• শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০, ২৭ চৈত্র ১৪২৬  |   ২৫ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বই আলোচনা

এক চোখে হুমায়ূনের দুই

  মাহবুব নাহিদ

২১ নভেম্বর ২০১৯, ১১:০০
গল্প
ছবি : উপন্যাস প্রচ্ছদ

জোছনা ও জননীর গল্প

লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনতে হয়েছে আমাদের চুড়ান্ত বিজয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে লেখা বেশ কয়েকটি বইয়ের মধ্যে জোছনা ও জননীর গল্প অন্যতম একটি ভাল বই। বইয়ের নামের মাঝেই লুকিয়ে আছে এর কঠিন সত্য। আমাদের প্রিয় দেশমাতৃকা অর্থাৎ আমাদের জননীর গল্প। বইয়ের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে জেনেছি মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। কাল্পনিক কিছু চরিত্র আর তার সাথে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের কিছু প্রবাদপ্রতিম মানুষদের গল্পগাঁথা শুনেছি পুরো বই জুড়ে। প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ যেন বই লেখেননি, আমাদের গল্প বলেছেন।

এই বইয়ে তিনি যেমন তার নিজের জীবনকে জড়িয়েছেন তেমনি কিছু কাল্পনিক চরিত্রের উপাখ্যান দেখিয়েছেন আবার মুক্তিযুদ্ধের তথ্যও দিয়েছেন। যে কারণে বইটি হয়ে দাঁড়িয়েছে একের ভিতরে অনেক কিছু।

লেখক তখন একদম তাজা যুবক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন তিনি। কিছু কোনো কালবৈশাখী ঝড়ের মতো কিছু একটা এসে তার পরিবারকে তছনছ করে দিয়ে যায়। বাবা পুলিশ অফিসার ফয়জুর রহমানকে ধরে নিয়ে পাক হানাদার বাহিনী। তারা দুই ভাই প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে পড়েন বিপাকে। তার বাবা হয়তো ফেরেননি, কেউ আবার ফিরেছে। কারাও আত্মত্যাগই কম নয়। তবে যারা চলে গিয়েছে তাদের কবরে যেন প্রতি ভরা জোছনা এসে আলোকিত করে আমাদের প্রিয় জননী-দেশমাতৃকা।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র শাহেদ আর তার অভিমানী স্ত্রী আসমানি। একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যায় তারা। একে অপরকে খুঁজে বেড়ানোর সে কি আবেগ! সে কি হৃদয় বিদারক স্মৃতিমাখা গল্প। কে জানে দেখা হয়েছিলো কিনা!

শাহেদের বন্ধু নাইমুল তার স্ত্রী মরিয়মকে কথা দিয়েছিল ফিরে আসবে বলে। কে জানে তাদেরও আর দেখা হয়েছিল কিনা!

মাওলানা ইরতাজউদ্দিনের মতো সাহসী চরিত্র ফুটে উঠেছে এই উপন্যাসে যিনি পাকিস্তানী হানাদারদের হুকুমের তাবেদার হননি। মাথা নত করেননি বন্দুকের সামনে, বুক চিতিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন দেশপ্রেমের কি অপরূপ শক্তি! আবার একইভাবে আমরা দেখেছি কলিমউল্লাহর মতো ধুরন্ধর মিথ্যাশ্রয়ী সাপের মতো খোলস বদলানোর মানুষ। উপন্যাসে প্রধান চরিত্র থেকে শুরু করে একদম ছোট চরিত্রও ফুটে উঠেছে দারুণভাবে। এই চরিত্রগুলো ছাড়াও শাহ্ কলিম, মাসুমা নামক চরিত্র গুলোও ভাল লেগেছে।

বইটিতে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহাপুরুষ বঙ্গবন্ধু, জিয়া, ভাসানী, কাদের সিদ্দিকীসহ বেশকিছু চরিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আনা হয়েছে ইয়াহিয়া কিংবা ভুট্টোদের মতো শোষকদের গল্পও।

গল্পের অনেক উক্তি ভাল লেগেছে তবে একটি উক্তির কথা না বললেই নয়, তা হচ্ছে ‘সুসময়ে হাসি সংসারে আরাও সুসময় নিয়ে আসে। দুঃসময়ে হাসি আনে ভয়ংকর কোনো দুঃসময়’।

স্বাধীনতা যুদ্ধের এই চিরজাগ্রত কাহিনী পড়তে গেলে শরীরের পশম খাড়া হয়ে যায় যেমন তেমনি সেই নরপশুদের কথা ভাবতেই ঘৃণায় শরীর জ্বলে যায়। কতটা সংগ্রাম করেছে আমাদের বীরেরা, কতটা কষ্টে জর্জরিত হয়েছে আমাদের মা-বোনেরা! আমরা কি দিতে পেরেছি তাদের? আমরা কি যোগ্য সম্মানটুকু বুঝিয়ে দিতে পেরেছি?

পারিনি হয়তো, হয়তো আমরা শুধুমাত্র দিবস পালনের নিয়মে বন্দী হয়ে গেছি। তবে যুদ্ধের ইতিহাস জানতে আর নিজের ভিতরে এক অদ্ভুত অনুভূতি আনতে হলে জোছনা ও জননীর গল্প বইটি প্রত্যেকের একবার পড়তে হবে। এটা আমাদের দায়িত্ব। ধন্যবাদ প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ স্যার।

 

শঙ্খনীল কারাগার


দিতে পারো একশো ফানুস এনে? 

আজন্ম সলজ্জ সাধ- একদিন আকাশে কিছু ফানুস উড়াই।

ছোট একটা কবিতা। অনেক অব্যক্ত বেদনার ছায়া হয়ে ফুটে উঠেছে এই লাইনদুটি। 

লেখক সোমেনচন্দ্রের লেখা একটি ছোটগল্প থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নিম্নবিত্ত মানুষদের জীবনকাহিনী নিয়ে লেখা শঙ্খনীল কারাগার তার প্রথম লেখা উপন্যাস। রফিক কায়সারের লেখা কবিতা ‘শঙ্খনীল কারাগার’ নামটি অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করেন হুমায়ূন আহমেদ। নন্দিত নরকে তার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস কিন্তু প্রথম লিখেছিলেন এই উপন্যাস। তার বাবাকে তার লেখা পাণ্ডুলিপি দেখাতে পেরেছিলেন বলে নিজেকে গর্বিতা মনে করতেন। এই উপন্যাস নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করেছে তথ্য মন্ত্রণালয়, পেয়েছে সেরা চলচ্চিত্র পুরষ্কার। 

উপন্যাসের নামকরণে স্যার দারুণভাবে সফল। মানুষ মুক্ত থেকেও দুঃখ বেদনার করাল গ্রাসে যে কারাগারে বন্দী থাকতে পারে তা দেখা গেছে এই উপন্যাসে।

মাত্র কয়েকটি চরিত্র ছিল, তবে চরিত্রগুলো বাস্তবের চেয়েও বাস্তব। আর কতগুলো প্রশ্ন থেকে গেছে যার উত্তর খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য। তবে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পাওয়াও যেন আনন্দের। 

খোকা পরিবারের বড় ছেলে কিন্তু বড় সন্তান রাবেয়া। তাদের বাবা আজহার হোসেন আর মা শিরিন। বাকি দুইবোন রুনু আর ঝুনু, এরা পিঠাপিঠি। খোকার ছোটভাই মন্টু।

শিরিন আর আজহারের সম্পর্কের মধ্যে এক অজানা রহস্য রয়ে যায়। যে রহস্যের জট যেন এখনো মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। ধনী পরিবারের মেয়ে শিরিন সবকিছু গুটিয়ে এই মানুষটার হাতে হাত রেখেছে। ভালবাসার কি দারুণ আবেগ! কিন্তু কোথায় যেন কি একটা ছিলনা।

বাবা মারা যাওয়ার পর খোকা পরিবারের হাল ধরে। স্থানীয় এক কলেজে প্রফেসর হিসেবে চাকরী পায় খোকা।  কিটকির সাথে খোকার ভালবাসার এই করুণ পরিণতি হয়তো মেনে নেওয়া কষ্টের। খোকা তার ভালবাসা হারায়। হারায় আস্তে আস্তে সবকিছুই। হয়ে যায় একদম একা!

রুনু সামান্য একটা ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে বিয়ে করতে পারে না তার ভালবাসার মানুষকে। বেচারিও জীবন সংগ্রামে হার মেনে সব হিসাবের খাতা চুকিয়ে পাড়ি দেয় ওপারে।

মন্টু আবার বেশ থাকে। কবিতা আর বন্ধুদের নিয়ে তার দারুণ সময় কাটে। একটা পত্রিকার সহ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পায় মন্টু, আর দুইটি কবিতার বই লিখে এক হুলস্থূল কাণ্ড লাগিয়ে দেয় সে। 

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রাবেয়া। রাবেয়ার মনে যত কষ্ট, যত আবেগ তা যেন শুধু চেপে রাখার জন্যই। কষ্টগুলোকে নিজের মনের বোতলে বন্দী করে সকলের সাথে হাসিমুখে ভালবেসে যাওয়ার এক অনন্য চরিত্র রাবেয়া।

কথায় বলে, শেষ ভাল যার সব ভাল তার। উপন্যাসের শেষটাই যেন সকল কিছুকে ছাপিয়ে যায়। এ যেন স্বপ্নের চেয়েও বড় কোনো স্বপ্ন। কেউ হয়তো গল্পের বৃদ্ধ বয়সে এমন কিছু আশাও করে রাখেনি। সেই চরম ব্যাপারটা, সেই রুদ্ধশ্বাস করা মুহূর্ত যা আমাদের স্বাভাবিক পৃথিবী থেকে অবাক পৃথিবীতে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। খোকাকে দেয়া রাবেয়ার চিঠিটা উপন্যাসের পাঠকদের জন্য সবচেয়ে বড় পাথেয়। নীলের কারাগার থেকে রাবেয়া হয়তো মুক্তি পায় কিন্তু চিরদিনের জন্য বন্দী করে দেয় খোকাকে! আর সাথে রাবেয়ার বাবার চরিত্রটা!

এমন কিছু যে লেখকের বই থেকে পাওয়া যায়, তার প্রত্যেকটা বই যেন এক বসায়ই পড়ে ফেলা যায়। নিঃসন্দেহে এটি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর মধ্যে একটি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড