• বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

প্রবন্ধ

বাংলা সাহিত্যের গীতিকবিতা ও আল মাহমুদ

  শব্দনীল

১১ জুলাই ২০১৯, ০৯:১৫
কবিতা
ছবি : বাংলা সাহিত্যের সোনার নোলক কবি আল মাহমুদ

বাংলা সাহিত্যের আদি যুগ চর্যাপদ থেকে কবিতা নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসে এখনো সাহিত্যের একটি প্রধান শাখা হিসেবে তার স্বকীয় যাত্রা অক্ষুণ্ণ রেখেছে। কবিতার এই দীর্ঘ যাত্রার মধ্যে যতগুলো ধারা এসেছে তার ভিতর অন্যতম গীতিকবিতা। যে কবিতায় কবির আত্মানুভূতি বা একান্ত ব্যক্তিগত বাসনা-কামনা ও আনন্দ-বেদনার পরিপূর্ণতা থাকে তাই গীতিকবিতা। কবি এখানে আত্মবিমুগ্ধ, তাই সমস্ত কবিতাব্যাপী তার প্রাণ-স্পন্দন অনুভব করতে পারে।

বাংলা কাব্য ধারায় আধুনিক গীতিকবিতার প্রবর্তক বিহারীলাল চক্রবর্তী। তবে আধুনিক বাংলার শ্রেষ্ঠ গীতিকবির আবির্ভাব ঘটে উনিশ শতকের মধ্যপঞ্চাশে। বলছি কবি আল মাহমুদের কথা। যার কবিতায় তিরিশোত্তর আধুনিক বাংলা কবিতার উৎকর্ষের সুরধ্বনিত। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান কবিদের মধ্যে অন্যতম এবং মুসলিমে ঐতিহ্যের আধুনিক রূপকার।

তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার তিরিশ দশকীয় প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ দৃশ্যপট, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের কর্মমুখর জীবন চাঞ্চল্য, নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহ, রাজনৈতিক, অর্থ-সামাজিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আধুনিক বাংলাভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যেই অত্যন্ত স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের সুন্দর প্রয়োগে কাব্যরসিকদের মধ্যে আল মাহমুদ নতুন পুলক সৃষ্টি করেন। তিনি কবিদের কবি জীবনানন্দ দাশ ও পল্লীকবি জসীম উদ্‌দীন থেকে সম্পূর্ণ নতুন ধারার এক কবি প্রতিভা। তিনি হচ্ছেন রবীন্দ্র-নজরুল গোত্রীয়, স্বশিক্ষিত, স্বাভাবিক জাত কবি।

স্বাধীন বাংলাদেশের বাংলা গীতিকবিতা ১৯৪৭ পরবর্তী দুইটি ধারায় প্রবহমান। প্রথম ধারাটি প্রধান কবি আল মাহমুদ এবং দ্বিতীয় ধারার প্রধান কবি শামসুর রহমান। তিরিশোত্তর বোধকে লালন করে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার যান্ত্রিক জীবনের গোলকধাঁধায় শামসুর রাহমান যখন ঘুরপাক খাচ্ছিলেন তখন আল মাহমুদ নগর থেকে ফিরে যান গ্রামীণ লোকজীবনে। সেখান থেকেই তুলে এনেছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস। গীতিকবিতায় পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ভেতর তিনিই সবচেয়ে উজ্জ্বল।

আল মাহমুদের ছড়ার বই ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ বাল্য অনুভূতির অসাধারণ শিল্পরূপ। এই ছড়াগ্রন্থের আকাশ নিয়ে, নোলক, পাখির মতো, মন পবনের নাও, ঝালের পিঠে ইত্যাদি ছড়াকবিতা যে কোনো কিশোরের মনে নাড়া দিতে সক্ষম। এছাড়াও ‘আরব্য রজনীর রাজহাঁস’ ছড়াগ্রন্থের বাপির জন্য দুটি কবিতা, ‘এক চক্ষু হরিণ’ ছড়াগ্রন্থের সুড়সুড়ির ছড়া, মিতুর জন্য ছয়টি কবিতা, নদীর ভিতরে নদী, প্রথমার জন্য তিনটি ছড়া ইত্যাদিতে শিশু-কিশোরদের অনুভূতির প্রকাশ যেমন আছে তেমনি শিল্প ও জীবনের গভীর তত্ত্বেরও প্রকাশ ঘটেছে। শহরে পড়ুয়া শিশু-কিশোরের স্বপ্ন কল্পনায় গ্রামের প্রতি কৌতূহলের একটি দৃশ্য যেমন ফুটিয়ে তুলেছেন কবিতায়-

‘বই খুলে সে কাল পেয়েছে কেয়া ফুলের নাম,
বর্ষা ঋতুর ফুল নাকি গো গন্ধে মাতায় গ্রাম
ফুলটাও চাই গন্ধও চাই এই তো আষাঢ় মাস,
শহরটাকে গ্রাম করে দাও সিমেন্ট ভেঙে ঘাস’

অথবা
‘মায়ের পাশে ঘুমিয়ে সে স্বপ্ন দেখে-
শহর গুড়িয়ে গেছে ঝড়ে এবং
ঝড়ের মাতন থামলে শেষে স্বপ্ন হলো নীল,
নীলের মাঝে দেখল খোকন সবুজ পানির ঝিল।
ঝিলের পাড়ে কাঁটায় ভরা কেয়াফুলের ঝাড়, 
হাত বাড়ারো কোথায় সে ফুল? খোঁপাটা আম্মার’
(খোঁপাটা আম্মার- এক চক্ষু হরিণ)

অথবা

‘জলকদরের খাল পেরিয়ে জলপায়রার ঝাঁক
উড়তে থাকে লক্ষ্য রেখে শঙ্খনদীর বাঁক।
মন হয়ে যায় পাখি তখন, মন হয়ে যায় মেঘ
মন হয়ে যায় চিলের ডানা, মিষ্টি হাওয়ার বেগ।’
(আকাশ নিয়ে- পাখির কাছে ফুলের কাছে)

অথবা

আম্মা বলেন, পড়রে সোনা
আব্বা বলেন, মন দে;
পাঠে আমার মন বসে না
কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।
আমার কেবল ইচ্ছা জাগে
নদীর কাছে থাকতে,
বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে
পাখির মতো ডাকতে’
(পাখির মতো- পাখির কাছে ফুলের কাছে)

তেমনি ‘লোক লোকান্তর’ ‘কালের কলস’ ‘সোনালি কাবিন’ কাব্য গ্রন্থে ফুটিয়ে তুলেছেন যৌবনের আদিম অনুভূতি, প্রেম- ভালোবাসার শৈল্পিক রূপ-
‘এ কোন কলার ছলে ধরে আছো নীলাম্বর শাড়ি
দরদ বিগলিত হয়ে ছলকে যায় রাত্রির বরণ,
মনে হয় ডাক দিলে সে-তিমির ঝাঁপ দিতে পারি
আঁচল বিছিয়ে যদি তুলে নাও আমার মরণ।’
( সোনালি কাবিন-২)

অথবা
‘ক্ষুধার্ত নদীর মতো তীব্র দুটি জলের আওয়াজ-
তুলে মিশে যাই চলো আকর্ষিত উপত্যকায়,
চরের মাটির মতো খুলে দাও শরীরের ভাঁজ
উগল মাছের মাংস তৃপ্ত হোক তোমার কাদায়’
(সোনালি কাবিন-২)

আল মাহমুদ রোমান্টিক কবি। কিন্তু বাস্তবকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য করে শুরু তার রোমান্টিকতার যাত্রা-
‘নদীর সিকস্তী কোনো গ্রামাঞ্চলের মধ্যরাতে কেউ
যেমন শুনতে পেলে আকস্মাৎ জলের জোয়ার,
হাতড়ে তালাশ করে সঙ্গিনীকে, আছে কিনা সেও
যে নারী উন্মুক্ত করে তার ধন-ধান্যের দুয়ার’
(সোনালি কাবিন-১২)

আবার স্বপ্নচারী কবি নেমে আসেন রক্ত-মাংসের বাস্তবে। তখন কবির ভাষায় কল্পনা আর বাস্তবতা একাকার হয়ে যায়-
‘...আমি
দ্রুত তার কম্পিত হাত সরিয়ে দিলে, সে লজ্জায়
গ্রীবা বাঁকিয়ে অন্যদিকে চোখ ফিরল। এই প্রথম
আমি কোন নারীর মধ্যে লজ্জা দেখলাম।
আর তা আগুনের মত লাল, আর শোণিতের মত সঞ্চরণশীল।
তার দুটি মাংসের গোলাপ থেকে নুনের হালকা গন্ধ আমার
কামনার উপর দিয়ে বাতাসের মতো বইতে লাগল।’
‘চক্রবর্তী রাজার অট্টহাসি’

কবিমনের রোমান্টিক পরিমণ্ডলে একটা শূন্যতাবোধ কাজ করে। শূন্যতাবোধের জ্বালায় ক্ষত-বিক্ষত কবিমানস তিরিশোত্তর আধুনিক কবিদেরও অতিক্রম করেছেন আল মাহমুদ। কেননা জাত গীতিময়তায় তিনি বিহারীলালের উত্তরসাধক। বাংলা কব্যে বিহারীলাল প্রথম গীতিকবির অন্তর্জ্বালার পরিচয় দিয়েছেন।
‘সর্বদা হু হু করে মন, বিশ্ব যেন মরার মতন
চারদিকে ঝালাপালা উহ্‌! কী দুরন্ত জ্বলা
অগ্নিকুণ্ডে পতঙ্গ পতন’
( সারদা মঙ্গল)

গীতিকবির অন্তর্বেদনাকে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন ‘অলৌকিক আনন্দের ভার বিধাতা যাহারে দেন? তার বক্ষে বেদনা অপার’। এই অপার বেদনাই গীতিকবির শিল্প সৃষ্টির উৎস। আল মাহমুদ এই বোধকে বলেছেন শূন্যতা। এই শূন্যতাকে পূর্ণতা দেন কবি কাব্যশিল্পের মাধ্যমে। লেখেন-
‘পংক্তি রিকে ভরেছি শূন্যতা
অজস্র সম্ভাব্য মিলে...।
অন্তরের অসহ্য বেদনার সুখ থেকে যেহেতু কবিতার উৎপত্তি
সেহেতু, কবিতা কষ্টের কলা
চতুর্দশ পদ লিখে কাঁদা
কে পড়ে ছিঁচকাঁদুনে পদ্য, পয়ারের মাত্রা ঠুকে বাঁধা।
 
এই জন্য আল মাহমুদ পদ্যের স্তূপ না গড়ে লিখেছেন শুধুই কবিতা। এই কবিতা শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন একটি আঙিনা, চেতনা ও বাক্যভঙ্গি প্রদান করে। এই কবি ১১ জুলাই ১৯৩৬ সালে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। তার পুরো নাম ছিল মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ।

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড