• শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

প্রবন্ধ

বর্তমান বিশ্বের কবিতা

  গিরীশ গৈরিক

০৯ জুলাই ২০১৯, ১৫:২৫
প্রবন্ধ
ছবি : বর্তমান বিশ্বের কবিতা

বর্তমান বিশ্বের কবিতা পূর্বের কবিতা কিংবা প্রাচীন কবিতা থেকে উৎকর্ষ বা মননঋদ্ধ কিনা, এ সকল প্রশ্ন- কাব্য পরিক্রমায় একদম অপ্রাসঙ্গিক। কেননা সময় বিচারে কখনো কবি ও কবিতা ছোট-বড় হয় না। কবি ও কবিতা প্রত্যেক সময়েই বর্তমান, সেটা হতে পারে অতীত বর্তমান, ভবিষ্যত বর্তমান, কিংবা চিরকালীন বর্তমান। অর্থাৎ প্রত্যেক সময়ই সেই সময়ের বর্তমান ছিল। যেমন চিরকালীন বর্তমান ভারতীয় মহাকাব্য ‘রামায়ণ-মহাভারত’, লাতিন মহাকাব্য ‘ঈনিড’ (Aeneid), ফরাসি মহাকাব্য ‘ক্যানজোন দ্য রোলান্ড’ (Chanson de Roland)আইসল্যান্ডের মহাকাব্য ‘সেইমুন্ডের এডডা’ (Saemund’s Edda), স্পেনের মহাকাব্য ‘এল ক্যানটার ডি মিও কিড’ ((El Canter di mio cid), জার্মানির মহাকাব্য ‘নিবেলুঙ্গেনলাইড’ (Orlando Furioso), ইতালীয় মহাকাব্য ‘ওরল্যান্ডো ফিউরিয়োসো’ (Orlando Furioso), পর্তুগীজ মহাকাব্য ‘ওস লুসিয়াডাস’ (Os Lusiadas), ইংল্যান্ডের মহাকাব্য ‘প্যারাডাইজ লস্ট’ (Paradise Lost), আমেরিকান মহাকাব্য ‘দি কলাম্বিয়াড’ (The Columbiad)’, পারস্যের মহাকাব্য ‘শাহানামা’ (Shah-Nameh)। এ সকল মহাকাব্য আরো কতকাল ভবিষ্যত বর্তমানকে অতিক্রম করবে তা আমাদের জানা নেই।

কবিতা প্রায় মানুষের সমবয়সী। আমরা যখন প্রায় মানুষ অথবা প্রাক-মানুষ ছিলাম তখন আমাদের কবিতা কেমন ছিল- তা সবকিছু নির্ভর করতো আমাদের মস্তিষ্কের চিন্তা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বুদ্ধি, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার বিবর্তনের ওপর এবং একই সঙ্গে জড়িত থাকতো সমাজ ও ভাষা, হাত ও হাতিয়ারের ব্যবহার। অবশ্য ওই সকল কবিতা ছিল মৌখিক ও প্রচলিত--স্মৃতি ও শ্রুতির স্রোতে প্রবাহিত। এ-কথা বলতে কোন কুণ্ঠাবোধ নেই যে, এ সকল হাজার হাজার বছরের চিন্তা ও শিল্পধারা এইসব মহাকাব্যের জন্ম দিয়েছিল যা আজও বর্তমান।

খ্রিস্টপূর্ব ২৩০০ সালে বিশ্বের প্রথম লিখিত কবিতার (আজ অবধি পাওয়া) কবি এনহেদুয়ানার (Enhedunna) কবিতা থেকে বর্তমান বিশ্বের কবিতা বিশ্লেষণ করলে আমরা বিস্তর প্রভেদ পাবো। কিন্তু আমরা একটি জায়গায় এক হবো--সেটা হল কাব্যশিল্প গুণ। যদিও আমরা আজ যাকে কবিতা বলছি পূর্বে তার নাম ঢঙ শরীর ছন্দ ভাষা ব্যবহার প্রভৃতি বিষয়-আশয় ভিন্ন থেকে ভিন্নতর ছিল। স্বাভাবিকভাবে যদি আমরা বিশ্ব কবিতার ১৫০ বছরের ইতিহাস দেখি। তাহলে আমরা দেখব- কবিতায় অনেক ইজমের ব্যবহার হয়েছে। আর প্রত্যেকটি ইজম এক একটি ইজম থেকে স্বতন্ত্র। তাদের মধ্যে অন্যতম ইমজ হল- অস্তিত্ববাদ, ইমপ্রেশনিজম, অ্যাবসার্ডইজম, কলাকৈবল্যবাদ, কিউবিজম, ক্লাসিসিজম, রোমান্টিসিজম, চিত্রকল্পবাদ, ডাডাবাদ, পরাবাস্তববাদ, প্রতীকবাদ, ফিউচারিজম, বাস্তববাদ, মরমিয়াবাদ ইত্যাদি। অবশ্য শেষ বিচারে কবিতাকে কোন ইজম দ্বারা অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব নয়। কবিতার ইজম একটি ধারণা বা ধারা মাত্র।

এখন তাহলে বর্তমান বিশ্বের কবিতা কোন ইজম দ্বারা অন্তর্ভুক্ত। সে ক্ষেত্রে অল্প বিস্তর ভেবেচিন্তে বলা যায় পোস্টমর্ডাননিজম। পোস্টমর্ডানিজম নিয়ে অনেক কাব্যরসিক, পাঠক, সমালোচক, কবি ও লেখকদের মধ্যে অনেক বাদানুবাদ আছে। পোস্টমডার্নিজম বা উত্তরাধুনিকতা সৃষ্টি হয়েছে আধুনিকতাকে উত্তরণের মধ্য দিয়ে। এটা কোন বিভেদ অথবা প্রতিদ্বান্দ্বিকতা নয়, কিংবা কোন প্রকার হেরে যাওয়া বা জিতে যাওয়া অথবা ভেঙে ফেলার বিষয়ও নয়, উত্তরাধুনিকতা শুধুমাত্র একটি ধারার প্রতিফলন ও প্রতিতুলনা। কারণ সকল শিল্পই সময়ের শর্তাধীন এবং সে কাব্য ইতিহাস থেকে ভেদের শনাক্তকরণ থেকে অভেদের সন্ধানে ব্রত। শিল্পের উদ্ভূত ধারণা, লেটেস্ট চাহিদা, আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশার সাথে সঙ্গতি রেখে মানবতা ও হোমোসাপিয়ান্সকে উপস্থাপন করে যে কোন সময়ের কবিতা। এখানে কোন প্রকার ইজম নিয়ে আলোচনায় যেতে চাই না।

বর্তমান বিশ্ব একটি মিশ্র সমাজ ব্যবস্থার অধীনে প্রচলিত। গ্লোবালাইজেশনের কারণে পৃথিবী একটি গ্রাম হয়ে গেছে। বিভিন্ন প্রকার ইন্টারনেট, গুগল, ইয়াহু ও সার্চ ইঞ্জিনের কল্যাণে প্রত্যেকেই ঘরে বসে আরেক ভাষায় শিল্প, ধ্যান, ধারণা, জীবনরীতি, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, মানবিক মূল্যবোধ শেয়ার করতে পারে। আর এ কারণে প্রত্যেক ভাষা, দেশ ও জাতির কবিতা প্রায় একটি ভাবধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় অতি সহজে অনুবাদ হচ্ছে তাদের কবিতা।


আলোচনার স্বার্থে যদি ধরে নেওয়া হয়, সাম্প্রতিক গ্রিক কবিতা, তাহলে আমরা দেখব বর্তমান বাংলা ভাষাসহ বিশ্বের অন্যান্য ভাষার কবিতার সাথে তার কতো মিল।


‘মুখ ঘোরাও, অন্য গালটিকে খুলতে দাও
বহুকাল ধরেই সে দীপ্তিময়
পাহাড়ের কালো নগ্নতা, গভীর নদী-উপত্যকা
ছায়াগুলি উপভোগ করে, আলোর বিপরীতে পশুরা
সাম্যতা নির্মাণ করে, মানুষ দুঃখ করে আর নগ্নতা লুকায়...’
(গ্রীক কবিতা, অনুবাদ: রুদ্র কিংশুক, কবি : থানসসিস হাটজোপৌলুস)

২ 
‘তোমার বয়স থেকে লিঙ্গ কেটে
সাগর থেকে গভীরতা তুলে আনা হল
তুমি যখন হাতির পিঠে নামিয়ে আনলে চাঁদ
তোমার নামে সভ্যতারা জয়ধ্বনি দিল।’
(বাংলা কবিতা : কবি : ওবায়েদ আকাশ)

৩ 
‘আমার দাদিমা বলেন:
রাতে তুমি যদি সাদা খাবার খাও
আগামিকাল মেঘেরা তোমায় সহচার্য দেবে;
তুমি যদি খাও হলুদ খাবার
সূর্য তোমাকে ছায়া দেবে;
তুমি যদি কিছুই না খাও
দিনের কোন রংই থাকবে না।’
(কলম্বিয়ান কবিতা : কবি- হুগো হেমিও জুজিবায়ো, অনুবাদ: চন্দন চৌধুরী)

৪ 
‘আমি ঐ স্বৈরাচারী সূর্যকে মুছে দেবো
তোমাকে করাবো স্নান আমার শরীরের বৃষ্টিতে
রাত্রির গোপনতায় তোমাকে করে তুলবো ঋজু ও নরম।
এবং সে তার জিভের ভেজা কাপড়ে মুছে দিল তার শরীর
নতুন প্রসূতি গাভী যেমন চেটে দেয় তার বাছুরকে
আর তার ফাটা মুখের ভেতর ভরে দিলো তার স্তন’
(ক্যারিবীয় কবিতা : কবি-- ডেভিড ডেভিডীন, অনুবাদ: খোন্দকার আশরাফ হোসেন)

উল্লিখিত চারজন কবির ভাষা, স্বদেশ ভিন্নতর এবং সকলেই নব্বইয়ের দশকের কবি। কিন্তু পরিমিত কাব্য বোধে একে অপরের প্রায় কাছাকাছি। তবে এ আলোচনায় একটি গোপন দুর্বলতা আছে। প্রথমত প্রত্যেকটি কবিতা বাংলা ভাষায় অনুবাদ; আর দ্বিতীয়ত, শুধুমাত্র চারজন কবি ও কবিতা দিয়ে সমগ্র বিশ্বে কবিতার উদাহরণ টেনে কথা বলা বোকামির শামিল। তবুও আমি বর্তমান বিশ্বের শত শত কবিতা পাঠের আলোকে বলছি যে, বর্তমান বিশ্বের কবিকুল প্রায় একসুতায় বাঁধা। প্রত্যেক ভাষার কবি একসূত্রে গাঁথা হলেও শিল্পের সম্ভাব্য অন্তর্ধানে তারা আবার স্বতন্ত্র। এর মূল কারণ প্রত্যেকের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্ব স্ব শিল্পেসাহিত্যের বিবর্তন। আপাতত দৃষ্টিতে বিষয়টি স্ববিরোধিতা মনে হলেও গভীর দৃষ্টি দিয়ে দেখলে বিষয়টি প্রায় একই মনে হবে। কেননা শিল্পের দ্বান্দ্বিকতা যে নিয়মে পরিবর্তনশীল, শিল্প ঠিক সে নিয়মেই পরিভ্রমণকারী।

বর্তমান বিশ্বের কবিতা এখন শুধু বাক্য বদলের খেলায় মত্ত নয়। একইসঙ্গে পূর্বের ধারা, ফর্ম, মেদ বহুল চিন্তা, যুক্তির প্রশ্রয়, একরৈখিক ক্রমঅগ্রসর, কেন্দ্রাভিগ, ক্লোজ এন্ডেড বিষয়, স্পেশালাইজেশান, অবিচ্ছিন্ন বোধ, গ্রান্ডন্যারোটিভ ও ব্যক্তি কেন্দ্রিকতাসহ অনেক বিষয়-আশয় থেকে মুক্তি দিয়েছে।

এ সময়ের কবিতা উদার। যে কোন বিষয় ও ভাবনা নিয়ে কবিতা হতে পারে। এর কোন ধরাবাঁধা নিয়মনীতির বালাই নেই। এ যেন প্রাচীন সংস্কৃত কবি ভমহ-এর সেই বিখ্যাত শ্লোক :

‘ন স শাব্দো ন তদ্বাচ্যং ন স ন্যায়ো ন বা কলা।
জায়তে যন্ন কাব্যাঙ্গাং অহো ভাবো মহান কবে:।’

অর্থাৎ এমন শব্দ নাই, এমন যুক্তি নাই, এমন অর্থ নাই, এমন কলা নাই, যা কাব্যের অঙ্গভূত হয় না।

আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় সংস্কৃতের কবি ভমহ-এর এই শ্লোকের ভিতর বর্তমান বিশ্বের কবিতার অন্তর্লোক অন্তর্নিমিত। অন্যদিকে এটাও সত্য যে কবিতার কাজ হল সকল সময় পাঠক চিত্তের সমস্ত ভাবনা ও চেতনাকে নাড়া দেওয়া। সাধারণত আমরা জানি ভাবনা ও চিত্র মিলে তৈরি হয় চিত্রকল্প। সেক্ষেত্রে পাঠক অধিকাংশ সময়ই ভুল পথে অগ্রসর হয়। যেমন--আল মাহমুদের অনেক কবিতা শুধু চিত্র আছে ভাবনা নেই:

‘তোমার হাতে ইচ্ছে করে খাওয়ার
কুরুলিয়ার পুরোনো কই ভাজা
কাউয়ার মতো মুন্সী বাড়ি দাওয়ায়
দেখবো বসে তোমায় ঘষা মাজা’
(তোমার হাত, সোনালী কাবিন)

এ বিষয়টি শুধু যে আল মাহমুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এমন নয়, সেটা রবি, নজরুল, শক্তি, শঙ্খ, বিনয়, উৎপল, সিকদারসহ বিশ্বের অনেক বড় বড় প্রথিতযশা কবির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আবার একই সঙ্গে তাদের কবিতায় ভাবনা আছে কোন চিত্র নেই। অর্থাৎ চিত্রকল্পহীন কবিতা। এখন আমরা চিত্রকল্প ছাড়া কবিতার কথা চিন্তা করতে পারি না। তবে অনেক কবি চিত্রকল্পকে অনেক ভাবে ভেবেছেন, যেমন ইয়েটসের ক্ষেত্রে ‘প্রতীকই কবিত্ব’, জীবনানন্দ দাশের ক্ষেত্রে ‘উপমাই কবিত্ব’, শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রে ‘প্রতীক-চিত্রকল্পই’ কবিত্ব, হুমায়ুন আজাদের ক্ষেত্রে ‘চিত্রকল্পই কবিত্ব’।

আমরা চিত্রকল্পকে যে কল্পই ধরি না কেন, অবশেষে তাকে কবিতা হয়ে উঠতে হবে। বর্তমান বিশ্বের কবিতা যে চিত্রকল্পের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ স্বজন তা বলা যাবে না। যেমন:

‘খারাপ সময়ের মধ্যে এক
এক অলৌকিক ঘটনা--
আমি বাড়িতে ছিলাম না
যখন ডাক পিয়ন এসেছিল।
আজ প্রথম ফুল ফুটেছে
আমি বলছি এটা একটি নিদর্শন।
আমি চারদিক তাকাচ্ছি: আমি একা
আমি কান্না করছি এই ছায়া’
(পর্তুগালের কবি: আনা পাউলা ইনাসিও, অনুবাদ: চন্দন চৌধুরী)

এই কবিতাটি শুধু ভাবনাই উপস্থাপন করে। পাঠককে ভাল কোন চিত্র দেয় না। সুতরাং এটি কোন চিত্রকল্পবাহী কবিতা নয়।

এমন দুর্বলতাসহ বিভিন্ন দুর্বলতা বর্তমান বিশ্বের কবিতায় আছে। তবে আশার কথা হল বর্তমান বিশ্বের কবিতা ভাষা ব্যবহারে ইন্দ্রজালিক। গ্যেটের একটি মন্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে ‘মানুষ যতটা ভাষাকে, ভাষা তার চেয়ে অনেক বেশি- মানুষকে তৈরি করে।’ ভাষা সবকিছুকে যুক্তি ও কল্পনা দ্বারা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও স্বতন্ত্র ভাবধারায় প্রসূত করে। তবে কবিতার ভাষায় থাকা চাই প্রতিতুলনাজাত অলঙ্কার, শব্দ ব্যবহারে উপমা রূপক উৎপ্রেক্ষা ও অভিনব চিত্রকল্প এবং ছন্দ ও ধ্বনি ব্যবহার স্বকীয়তা।

বিশ্বসাহিত্যে ও কাব্যে একসময় যে সকল ভাষা ও দেশ পশ্চাৎপদ ছিল তারা এখন অসম্ভব সফল গতিতে এগিয়ে এসেছে। আবার কোন কোন দেশ ও ভাষার কবিতা বর্তমানে পূর্বের প্রতিনিধিত্বশীল দেশ যেমন ফ্রান্স, রাশিয়া, ব্রিটেনের থেকেও অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। তাদের মধ্যে অন্যতম আফ্রিকা, কলম্বিয়া, নেদারল্যান্ডস, আইসল্যান্ড, চিলি, ক্রোয়েশিয়ার ভাষা ও কাব্যসাহিত্য। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে পিছিয়ে আছে আমি তা বলবো না। বাংলাদেশের কবিতার দুর্বলতা হল বিদেশী ভাষায় অনুবাদের পশ্চাৎপদতা। যা কিনা আমাদের কবিতাকে বিশ্বসাহিত্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে বাধাগ্রস্ত করছে। যেমন বিশ্বসাহিত্য যে সকল কবি ও উপন্যাসিক নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন, তার সাহিত্য ও কাব্যগুণ সমহার করলে আমাদের জীবননান্দ, বিনয়, বিভূতি, মানিক, তারাশঙ্করসহ অনেকে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা রাখে। কিন্তু ঐ যে বললাম অনুবাদের দুর্বলতা।

বাংলা ভাষাসহ বিশ্ব কবিতায় তিরিশের দশক একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসম্ভাবনার জন্মদাতা দশক। আমাদের পঞ্চপা-বদের মতো সমগ্র বিশ্বেও অনেক মহাপা-বকে জন্ম দিয়েছে তিরিশের দশক। তখন জন্ম হয়েছে সুররিয়ালিজম, ফিউচারিজম, কিউবিজমের মতো অনেক ইজমের। কিন্তু তারপর গত হতে চলছে প্রায় শতাব্দিকাল। ততদিন সাহিত্যের সুবর্ণরেখা পাড়ি দিয়েছে এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে, এভাবে ক্রমচলমান স্টেশন থেকে স্টেশনে। কিন্তু এর শেষ কোথায়। এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর নেই। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ আরো অনেক যুদ্ধ এ যাত্রাকে সাময়িক বিঘ্নিত করলেও আবার যোগ করেছে নতুন মাত্রা। বর্তমানে এ ধরনের দুই একটা ছোটখাট যুদ্ধ থাকলেও আরেকটি যুদ্ধ আছে, সেটা হলো স্নায়ু ও অর্থনৈতিক যুদ্ধ এবং এর সাথে যোগ হয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি; যার কারণে বর্তমান বিশ্বের কবিতাও ধাবিত সেই দিকে। বিজ্ঞানমনষ্ক কবিতা এখন লেখা হচ্ছে ভূরি ভূরি- যা পূর্বে তেমন কোন উল্লেখযোগ্যভাবে দেখা যায় নাই। বিজ্ঞানমনষ্ক কবিতা কবিকে অন্য যা কিছু দিক তবে তাঁর শিল্প জীবনকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রত্যেক কবির একটি শিল্প জীবন যাপন দরকার, নাহলে সে শিল্পের উন্নত শিখরে পৌঁছাতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, লোরকা, বোদলেয়ায়, র্যাঁবো, জীবনানন্দ, বিনয়, মধুসূদন, কীটস, দান্তে, সারভানটিস, মোপসাঁ, পল গগ্যাঁ, ভ্যাঁস: ভ্যানগঘের মতো মহৎ শিল্পীদের চরম শিল্পবান্ধব জীবন ছিল। তাই তাঁরা মহৎ শিল্পকর্ম সৃষ্টি করতে পেরেছেন।

বর্তমানে আমরা বিভিন্ন ক্রাইটেরিয়ায় পূর্বের বড় বড় কবি ও শিল্পীদের খারিজ করলেও ঘুরেফিরে আবার তাঁরা জায়গা দখল করে নেয়। এর মূল কারণ আমাদের কুয়াশাচ্ছন্ন ভাষা (ঋড়মমু ষধহমঁধমব), আলোচক ও সমালোচকদের মৃত কবিদের নিয়ে নাড়াচাড়া করা এবং মিডিয়ার ভাঁড়ামি। এতে করে বিলম্বিত হয় সময়ের কবিদের অনুধাবন করা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড