• শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২০, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭  |   ২৫ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বই আলোচনা

এবং রুদ্র : স্রোতের মতো বহমান কথা

  শব্দনীল

১৪ মার্চ ২০২০, ১৩:০১
প্রচ্ছদ
প্রচ্ছদ : কাব্যগ্রন্থ ‘এবং রুদ্র’

২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবর “প্রজন্মের চোখে ‘রুদ্র’’ শিরোনামে কজন তরুণ লেখক-লেখিকার মন্তব্য নিয়েছিলাম। দিনটি ছিল রুদ্রের প্রয়াণ দিবস। যদিও আমার কাছে রুদ্রের কোন প্রয়াণ নাই, প্রস্থান আছে। আমার জানার আগ্রহ ছিল, সত্তর দশকের দ্রোহ এবং প্রেমের কবিকে নিয়ে এই প্রজন্ম কী ভাবে। যেহেতু তাকে তারুণ্যের কবিও বলা হয়। 

কবি নাজমুল ইসলাম সীমান্ত বলেছিলেন ‘বোহেমীয় স্রোতের পাদদেশে ভালোবাসা আর দ্রোহের এক আকণ্ঠ হিমালয়; এক চিরসবুজ গহীন তেপান্তরের অপর নামই রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’। অন্যদিকে কবি চৌধুরী ফাহাদ এক বাক্যে রুদ্র সম্পর্কে বললেন, ‘রুদ্র আমার ভাই লাগে।’

তার মানে তিনি কোনো দশকের কবি নন। তিনি কালান্তরের কবি। কথাটি নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় থাকলেও ২০২০ গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হওয়া একটি কাব্যগ্রন্থের নাম দেখে, দ্বিধাটি সম্পূর্ণ চলে যায়। যদিও ২৬ জানুয়ারি ২০১৯-এ কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপির নামটি জানতে পরি। কাব্যগ্রন্থটির নাম ‘এবং রুদ্র’।  

তখন একদিক থেকে দ্বিধা চলে গেলেও শঙ্কা তৈরি হয়ে ছিল মনের ভেতর। রুদ্র আবার পূজারী হয়ে যাচ্ছে না তো। কাব্যগ্রন্থটি সম্পূর্ণ তাকে নিবেদিত নয় তো!

নাম দেখে ভাবনাটি মাথায় আসলেও বেশিক্ষণ পাত্তা দিইনি। কারণ ‘এবং রুদ্র’ তখনো পড়া হয়নি। কাব্যগ্রন্থটি হাতে আসার পরে বুঝতে পারলাম রুদ্র একটি চরিত্র মাত্র। চরিত্রটি অঙ্কন করেছেন কবি মহসিনা সরকার। ‘এবং রুদ্র’ তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। 

কাব্যগ্রন্থের ফ্ল্যাপ লিখতে গিয়ে কবি গিরীশ গৈরিক লিখেছেন, ‘বাংলা কবিতায় বিদ্রোহের ধারা নদীর স্রোতের মতো প্রবহমান। কেননা, যুগে যুগে ভিন্ন ভিন্ন রূপে হাজার বছরের বাঙালি সভ্যতায় বৈষম্য বিরাজমান। মহসিনা সরকারের ‘এবং রুদ্র’ কাব্যগ্রন্থে সেই বিদ্রোহের ধারা প্রতিভাত হয়েছে- প্রেম ও কামের সৌষ্ঠবে। কাব্যসাধনার শুরু থেকে তার কবিতায় সমাজচিন্তা, বিপ্লব, প্রেম, রাষ্ট্রের বিভিন্ন চিত্রের প্রতিফলন ঘটেছে। তার কবিতার ভাষা সহজ সরল যেন বাউল ঘরানা।’

এই যেমন লিখেছেন ‘মৃত্যু দেখতে চাই’ কবিতায়-

‘আমি দেখতে চাই-
মৃত্যু কেমন তোমায়
আমার জন্য অমর করে রাখে,

অথবা
ঐ চাঁদ না আমি, কে বেশি প্রিয়?
                 (রোদের বিপরীতে রুদ্র)

সহজ ভাষায় নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে কার্পণ্যবোধ করেননি তিনি। প্রিয় মানুষকে সম্পর্কের প্রতিযোগিতায় হারাতে না চেয়ে মৃত্যুকে বেছে নিতে বলছেন যেমন, তেমনি দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছেন প্রকৃতি ও মানুষের ভিতরে। একদিকে ভালোবাসার জন্য আকাঙ্ক্ষা আবার অন্যদিকে দ্রোহের কথা বলছেন। যেমন পাপাত্মার আত্মহত্যা কবিতায় লিখেছেন-
‘মাঝে মাঝে নিজেকে মৃত ভাবতে খুব ভাল্লাগে 
এই বোধহীন শুকনো শহরে...’

কাব্যগ্রন্থটিতে রয়েছে ৬১টি কবিতা। প্রতিটি কবিতাই ভিন্নভাবে উপস্থিত হয়েছে আমার সামনে। কখনো প্রেম, কখনো বিরহ, কখনো আশা এবং হতাশার গল্প নিয়ে। ‘হতাশা বিষণ্নতা’ কবিতায় একাকীত্বকে প্রকাশ করতে বলছেন-
বহুদিন পর বিষণ্ণতার চারপায়াটায়
বেশ আয়েশ করে বসা,

এটুকু পড়ার পড়ে মনে হচ্ছিল শেষ, অসম্পূর্ণ লাইন রেখেছে কবি কিন্তু না, তার পরে বলছেন-
হতাশা বিষণ্ণতায় রূপ
এইতো নেবে নেবে ভাব,
আজ বেড়ি বেঁধো নাকো
যকটুকু যাওয়ার যায় যাক।’

স্রোতের সাথে এখানে কবি গা ভাসিয়ে দিচ্ছেন। এক দিকে বিদ্রোহ করছেন অন্যদিকে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছেন আবার নৌকার পালের মতো ভাসতে চাচ্ছেন। এ যেন চলচ্চিত্রের ক্লাইম্যাক্স। ক্ষণে ক্ষণে নিজেকে পরিবর্তন বা ভাঙা-গড়ায় মত্ত হচ্ছেন কবি। কোথাও গিয়ে হিসেবও কষেছেন নিজের মতো করে। ‘ইচ্ছে’ কবিতায় মহসিনা বলছেন-
‘অচেনা কোনো ইচ্ছের রসায়নে 
চলো হুট করে,
করে আসি তোমার আমার
প্রেমের গভীরতার ক্যালকুলাস
--------------------------------
কতটুকু আধানের প্রভাবে
মিলে যায় আমাদের
কোয়ান্টাম তত্ত্ব।’

বাদ দেননি সমাজ বা রাষ্ট্রের চিত্র অঙ্কন করতে। তিনি খুঁজেছেন নগ্নতার মাঝে পবিত্রতা। আধারের ভিতরে থেকেও আলোর সন্ধান করেছেন। কবি রুদ্রকে কতটা ধারণ করেছেন ব্যক্তিস্বত্তায় ‘ছয়গুটি-৪’ কবিতায় তুলে ধরেছেন স-মহিমায়-
লোকাল বাসে,
নর্দমার ওপাশে,
অবহেলিত বিজ্ঞপ্তিতে,
হোসেন ভাইয়ার চায়ের টঙে 
একটা কথাই ছড়িয়ে যাক,
এ শহরে আমার একটা রুদ্র ছিলো।

‘এবং রুদ্র’ কাব্যগ্রন্থে উপমা এবং অলঙ্করণ খুব কম পেয়েছি। কবিতা কখনো বলে না, ‘আমি ভাত খাব’ বলে ‘ভাত আমাকে খাবে।’ এদিক দিয়ে চিন্তা করলে নান্দনিকতাও কিছুটা না পাওয়াই থেকে যাচ্ছে। কয়েকটি কবিতায় শব্দ ব্যবহারে আরও একটু সচেতনতা প্রয়োজন ছিল মনে করি। 

আরও পড়ুন : জীবনবোধের অধ্যায় গিরীশ গৈরিকের ‘মেডিটেশনগুচ্ছ’

কাব্যগ্রন্থটির বাইন্ডিং এবং পেস্টিংয়ে ‘ঘাসফুল’ প্রকাশনীর আরও একটু নজর দিয়ে এবং দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করার প্রয়োজন ছিল বোধকরি। তবে মহসিনা সরকারের ‘কাঁচা রোদে ঝলসে’ উঠতেও ভুলিনি। প্রথম প্রেমের মতো।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড