• বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২০, ১৯ চৈত্র ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

প্রবন্ধ : বিশ্বাস

  মনসুর সাদাত

২২ মার্চ ২০২০, ১৫:১৭
প্রবন্ধ
একদিকে অধার্মিক অপরদিকে ধার্মিক (ছবি : প্রতীকী)

আধুনিক বিশ্বে বিজ্ঞানের জয়গান। প্রত্যেকযুগে ধর্ম ছিল। ধর্মের দরকার আছে বহুলাংশে।কেননা ধর্ম মনকে পবিত্র রাখে। কিন্তু আজকাল দেখা যায় কেউ কেউ ধর্মের অপব্যাখা করে সমাজ, জাতিকে ধোকা দিচ্ছে। একদিকে অধার্মিক অপরদিকে ধার্মিক। কেউ বলছে ইশ্বর নেই, কেউ বলছে আমার ধর্ম সঠিক। একদল বলে মানুষ আগে অন্যদল বলে ধর্ম। তাদের যুক্তিতর্কের অন্ত নেই। যুক্তির মারপ্যাচে মানুষ দিশেহারা। আমি একান্ত ভাবেই একেশ্বরবাদী ইশ্বরে বিশ্বাসী। কোনো ধর্মকে বড় করে দেখা আমার কাজ নয়। ছোট বেলায় আমি আমার ধর্মকে নিয়ে অনেক ভাবতাম। একমাত্র আমার ধর্মই ঠিক। অন্য ধর্ম মাত্র ভুল। পৃথিবীর নব্বই শতাংশ লোক তাই ভাবে আপনার ধর্মই সত্যি বাকি সব মিথ্যা। সময়, পরিবেশও অবস্থা আমাকে ভাবায় আসলে সমাজে প্রচলিত ধর্মের আরেক নাম বিকৃত রাজনীতি। বাপদাদা যা যা করছে হুবহ তাই করাটাই নাকি ধর্ম। আমি মানতে পারতাম না। আমি জানি ইশ্বরকে পেতে হলে ধর্মকে মানতে হবেই, তা কোনো কাজের কথা নয়। এটা এক ধরনের চুঙ্গিবাজি। সরাসরি বসের সাথে আলাপ করতে চান, তাই বলে কি বসের চামশার হাতে টাকা গুজে দেবেন? যদি দেন সেটা ত ফেয়ার না। Its not fair.যে সৃষ্টি করছে সৃষ্টিকে যেন পৃথক সেই করেছে! ইশ্বর আছে কি নাই এটা নিয়ে কোনো কথা বলতে রাজি নই। তবে আজ আমি বিশ্বাস নিয়ে কথা বলব। কেননা প্রত্যেক ধর্মের মুল ভিত্তি হল বিশ্বাস। বিশ্বাসের সংগা না বুঝেই না জেনেই অনেকে একে বিকৃত করে ফেলছে কিংবা নিজের মত সংগা দিয়ে ফায়দা লুটছে। 

মানুষকে নিজের দিকে টানছে। বিশ্বাস হল অবচেতন মনে ঘটা ঘটনার উপর ভরসা করে তার চেতন মনের প্রতিফলন। এটা কতটা সত্য বা মিথ্যা তা ব্যক্তির উপর নির্ভর করে। বিশ্বাস যেমন সত্য নয় তেমনি মিথ্যাও নয়। পৃথিবীর কোনো বিষয় বস্তু পরম সত্য নয়। বিজ্ঞান দিয়ে সব সত্যের উদঘাটন সম্ভব নয়,তেমনি যুক্তি দিয়েও অসম্ভব।সাহিত্য যেমন কিছু সত্য লুকিয়ে রাখে তেমন করে ধর্ম কিছু সত্য আড়াল করে প্রকাশ পায়। যেখানে ধর্ম আটকে বিজ্ঞান সেখানে উত্তর দেয়। আবার সাহিত্য আটকে গেলে ধর্ম তার ব্যাখা দিয়ে আলোকিত করে। এটা একটা চক্র। তবে এরা সবাই টিকে থাকে মানুষের বিশ্বাসে। মানুষ যেহেতু বুদ্ধিমান তাই কাহিনি টা এখানেই হয়। ধর্মে বিশ্বাস থাকলেও বিশ্বাসে ধর্মের অস্তিত্ব বিলীন। বিশ্বাস মাত্রই সত্য বা মিথ্যা তা বলা যায় না, উপায় ও নাই। 

আমার আব্বু মারা যাওয়ার তিনদিন আগে আমগাছের ডালে একটা পাখি বসত মাগরিবের আজানের সময়। কেমন বিদঘুটে ডাক তার!আম্মু শুনত পাখির ডাক। এ ডাক তাকে ভাবাতো? পাখিটাকে কখন দেখা যেত না। আম্মু ভেবেই নিয়েছিল কেউ একজন মারা যাবে এটা তার দৃঢ় বিশ্বাস। তারপর আব্বু মারা গেলে সেই পাখিটা আর ডালে বসে নি,ডাকেনি। আপনি এর ব্যাখা কী দিবেন? যারা একে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করবেন তাদের বলব এটা বিজ্ঞানকে বলুন,ধর্মকে প্রশ্ন করুন! আম্মুর বিশ্বাস টা এক-দুই দিনে অর্জন হয়নি। অবচেতন মনের ঘটনা তাকে চেতন মনে ফল দিয়েছে। ঠিক তাই বিশ্বাস বাপদাদার সম্পত্তি নয়,যে উত্তরাধিকার সুত্রে পাবেন। এটা অর্জন করতে হয়। বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এটা ঘটার আগে কাউকে বল্লে বা একটু এদিক হলেই মিথ্যা হবে। আপনি ভাবছেন ক্লাশে উত্তরে আপনার বন্ধু এই কথাটা বলবেই! আপনি বিশ্বাস করছেন এটা বলবেই একশো পারসেন্ট।যখন এটা কাউকে বলার পর বা আগে ভাবলেন হয় কি না হয়! এই চিন্তা আপনাকে বিশ্বাস থেকে সরিয়ে আনবে এবং দেখবেন তা আর বলেনি আপনার বন্ধু। তাই বিশ্বাস যার সত্য তার কাছেই। আপনার বিশ্বাস অন্যের ঘাড়ে কখনো চাপাবেন না।

এখন কথা হল অবচেতন মন কি? মনের তিনটে অবস্থা চেতন, অবচেতন, অচেতন। ইংরেজিতে কনসাস, সাব-কনশাস, আনকনশাস। চেতন মন হল বুঝে শুনে ভেবে চিন্তা করার অবস্থা। অচেতন হল চেতনের বিপরীত। অবচেতন হল দুটার মাঝামাঝি অবস্থা। না চেতন না অচেতন। ধরুন বিছানায় শুয়ে আছেন ভাবছেন এটা করবেন ওটা করবেন এটা চেতন মন। আবার পুরোদস্তুর ঘুমে আচ্ছন্ন হলেন এটা হল অচেতন মন। এখন ঘুমের ঘোরে হাটলেন, অনেক কিছু করলেন, ঘুম থেকে উঠতেই মা কথাটা বল্লে, আপনি কিছুই জানেন না বল্লেন। এটা হল অবচেতন মন। ভাবুন আপনার মনের কোন অবস্থাকে আঘাত করা হয়েছে। আফিম খেয়ে মাতাল হয়ে আপনি অনেক কিছু করতে পারেন, আর এখানেই ধর্মের অবস্থান। ঘোরের মত। নেশা ছাড়লেই পগারপার। লোকে একে সত্য বলেই মেনে নেয়। প্রত্যেক ধর্মের ধার্মিকরা এটা করে থাকে।

সেদিন মামা বাড়ি বেড়াতে গেছি, জুমা বার। মামারা নামাজে গেছে। মামি নামাজে যেতে বল্ল। আমি যাব না বলে দিলাম।

কেন?

আমি বিশ্বাস করি না বলাতে অনেকগুলো লেকচার শুনিয়ে প্রমাণ করতে চাইল, ইশ্বর আছে, ধর্ম ঠিক। আমিও তেনাকে বিশ্বাস কি বোঝালাম। তিনি রাগ হয়ে বল্লেন বিধর্মী হয়ে যাচ্ছ দিনদিন। তোমার আব্বু মারা গেল ক'দিন আগে,খেয়াল নাই। পৃথিবীর ভারি অদ্ভুত নিয়ম সবাই ইমোশন, দূর্বলতাকে আঘাত করে কাবু করতে চায়। আমি সহজে কাবু হবার পাত্র নই। খিদে লাগছে।

ভাত এনে দিয়ে গল্প শুরু করলেন। আপাতত ধর্মের কথা বাদ দিলেন।

মামি বিশ্বাস করত যেদিন তিনি এশার নামাজ না পরে ঘুমাতে যান সে রাতে শয়তান ধোকা দেয়। আজেবাজে স্বপ্ন দেখে এবং তা ফলে যায়। আমি হা হয়ে তেনার কথা শুনছিলাম। বল্লাম তাইলে তো আপনি আব্বুকে মেরে ফেল্লেন, হাহাহা।

আমি সিরিয়াস।

এটা কি আপনি বিলিভ করেন?

হ্যা,দৃঢ় বিশ্বাস। এটা সত্য এবং ঘটবেই।

না এটা মিথ্যা। কই আমার সাথে তো ঘটে না এমনকি মামার সাথেও না। আমি এটা বিশ্বাস করি না।

এটা মিথ্যা নয়।এটা ঘটে বিশ্বাস কর।

আপনি যদি আমাকে বলেন এটা আমি কি বিশ্বাস করব? বিশ্বাস করলে কি এটা সত্য? হ্যাঁ, সত্য তবে সেটা আপনার কাছে আমার কাছে নয়।মামি কথা বাড়াল না।

খাও এই সময় খেতে হয় বেশি বেশি।

এগুলো হল আসল বিশ্বাস। এখানে ধর্ম নাই, বিজ্ঞান নাই, যুক্তি নাই। আপনার বিশ্বাসই সত্য। আমার কাছে তা সত্য না হতেও পারে। মনে রাখবেন সবকিছু আপেক্ষিক। কোনো কিছুই একেবারে সত্য নয়। তাই বিশ্বাস নামক বস্তু কারো কাধে চাপাবেন না। যে ধার্মিক তাকে তাই হতে দিন আর যে ইশ্বরে বিশ্বাস করে না তাকে তাই করতে দিন। আপনার অধিকার নাই তাকে এসব বিশ্বাস করানোর। করালেন তো তা রাজনীতি হল। কেননা তাকে আপনার দলে ভিড়ানোর ধান্দা করলেন।

আপনি যা করেন তাই সত্যি 

লোকে যা বলে তা রাজনীতি।


সত্য কয় প্রকার? মিথ্যা কয় প্রকার? জ্ঞানের প্রকারভেদ কী? উত্তর দিতে পারবেন? সত্য কেন সত্য বলতে পারবেন না! বিশ্বাসের ও প্রকার নেই, ধরন নেই। সত্য সত্যই, মিথ্যা মিথ্যাই, তেমন ভাবে বিশ্বাস বিশ্বাসই। এদের প্রকার ভেদ করতে গেলেন তো বোকা বনে গেলেন। বাংলাদেশের একদল লেখক বিশ্বাসের প্রকারভেদ করে বলেন এটা দুই প্রকার-

প্রমাণ নিয়ে বিশ্বাস ও প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস। প্রমাণ নিয়ে বিশ্বাস নাকি চুক্তির বিশ্বাস। হাহাহা

যেখানে বিশ্বাসেরই প্রমাণ নাই সেখানে বিশ্বাসের প্রকারভেদ কতোখানি আহাম্মকি তা আল্লাহ মালুম।

উনারা বলেছেন প্রমানের ভিত্তিতে বিশ্বাস নাকি টেম্পোরারি, সময় বাদে পাল্টায়। এটা দুর্বল মানে স্বাস্থ্য সম্মত নয়। বলে রাখা দরকার বিশ্বাস যদি পাল্টায় তবে সেটা কেমনে বিশ্বাস হয়?

সে যাই হোক উনার সাথে তর্কের খাতিরে কথাগুলো পর্যালোচনা করা যাক। আমি যদি হারি বা জিতি সেটা কোনো কথা না। কথা হল লোকে কিছু জানতে পারবে।

উনারা টলেমির, সূর্য ও পৃথিবীর রহস্য সূত্রের কথা তুলে এনে বলেছেন ২৫০বছর মানুষ এই সূত্র বিশ্বাস করে এসেছে। এখন আমার কথা হল উনাদেরকে বলেছে এটা লোকে বিশ্বাস করেছে?এটা লোকে মেনে নিয়েছে! বিশ্বাস আর মেনে নেয়া এক নয়। আমি যদি কাউকে বলি এটা সত্য, বিশ্বাস কর সে কি বিশ্বাস করবে? বলবে ঠিক আছে, মেনে নিলাম। আর যদি বলেই থাকে, হোক বিশ্বাস করলাম!আদৌ কী বিশ্বাস করতে পেরেছে?

লোকের মাঝে কী প্রচলিত আছে তা টেনে এনে বিশ্বাস কে বিকৃত করা কেউ চায় না। আমি অবাক হয়ে যাই কতটা নিচু স্তরের চিন্তা ভাবনা করলে মানুষকে অন্ধ করে ফায়দা লোটা যায়! লোকের মাঝে কী প্রচলিত আছে তা কি কেবলই বিশ্বাস? এটা হতে পারে বিশ্বাস, হতে পারে প্রথা, নিয়ম এমনকি মেনে নেয়ার প্রবনতা। বিজ্ঞান সদা পরিবর্তন শীল এবং এর নিজের উপরই বিশ্বাস নাই এ রকম কথা উনারা বলে। সুরা বাকারার ২নং আয়াতে বলা আছে ‘এটা তাদের যারা বিশ্বাস করে’ এখানেই প্রমান হল কোরান সত্য? যারা অবিশ্বাসী তাদের জন্য কোরান কিন্তু মিথ্যা হতে পারে। কেননা বিশ্বাসের এই দিক টা উপস্থিত। বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে ইশ্বরের নাই? ধার্মিকেরা ইশ্বরকে আবদ্ধ করেছে কয়েকটা বইয়ের পাতায়। 

কাউকে ধর্ষণ করে, বিজ্ঞান দিয়ে প্রমান করতে বলেন ধর্ষকের শাস্তি হোক? কতটা ফালতু খোঁড়া যুক্তি। যদি বলি ধর্ষক যে ধর্ষন করেছে ধর্ম দিয়ে প্রমান করুন, পারবেন? লোকে বলবে What a silly question? তাহলে উনাদের প্রশ্ন কী সিলি নয়?

ধর্ষন সমাজে কেন হয় কে করে? গবেষণা বলছে মানুষের মনুষ্যত্ব লোপ না পাওয়া পর্যন্ত কেউ ধর্ষণ করে না। আপনি যখন অপরাধ করে ফেলেন তারপর যখন মনে পরে এটা অপরাধ, ভাবেন কেন করলেন! আপনার যেকোনো কাজ অবচেতন মনে করে ফেল্লে পাপ আপনাকে গ্রাস করবে। একজন মাতাল, মনুষ্যত্ব বিহীন লোক যখন খারাপ কাজ করে পরে ভাবে এটা খারাপ। তাহলে ভাবুন ধর্মগুলোর কি অবস্হা। অবচেতন মনে ধর্ম পালন করতে হবে। তাইলে ধর্ষক তো আপনি।

প্রমানবিহীন বিশ্বাস। উনার কথায় এটাই আসল বিশ্বাস। এখানে কোনো সন্দেহ নেই।আমি কেন বাপকে বাপ, ভাইকে ভাই বোনকে বোন বলি? কেন জানতে চাইনি বাপের ঔরসজাত কিনা? শুনে এসেছি বলেই ডেকেছি। এই কথা বলেই প্রমান হল আমরা প্রমানছাড়া বিশ্বাসে বিশ্বাসি।বাঙালিও পারে বটে? কথা হল বিজ্ঞানের দারস্থ হন DNAবলে দেবে কে ভাই আর কে বাপ! পাশের বাড়ির রহিম চাচার মেয়েকে আপনার মা নিজের মেয়ের মত করে লালন পালন করে, বড় করছে। কোনদিন প্রশ্ন তোলেননি।আপনার বড় ভাই তাকে আপু ডেকেছে ত আপনিও ডেকেছেন নাকি? কেননা আপনি শুনে শুনে বিশ্বাস করে নিয়েছেন সে আপনার বোন। এই বিশ্বাস আপনার আছে সে আপনার বোন। একদিন শুনলেন সে আপন বোন না পালিত তখন কি বিশ্বাস থাকবে, মেনে নিতে পারবেন? লেখকের মতে এই বিশ্বাস টা আসল এবং সত্য এখন কী সত্য বলে মানবেন? সন্দেহ কী সৃষ্টি হবে না? বিশ্বাস নামক বস্তু আদৌ থাকল?

খোঁড়া যুক্তি উপস্থাপন করে নিজের দিকে টানা বা ভেড়ার পালের মত দলে ভেড়ানো বাদ দিন। আমি কাউকে বলবোনা এদিকে আমার দিকে এসো। যথেষ্ট বয়স হয়েছে লোকের। ইমোশন,অবচেতন মনে আপনি অনেক কিছু করতে পারেন একান্ত আপনার ব্যাপার।মনে রাখবেন

আপনি যা করেন তাই সত্যি 

লোকে যা বলে তা রাজনীতি।

নিশ্চয় আপনি পঁচা রাজনীতি করবেন না।

লোকে সত্য নেবে কি রাজনীতি করবে তারা করতে পারে।

আরও পড়ুন : রফিক আজাদ : এক দুঃখী প্রজন্মের কবি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড