• বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ (১ম পর্ব)

  রিফাত হোসেন

১২ অক্টোবর ২০১৯, ১৯:১২
গল্প
ছবি : প্রতীকী

- আমি যদি জোর করে তোর বোনের ভার্জিনিটি নষ্ট করে দেই, তাহলে কেমন লাগবে তোর? 

ফাহাদের কথা শুনে সায়েমের মাথায় রক্ত ওঠে গেল। শরীরের আনাচে-কানাচেতে থাকা হিম শীতল রক্ত হঠাৎ করেই যেন আগ্নেয়গিরির মতো ভয়ানক হয়ে উঠল। তবুও নিজের হাত-পা কন্ট্রোলে রাখার চেষ্টা করছে সায়েম। নড়েচড়ে একবার আশেপাশে তাকালো। এরপর আবার ফাহাদের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘আমার বোনকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলিস না ফাহাদ।’

ফাহাদ হেসে দিয়ে বলল, ‘আজেবাজে কথা বলছি না তো। যা করব তাই বলছি। তুই কী এখনি করে দেখাতে বলছিস?’

রাগটা আর কন্ট্রোল করতে পারল না সায়েম। নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে ফাহাদের কলার চেপে ধরে চিৎকার করে বলল, ‘আমার বোনকে নিয়ে আর একটা খারাপ কথা বললে তোকে খুন করে ফেলব কুত্তার বাচ্চা।’

ফাহাদ পুরো শরীর ঝাঁকিয়ে হাসতে লাগল সায়েমের কথা শুনে। রাগটা আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেল সায়েমের। শার্টের কলার চেপে ধরা অবস্থাতেই ফাহাদের দুই পায়ের মাঝখানে সজোরে লাথি মেরে দিলো । ব্যথায় কাতরিয়ে উঠল ফাহাদ। তবুও সেই শরীর ঝাঁকানো হাসি একটুও কমেনি। পাশ থেকে ইতি সায়েমের হাত চেপে ধরে বলল, ‘ওকে ছেড়ে দাও ভাইয়া? এভাবে মেরো না।’ 

সায়েম আড়চোখে ইতির দিকে তাকালো। সায়েমের লাল টকটকে আকৃতির বাঁকানো চোখজোড়া দেখে শিউরে উঠল ইতি। ভয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল ও। গত কয়েক বছরে সায়েমের এতটা রাগ দেখেনি ইতি। আজ হঠাৎ এতটা রাগ দেখে সেই চিরচেনা আর পরিচিত ভাইকেও যেন অপরিচিত লাগছে। সেই শান্তশিষ্ট আর গভীর চিন্তাধারার ভাইকে হঠাৎ উন্মাদ হয়ে যেতে দেখে ইতির মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না। সায়েমের রাগ যে মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেছে, তা ফাহাদের দু’ই পায়ের মাঝ বরাবর লাথি মারাতেই স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। আর ফাহাদ ছেলেটাও অদ্ভুত! ব্যথায় কারতাচ্ছে, তবুও খিলখিল করে হেসে যাচ্ছে। 

- সবাই আজ বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছে। নিজের মনে মনে কথাটা বলল ইতি। হঠাৎ লক্ষ্য করল, সায়েম আবারও ফাহাদকে মারার জন্য হাত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ইতি লাফ দিয়ে সায়েমের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। এরপর হাত জোর করে বলল, ‘প্লিজ ভাইয়া, ওকে আর মেরো না।’

ইতির দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে সায়েম বলল, ‘সামনে থেকে সরে যা ইতি। হারামির বাচ্চাটাকে আজকে খুন করব আমি। ওর সাহস কী করে হলো তোকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলার।’

- ফাহাদ ভাইয়া বুঝতে পারেনি বোধহয়। হয়তো কোনো কারণে রাগের মাথায় উল্টোপাল্টা বলে ফেলেছে। সামান্য কারণে নিজের বন্ধুকে এভাবে মেরো না ভাইয়া। করুণ কণ্ঠে ইতি কথাটা বলল। সায়েম প্রতিউত্তরে বলল, ‘বুঝতে পারেনি মানে! ও তো আর ছোট্ট বাচ্চা নয়। ওর বুঝা উচিত ছিল, আমার বোনকে নিয়ে আজেবাজে কথা সহ্য করতে পারব না আমি।’

ফাহাদ নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সায়েমের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমারও এইরকম রাগ হয়েছিল, যখন আমি জানতে পেরেছি তুই আমার বোনের সাথে খারাপ কিছু করার চেষ্টা করেছিস।’

সায়েম হতভম্ব হয়ে ফাহাদের দিকে তাকালো। ফাহাদ আবার বলল, ‘আমার বোন যখন কেঁদে কেঁদে আমার কাছে এসে বলল, জানিস ভাইয়া, সায়েম আমার সাথে খারাপ কিছু করতে চেয়েছিল। ভাগ্য ভালো ছিল বিধায় কলঙ্কিত হওয়া থেকে বেঁচে গেছি আমি।’

সত্যি বলছি সায়েম, ‘তখন আমার ইচ্ছে করছিল তোর কলিজাটা খুলবে নিই। যে চোখ দিয়ে তুই আমার বোনের দিকে খারাপ নজরে তাকিয়েছিলি, তোর সেই চোখ ধারালো ছুরি দিয়ে উঠিয়ে নিতে ইচ্ছে করছিল। তুই যে হাত দিয়ে আমার বোনকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেছিলি, তোর সেই হাতটা কেটে টুকরো টুকরো করে দিতে ইচ্ছে করছিল আমার। অনেক কষ্টে আমি নিজেকে কন্ট্রোলে রেখেছি শুধুমাত্র এই মুহূর্তটা দেখার জন্য।’

কথাটা বলে ফাহাদ আগের থেকেও জোরে জোরে হাসতে লাগল। সায়েম একবার ইতির দিকে, আরেকবার ফাহাদের দিকে তাকাচ্ছে। এমনভাবে তাকাচ্ছে, যেন কথাটা শুনে ও আকাশ থেকে পড়ল। ইতি ফাহাদকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘তুমি কী পাগল হয়ে গেছ ফাহাদ ভাইয়া? আমার ভাইয়া তোমার বোনের সাথে এইরকম কেন করবে? তাছাড়া তোমার বোন অনেকটাই ছোট। আর আমার ভাইয়ার একটা নিজস্ব ব্যাক্তিত্ব আছে। ভাইয়া কখনোই এমন কিছু করবে না বা করার চেষ্টা করবে না, যার দ্বারা নিজের সম্মান এবং অন্যের সম্মান হয়৷ বিশেষ করে অন্যজন যদি হয় প্রিয় বন্ধুর ছোট বোন।’

- তোমার কী মনে হয় আমি মিথ্যে বলছি?

- অবশ্যই। আমি আমার ভাইয়াকে বিশ্বাস করি।

- আমিও আমার বোনকে বিশ্বাস করি ইতি। আমি দেখেছি, ওর চোখের জলে কোনো ছলনা ছিল না। ওর করুণ কণ্ঠস্বরে কোনো মিথ্যে ছিল না।

ইতি কিছু বলতে গিয়ে-ও থেমে গেল।  পাশ থেকে সায়েম বলল, ‘তোর বোন সাজানো একটা গল্প বলেছে। আর তুই-ও সেই গল্পে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেছিস। আরে ইয়ার, তুই তো আমার বাল্যকালের বন্ধু। তুই তো আমাকে খুব ভালো করেই চিনিস, তাই না? তোর কী মনে হয় আমি এইরকম কাজ করতে পারি? তোর বোনকে আমি নিজের বোনের নজরে দেখি ফাহাদ। আর তুই সেই আমাকেই এতবড় অপবাদ দিলি।’

- আমি আমার বোনকে-ও ভালো করে চিনি সায়েম। ও কখনোই এইরকম কিছু নিয়ে মিথ্যা বলবে না।

- ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা কর সবটা। নিজেই বুঝতে পারবি কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা।

- আচ্ছা, আমাকে বল, সকালে কী আমাদের বাড়িতে যাসনি তুই?

সায়েম স্বাভাবিক ভাবেই বলল, ‘হ্যাঁ গিয়েছিলাম।’

- তখন বাড়িতে শুধুমাত্র আমার বোন একা ছিল, সেটা নিশ্চয়ই জানতি।

- আগে জানতাম না, তোদের বাড়িতে গিয়ে জেনেছি।

- সে যাই হোক। বাড়িতে যে আমার বোন একা, সেটা তো কোনো একসময় জেনেছিলি তুই, তাই না?

- হ্যাঁ। সেই সময়টাতে তোর বোন একাই ছিল বাড়িতে। তুই একটা কাজে কোথায় যেন গিয়েছিলি, আর তোর মা স্কুলে( শিক্ষিকা) গিয়েছিলেন।

- আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছিস তুই। আমার বোনকে একা পেয়ে ওকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছিলি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারিসনি তুই।

সায়েম অবাক দৃষ্টিতে তাকালো ফাহাদের দিকে। ও বুঝতে পারছে না এখন কী বলা উচিত। মেয়েটা এভাবে ওকে ফাঁসিয়ে দিবে, তা কল্পনা-ও করতে পারেনি সায়েম।

-  চুপ করো ফাহাদ ভাইয়া। নিজের বোনের দোষটা আড়াল করর চেষ্টা কোরো না। তোমার বোন যে সারাক্ষণ আমার ভাইয়ার পিছনে ঘুরঘুর করে, তা ভালো করেই জানি আমি। তোমার বোন মাত্র কলেজে উঠেছে। আর এই বয়সে পড়াশোনা বাদ দিয়ে আমার ভাইয়ার পিছন পিছন ঘুরে কোন সাহসে? ও বারবার ভুলে যায় ভাইয়া কতটা সিনিয়র ওর থেকে। যেই মেয়ে হাতে সামান্যতম ব্যথা পেলে ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে দেয়, সেই মেয়ে কিনা এত সিনিয়র একটা ছেলেকে প্রপোজ করে। এত সাহস কোত্থেকে পায় ও?

সায়েমের চুপ করে থাকা দেখেই ইতি একনাগাড়ে কথাগুলো বলল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ফাহাদ আবার বলল, ‘আমার বোন সায়েমকে পছন্দ করে, এটা নিশ্চয়ই ওর অপরাধ নয়?’

- কাউকে পছন্দ করা অপরাধের কিছু নয় ফাহাদ ভাইয়া। কিন্তু সেই পছন্দ থেকে অন্যায় কিছু প্রত্যাশা করাটা অপরাধ। আর তোমার বোন সেই অন্যায় প্রত্যাশা থেকেই আমার ভাইয়ের নামে এইরকম খারাপ একটা অভিযোগ এনেছে। তোমার বোনকে ডাক্তার দেখাও ফাহাদ চাই।

-  ঠিক করে কথা বল ইতি। 
 আমার বোন অসুস্থ নয়, ‘ওকে ডাক্তার দেখাবো।’

- সবসময় শারিরীক অসুস্থ হয় না মানুষ। মাঝে মাঝে মানসিক ভাবে-ও অসুস্থ হয়ে পড়ে মানুষ। আর সেই অসুস্থতা মানুষের আবেগী মন আর কল্পনা শক্তির উপর প্রভাব পড়ে। ফলে শারিরীক ভাবে একজন সুস্থ মানুষ-ও সেসময় উদ্ভট সব কথা বলে এবং কূ-কর্ম করতে শুরু করে।

ফাহাদ কিছু বলল না। ইতি সায়েমের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাড়িতে চলো ভাইয়া।’

সায়েম মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। ইতি ওর হাত ধরে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর-ই হঠাৎ থেমে গেল ইতি। সায়েম বলল, ‘কী হলো?’

- ঝালমুড়ি যে খাচ্ছিলাম, টাকা তো দেওয়া হয়নি।

সায়েম মৃদু হাসি দিয়ে বলল, ‘একটু ওয়েট কর, আমি দিয়ে আসছি।’

ইতি সায়েমকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘তোমাকে যেতে হবে না। তুমি এখানেই দাঁড়া-ও, আমি দিয়ে আসছি। তোমাদের ঝগড়া দেখে ঝালমুড়িওয়ালা হয়তো টাকা চাওয়ার সাহস-ই পায়নি।’

ইতির কথা শুনে জোর করে হাসার চেষ্টা করল সায়েম। ইতি আবারও সেখানে চলে গেল। সেখানে গিয়ে দেখে ফাহাদ এখনো দাঁড়িয়ে আছে। সামনের ছোট্ট পুকুরটার দিকে তাকিয়ে আছে ও। পুকুরটার চারপাশের পাড়গুলো উঁচু উঁচু। সেই সাথে পাড়ে অসংখ্য সবুজাত প্রকৃতি। পুকুরের মধ্যেখানে এক চিলতে ঘোলাটে পানিতে ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটা শাপলা ফুল ফুটে উঠেছে। আবহাওয়া খুব একটা ভালো নেই আজ। উদাসীন ভাবে বিশাল  আকাশে মেঘেরা উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে-বেড়াচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে মেঘেদের আনাগোনা-ও বেড়ে যাচ্ছে। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘ থেকে বৃষ্টি হবে। যাকে বলে মেঘ বর্ষণ। বেড়ে যাবে পুকুরের পানি। সেই সাথে শাপলা ফুলগুলোও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। ইতি ফাহাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আলতো করে ফাহাদের হাত স্পর্শ করল। আকস্মিক ভাবে চমকে উঠল ফাহাদ। পাশে তাকিয়ে বলল, ‘এখনো যাওনি তুমি?’

ইতি করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি বাড়িতে যাবে না ফাহাদ ভাইয়া?’

- হুম যাবো। একসময় ঠিকই যাবো।

ইতি ফাহাদের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল, ‘কষ্ট পেও না ফাহাদ ভাইয়া। দেখো, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার বোন বাস্তবতা বুঝতে শিখবে। তোমার আর ভাইয়ার আজকের এই মনমালিন্য দূর হয়ে যাবে একদিন। আবারও আগের মতো একে অপরের প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠবে তোমরা।’

ফাহাদ নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘সায়েম অপেক্ষা করছে, যাও তুমি।’

ইতি হাত দিয়ে চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকো মুছে ঝালমুড়িওয়ালাকে টাকা দিয়ে দৌড়ে চলে এলো সায়েমের কাছে। এরপর বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। চারিদিকে অন্ধকার ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। মৃদু বাতাস-ও বইছে। ভ্যাপসা গরমের সময় পেরিয়ে শীতের সময় আসছে। সিজন চেঞ্জ হওয়ার সময় সাধারণত এইরকম হয়েই থাকে। হুটহাট করে আবহাওয়া নিজের সাজ পরিবর্তন করে ফেলে। কখনো কাঠফাটা রোদের তাপ, আবার কখনো ঝুম বৃষ্টি। এইতো সকাল থেকেই আবহাওয়া বেশ ভালো ছিল। খুব বেশি রোদ-ও না, আবার এখনকার মতো ঘন অন্ধকার-ও ছিল না। সেজন্যই তো ভাই-বোন বিকেলবেলা একটু ঘুরতে বেরিয়েছিল। মজা করে এক প্যাকেটে ঝালমুড়ি খাচ্ছিল দু’জন। শুরুটা ভালোই ছিল। হঠাৎ কোত্থেকে  ফাহাদ চলে এসে উদ্ভট সব কথা বলতে শুরু করল। আর তারপরই শুরু হয়ে যায় দুই বন্ধুর মধ্যে ঝামেলা। ব্যাস, উপভোগীয় মুহূর্তটা নষ্ট হওয়ার জন্য এইটুকুই যথেষ্ট ছিল। 

- ফাহাদ ভাই নিশ্চয়ই খুব ব্যথা পেয়েছে।
নিজের মনে মনে কথাটা বলল ইতি। পাশে থেকে সায়েম বলল, ‘কিছু বললি ইতি?’

- না ভাইয়া।

- ওহ্ আচ্ছা।

সায়েম আর কিছু বলে না। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে হাঁটার জন্য সায়েমকে তাগাদা দিলো ইতি। সময় পেরিয়ে যায় ধীরেধীরে। একসময় ওরা বাড়িতে পৌঁছে যায়। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। 

কাশতে কাশতে বিছানায় বসে পড়লেন আনিস উদ্দিন। অসহায়ের দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকালেন কয়েকবার। কিন্তু কাউকে দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলেন। পাশের দু'টো ঘর পরেই রান্নাঘরে অন্তরা বেগম কাজ করছেন। কিন্তু স্ত্রীকে ডাক দেওয়ার মতো শক্তি তার গলায় নেই। তবুও দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে গুঙিয়ে গুঙিয়ে বললেন - " অন্তরা।"

রান্নাঘর থেকে কোনো আওয়াজ-ই এলো না। না আসাটাই স্বাভাবিক। আনিস উদ্দিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবারও ডাক দিলেন স্ত্রীকে। কিছুক্ষণ পর তার স্ত্রী ঘরে এসে বললেন - " কী হয়েছে? ডাকছ কেন?"

- আমার শরীরটা ভালো লাগছে না অন্তরা।

- এ’কথা তো প্রতিদিনই বল। ডাক্তার দেখাতে বললে দেখাও না। টাকা পায়সার তো কোনো অভাব নেই। অথচ খরচের বেলায় বেঁকে বস তুমি। কার জন্য এত টাকা জমাচ্ছ? ছেলে-মেয়েদের জন্য? কিন্তু কোথায় তোমার ছেলে-মেয়েরা? সেই যে রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। আর কোনো খোঁজ-খবর নেয়নি। আর তুমিও রাগ করে ওদেরকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা-ও করোনি। ছেলে-মেয়ে যখন নেই, তাহলে এত টাকা দিয়ে করবে টা কী? কবরে তো আর নিয়ে যেতে পারবে না।

আনিস উদ্দিন বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকালেন স্ত্রীর দিকে। অন্তরা বেগম এর কথাগুলো যে দিনদিন বিরক্তির মাত্রায় পৌঁছে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন বেশ কিছুদিন ধরে। সেই সাথে এখন আবার যোগ হয়েছে একটা কথার প্রতিউত্তরে আরো দশটা কথা শুনিয়ে দেওয়া। রীতিমতো বাজে একটা অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে তার। সাথে চেঁচামেচি আর জ্ঞান ফ্রি-তেই সাপ্লাই দেয়।

আনিস উদ্দিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘তোমার এই বাজে অভ্যাস মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে অন্তরা। এখানে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।’

- মানুষটাই তো দিনদিন পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছি। অভ্যাস পরিবর্তন হবে না? এতবড় ছেলে-মেয়ে থাকতে এখনো এতবড় বাড়ির দেখাশোনা আমাকেই করতে হয়।

- তোমার এত কথা শুনতে আমার ইচ্ছে করছে না অন্তরা। যেজন্য তোমাকে ডাকা, সেটা শুনে যাও এখান থেকে।

- বলো তাড়াতাড়ি।

- আজকে আমার কেমন যেন লাগছে। মনে হয় আর খুব বেশিদিন বাঁচবো না। নিশ্চয়ই তুমি এখন বলবে, এই একই কথা প্রতিদিন বলি আমি। যাই হোক, কালকে সকালে কাশেম এলে, আমার ঘরে একবার পাঠিয়ে দিও। অনেকদিন হলো আমার সামনে আসে না । ওকে কাজের দায়িত্ব দিবো। ঠিকঠাক করতে পারলে পুরষ্কার ও দিবো।

- কী কাজ দেবে ওকে?

- ছেলে-মেয়েদের খোঁজ-খবর আনতে বলব ওকে। এরজন্য আলাদা বেতনও পাবে ও। ওরা কেমন আছে আমার জানা জানা দরকার। কেন জানি মনে হচ্ছে ওরা কোনো সমস্যায় পড়েছে।

- তাহলে কী শুধু বেতন দিবে, পুরষ্কার দিবে না ওকে?

- দু’টোই দিবো। তবে সেটা পাওয়ার জন্য ওকে পরিশ্রম করতে হবে। কাশেম ছেলে-মেয়েদের খোঁজ-খবর রাখবে ঠিকই, কিন্তু সেটা ছেলে-মেয়েদের বুঝতে দেওয়া যাবে না একটুও। ওরা যাতে কোনোভাবেই টের না পায়, আমি ওদের খোঁজ-খবর রাখছি।

- তোমাদের মান-অভিমান দেখে মাঝে মাঝে আমার মাথা ঘুরে যায়। ছেলে-মেয়েদের খোঁজ-খবর নিবে, অথচ ওদের জানতে দিবে না। ছেলে-মেয়েদের জন্য যদি এতই দরদ হয়, তাহলে বাড়িতে ফিরিয়ে আনলেই হয়। তা না, কী একটা ভাব ধরছে?

আনিস উদ্দিন রেগে গিয়ে বললেন, ‘কখনোই না। আমি ওদের ফিরিয়ে আনবো না। তুমি কী ভুলে গেছ ওরা দু’জন আমাকে কতটা অপমান করেছে। কত আনন্দ করে মেয়েটার বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। পাত্রপক্ষীয় লোকদের সাথে সব ঠিকঠাক। আর তোমার মেয়ে বিয়ের দিন বেঁকে বসল। আরে বাবা, ছেলেটাকে পছন্দ না হলে আগেই বলতে পারতি, বিয়ের দিন অত নাটক করার কী আছে? সে নাকি আগে প্রতিষ্ঠিত হবে, এরপর ভেবেচিন্তে নিজের পছন্দ মতো একজনকে বিয়ে করবে। তোমার ছেলে-ও বোনের পক্ষে কথা বলতে শুরু করল। বিয়ের দিন এইরকম কথা মানা যায় বল? তার উপর আবার পাত্রের নামে কত অভিযোগ নিয়ে এলো তোমার মেয়ে। ছেলে নাকি কত কিছু খায়! বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার সময় আবার পাত্রের গালে থাপ্পড় ও মেরে গেল একটা। তখন কিছু বলতে পারেনি ঠিকই, পরে যদি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ওরা কোনো ক্ষতি করে তোমার মেয়ের। তখন কী করবে? ওরা তো আবার ক্ষমতাবান লোকজন সব।’

- চুপ করো তো। এইসব শুনতে ইচ্ছে করছে না আমার। আর যেই না ছেলে-মেয়েকে নিয়ে কথা বলেছি, ওমনিই তোমার গলায় জোর চলে এসেছে, তাই না? তোমার ভাবসাব কিছুই বুঝি না আমি।

আনিস উদ্দিন কিছু বললেন না। রাগে রীতিমতো ঘেমে গেছেন তিনি। অন্তরা বেগম আবারও রান্নাঘরে চলে গেলেন রাতের খাবার তৈরির জন্য।

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড