• বুধবার, ২৭ মার্চ ২০১৯, ১৩ চৈত্র ১৪২৫  |   ২৫ °সে
  • বেটা ভার্সন

আমার চোখে মাহফুজ সিদ্দিকী হিমালয় (শেষ পর্ব)

হিমালয় ভাই’র ব্যক্তিগত জীবন বলতে কিছু নাই

  অধিকার ডেস্ক    ২২ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৮:৩৭

উপন্যাস প্রকাশন
ছবি : সম্পাদিত

একজন ব্যতিক্রমী মননের মানুষ মাহফুজ সিদ্দিকী হিমালয়। ব্যতিক্রমী তার লেখার ধারা। কেউ কেউ মনে করে তিনি বিচিত্র রঙের গল্পকার। কারও কাছে সুচিন্তিত সমালোচক, আবার কারও কাছে সূক্ষ্ম বিশ্লেষক। অনেকের কাছে অবশ্য তিনি বর্তমান সময়ের সেরা ক্রিকেট বোদ্ধা হিসেবে পরিচিত।  

সম্প্রতি তিনি পাঠক মহলে বেশ কৌতূহল সৃষ্টি করেছেন ‘নামহীন দামহীন’ শীর্ষক বিশ্ব ব্যতিক্রমী এক আত্মজীবনীর মাধ্যমে। আসলে কেমন মানুষ হিমালয়? কাছের মানুষদের চোখে তার ব্যক্তিত্ব কেমন? ব্যতিক্রমী চিন্তার এই মানুষটিকে নিয়ে লিখেছেন তার সঙ্গে কিংবা আশেপাশে থাকা কিছু নিকটবর্তী মানুষ। তাদের বলা কথাগুলো নিয়েই ‘উপন্যাস প্রকাশন’ এর উদ্যোগে ‘দৈনিক অধিকার’ এর ধারাবাহিক আয়োজন, ‘আমার চোখে মাহফুজ সিদ্দিকী হিমালয়'।  

আজ প্রকাশিত হচ্ছে ধারাবাহিক এ আয়জনের সর্বশেষ পর্ব। এ পর্বে লেখক হিমালয়কে নিয়ে লিখেছেন- বদরুন্নেসা কলেজের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস। 

‘আমার চোখে অমুক’ শীর্ষক লেখাগুলো লেখা হয় মৃত বোদ্ধাদের জন্মশতবার্ষিকীতে। হিমালয় ভাইয়ের ঈর্ষণীয় সৌভাগ্য(!) জীবদ্দশায়ই হিমালয় ভাই সেগুলো দেখে যেতে পারছেন! 

২০১৫ এর নভেম্বর মাসে অন্যরকম গ্রুপের একটা ইন্টার্নশিপ এর জন্য আমি অন্যরকম গ্রুপে যাই। তখন রিটেন পরীক্ষার পরের স্টেপ ছিল ১৯, ২৩, ৭৯, ১১৩ এরকম পৃষ্ঠার আত্মজীবনী লিখতে হবে। আমি খুবই লাকি যে আমাকে ১৯ পৃষ্ঠা লিখতে হয়েছে; আমার পরে যারা ইন্টার্নের জন্য গিয়েছে তারা কেউ ৭৯ পৃষ্ঠার নীচে লিখে নাই। বায়োগ্রাফী লিখে টিকে গেলাম, পদ হলো মানব গবেষক! সম্মান প্রথম বর্ষে পড়া একটা স্টুডেন্টকে মানব গবেষক পদে বসিয়ে দেয়া হয়েছে! ঐ সময় এরকম আরও অনেক নবীশ কিংবা ড্রপ আউট স্টুডেন্ট এক একজন এরকম ভারী ভারী পদ নিয়ে বসে আছে। টিম রকমারি তখনো নতুন নতুন, টেপ টেনিস বলে খেলছে। একদিন শুনলাম টিম রকমারি থেকে আরেকজন নবীশ গিয়ে সাকিব আল হাসানেরও ইন্টারভিউ নিয়ে এসেছে। 

হিমালয় ভাইয়ের অনেক চমৎকার দিক আছে, শুধু রিক্রুটমেন্ট প্রসেস নিয়ে লিখলেই একটা বই লিখে ফেলা যাবে। এতকিছুর মধ্যে শুধু গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক নিয়ে যদি বলতে হয় তাহলে বলবো  হিমালয় ভাই যাদের দিয়ে কাজ করেন তারা পুরোপুরি এমেচার। এমেচার বলতে আমি ফ্রেশার বলছি না, পুরোপুরি নবীশ পর্যায়ের। এমেচারদের দিয়ে সিরিয়াস সব কাজ করানো ব্যাপারটা অত হালকা শোনালেও এটা কী রকম রিস্কি এটা ঠিক কাজে না নামলে বলে বোঝানো যাবে না; অনেকটা শূন্যে ইনভেস্ট করার মত। 

হিমালয়

মাহফুজ সিদ্দিকী হিমালয়

 

আমি কখনো ইন্টারভিউ নিই নাই, আমাকে কোনো ডিরেকশনও দেওয়া হতো না, কোন ওয়ার্কশপও না, অথচ মানব গবেষকের পরে আমি ইন্টারভিউয়ার হিসেবে কাজ করেছি বহু দিন। ওভাবেই আমি যেতাম এন্ট্রপ্রিনিউর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বুয়েটের শিক্ষক, সায়েন্স ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীদের ইন্টারভিউ নিতে। 

আমার জড়তা কাজ করতো, আমি প্রপারলি ইন্টারভিউ নিতেও পারতাম না কিন্তু হিমালয় ভাই কোনদিনের জন্য শংকা-সংকোচবোধ করে নাই আমাকে পাঠাতে। ভাইয়ার বিশ্বাস, কাজ কাউকে শেখানো যায় না; যার কাজ করার আগ্রহ আছে, তার জন্য ইচ্ছা আর গুগলের এভেইলেবিলিটিই যথেষ্ট!

আমি হয়তো ঝরে গিয়েছি, কিন্তু এই এমেচারদের মধ্যে যারা এখন হেঁটে অনেক দূর চলে গিয়েছে এবং যাবে তাদের গল্প অন্য সময়ের জন্য তোলা রইলো।  

আগের পর্ব পড়তে : ভাইয়ার কাজকর্ম বেশ স্বাধীনচেতা ঘরানার

যে কোনো মানুষের ব্যাপারে ফার্স্ট ইম্প্রেশনটাই ঐ মানুষের প্রতি নির্মোহ বিশ্লেষণ। ভাইয়ার সাথে পরিচিত হবার পর ভাইয়ার যে কয়েকটা জিনিস খেয়াল করেছিলাম- স্বচ্ছতা, নির্লিপ্ত আচরণভঙ্গি, প্রজ্ঞা। এগুলো নিয়ে অন্যরা বলে ফেলেছে তাই আর বিস্তারিতে গেলাম না। হিমালয় ভাই’র ব্যক্তিগত জীবন বলতে কিছু নাই। ওয়াসিফা জান্নাত আপুর মতো বলতে হয় তিনি সবসময়ই মানুষকে রিসোর্স দিয়ে বেড়ান। 

প্রথম দিকে অফিসে একটা মজার ব্যাপার দেখেছিলাম- হিমালয় ভাইকে যদি কেউ তার ভালোর জন্য কিংবা ব্যাপক কল্যাণার্থেও কারও ব্যাপারে গোপনে বিচার দেয় কিংবা কোনো সমালোচনা গোপনে শেয়ার করে হিমালয় ভাই ঠিক তখনই তাকে ডেকে নিয়ে এসে দুজনকে সামনা সামনি জিজ্ঞেস করবে ‘এই তুমি নাকি আমার নামে এইটা বলছো?’ অপমানের চুড়ান্ত!

কাজ শুরুর পর প্রথম অনেক দিন পর্যন্ত আমি কোনো কাজ ছাড়াই প্রায় প্রায় অফিস যেতাম, আমার মতো আরও অনেকে যেত তাদের কাজে। আমার অফিস কেন্দ্রিক তেমন কাজ ছিল না, তবুও আমি যেতাম। ফার্স্ট ইয়ারে পড়তাম, মুগ্ধতা-কাজের উৎসাহ তাই চোখে-মুখে, তখনকার নির্মীয়মান মৌচাক ফ্লাইওভারের জ্যাম ঠেলে অফিস যেতাম প্রায়ই। 

হঠাৎ একদিন হিমালয় ভাই বলে বসলো- “এই তোমার বাসা তো দূরে, তুমি রোজ আসো কী করতে? হ্যাঁ, আর রেগুলার আইসো না”। হঠাৎ আক্রমণ ঠেকাতে এমন একটা ভাব করলাম যে “অনেক কাজ থাকে তো এইজন্য আসি, না আসতে পারলে বেঁচে যাই!” কিন্তু বলা হয় নাই, ঐ সময় কাজ করতে আমি কী আনন্দ পেতাম!

অফিসে ঢোকার কিছুদিন পরই হিমালয় ভাই দত্তক নিয়েছিলেন, আর দত্তক নেয়ার সাথে সাথে নতুন একটা নাম ‘শব্দ’। হিমালয় ভাইয়ের যাদের পরিচয় আছে তারা জানে হিমালয় ভাই অনেক মানুষকে নতুন নাম, পদবী কিংবা সংখ্যা দিয়েছেন, কিছু উদাহরণ দিই ছোট্টবন্ধু রুকন, উৎসব, সুপ্ত, শাহবাগীয় বুদ্ধিজীবি সাত্তার, ডেভিড, নভেম্বর, গফুর। অফিসের ভেতর সেই নাম ধরে না ডাকলে ১৭ টাকা জরিমানা হতো, জরিমানাটা জমা হতো ডেস্কের পেন হোল্ডারের ভেতর, সে এক উৎসবমুখর সময়। 

হিমালয় ভাইয়ের দত্তক পরিবারের সদস্য সংখ্যা অগণিত। তাঁর একাধিক দত্তক পুত্র সন্তান আছে, দত্তক কন্যা সম্ভবত আমি একা, ইভেন দত্তক বোন ও আছে! দত্তক পুত্রবধু আছে, যদিও তার বিয়ে হয় নাই, বিয়ে করলে তার হাজবেন্ড পাবে একটি দত্তক শ্বশুর! 

আমি হিমালয় ভাইয়ের তেমন প্রমিজিং কোনো কাজই করি নাই, বিশেষত ভাইয়ার শেষ দুইটা ইনকমপ্লিট ইন্টারভিউ দীর্ঘদিন ধরে আটকে রেখেছি, শেষ করি নাই। একবার শুনেছিলাম, হিমালয় ভাই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলো মেইন্টেইন করতে পারেন না। কিন্তু আমার সাথে হিমালয় ভাইয়ের সম্পর্ক অমলিন আছে শুধুমাত্র হিমালয় ভাইয়ের একক প্রচেষ্টায়! 

আমি ঝোঁকের কই, সম্পর্কের বহমানতা আমার মধ্যে নেই। শুধু একটা জায়গায় আমি হিমালয় ভাইকে ফিল করি, যখন আমার কোন পারিবারিক, মানসিক সমস্যা কিংবা টানাপোড়ন যেসব কথা আব্বু-আম্মুকেও বলা যাচ্ছে না তখন কেবলই মনে হয় ‘ভাইয়ার সাথে অনেক দিন দেখা হয় না!’ 

হিমালয় ভাই’র নামহীন-দামহীন পড়ার পর আমার মনে হয়েছিল এখন থেকে পাঁচ-সাত বছর পর ভাইয়া কি এই বই নিয়ে আফসোস করবে যে এইগুলা লেখা নিষ্প্রয়োজন ছিল?  কিন্তু এখন পর্যন্ত ভাইয়ার যে কনফিডেন্ট (প্রথম মুদ্রণ শেষ) তাতে আমার ধারণা মাঠে মারা পড়বে বলে আমার খারাপ লাগছে না। শুধু নামহীন বইটা না, হিমালয় ভাইয়ের ব্যতিক্রমী চিন্তাগুলো উদ্যোমী মানুষদের কাঁধে কাঁধে ভর করে ছড়িয়ে যাক পৃথিবী ব্যাপী... 
 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড