• রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২২ চৈত্র ১৪২৬  |   ৩৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বই আলোচনা

সূর্য দীঘল বাড়ী : মানুষ, না মানুষের গল্প

  মাহমুদুল হাসান

১৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:৩২
কবিতা
প্রচ্ছদ : উপন্যাস ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’

আবু ইসহাকের ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ একটি কালজয়ী উপন্যাস এর অবলম্বনে নির্মিত ছবি নয়টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে। এটি নির্মিত হয়েছে উভয় বাংলায়। জয়গুণ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তার ও তার সন্তানদের অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম উপন্যাসের মূল উপজীব্য। জয়গুণ শহরে ভাতের লড়াইয়ে টিকতে না পেরে অবশেষে গ্রামে চলে আসে।  এসে বাস শুরু করে সূর্য দীঘল বাড়ীতে। যে বাড়ি তথাকথিত অভিশাপ আক্রান্ত। আশ্রয় যোগান হলেও জঠরের তাড়নায় তাকে কাজ করতে হত অপরের বাড়িতে। ট্রেনে ধরে শহর থেকে চাল কিনে এনে বিক্রি করতে হত গ্রামের হাটে। 

ভিক্ষার চালের মতন করে আনতে হত খরচ বাঁচানোর জন্য।  তার এই সংগ্রাম ভাল লাগেনি ধর্মান্ধ মুসল্লিদের। তাই জয়গুণকে তারা দিয়েছে ধিক্কার। প্রথম পাড়া হাসের ডিম হুজুর না রেখে চোখেমুখে ঘেন্নার তীব্রতা ফুটিয়ে তিনি ফিরিয়ে দেন, আল্লার কাছে শুকরিয়া জানান আল্লাহ হারাম থেকে তাদের হেফাজত করেন। ভাবখানা এই না খেয়ে মারা যাবার জন্য এদের জন্ম, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার অধিকারটুকু পর্যন্ত এদের নেই।

জয়গুণের বিয়ে হয়েছিল দু’বার। স্বামী মারা যাবার পর জয়গুণকে আরেকটি বিয়ে করতে হয়েছিল। দুর্ভিক্ষের সময় তার স্বামী তাকে তাড়িয়ে দেয় কোলের ছেলে সন্তান রেখে। অথচ মেয়েটিকে রাখেনি। যেহেতু-
 ‘পুত্র সে হাতের লাঠি বংশের চেরাগ
  কন্যা সে মাথার বোঝা কূলে দেয় দাগ।’

দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে মারা যায় মেয়েটি। দেশ যখন স্বাধীন হল ১৯৪৭ সালে, তখন জয়গুণের মনে আশার সঞ্চার হল৷ এবার  চালের দর সস্তা হবে, তারা পেট পুরে খেতে পারবে। দেশের জাতীয় পতাকা তাকে স্বপ্ন দেখায়। সবুজ নিশান জীবনের নিশান, মনে জাগে বাঁচবার আশা। পরিবারে হাল ধরতে তার কচি বড় ছেলেটিকেও মুঠে বইতে হত। তার কচি ঘাড়টা তাই মাঝেমাঝে ব্যথা কাতর হয়ে পড়তো।

অল্প বয়সে মেয়ে বিয়ে দেবার প্রথা এখনও আমাদের সমাজে প্রবলভাবে বিদ্যমান। জয়গুণের মেয়ের তাই বিয়ের পরিণতি হয় ভয়াবহ। আমাদের সমাজে তাই প্রয়োজন বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে বিপ্লব। জয়গুণের ছেলে হাসুকে যদিও তার স্বামী আটকে রাখে কিন্তু মায়ের ভালবাসা থেকে আটকে রাখার সাধ্য কি জাগতিক নিয়মে পারা যায়৷ সন্তান হারানোর ভয়ে তাই করিম বক্স হাসুকে আটকে বাড়িতে।  

কখনও কাছ ছাড়া হতে দেয়না। ভূতের ভয় দেখিয়ে আটকে রাখার ফন্দিতে হাসু ভয় পেয়ে মৃত্যুর দুয়ারে পৌছায় হাসু। মায়ের সেবা আবার তাকে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনে। তাতে হুশ হয় করিম বক্সের। সে জয়গুণকে আবার ঘরে তোলার প্রস্তাব দেয়, কিন্তু জয়গুণ তা প্রত্যাখ্যান করে পিতৃতন্ত্রের মুখে কালিমা ছুঁড়ে দেয়।

জয়গুণকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যায় গেদু প্রধান। তাই সে তথাকথিত ভয়ের আশ্রয় নিয়ে ঢিল মারতে থাকে বাড়িতে। জয়গুণের স্বামী দেখে ফেলায় তাকে গলা টিপে মেরে ফেলে গেদু। আর তাই ভূতের কারসাজি মনে করে বাড়ি ছাড়তে হয় জয়গুণকে।

এভাবেই লেখক কাহিনী এগিয়ে নিতে থাকেন । যেখানে জয়গুণের সংগ্রাম, অস্তিত্ব ঠিকিয়ে রাখার অধিকার না থাকা, মাতৃ বাৎসল্য, অবশেষে সূর্য দীঘল বাড়ি থেকে পরিকল্পিতভাবে তাদের উচ্ছেদ এর মধ্য দিয়ে কাহিনী শেষ হয়।

বইটি পড়ে মনে হল, সব মানুষ এখনো মানুষ হয়নি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড