• শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৫ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

যেভাবে পরিচিত হই হুমায়ূন আহমেদের সাথে

  অলক চন্দ্র দাশ

১৩ নভেম্বর ২০১৯, ১৩:১১
ছবি
ছবি : বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির অন্যতম পথিকৃৎ হুমায়ূন আহমেদ

আমি মূলত এত বই পড়িনি। বই পড়ার অভ্যাসটি গড়ে তুলতে পারিনি। তবে পত্রিকা পড়ার অভ্যাসটি খুব বেশি ছিল। আমার বেশ কিছু বন্ধু  অ্যাকেডেমিক বই থেকে বিভিন্ন লেখকের বই খুব বেশি পড়েছে। এদের বই সংগ্রহের ধারে কাছেও আমি নেই! ওদের গোপন একটা প্রতিযোগিতা ছিল বই পড়ার।  কার চেয়ে কে বেশি পড়বে। কে বেশি জানবে, কার আগে কে আড্ডায় একটা নতুন গল্প শোনাবে। স্টলে বসেই আড্ডাটা বেশি জমতো আমাদের। তো আমি ওদের এক- দুটির অর্জিনাল নাম চেঞ্জ করে হিমু, মিছির আলী বলে ডাকতাম। আবির হিমুর চরিত্রের মতোই নিজেকে অনুভব করত, তাই তাকে হিমু ডাকতাম। সমুদ্রকে মিছির আলী ডাকতাম।

ওদের মুখে মুখে শুনে হিমু, মিছির আলী, নন্দিত নরক থেকে শুরু করে আরো অনেক গল্পই আমার জানা হয়ে যেত। আমাকে ওরা প্রায়ই বলত, এটা পড়। স্যারের বেস্ট লেখা। আমি বলতাম তোদের যে কারও পড়া শেষ হয়ে গেলে দিস তো বইটি। পড়ব, অবশ্যই পড়ব। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, আর পড়া হতো না আমার।

ওরাই এসে আড্ডায় আড্ডায় গল্পগুলো বলত। এরচেয়ে আরো বেশি জানা হতো যখন পকেট ছাড়া পাঞ্জাবি পরে বেড়াতো আবির। অদ্ভুত কিছু ভাবনার বিস্ফোরণ দেখে আমি কিছু জিজ্ঞেস করলে বলত, ‘হিমু পড়ো উত্তর পেয়ে যাবে।

আমি বুঝে নিতাম হিমু হয়তো এমন কোনো পোশাক পরত। বেশ কয়জনের মুখেও শুনেছি এমন। আচ্ছা, হিমু কি মূলত সন্ন্যাস? না পড়ে এত কিছু জানলে ভিত্তি মজবুত হবে না জ্ঞানের। নিজে পড়, অনুভব কর, প্রশ্ন নির্বাচন কর। এরপর গবেষণা সৃষ্টি হবে, স্থির হবে অজানা। জানার জন্য অন্তত, নিজেকেই উদ্যোগী হতে হয়। আমি চা খেতে খেতে হিমুকে একটু একটু কল্পনা করি। যতটুকু জানি এর বেশিদূর যেতে পারি না।

ঠিক করলাম, হিমু সিরিজ পড়ব আজ থেকেই। ওর কাছ থেকে গল্পের বইগুলো ধার নিলাম। আমার বই পড়তেই যত দিন তারিখ নির্ধারণ করতে হয়। তাড়াহুড়া করা এটা আমার বদ অভ্যাস। পরীক্ষার আগের রাতে পড়াশুনা করে পাশ করা ছাত্র আমি। এত আবেগে যে বইগুলো নিলাম, পড়ে শেষ করতে পারব তো? নাকি পাতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাব শুধু। এ রকম ফাঁকি দিয়েই তো বন্ধুদের ওভারটেক করতে পারিনি ক্লাসের রোল নম্বরে।

ওই আবেগ থাকতে থাকতেই, ছুটির দিনে পড়া শুরু করলাম। হিমু ছাড়া এখন আর কোনো বন্ধু নেই আমার। আমি হিমুর, হিমু আমার এমন। নিজের প্রেমিকাকে রূপা ভাবতে শুরু করলাম। রাতের শহরে ঘুরতে শখ জাগে। রাত জাগতে শখ জাগে। নিয়ন আলোয় হাঁটাহাঁটি করতে শখ জাগে। রহস্যময় চলাফেরা নিজের মাঝে বিরাজ করে। খালি পায়ে হাঁটার অদ্ভুত এক শীতল ছোঁয়া অনুভব হয়। পুলিশ কেন আমাকে গ্রেফতার করে না, এটাও মনে হয়। আমি হিমুকে অনুভব করে যাই। ছুটি কাটিয়ে শহরে ফিরি। ফুটপাতে হাঁটার সময় খালি পায়ে হাঁটতে মন চায়। হিমুর মতো উদাসীন মনে তাকিয়ে থাকি। চারপাশটা পুনরায় পড়ি।

পুনরায় নির্মাণ করি বাসার গেইট, চলার পথ। ছন্নছাড়া হতে মন চায়, মানুষ তো মূলত একাই। সময়ে সময়ে নিজের জন্যেই মূলত একত্রিত হয়। নিজের জন্যেই, বাঁচা মরার মাঝ পথে অস্তিত্ব ছড়িয়ে রাখা। এই একা চলাটা অভ্যাস করা উচিত। নিজেকে স্বতন্ত্র করতে গেলে অবশ্যই আত্ম মন্থন প্রয়োজন। সংযমী হতে হয়। ভালোবাসা তো সংযমের মূল অংশ। ত্যাগ-শুদ্ধতার যতি চিহ্ন। জ্ঞান সত্ত্বাকে ধারণ করতে উপযোগ সৃষ্টি করে হৃদয়ে। জ্ঞানীরা তো এমনি অনুভব করেন। হুমায়ূন আহমেদ স্যারের নাটক ও সিনেমায় আমার চোখ ডুব দেয়, উবু হয়ে দাঁড়ায়, হামাগুড়ি দেয় সবসময়। নির্মাণগুলো তিনি নিজে খেঁটেখুটে করে গেছেন। যেমন একজন মা তার শিশুকে গড়ে তোলেন। 

‘ঘেটুপুত্র কমলা, শ্রাবণ মেঘের দিন, আমার আছে জল,’ আমার প্রিয় সিনেমাগুলোর মধ্যে এই তিনটি অন্যতম। ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ মনোরঞ্জন করার একটি  চরিত্র। নাচ গান এইতো, কম বয়সের একজন বালককে মেয়ে সাজানো হয়। এরপর জমিদারের পছন্দ মতো পোশাক পরানো হয়। নাচের আয়োজন করা হয়। জমিদারের মন জয় করার একটা বিষয় আছে এখানে। আছে অর্থ উপার্জনেরও সুযোগ। জমিদারের স্ত্রী ছিলেন ওই আমোদ-প্রমোদের একদম বিপরীতে। ঘেটুপুত্র কমলাকে তিনি দুই চোখে মেনে নিতে পারতেন না। হুমায়ূন আহমেদ শত বছর আগেকার গ্রামীণ জীবনযাপন আর সমাজকে রূপায়ণ করেছেন ওই সিনেমাটিতে।

সিনেমাটিতে জমিদার কন্যার ঘেটুপুত্র কমলাকে নিয়ে বেশ কৌতূহল ছিল। তাকে সে একবার মেয়েলী বেশে দেখত, আবার ছেলে। বস্তুত সে ছেলে না মেয়ে? পরে তার সংশয় ভাঙে। ঘেটুপুত্র কমলা সিনেমাটির শেষের ট্র্যাজেডিতে, আমার দু চোখ ডুবেছিল নিজস্ব বর্ষায়!  

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড