• বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

বাংলা নাট্যের প্রবাদ পুরুষ সেলিম আল দীন

  শব্দনীল

১৮ আগস্ট ২০১৯, ০৮:৩১
ছবি
ছবি : বাংলার নাট্য কিংবদন্তি সেলিম আল দীন

হাজার বছরের বাঙলার নিজস্ব সংস্কৃতি শিকড় থেকে যিনি সন্ধান করে নাট্যরূপ দিয়েছেন তিনি সেলিম আল দীন। তিনি গ্রাম-বাঙলার পালা, জারি, যাত্রাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে বিস্ময়করভাবে নানা আঙ্গিকে তুলে এনেছেন। করেছেন সমকালীন বৈশ্বিক রুচিবোধের অনুকূলে উপস্থাপন। তিনি বিষয়বস্তু থেকে শুরু করে রচনারীতিসহ সামগ্রিকতায় বাঙালির বহমান রীতিকেই গ্রহণ করেছিলেন। আমরা তার প্রতিটি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করলেই দেখতে পাব আবহমান বাঙলার গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি।

সেলিম আল দীন নাট্যকার হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত হলেও তিনি সাহিত্য-শিল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রেখেছেন অবদান। তিনি নাটকের পাশাপাশি লিখেছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ। গবেষণা করেছেন মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে নাটকের ওপর। সেলিম আল দীনের প্রতিটি নাট্যের দিকে যদি তাকাই দেখতে পাব হাজার বছরের বাঙালি জীবনের চর্চিত জীবন ও সংস্কৃতি। তার নাট্য রচনায় প্রথম দিকে ইউরোপীয় ধ্যানধারণা এবং দ্বিতীয় দিকে বাঙালি সমাজের প্রতি গভীর টান সাদৃশ্য।

শকুন্তলা নাটকের নামকরণের মধ্যেই প্রাচীন বাঙালিত্বের গন্ধ রেখেছেন সেলিম আল দীন। তিনি শকুন্তলাকে ছাপিয়ে চিরায়ত করেছেন বাঙালি সংস্কৃতির প্রচার। অন্য দিকে বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যে চিরায়ত প্রবাদ আছে ‘বারো মাসে তের পার্বণ’। ‘বারো মাসে তের পার্বণ’র সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত ‘মেলা’। তিনি কিত্তনখোলা নাটকে বহমান বাঙলার সংস্কৃতির ‘মেলা’কে ধরে রচনা করেছেন। রচনা কৌশলেও হাজার বছরের বাঙলার সাহিত্য, শিল্প ও রচনারীতির কাছেই ফিরে যেতে চেয়েছেন। কিত্তনখোলা নাটকের শুরুতেই অষ্টাদশ শতকের বাঙলার জনপ্রিয় দেওয়ানা মদিনা পালার বন্দনার নিরীখে বন্দনা করেছেন। এতে আবহমান বাঙলায় বিদ্যমান পরিবেশনা রীতির সুস্পষ্ট রূপ ফুটে ওঠে:

পূর্বেতে এই কিসসা কইছে অনেক মহাজন
সেই কিসসা কইবাম আমি সত্য ভাবি মন।
এই কিসসা আইচ আছে–রইব ভবিষ্যতে
নানা ছন্দে নানা রীতি রইব নানা মতে।
তবে যে গুন্থিলাম আমি করিয়া জোগাড়
দোষ ত্রুটি থাকে যদি ক্ষেমিও আমার।

সেলিম আল দীন বিভিন্ন নাটকে উপস্থাপন করেছেন হাজার বছরের গ্রাম্য সংস্কৃতির ঐতিহ্য বোধ-বুদ্ধি ও ভাষার মাধ্যমে নিপুণ করে। তিনি নাটকে রেখেছেন- টিনের বাঁশির হুইসেল, বায়োস্কোপ, যাত্রার প্যান্ডেল, কাককাড়ুয়া, চটের বেড়া, চুড়ির পসরা, কবিগান, খেলনার দোকান, ঔষধ বিক্রেতা, পটচিত্র, বয়াতি, নকশা করা পিঠা ইত্যাদি। যা গ্রাম্য বাঙলার সংস্কৃতিতে স্থান দখল করে রেখেছে হাজার বছর ধরে।

শুধু তাই নয়, নাটকের চরিত্রগুলোর নামকরণেও রেখেছেন একই ধারা। কেরামত, অধর, আকিন, শরমালি, দশরথ, সায়েবালি, আজমত, সোনাই, বছির, ছমির আলী, সুবল ঘোষ, ইদু, মংলা, শামছল, রুস্তম, ছায়ারঞ্জন, কেরামত, অখিলদ্দি, ছবর, জালু, মির্জা, অধর, আকিন, শরমালি, দশরথ, সায়েবালি, আজমত, খালেক, মোহাদ্দেস, ডালিমন প্রভৃতি চরিত্র বর্তমানের বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে নিয়মিত বসবাসরত মানুষের ব্যক্ত রূপ ও নাম।

আমরা যদি ‘কেরামতমঙ্গল’ নাটকের দিকে তাকাই তবে দেখতে পাব কেরামতের জীবন প্রবাহের মধ্য দিয়ে এ নাটকটিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে সমাজ, সভ্যতা ও বাস্তবতাকে। এতে আছে হাজংদের আন্দোলন এবং বাঙলায় ধর্মীয় আগ্রাসনের চিত্র। 

‘কেরামতমঙ্গল’ নাটকের শুরুতেই কেরামত কাকতাড়ুয়া বানাতে বানাতে বলে:
‘মলকা বানুর দেশেরে। বিয়ার বাদ্য আল্লা বাজে রে। কাককাড়ুয়ার সাথে কথা কিরে বেডা মলকা বানুর দেশে যাবি না আমাগো মুগ খেতে খারায়া খারায়া পক্ষী তাড়াবি। হে হে হে। আইচ্ছা থাইক তরে আগে মুন মিয়ার হাজ পোশাক দিয়া নুই।’

কেরামতমঙ্গল নাটকটিতে তিনি গ্রামীণ খাদ্যের নাম উল্লেখ করেছেন। মুড়ি, কোঁচ, হুকা, হাস্তর কওয়া, গাজন, জিওল মাছের ঝোল, কদমা, মহরমের গান, পাকা শরবি কলা ইত্যাদি যা বাঙলার চিরায়ত সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

সমুদ্র উপকূলবর্তী আঞ্চলিক মানুষের জীবনচিত্র নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন নাটক ‘হাত হদাই’। এ নাটকে বাঙলার আঞ্চলিক জীবন প্রস্ফুটিত। এ নাটকের চরিত্র মোদু ও আনার ভারির কথোপকথনে ভিন্ন ভাষার মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। সেলিম আল দীনের কথানাট্যরীতির আরেকটি নিরীক্ষাধর্মী ‘যৈবতী কন্যার মন’।

এ নাটকেও তিনি ঔপনিবেশিক সাহিত্যধারাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যধারাকে বিকশিত করার কাজে লিপ্ত হন। বাংলা নন্দনতাত্ত্বিক শিল্পরীতিও এ নাট্যে প্রায়োগিক আখ্যানে একীভূত করেন। এ নাটকের প্রতিটি বর্ণনা-কথোপকথনের মধ্যে বাঙালি সমাজ- সভ্যতার চিত্র দারুণভাবে তুলে ধরেছেন। বর্ণনাত্মক ধারা বাঙালির মধ্যযুগে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। এ নাটকে ভিন্ন কালের বাঙালি নারীজীবনের যন্ত্রণাকে বেঁধেছেন তিনি একই পুঁথির মালাতে।

বাংলা নাট্যের এই প্রবাদ পুরুষ ১৯৪৯ সালের আজকের দিনে (১৮ আগস্ট) তিনি ফেনীর সোনাগাজী থানার সেনেরখিল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড