• রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

নিশীতা মিতুর তিনটি কবিতা

আমিই রৌদ্রোজ্জ্বল নতুন সকাল

  নিশীতা মিতু

০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:১১
কবিতা
ছবি : প্রতীকী

আমার পরিচয়

মাঝে মাঝে নিজের পরিচয় খুঁজতে গিয়ে আমি বেশ ভাবুক হয়ে উঠি,
কে আমি, পরিচয়টা ঠিক কিভাবে দেয়া উচিত? 
আমি পিতার চোখে ধরণীর শ্রেষ্ঠ দুহিতা; সহজ, সরল, অমায়িক।

মায়ের দৃষ্টিতে আমি বোধহয় ঝর্ণার জলের মতন স্বচ্ছ!
প্রেমিকা হিসেবে হয়তো প্রেমিকের কাছে আমি বেশ রহস্যময়,
অজানায় ভরপুর এক জটিল উপন্যাস।
নিজের পরিচয় নিয়ে আমি নিজেই গুলিয়ে যাই ভেবে ভেবে,
আমি আসলে কেমন, আমার বৈশিষ্ট্যই বা কী?
সমাজের দৃষ্টিতে আমি একজন বাঙালি মেয়ে বা নারী,
যে প্রতিনিয়ত ডিঙিয়ে পার হয় ছোট বড় সামাজিক বাঁধাগুলো।

অথচ আমি তো সেই মানুষ হতে চেয়েছি,
নির্ভয়ে প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলা যার প্রাপ্য অধিকার।
খুব ভেবে আমি আবিষ্কার করি আমার নিজেকে,
আমি বোধহয় একজন সাধারণ বাঙালি রমণী।
অভিধান অনুসারে একজন সুন্দরী নারী কিংবা পত্নী,
বেঁচে থাকা অর্থে যে, সুখ, দুঃখ এবং একরাশ স্বপ্নের মিলিত গল্প।

আমি কখনো স্বচ্ছ, কখনো জটিল, কখনোবা বেশ হিংসুটে,
আমি নারী, আমি রমণী, আমিই শক্তি ধরে রাখি হাতের মুঠে।
আমাকে আবিষ্কার করতে গিয়ে বারংবার থেমে যায় মহাকাল,
আমি রাত্রির মতন আঁধার, আমিই রৌদ্রজ্জ্বল নতুন সকাল।


সময়ের খেলা

ছোট্ট শহরে একটাই মসজিদ, অদূরেই একটা সস্তা হোটেল বাতায়ন;
ক্রোশ খানেক দূরে মন্দির আছে, পাশেই শহরের মিলনায়তন।

মসজিদে আজান হচ্ছে, মুয়াজ্জিন ডাকছে সব মুসল্লিকে,
শক্ত হাতগুলো থেকে নিজেকে ছাড়তে পারছেনা মেয়েটা, চেহারা তার ভীষণ ফিকে!

ওদিকে দেবীকে ডাকছে পূজারী, মন্দিরের ঘন্টা বাজে টং টং টং...
এদিকে মেয়েটাকে বলছে একজন, চুপ থাক মাতাড়ি, করিস না বেশি ঢঙ!

সস্তা হোটেলের বদ্ধ কামরা, হারাচ্ছে মেয়েটা সতীচ্ছেদ;
মিলনায়তনে বক্তৃতা দিচ্ছে অতিথি, নারী পুরুষে রবে না আর বিচ্ছেদ!

গ্রামের পুবের ঘরটায় শোকের মাতম, মেয়েকে তুলে নিয়ে গেছে,
এদিকে মোনাজাতে কাঁদছে ইমাম, সকলের আত্মশুদ্ধি চলছে!

নারী জাগরণের অনুষ্ঠান চলছে, প্রধান অতিথিকে করছে বরণ,
মেয়েটা চিৎকার করে কাঁদছে, হচ্ছে ভীষণ রক্তক্ষরণ!

নামাজ শেষ, পূজা শেষ, হয়ে গেছে শেষ অনুষ্ঠান...
মেয়েটা চিৎকার করে বলতে চাইছে, ভাই আমারে বাঁচান!

পরের নামাজে আসছে মানুষ, আসছে নতুন পূজায়,
পরের পশু এসে মেয়েটার পুরোটা দেহে খোঁচায়!

ইমাম বলে নবীদের কথা, পুরোহিত বলে রাম,
ওদিকে মেয়েটার শরীর ভিজে যায়, বিন্দু বিদু রক্ত-ঘাম!

অনুষ্ঠানে আজ শপথ হয়েছে, আঁচড় লাগবে না কোনো নারীর গায়ে,
ওদিকে মেয়েটার দেহ পুড়ে যায়, সদ্য ফেলা উষ্ণ চায়ে!

শেষ উক্তি ছিলো মেয়েটার, ‘হারামজাদা তোদের জন্ম দিয়েছে কোনো না কোনো নারী’
মেয়েটা মরেছে, বাবা মা কেঁদে বলে, মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়াই ভুল হয়েছিলো তোর ভারি।


সবুজ বাতি

তোমার নামের পাশের সবুজ বাতি নেভার আগে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি, 
এমনটা তো হয়নি কখনো তাই না?
আমি জেগে থাকি। 
খুব ঘুম পেলেও জেগে থাকি। 
ঘুমে কাতর হলেও জেগে থাকি। 
জেগে থাকি ততক্ষণ অবধি যতক্ষণ না তোমার নামের পাশের সবুজ বাতিটা না নেভে।

সবুজ বাতি নিভলো মানে তোমার চোখে রাজ্যের ঘুম। 
আমি কল্পনায় খানিকটা সময় তোমার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকি। 
তাকিয়েই থাকি! 
কি পবিত্র চাহনি! 
সারাদিনের ব্যস্ততা, কাজের চাপ, হাজারটা চিন্তার পর একটুখানি প্রশান্তি। 
চোখের কোণে জল জমলে আমি একটু আড়াল হই। 
কি জানি আবার, আমার চোখের জলে অমন পবিত্র ঘুম নষ্ট না হয়ে যায়!

অতটা ভালো ঘুম হয় না বলে আমি রাতে প্রায় ৩/৪ বার জেগে উঠি। 
জেগে উঠেই ইনবক্সে গিয়ে দেখি সব ঠিকঠাক আছে কিনা! 
ম্যাসেঞ্জারের আধুনিক নিয়মে দেখায় তুমি জেগে ছিলে ২/৩/৪ ঘণ্টা আগে। 
ব্যাপারটা যেন এমন যে ঘুম ভেঙ্গে আমি পাশ ফিরেই আলতো করে তোমার বাহু স্পর্শ করে দেখি, 
ঘুমিয়ে আছো তো!

সকালে ঘুম থেকে জেগেও প্রথম কাজ চেক করা,
কে জাগলো আগে, তুমি না আমি? 
এই প্রতিযোগিতায় অবশ্য আমিই জয়ী হই বেশিরভাগ সময়। 
তোমার ঘুম ভাঙলে ফেসবুকের নীল সাদা জগতে ১০/১৫ মিনিট ঢু মারো। 
তারপর আবার ঘণ্টাখানেক পর আসো। 
যেন ঘুম ভেঙ্গে চারপাশটা দেখে আবার আমায় নিয়ে আরেকটা স্বপ্ন দেখবে বলে আবার একটুখানি ঘুমনো!

তারপর সারাদিনের ব্যস্ততা,
আবার সেই রাত, আবার সবুজ বাতির জ্বলা নেভা আর আমার ভালোবাসা....

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড