• শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

প্রবন্ধ

বাবাকে মনে পড়ছে

  মজিদ মাহমুদ

১৬ জানুয়ারি ২০২০, ১০:৩৫
প্রচ্ছদ
ছবি : আমার বাবা বড় শক্ত ধাতের মানুষ ছিলেন (প্রতীকী)

কখন আমার বাবা আমার কাছে প্রতিভাত হয়ে উঠেছিলেন, তা ঠিক মনে নেই। সংসারে একজন মানুষ বাবা; তার একচ্ছত্র আধিপত্য, সবাই তাকে মান্য করে চলে; আর এর মাধ্যমেই হয়তো আমাদের প্রাতিষ্ঠানিকতা ও সংঘবদ্ধতার ধারণা গড়ে ওঠে; সমাজ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর শৃঙ্খলার মধ্যে আমরা নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়ার ধারণাটি গড়ে নিতে পারি। সংসারে আমরা পিতাকে দেখেছি পরমপুরুষ, সৌম্যদর্শন, ন্যায়পরায়ণ ও স্পষ্টভাষী হিসাবে। বাবা চরিত্রটি আমার কাছে একই সঙ্গে বাস্তব ও মেটাফর; অধরা ও রহস্যময় চিরকাল। বাবা হলেন পৃথিবীতে মানুষের গমনের পথ। কোনো এক পরমপিতার ধারণা আদিকাল থেকে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে আশ্রয় পেয়েছে; যিনি জগত পিতার মর্যাদায় আসীন। এই ধারণাকে কেন্দ্র করেই আমাদের সকল প্রতিষ্ঠানের সূত্র। তার প্রথম বাস্তবতা পরিবার। 

পরিবার হলো সমাজ-রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম ইউনিট। পিতার ধারণাই পরিবারের ধারণা; আর পরিবারের চূড়ান্ত রূপ হলো রাষ্ট্র। পরিবার না থাকলে সমাজ ও রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকে না। যদিও মাতৃতান্ত্রিক পরিবারের কথা নৃতাত্ত্বিকগণ বলে থাকেন, তবু আমাদের পরিচিত সমাজের ইতিহাসে তার বাস্তবতা লক্ষ করা যায় না; এমনকি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোতে, যেখানের মাতৃতন্ত্রের বন্ধন রয়েছে সেখানেও পুরুষের প্রাধান্য স্পষ্ট। একজন শিশুর চেতনা বিকাশের সাথে দেখা যায়, পরিবারের মধ্যে একজন মানুষ, সবচেয়ে বলশালী ও কর্তৃত্বপরায়ণ এবং সবাই তাকে মান্য করে চলছে। এই আনুগত্যের ধারণাটিই সমাজ রাষ্ট্র কিংবা প্রতিষ্ঠানসমূহ কাজে লাগায়। পূর্বে কৃষিভিত্তিক সমাজে এই ধারণা ও নিয়ন্ত্রণ ছিল আরও ব্যাপক ও গভীর। সেখানে কেবল বাবা নয়, বাবার বাবা বেঁচে থাকলে তার নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব থাকতো সর্বাধিক; অর্থাৎ কৃষিভিত্তিক সমাজে পরিবারটিই ছিল মূলত একটি ইন্ডাস্ট্রি; আর বাবা বা দাদা থাকতেন এই ইন্ডাস্ট্রির মালিক মূলত। তবে এটি ছিল একটি বিশ্বস্ত, মধুর ও সবচেয়ে টেকসই প্রতিষ্ঠান। পিতার কঠোরতাই যে আমাদের তার থেকে বিযুক্ত করেছে তা নয়; তার পরম স্নেহে আমাদের কাছে টেনেছে।

পিতা আমার কাছে যেভাবে বেঁচে আছেন তা স্মৃতির সমষ্টি ছাড়া কিছু নয়। ভাবতে চেয়েছি, কখন থেকে তাকে প্রথম মনে করতে পারি; খুব শৈশবে, তখনো আমার স্মৃতি পুরোপুরি সংগঠিত হয়নি, কোনো একদিন কোথাও যাওয়ার কালে একজন লোক আমার কপালে হাত রেখে শরীরের তাপ পরীক্ষা করলেন, নাড়ি টিপে রক্তের চলাচল পরীক্ষা করলেন, একটু কাছে টেনে নিলেন; এটি যদিও নতুন কিছু ছিল না, প্রতিদিনই হয়তো আমি তার সান্নিধ্যে ছিলাম; তবু সেদিনই আমার মনে একটি ভাবের উদয় হলো- এই লোকটি কেন আমাকে এত ভালোবাসেন, আমার জন্য কোথায় যেন তার একটি মায়া পড়ে আছে। 

আমাদের বেড়ে ওঠার সময়টি ছিল কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ জীবনের প্রায় শেষপাদ; আজকে নগর জীবনে পিতাদের দায়িত্বের চেয়ে তার মাত্রা ছিল ভিন্নতর। আজ যে সব শিশু একটি বদ্ধ ঘরের মধ্যে বেড়ে উঠছে, পিতামাতা উভয় চাকরি করছে- সেখানে মা ও পিতার দায়িত্বের মধ্যে তেমন পার্থক্য থাকছে না; শিশুর পরিচর্যা পিতা-মাতা উভয়কে সমানভাবে ভাগ করে নিতে হচ্ছে; স্কুলে নেয়া, পাঠদান, খাওয়ানো- এখন মায়ের পাশাপাশি পিতাদেরও করতে হয়। কিন্তু আমাদের সময়ে পিতার প্রধান কাজ ছিল, খাদ্যসংগ্রহ, নিরাপত্তা বিধান; ফলে পিতার আদর অবারিত থাকলে শাসন ছিল কঠোর; তার নিয়মের ব্যত্যয় করা আমাদের জন্য ছিল অসম্ভব; আর সেটি আমাদের মধ্যে নিয়মনিষ্ঠা ব্যক্তিত্বের জন্ম দিয়েছিল বলে মনে হয়। আমার পিতা আমাদের কখনো শারীরিক প্রহার করেননি বটে, কিন্তু কোনো কারণে তুমি থেকে তুই বললে যারপর নাই ভয় ও কষ্টের কারণ হতো।

মুক্তিযুদ্ধকালে আমার বয়স ছিল বছর পাঁচেকের মতো। বড় ভাইয়েরা ভারত থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছিলেন। আমাদের বাড়িতে স্থানীয় পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের একটি ক্যাম্প ছিল। তার অনেক টুকরো স্মৃতি এখনো মনে করতে পারি। যেমন রাইফেল, মেশিনগান, বেটাগানের স্মৃতি; কিভাবে পিন খুলে গ্রেনেড ছুঁড়তে হয় সেগুলোও আমরা দেখেছি; প্রশিক্ষণ কিংবা মিসফায়ারে পড়ে থাকে গুলির খোসাগুলো আমরা খেলার সরঞ্জাম হিসাবে জমিয়ে রাখতাম; যদিও পরে তা দামে বিক্রি হয়েছে। এ সব দিনগুলোতে পিতাকে কেমন বিষণ্ণ ও অস্থির দেখেছি; তখনই তার বয়স ষাট পেরিয়ে গেছে; ব্রিটিশ বিরোধী পাকিস্তান আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল; অথচ তারই সন্তানেরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই করছে; নিঃসন্দেহে তার একটি কষ্ট ও দ্বন্দ্ব ছিল; আবার প্রত্যক্ষ সমর্থন না থাকলে তার সন্তানেরা কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে সশরীরে শরিক থাকতে পারে; নিজের বাড়ি ক্যাম্প হিসাবে ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু এ সময়ের যে স্মৃতিটি এখনো আমাকে তাড়িত করে তার অন্যতম: যেদিন পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা আমাদের গ্রামটি জ্বালিয়ে দিল, সেদিন আমরা গ্রাম থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে নদীর ধারে পালিয়ে গিয়েছিলাম। প্রতিটি নারী পুরুষ সেখান থেকে লক্ষ করলেন তাদের জীবনে তিল-তিল করে গড়ে তোলা তাদের বাড়িটি হানাদার বাহিনির লাগিয়ে দেয়া লেলিহান শিখায় ভস্মীভূত হয়ে যাচ্ছে। যখন আগুন আমাদের বাড়ির ঘরের চালা বেয়ে পাশের তালগাছের উপরে উঠে গেল তখন বাবা দুহাতে চোখ ঢেকে হুহু করে কেঁদে উঠলেন; অথচ যে মানুষটিকে কখনো আমরা ভেঙ্গে পড়তে দেখিনি, কারো কষ্টে ও বিপদে সর্বাগ্রে ছুটে গেছেন, সান্ত¦না দিচ্ছেন; সেই মানুষের কান্না এখনো আমার পিতার প্রতিমূর্তি হয়ে স্বাধীনতার স্মৃতি নিয়ে এখনো জেগে আছে।

আমার জীবনে চরিত্র গঠনে পিতার ভূমিকা ছিল ব্যাপক ও গভীর; সাহস, সত্যবাদিতা, নিঃস্বার্থ চিন্তা ও পরোপকারিতার ধারণার কিছুটা পেয়েছি আমার পিতার কাছে থেকে। আমরা যে গ্রামে বাস করেছি সেটি ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকা, এখনো তার পরিবর্তন খুব কমই হয়েছে, জোর যার মুল্লুক তার- এই জঙ্গলের নীতি এখনো সেখানে বলবৎ; তবু দেখেছি আমার পিতার সাহস ও যুক্তিবাদিতাকে যে কোনো বিচার-শালিশিতে মান্য করা হচ্ছে। আমার কবিতা-সাহিত্যের পিতাচরিত্রের প্রতিফলন রয়েছে। আজ থেকে প্রায় তেত্রিশ বছর আগে, আমি তখন কেবলই এসএসসি পাস করেছি, সে সময়ে আমার বাবাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলাম; কবিতাটি এখনো পাঠক মহলে সমান জনপ্রিয়; এটি আমার ‘বল উপাখ্যান’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কবিতাটি এখানে উদ্ধৃত করছি; কারণ আমার পিতাকে বোঝার জন্য এরচেয়ে যথার্থ আর কোনো বাক্যবন্ধ রচনা করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

বাবা 

আমার বাবা বড় শক্ত ধাতের মানুষ ছিলেন
পাঞ্জাবিটার বোতাম খুললে অবাক হয়ে দেখেছি ওই শরীর
কখন বাবা উদোম করেন শরীর
যখন আমার বাবা তিনি শ্বেত-শ্মশ্রু কান্তিমান বৃদ্ধ তখন
সারাক্ষণই দ্রব থাকেন অদৃশ্যের নাম জিগিরে
ভয় বলে আর হয় না বলে শব্দ দু’টি অজানা তার চিরদিনের
মোগল রাজের শেষ সীমানায় পা রেখেছেন 
ইংরেজের রেজিমেন্টে নাম লিখেছেন
ভারত ভাঙার আন্দোলনে সামনে ছিলেন 
বাংলাদেশের স্বপ্ন সে যে তারচে আর
বেশি করে কে দেখেছেন
বাবা বড় শক্ত ধাতের মানুষ ছিলেন 
মা বলে সে নরম ছিল
পিঠের পরে কাল গোখরার খড়ম ছিল
আমার মা’র কাছে সে নরম ছিল
হানাদারের আঘাত সয়ে ভাইয়া যখন চলে গেলেন
বাড়ির সবাই কাল-বোশেখি ঝড়ের মতো
দমকা দমকা মূর্ছাহত
বাবা তখন আদর করে ভাইয়ার গালে চুমু খেলেন
কত দিনই ঝড় বয়েছে 
ঘর ভেঙেছে
উতাল করা ঝড়ের মুখে আমরা তখন হাবুডুবু
দিকভ্রান্ত নাবিক তখন দক্ষপেশী হাল ধরেছে
মুচকি হেসে বলতো খোকা ভয়টা কিরে?
জীবনটা যে অজানারে মৃত্যু ছাড়া
মৃত্যু দিয়েই জীবনটাকে জয় করা যায়
আজো যখন ঝড়ের মুখে উড়তে থাকি
ভাসতে থাকি প্রচলিত স্রোতের সুখে
প্রতিবাদে দাঁড়াইনিকো
বলি আমার শক্তি কোথায়?
হঠাৎ তখন মনে পড়ে শ্বেতশ্মশ্রু কান্তিমান বৃদ্ধটাকে
সন্দ জাগে তিনি আমার পিতা কিনা
না কোন এক কাপুরুষের জারজ আমি
তা না হলে প্রতিবাদে হয় না মুখর 
আদায় করে নেয় না কেন ন্যায্য হিস্যা।

এছাড়া আমার জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থের বাবার সংগ্রাম ও তার জীবনে পদ্মায় সতের বার বাড়িভাঙ্গার প্রসঙ্গটি এসেছে। ‘ধনীনন্দন জনক মনসা-মঙ্গলের চাঁদ সওদাগর/ সতেরবার পদ্মায় ভেঙ্গেছে বসত তাই বিত্তহীন লোক/ আর আমি আজ নামগোত্রহীন অখ্যাত অনিকেত যুবক/ ক্ষুধা ও অজন্মার ভয়ে মানুষের অনুগ্রহ করেছি ধার।’
তাছাড়া ‘ধাত্রীক্লিনিকের জন্ম’ পিতাকে নিয়ে একটি কবিতা রচনা করেছিলাম। সেটিও এখানে উদ্ধৃত করলাম।

পিতা

পিতা হওয়া কি কোনো কষ্টের কাজ?
মাংসের গিরিপথ দিয়ে মানুষের সন্তানেরা বের হয়ে আসতে চায়
ওসব বেয়াদব বাচ্চারা বের হয়ে গেলেই তো বাবার ভালো
বাবা কিছুটা স্বস্তি পায়
নির্ঝঞ্ঝাট কিছুক্ষণ কাজ-কর্ম করতে পারে
তবু বাবা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে-
তার নাবালক বাচ্চারা যে অজানা সুরঙ্গ-পথে বের হয়ে গেল
তারা ঠিক মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলো তো
সেই অজানা পথের পাশে গভীর উদ্বেগে অপেক্ষা করে বাবা
সেই সরু সুরঙ্গের মধ্যে শিশুরা ছাড়া তো কেউ যেতে পারে না
কেবল পর্বতের গায়ে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে পিতা
বাবা জানে, এই সুরঙ্গে ঢোকা এবং বেরুনোর একটিই পথ
পরিত্যক্ত সন্তানের জন্য তার মন কাঁদে
যখন ফিরে আসে তখন আর পিতা সন্তানকে চিনতে পারে না
মনে করতে পারে না যাত্রাকালে কেমন ছিল তার আত্মজ
কি ছিল তার ভাষা
আবার শুরু হয় তাদের পরিচয় পালা
এ ভাবে অনন্ত অপেক্ষা তাদের হয় না শেষ
তাই পিতা ও পুত্র আজীবন কাছাকাছি থাকে।

আমি আমার কবি জীবনের শুরু থেকেই ভেবেছি বাংলা সাহিত্যে পিতাকে নিয়ে একটি কাব্যসংকলন করবো; সকল কিছু সঠিকভাবে হলেও এই প্রাণের কাজটি এখনো করে উঠতে পারিনি; ফলে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, গবেষক ও সুসাহিত্যিক মনোয়ার হোসেন জাহেদী পিতাকে নিয়ে যে আয়োজন করছেন, তার কর্মের মাহাত্ম্যে ছাত্র হিসাবে আমি কিছুটা দায়মুক্তি অনুভব করছি। সকল পিতার সূত্র ধরে পৃথিবীর জীবন চিরজীবী হোক।

আরও পড়ুন- আবেগ ও মননশীলতায় উজ্জীবিত কবি

ওডি/এসএন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড