• শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২০, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বই আলোচনা

শেষ প্রশ্ন : নারী চরিত্রের এক দৃঢ়তা

  মারিয়াম ছন্দা

১৯ নভেম্বর ২০১৯, ১২:২০
প্রচ্ছদ
উপন্যাস প্রচ্ছদ : শেষ প্রশ্ন

খুব অস্থির একটা সময়ে বইটা পড়া শুরু করেছিলাম। শ্রীকান্তের পর একটা দীর্ঘ বিরতি নিয়েছিলাম শরৎচন্দ্রের কাছ থেকে। শরৎ এর পঠিত অন্যান্য উপন্যাসের নারী চরিত্রের মতো ভেবেছিলাম কমল চরিত্র, মমতা ও চিরায়ত নারী চরিত্রের এক মহান দৃষ্টান্তই স্থাপন করবে অথচ ক্রমে এ ভুল কেবল ভাঙলই না রীতিমতো হোঁচট খেলাম। বলা বাহুল্য শুরুতে মনোরমাকেই আমি মূল চরিত্র ভেবেছিলাম। যদিও এই উপন্যাসে প্রত্যেকটি চরিত্রই খুব শক্তিশালী।

আশুবাবু সংযম ও মমতার কর্ণধার, আশুবাবুর কন্যা মনোরমা, শিক্ষিত তবে শিক্ষার যে মূল উদ্দেশ্য সংকীর্ণতা না রাখা তা আমি তার মধ্যে দেখিনি, যা আজকের বহু নারী চরিত্রেই বিদ্যমান। যাইহোক এই চরিত্রটি শুরু থেকেই আমার পছন্দ হয়নি।

হরেন্দ্র, নীলিমা, সতীশ, অক্ষয়, অজিত, শিবনাথ প্রত্যেকটি চরিত্রই এত উজ্জ্বল। রাজেন চরিত্রের বিস্তার উপন্যাসে তেমন না হলেও তার এই স্বল্প সময়ের উপস্থিতি এবং আকস্মিক ইতি পাঠকের হৃদয়ে তার বিস্তার ঘটাবে আশা করা যায়।

আমার কাছে এই উপন্যাসের বেশকটি চরিত্রকে মনে হয়েছে শরৎচন্দ্রের নিজের এবং সমাজের সাথে আলাপন। যেনো পুরো আলাপটাই একটা ভাঙাগড়ার খেলা। শরৎচন্দ্র কমলের হাত ধরে প্রাচীর ভাঙার সাহস যেমন দেখিয়েছেন, সমাজকে আহত করেছেন আবার আশুবাবুর হাত ধরে টেনে ধরেছেন পরিচিত গণ্ডির মধ্যে, সমাজকে সমীহ করেছেন।

কমল চরিত্রটিকে কখনো মনে হয়েছে আমার নিজস্ব সত্ত্বা আবার তার মূহুর্মূহু সমাজকে, মানুষকে ভাঙতে যেয়ে মানুষকেই দুঃখ দেবার প্রবণতা দেখে মনে হয়েছে এতে তো লোকে দুঃখই পাচ্ছে, নিয়ম সংস্কার যুগপৎ না হলে ঝেড়ে ফেলা উচিত তবে মানুষকে দুঃখ দিয়ে তো তা আমি করতে পারিনা।মানুষই তো সভ্যতার মূলে, মানুষই তো আমার প্রার্থনাগৃহ। তাকে তো বেদনা দিতে পারিনা। তবে আমার এই ভাবের উত্তরও উপন্যাসে দেয়া হয়েছে, বলা হয়েছে,
‘সমস্ত বড় বিষয়ের জন্ম তো হাহাকারের মধ্যেই’
অর্থাৎ জন্মশব্দ পেতে হলে জন্ম দেবার ব্যথাও অনিবার্য।

কমলের বিভিন্নরূপের একটি তার নির্লিপ্ততা, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সত্যকে সহজরূপে গ্রহণ করবার সামর্থ্য, তার একটি উদ্ধৃতি দেই- ‘দুঃখ যে পাইনি তা বলিনে কিন্তু তাকেই জীবনের শেষ সত্য বলে মেনেও নিইনি। শিবনাথের যা দেবার ছিলো তিনি দিয়েছেন, আমার পাবার যা ছিল তা পেয়েছি। আনন্দের সেই ছোট ছোট ক্ষণগুলি মনের মধ্যে আমার মণি মাণিক্যের মত সঞ্চিত হয়ে আছে। নিষ্ফল চিত্তদাহে পুড়িয়ে তাদের ছাই করেও ফেলিনি, শুকনো ঝর্ণার নীচে গিয়ে ভিখে দাও বলে শূন্য দু’হাত পেতে দাঁড়িয়েও থাকিনি। তার ভালোবাসার আয়ু যখন ফুরলো তাকে শান্তমনেই বিদায় দিলাম। আক্ষেপ ও অভিযোগের ধোঁয়ায় আকাশ কালো করে তুলতে আমার প্রবৃত্তিই হলোনা।’

এই শেষ দুটি কথার মধ্য দিয়ে কমল চরিত্রটি একদম নিজস্ব হয়ে গেলো আমার। ভালোবাসা ফুরোলে শান্তমনে বিদায় দিতে পারা যে কতবড় কাজ তা আজকের দিনে ভেঙে যাওয়া সম্পর্কগুলোর দিকে তাকালেই বুঝতে পারি।
বিয়ে না করেও যে দৃঢ় বন্ধন কমল খুঁজে পেয়েছিলো তা যদি শিবনাথ না পেয়ে থাকে তো সেটা তার ব্যর্থতা তাই বলে কমল তাকে ছোটো করেনি।
যাকে একদিনও ভালোবাসা যায় তাকে যে কোনোদিন, কোনোভাবেই, কোনো পরিস্থিতিতেই ছোটো করা যায়না এই সত্যটিই প্রায় মরতে বসেছে একালে।

কমল প্রসঙ্গে হরেন্দ্র বলেছিলো -
‘কমলের দেয়া খাবার খাওয়া যায় কিন্তু তা হজম করা যায়না’।
সম্পূর্ণ বিপরীত আদর্শের হওয়া স্বত্তেও আশুবাবু হরেন্দ্র এবং শেষমেশ অক্ষয়ও যে কমলকে শ্রদ্ধা করতো এ কমলের আশ্চর্য চরিত্রবলেই।

কমল বলেছে-
‘ভয়ানক মজবুত করার লোভে অমন নিরেট নিশ্ছির করে বাড়ি গাঁথতে চেয়োনা।ওতে মড়ার কবর তৈরি হবে,জ্যান্ত মানুষের শোবার ঘর হবেনা।’

অকপটে তার শৈশবের স্মৃতি, জন্মবৃত্তান্ত বলে গেছেন যা সমাজের কাছে অগ্রহণযোগ্য। উনি দেখিয়েছেন সমাজের কোথায় অসুখ, গভীর অসুখ।

‘লোকে এইটিই বুঝতে পারেনা যে প্রচলিত সমাজ বিধি লঙ্ঘন করার দুঃখ শুধু চরিত্র বল ও বিবেক বুদ্ধির জোরেই সহা যায়। মানুষে বাইরের অন্যায়টাই দেখে, অন্তরের প্রেরণার খবর রাখেনা। এইখানেই যত দ্বন্দ্ব, যত বিরোধের সৃষ্টি।’

এই যে মাত্র দুটি লাইনে সমাজকে এত নগ্নভাবে প্রকাশ করা যায় তাতো কেবল কমলই বলেই পারলো। এই শক্ত, স্বচ্ছ,সংযমী, ভয়ানক আত্মমর্যাদাবান কমলই আবার মমতাময়ী মাতার মতো দুদিনের পরিচয়ে রাজেনকে গৃহে স্থান দিয়েছিলো কোনোকিছু না ভেবেই।আবার সেই রাজেনের করুণ মৃত্যু সংবাদ শুনে বললেন-

‘দুঃখ কিসের? সে বৈকুন্ঠে গেছে, হরেন্দ্রকে উদ্দেশ্য করিয়া কহিল কাঁদবেন না হরেনবাবু, অজ্ঞানের বলি চিরদিন এমনি করেই আদায় হয়।’

যদিও এই সংবাদে তিনিই সবচেয়ে বেশি দুঃখ পেয়েছিলেন তথাপি এইরূপ তার সংযম, আত্ম আদর্শের প্রতি সমর্পণ, শ্রদ্ধা এবং তা প্রতিষ্ঠার স্পৃহা। এইভাবে উপন্যাসের শেষে শোকাচ্ছন স্তব্ধ নীরবতার মধ্যে অজিতেকে নিয়ে কমলের প্রস্থান।

পুরো উপন্যাস জুড়েই কমলের আশ্চর্য অনভিপ্রেত সব কথা, সিদ্ধান্ত, আচরণের প্রতিফলন দেখা যায় শেষটাতেও, অজিতের সাথে তার এই প্রস্থান এত টাই আকস্মিক যে কমল পুরো উপন্যাস জুড়েই হোঁচট খাওয়ালেও এই হোঁচটটা বেশ শক্তপোক্ত লাগে। তবে এমন আশ্চর্য সম্পর্কেও কমল তার নিজ বৈশিষ্ট্যগুনে চিরন্তন সত্য বলে মানেননি। যখন আশুবাবু বলেন-
‘কমল আদর্শ, আইডিয়াল শুধু দু’চারজনের জন্যেই তাই তার দাম তাকে সাধারণ্যে টেনে আনলে সে হয় পাগলামি, তার শুভ ঘুচে যায় তার ভার হয় দুঃসহ।’

তখন কমল উত্তর দেয়, ‘যে দুঃখকে ভয় করচেন কাকাবাবু তারই ভেতর দিয়ে আবার তারচেয়েও বড় আদর্শ জন্মলাভ করবে, আবার তারও যেদিন কাজ শেষ হবে সেই মৃতদেহের সার থেকে তার চেয়েও মহত্তর আদর্শের সৃষ্টি হবে। এমনি করেই সংসারে শুভ শুভতরের পায়ে আত্মবিসর্জন দিয়ে আপন ঋণ শোধ করে। এই তো মানুষের মুক্তির পথ।’

এইভাবে এই শক্তিশালী নারী চরিত্রের প্রস্থান এই উপন্যাসে অথচ আমার হৃদয়ে, আমার দুঃসময়ে স্মরণ করবার দেবীরূপ হয়ে তিনি থেকে গেলেন। পাঠকের হৃদয়ে জীবনে একবারও কমল হয়ে উঠতে পারার গোপন ইচ্ছার বীজ বপন করে তিনি চলে গেলেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড