদনা করে। ক্রমান্বয়ে হেটে চলি অন্ধ কূপে। কবির আক্ষেপ উক্তি - 'উদ্ভট স্বদেশ-প্রতীক্ষায় ভোর আমি এক দাঁতাল শকুন।’ (অন্ধকার এক নির্মমতার নাম)

আমার চিন্তায় তোমার বিপক্ষ অবস্থান। আমি সুচিন্তার চারাগাছ রোপণ করি, তুমি মুখোশের আড়ালে আত্মপ্রতারিত হলেও করে চল অন্যায্য। কবি লেখেন,- ‘তুমি ভাসমান জীবনে রোপে আছো মিথ্যার নিরুপায় চারা।’ (দাঁড়িয়ে তুমি আমার বিপরীতে)

পরম আকাঙ্ক্ষাকে না পেলে মনবাজার থেকে তাকে বিক্রি করে দিই। বিসর্জনই দিই। কবি লেখেন,- ‘মেজাজী যন্ত্রণায়- মাছ বিক্রেতা সেজে ধীরে ধীরে তোমাকেই বিক্রি করি।’ (তোমাকেই বিক্রি করি)

মা হারানো সন্তানের মমতা প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষার শেষ নেই। কোনো এক বৃদ্ধাকে পেলেও তাকে জড়িয়ে মাকে পাওয়ার স্বাদ নেওয়া। কবি লেখেন- ‘গভীর রাঙা সন্ধ্যায় একজন বৃদ্ধা আমাকে জড়িয়ে প্রতিদিন হাঁটে-সে আমার কেউ না; তবু মায়ের মতো আমারই হারানো অতীত।’ (মা)

বিয়োগাত্মক বেদনার দাগাগ্নিতে যাপিত জীবন। সৎকারে বিয়োগিত সজ্জন খুশী। কবির কথাতে- ‘স্বাপ্নিক অভিশাপে রক্তের সঙ্গম আঁড়াল করে তুমি- আমার সৎকারে খাচ্ছো চুমো...’ (চুমো)

অনলে পুড়ে অঙ্গার শেষে অনলাহত ফসল পেলে ধ্যানী কাকের নজর পড়ে। এজন্য আনন্দ সানন্দ বা অত্যানন্দ মাঝেও বুকে ভীতি থাকে। তারপরও মনে সুখ বিরাজ করে। কবির কথায়, ‘রাধার মনে চূড়ান্ত বর্ষা এলে/কৃষ্ণের চোখে ভাসে ধানবীজ।’ (কীর্তনে ভেসে আসে হাঁপরের ধ্বনি) চেতনাধারী আর চেতনা ব্যবসায়ী এক নয়। সুশীল যদি মগজ বিক্রি করে বা মগজ বর্গা দেয় বলব তাদের মগজে মূত্র। কবির কথায়,- ‘শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে মাথা ঘুরে ঘুরে দ্যাখো সত্যি কী না’ (জটিল স্বাপ্নিক বাস্তবতা)

যৌবনা ধবল জ্যোৎস্নার মত কুমারীর শরীরের কিরণও উজ্জ্বল। একান্ত নিরাবেগেরও ঘুমন্ত দৈত্য সাড়া দেয়। কবির কবিতায়- ‘কুমারী মেয়ে জলে মেখে শরীর ভিজিয়ে তুলবে মৃৎ পাত্র।’ (কুমারীবকফুল)

এ জীবন এক রহস্যগহন। সঙ্গতায় থেকেও নিঃসঙ্গতায় মগন। নিরাসক্ততা জাগে, সকালের স্নানে শুদ্ধ না হয়ে সকালকে তুলে দিই আঁধারের কোলে। কবির কলমে- ‘মুগ্ধতার সকালে নদীর সাম্পান নিঃসঙ্গতার ভেলায় শয্যা পেতে শুনে নেয় জীবনে ল্যাপ্টে যাওয়া পাললিক সুর।’ (পাখিহীন সকালে পাললিক সুর)

প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন দেখলে ঐ নিদর্শনের অতীত ইতিহাস মনে পড়ে। কারও মৃত্যুর কথা মনে পড়লে তারও অতীত কথা মনে বাজে। তাই কবি লেখেন- 'লতায় পাতায়-দুঃস্বপ্নের রোদ ঠুকরে খায়-ভেজা ভেজা চোখ।' (মৃত্যু: প্রত্নইতিহাস)

স্বদেশ চিন্তাবিদরাই নির্বিঘ্নে নাকে তেলে ঘুমায়। প্রেমে প্রেমে প্রিয়ার সাথে সময় রাঙায়। অথচ গরিব দুঃখী স্বদেশ নিয়ে কত চিন্তিত। কবির কাব্যে- ‘তবু দেখো-ভিক্ষারীর মুখে বিদগ্ধ স্বদেশ ছটফট করে -জ্বলে অস্বচ্ছ অন্ধ মন্দির।’ (বিদগ্ধ স্বদেশ)

শ্বেত বসনে স্নান করলে ভেজা বালিকার দেহ প্রকোষ্ঠে মগজের মনিটর আটকে যায়। হৃদয় চাষার সব চিন্তা স্নাতা বালিকার নাভিকমলে স্থান চায়। কবির কলমে- ‘সোনামুখী সকাল আছড়ে পড়ে তোমার বুকের কাছে।’ (বুকের কাছে)

সীমাবদ্ধতা, অভাব, অনটনে কবি প্রেম বিসর্জন দিয়েছেন। আক্ষেপ করে কবি লেখেন- ‘বাবার ছাতার নিচেয় কতকাল থাকা যায়, বলো?’ (প্রেম)

বিশ্বভ্রমণ করলেও মন পড়ে থাকে জন্ম জলাশয়ে। কবি লেখেন- ‘দূরে দূরে করে অনেক দূরে গেলে তবু রয়ে গেলে মুচড়ে ভাঙা বুকে।’ (ভাঙাবুক)

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিবেদিত কবিতাটি। কবি তাঁর তর্জনী শক্তির বর্ণনা করতে যেয়ে বলেন, ‘জনকের তর্জনী আঙুল আমাদের লড়াই-সংগ্রাম।’ (স্বদেশ)

পিঠকে প্রাচীর করে মনমানসীকে অভয় দেয় পুরুষ। সেই হৃদয়ার চোখে জল এলে মরণ বরণ করতে ইচ্ছে করে। কবি লেখেন- ‘চোখের জলে জমলে নদী আত্মঘাতী পুরুষ বুকে তোমার দুঃখ পুষে জ্বালাই দিনের সুরুজ।’ (চোখের জলে)

পতিতার শরীরজুড়ে যে আয়েশী বাগান তাতে আত্মমগ্ন থাকে কামুকশাবক। সুখের আশায় মনের কথা সেও খুলে বলে খদ্দেরকে, সুখ নিতে আসা যুবা বলে- ‘আমিও তোমার বাগান হবো ছড়িয়ে দেবো ফুলের সুকোমল ঘ্রাণ।’ (পতিতা)

বস্তির বাবুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সবাই শোষক-কীটের স্তুতিতে মগ্ন। অসহায় জীবগুলো বাঁচার নামতায় হেরে থাকে৷ কবি তাই এসব শোষকদের বলেন, ‘জীবন শোষণের মোহন কারিগর।’ (গৃহপালিত জীব)

কবি ক্ষোভ প্রকাশ করে আত্মবিসর্জনের চিন্তা বাদ দিতে বলেছেন। যারা বিবেক বিসর্জন দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বড় হতে হলে তাদের লেজ ধর। কবি সমাধানও দিয়েছেন,- ‘সমাধান চায়-তাতিয়ে তোলো শরীর-পুড়ে যাক মিথ্যা আর অন্যায় দৃষ্টির কলুষ, চৈতন্য সংকীর্ণতার লেপন টোটেন।’ (বন্ধন রাখিয়া কি হবে)

বুদ্ধিজীবী বলতে কোনো কিছু নেই। লোভে সাহচর্যপ্রীতিই মূলনীতি। বা সহজ অর্থে সবাই বুদ্ধিজীবী। কবি লেখেন- ‘ইতিহাসের লাজুক পাতায় তুমিও লিখবে স্বজন হারানো নিথর দেহাখ্যান।’ (বুদ্ধিজীবী)

যেখানেই পণ্য ক্রয়-বিক্রয় হোক সেটা বাজার। যেখানেই মনের লেনদেন হোক সেটা প্রেমের ইশকুল। যৈবতী কন্যার পিতৃালয় উন্মুক্ত পায়রার, যৈবতী কন্যার স্বামীগৃহ স্বাধীনতার চেয়ে বেশি পরাধীনতার। এ কবিতায় যৈবতী কন্যার পাওয়ার আকুলতায় কোনো এক যুবকের বুকের রক্তক্ষরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। (যৈবতী কন্যা ইশকুলে-২) প্রেয়সীকে কবি বলেছেন আমাকে জড়িয়ে রেখো না, আমি বিশ্বাসঘাতক। পাগল মন তবুও প্রিয়ার হাত থেকে বাসিপচা ভাত খেতে চায়। দোলাচলের মধ্যে থেকে কবি লেখেন,- ‘আমি-তুমি, আমরা-আমাদের নিয়ে ভাবি চলো... তবু তাড়া করে জুডাসজীবন।’ (জুডাসজীবন)

প্রবল প্রেমাবেগে স্বপ্নবাজ দুজন ঘ্রাণে উন্মাদ হতে চায়। কারণবিহীন দুমনে বিচ্ছেদ এলে ভিজে যায় চোখ। কবি লেখেন- ‘তুমি জানো বুঝি-ছলনার রং গাঢ় হয় যেমনটা ছিলো-লাভ ইউ প্রান্তে বিশ্বাসীলোভ।’ (যৈবতী কন্যা ইশকুলে-৩)

‘স্বৈরাচার’ কবিতায় কবির প্রতিবাদী সত্তার উন্মেষ আছে। অধিকার আদায়ে স্বদেশ চিন্তায় কবি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কবির দৃঢ় উচ্চারণ- ‘আমি এখন আর রঞ্জিত চোখে শিরোধার্য মাথা নোয়াই না।' (স্বৈরাচার)

অপরাজনীতির দাপাদাপি থাকলে জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ হবে না। ক্ষোভে কবি লেখেন, ‘কেড়ে খায় মানুষের জীবন-বুনো রাজনীতি।’ (বুনো রাজনীতি)

কবি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্ম 'জনক' কবিতায় অনবদ্য করে তুলে এনেছেন। কবি লেখেন- ‘জন্মান্তর বিশ্বাসী এক পিতা, নকশা পাইপে টানে-সংক্রান্তির লেপ্টে যাওয়া বিবেকে রক্তদানের রক্তিম দাগ...’ (জনক)

জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া শাহীনার করুণ পরিণতি অংকনের মধ্য দিয়ে কবি বঙ্গ রাখাল সমাজে অবহেলিত, আশ্রয়হীনদের জন্য সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। কবি ধনবানদের বাক্যবাণে জর্জরিত করে লেখেন- ‘এই কথা সেই সব ধনবান বীরদের জন্য-যারা মানবতার কথা বলে ক্ষমতার ঘোড়ায় চড়ে...’ (একজন শাহীনা ও মানবিক মৃত্যু)

অকল্পনীয় কল্পিত কল্পনার প্রেমের আবহ সৃষ্টি ‘ব্ল্যাক মেজিক’ কবিতায়। যেমন: ‘রোজারা আমি এক জলন্ত গুহা আগুনের গাছ-তুমি বিশ্বাসে রাখো হাতের তালু পাথরে ঢেলে জলের ছিটা।’ (ব্ল্যাক মেজিক)

সমাজের হেরে যাওয়া মানুষের জীবনযুদ্ধের চিত্র কবিতায় বিমূর্ত হয়ে ধরা দেয়। দেবশিশু, সংগ্রামী মা, শরীরীনৃত্যের নারী, ঈশ্বর পুরুষ সবার কথা আছে- ‘উলপোকাদের জীবনবুননের গল্প’ কবিতাটিতে। সংগ্রামী কোন এক মেয়ে অবারিত দুঃখগুলো লুকিয়ে বাদশার মেয়ে সেজে মনের বিপরীতে হেসে চলে। যেমন কবি লেখেন,- ‘পাতা দোলে কোন সে মায়ায় সবুজ হাসি হেসে তোমার দেখা শনিবারে সস্তা গলির মোড়ে।’ (বাদশার মেয়ে)

অসংগতি বিসংগতি কিংবা শুদ্ধতায় কবি ক্রুদ্ধ কিংবা মুগ্ধ হয়ে কবিতা লেখেন। সার্কাসে নর্তকীদের দেহনৃত্য দেখে কবি জোকার হতে চান। কবি লেখেন- ‘কবিতা লেখতে লেখতে নারীদেরও কবিতা মনে হয়। কবিতার মতোই ভালোবসে ফেলি সাইলা অদ্রিতাকে-যে কিনা কবিতার 'ক'ও বোঝে না।’ (কবিতার টানে)

মুজিব প্রেমে মুগ্ধতার এক অনন্য কবিতা ‘ভঙ্গুর বুকও একদিন করেছিলো মুজিব মুজিব...’। যেখানে লাঙল জোয়াল কাঁধে বালকের কথা আছে, আগমনী ভোরের কথা আছে, ধানমন্ডির ৩২ নং বাড়ির কথা আছে, আছে ছোঁ-মারা শকুনদের কথা। যে সৌন্দর্য দেখে কবি কবিতা লেখার উজ্জীবনী শক্তি পান সে সৌন্দর্যের কথা আছে 'বারুদগন্ধী কবিতা' কবিতায়। যেমন- ‘যে মেয়েটা প্রতিরাতে আমাকে সঙ্গমের উত্তাপে মাস্টারবেশনে জাগিয়ে তোলে-শরীর হতে নেতিয়ে পড়া দেহ...সেই মেয়েই আমার কবিতা।’ (বারুদগন্ধী কবিতা)

অপশক্তির ওড়াউড়ি অথচ ঝরে পড়ে শ্বেতপুষ্প। উঁইপোকা, ঘূণপোকাদের মাতামাতি অথচ শ্রমজীবীর শূন্যব্যাগ। অমানুষদের দাপাদাপি অথচ মানুষগুলো মৃতপ্রায়। এমনি ভাবাপন্নের কবিতা 'মদ্যপানে রাজনীতির ভেজা শরীর' প্রাণ পাখির কল্পনায় কবি বিভোর। স্বপ্নে তাকে সাজান, তাকে নিয়ে ঘোরেন, ভালোবাসি বলেন, কাছে বসেন, রিক্সায় চড়েন, ঠোঁটে ঠোঁট রেখে মাতলামি করেন৷ কিন্তু বাস্তবে তার দেখা মেলে না। কবি লেখেন- ‘পাখির জন্য মন পোড়ায়, ছটফট করি, তবু মন খুলে বলতে পারিনি- ভালোবাসি, ভালোবাসি...(যা প্রকাশ করা হয়নি) বিরুদ্ধস্রোতে চলা কবির স্বভাব। নিরবন্ত্রী উন্মত্তদেহে কবি নেশাতুল কামুক হলেও চিন্তার জগৎ তাঁর দূর কোনো গাঁয়ে ফেরি করে। কবি বিষাক্রান্ত হবেন নগ্ন নারীর দেহে ডুবে নয়, অরণ্যভূমে ভিজে। এমনি ভাবাপন্নের কবিতা 'হেমলক'। শীত এলেই কামনাগ্নি জাগে। অন্য উপায়হীন নিজ বীর্যে লেপ্টে রাত অপচয় করে। পতিতাপল্লীর সর্দারনীর খতিয়ানে খদ্দেরের নাম জমা পড়ে ঢের। কবি লেখেন- ‘শিয়ালও আড়ি পাতে নিঝুম শরীরী শীত বালিকার খণ্ডিত মেসাসাওয়াই।’ (শীত যাপনের কাল)

‘ত্রিস্তনের দাহ' কবিতায় আছে,- ‘নিষ্ঠুর দরদীয়া বুঝে নিস অস্পষ্ট জীবনের ক্ষীণদৃষ্টির পাশবিক নির্জনতায় ঘুমিয়ে ত্রিস্তনের অমলিন দাহ...’ এবং ৫৭তম অর্থাৎ শেষ কবিতা ‘আলোকিত সুজন’তে আছে ‘ত্রিশূল তোমার বুকের মাঝে অপচয়ের ক্ষরণ মুখস্ত করে তবুও তুমি বটবৃক্ষের বিষণ্ন ছায়ায় শান্তির ফাগুন পাঠিয়ে বুনোঘাসের চরণে রাখো আলোকিত ভোর...।

পাঠান্তে, বঙ্গ রাখালের 'যৈবতী কন্যা ইশকুলে' পড়ে উপলব্ধি হলো কবি প্রতিশ্রুতিশীল কবিদের একজন। দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে লেখেন। সমাজের অসঙ্গতি কলমের খোঁচায় তুলে এনে জানিয়ে দেন বিবেকের দরজা কেন বন্ধ রাখি। কবিতার অবয়ব জুড়ে যে নান্দনিকতার ছড়াছড়ি তা পড়ে শিহরিত হই। কবিতার মাত্রা, নির্মাণ, চিত্রকল্প, মিথ প্রয়োগে কবি যে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তাতে বলা চলে কবি গতানুগতিকের বাইরের কেউ। কবিতায় নারী, প্রকৃতি, নস্টালজিয়া, আন্দোলন, বাদ-প্রতিবাদ এক সাথে সহবাস করে। সময়ের যথোপযুক্ত প্রেক্ষাপটকে ধরে কবি দেখিয়ে দিয়েছেন আমাদের কি করা বাকি, কি করা উচিত। কবিতাগুলি পড়ে যে তৃপ্তি পেয়েছি তার রেশ মস্তিষ্কে কিছুদিন থাকবে। কবিতা যে মানুষকে নাড়িয়ে দিতে পারে বঙ্গ রাখালের কবিতা না পড়লে বুঝতাম না। তাঁর কবিতায় আপাতদৃষ্টিতে যে সৌন্দর্য ধরা দেয় তাতে মুগ্ধতা আছে, আর গভীরে প্রবেশ করলে যে সৌন্দর্য ধরা দেয় তাতে বিস্ময়ের শেষ থাকে না। কবি সৃষ্টি করুক নতুন নতুন আরও কবিতা, আমরা যারা পাঠক হওয়ার চেষ্টা করছি তাঁর কবিতা পাঠের লোভ লুকিয়ে রাখব না। নতুন কবিতার জন্ম দেবেন কবি, কবি বেঁচে থাকবেন তাঁর কবিতার প্রতিটি শব্দে। কবি বঙ্গ রাখাল সফল মানুষ হবে এবং তাঁর অমর পর্যায়ের সৃষ্টি 'যৈবতী কন্যা ইশকুলে' পাঠকপ্রিয়তা পাবে এ প্রত্যাশাই থাকল।

আরও পড়ুন : এবং রুদ্র : স্রোতের মতো বহমান কথা

গ্রন্থ পরিচিতি

কাব্যগ্রন্থ- যৈবতী কন্যা ইশকুলে কবি- বঙ্গ রাখাল প্রকাশনি- টাঙ্গন প্রচ্ছদ- শিশির মল্লিক

jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড