• সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

আহমদ ছফা : একজন প্রথার বাইরের মানুষ

  সাহিত্য ডেস্ক

২৮ জুলাই ২০১৯, ১৩:৫৯
আহমদ ছফা
আহমদ ছফা

‘আমার কাছে ঈশ্বর-চিন্তা আর মানুষের অমরতার চিন্তা সমার্থক। কেউ যদি আমাকে আস্তিক বলেন বিনা বাক্যে মেনে নেব। আমি আস্তিক। যদি কেউ বলেন নাস্তিক আপত্তি করব না। আস্তিক হোন, নাস্তিক হোন, ধর্মে বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, আমি কোনো বিবাদের হেতু দেখতে পাইনে। আমার অভীষ্ট বিষয় মানুষ, শুধু মানুষ। মানুষই সমস্ত বিশ্বাস, সমস্ত মূল্যচিন্তা, সমস্ত বিজ্ঞানবুদ্ধির উৎস।’

কথাগুলো যিনি বলেছেন তাকে বলা হয় বাংলাদেশি জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ও সলিমুল্লাহ খানসহ আরও অনেকের মতে, মীর মশাররফ হোসেন ও কাজী নজরুল ইসলামের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি মুসলমান লেখক। তিনি হচ্ছেন আহমদ ছফা। যার লেখায় প্রাধান্য পেয়েছে বাংলাদেশি জাতিসত্তার পরিচয়। তিনি একাধারে ছিলেন লেখক, ঔপন্যাসিক, কবি, চিন্তাবিদ ও গণবুদ্ধিজীবী। এই বহুমুখী প্রতিভাসম্পূর্ণ মানুষটির জন্মদিন আজ।

তিনি ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রাম জেলার চান্দনাইশ থানার গাছ বাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন হেদায়েত আলী এবং মা মরহুমা আসিয়া খাতুন। দুই ভাই চার বোনের মধ্যে আহমদ ছফা ছিলেন বাবা-মার দ্বিতীয় সন্তান।

আহমদ ছফা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের মানচিত্র অঙ্কন করেছেন। করেছেন বুদ্ধিজীবীদের ব্যর্থতায় বাংলাদেশের কী দুর্দশা হতে পারে তার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে রচিত ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ প্রবন্ধগ্রন্থে উন্মোচন করেছেন সুবিধাবাদিতার নগ্ন রূপ। তার রচিত প্রতিটি উপন্যাসই ভাষিক সৌকর্য, বিষয়বস্তু ও রচনাশৈলীর অভিনবত্বে অনন্য। মানসিক, সাংস্কৃতিক ও আর্থসামাজিক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুষঙ্গসহ ছফার চরিত্র সৃষ্টির তথা কাহিনীকথনের সৃষ্টিকরণ ছিল অসামান্য। 

তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যজগতের অনুপ্রাণিত একজন স্রষ্টা। যার কর্মের মাধ্যমে লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, চলচ্চিকরসহ অনেকে উৎসাহ পেয়েছেন প্রতিনিয়ত। যদি নাম বলা হয় তার মধ্যে অন্যতম আছেন হুমায়ূন আহমেদ, ফরহাদ মজহার, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, তারেক মাসুদ, সলিমুল্লাহ খানসহ অনেকে। তাকে বলা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী।

আহমদ ছফা তার প্রথা বিরোধিতা, স্পষ্টবাদিতা, স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গির জন্য লেখক ও বুদ্ধিজীবী মহলে বিশেষ আলোচিত ও বিতর্কিত ছিলেন জীবদ্দশায়। অনেকে তাকে বিদ্রোহী, বোহেমিয়ান, উদ্ধত, প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাহীন ও বিতর্কপ্রবণ বলেছেন। তবুও লিখে গিয়েছেন প্রতিনিয়ত।

জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের মতে, ছফার রচনাবলি গুপ্তধনের খনি এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম স্বকীয় এক জগতের সৃষ্টি করে যে জগতে যে কোনো পাঠক হারিয়ে যেতে পারে।

হুমায়ূন আহমদ আহমদ ছফাকে 'অসম্ভব শক্তিধর একজন লেখক' বলে অভিহিত করেছেন এবং তাঁকে নিজের মেন্টর বলে উল্লেখ করেছেন।

মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতে, আহমদ ছফা 'চুলের ডগা থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত' 'একশ ভাগ খাঁটি সাহিত্যিক। আমাদের বড় সৌভাগ্য তাঁর মতো একজন প্রতিভাবান মানুষের জন্ম হয়েছিল।'

আহমদ ছফা সম্পর্কে ফরহাদ মজহার বলেছেন 'সে (ছফা) গাছবাড়িয়া গ্রাম থেকে আসা অতি সাধারণ একটি গ্রামের ছেলে। কিন্তু সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিন্তা ও রাজনীতির জগতে সে যে উথালপাথাল ধাক্কা দিয়ে গেল তার ফলে বাংলাদেশের সাহিত্য বলি, সংস্কৃতি বলি, রাজনীতি বলি, বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড বলি তার সঙ্গে খোদ একটা বোঝাপড়া না করে কোনো ক্ষেত্রেই অগ্রসর হওয়া যাবে না।'

আহমদ শরীফ বলেছিলেন ‘সুবিধাবাদীর 'Life is a compromise' তত্ত্বে ছফার আস্থা নেই। আজকের বাংলাদেশে এমনি স্পষ্ট ও অপ্রিয়ভাষী আরো কয়েকজন ছফা যদি আমরা পেতাম, তাহলে শ্রেয়তর পথ স্পষ্ট হয়ে উঠত।’

সলিমুল্লাহ খান তাঁকে একজন দ্রষ্টা, রাষ্ট্রচিন্তাবিদ, বিশ্বের সেরা কাহিনী-কথকদের একজন ও বাংলা ভাষার মহান কথাসাহিত্যিক বলেছেন। খান মনে করেন ছফা কাজী নজরুল ইসলামের উত্তরাধিকারী। 

সরদার ফজলুল করিম বলেছিলেন, ছফা কেবল পাঠ করার বিষয় নয়, চর্চা করার বিষয়।

‘আহমদ ছফা : প্রথার বাইরের মানুষ’ নামের এক নিবন্ধে রাশেদ খান মেনন লিখেছেন, 'বাংলাদেশের সাহিত্য, বাংলাদেশের মননজগৎ ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডল (ছফাকে) হারিয়ে অনেকখানি রিক্ত হয়ে পড়েছে।'

রশীদ করীম লিখেছেন, আহমদ ছফার এক একটি শব্দ শিলাখণ্ডের মতন কঠিন, আপাত-উদাসীন নির্মম অথচ তারই অন্তরে গভীর বেদনা ভালোবাসা কী পরিমাণ তার কোনো সীমা নেই।

ছফার উপন্যাস নিয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লিখেছেন 'ব্যক্তির মধ্যে ইতিহাসকে ও ইতিহাসে বর্তমান ব্যক্তিটিকে নিবিড় করে অনুভব করার তাগিদে পাঠক আহমদ ছফার অনুসন্ধানী অভিযানে শরিক হবেন।'

আহমদ ছফা রচিত গ্রন্থগুলো হলো- বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, বাঙালি মুসলমানের মন, ওঙ্কার, একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন, অলাতচক্র, গাভী বিত্তান্ত, অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী, পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ, যদ্যপি আমার গুরু, ফাউস্ট’সহ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
 
প্রতিষ্ঠানবিরোধী আহমদ ছফা নিজকর্মের জন্য ভূষিত হওয়া ১৯৭৫ সালের শিবির পুরস্কার ও ১৯৯৩ সালে বাংলা একাডেমীর সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সাহিত্যে অবদানস্বরূপ ২০০২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করেন। এই প্রতিভাধর বুদ্ধিজীবী মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ২০০১ সালের ২৮ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন।

ওডি/এএন 

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড