• বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস : এক ভিন্ন চিত্রের কারিগর

  বঙ্গ রাখাল

১০ জুলাই ২০১৯, ১৪:৫৫
ছবি
ছবি : কথাসাহিত্যক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একজন শক্তিশালী কথাসাহিত্যক যার লেখনিতে উঠে এসেছে- সমাজে ঘটে যাওয়া ভণ্ডামি, অসাড়তা আর তীর্যক দৃষ্টিকে আশ্রয় করে যারা সমাজের মানুষকে শোষণ করতে চায়, সেই সব সমাজের মানুষের জীবনেতিহাস। তিনি সমাজে ঘটে যাওয়া থিম বা কন্টেন্টকে ধারণ করে একের পর এক নির্মাণ করেছেন নতুন নতুন চিন্তাশীল সাহিত্য যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে সমাজের চিত্র প্রদর্শন করতে শেখায়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস দেশজ উপদানকে সম্বল করে ফলিয়েছেন সাহিত্যের ফসল যা একজন দক্ষ চাষির পক্ষ্যেই এত নিপূণ আর ঐশ্বর্য মণ্ডিত ফসল ফলানো সম্ভব। এমনিক দক্ষ চাষি ৫৩ বছরের জীবন কেউ নিবেদন করেছেন এই ফসল উৎপাদনের পেছনে। তাঁর সাহিত্য কর্ম সৃষ্টিতে তিনি করেছেন গভীর পরীক্ষা- নিরীক্ষা যার প্রতিফলিত রূপ তাঁর গল্প, উপন্যান এবং প্রবন্ধ গ্রন্থ।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর নিজস্ব মননশীলতাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বেছে নিলেন চলিত রীতির আঞ্চলিক কথ্য রীতিকে যার সঠিক ব্যবহার এবং উপমা, ক্রিয়াপদের সুষ্ঠ প্রয়োগ রীতির সাথে নৈপূণ্য প্রতীকের ব্যবহার তাঁর সাহিত্যকর্মকে আরও ঐশ্বর্য মণ্ডিত করে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছে। তাঁর নিজস্ব প্রকাশ ভঙ্গির মধ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে সমাজ বাস্তবতার চিরন্তর রূপ যা এক আদর্শিক কথা সাহিত্যিকের হাতের স্পর্শেই ডাল পালা ছড়িয়ে মহিরূহে বিকাশ লাভ করা সম্ভব।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের (১৯৪৩-১৯৯৬) জন্ম বগুড়ায়। তাঁর বিশ বছরের সাহিত্যময় জীবনে প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা সর্বমোট ৮টি। যার মধ্যে পাঁচটি গল্প গ্রন্থ, দুইটি উপন্যাস এবং একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ। অন্য ঘরে অন্য স্বর (১৯৭৬), খোয়ারী (১৯৮২), দুধ ভাতে উৎপাত (১৯৮৫), চিলে কোটার সেপাই (১৯৮৬), দোজখের ওম (১৯৮৯), খোয়াবনামা (১৯৯৬), জাল স্বপ্ন স্ব্প্নের জাল (১৯৯৭), সংস্কৃতির ভাঙ্গা সেতু (১৯৯৪)।

আখতারুজ্জামন ইলিয়াসের সাহিত্যকর্মে ঘুরে ফিরে উঠে এসেছে সমাজ নির্ভর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যা আমাদের জারিত বাস্তবমুখি সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। চিলে কোঠার সেপাই (১৯৮৬) তাঁর প্রথম এবং খোয়াবনামা (১৯৯৬) দ্বিতীয় ও শেষ উপন্যাস। খোয়াবনামার ঘটনা, স্থান কাল, পাত্র বা উপন্যাসের চরিত্র চিত্রায়ন ও করেছেন ঔপন্যাসিক পূর্ব বগুড়ার কাৎলাহার বিল এবং বিল পাড়ের মৎস্যজীবী আর শ্রবজীবী, ভূমিহীন কৃষকদের জীবনাখ্যানকে কেন্দ্র করে। উপন্যাস সৃষ্টির পূর্বে পরিকল্পনা বা তার কাঠামো নির্মাণ করে নিতে হয় যা লেখার পূর্ব পরিকল্পনা বলে বিবেচিত হয় এবং এই পরিকল্পনাকে আশ্রয় করেই সৃষ্টি হয় সুসৃষ্টি কর্ম। এটা হতে পারে লেখকের কোনো কল্পিত স্থান বা নিজের দেখা কোনো বাস্তবিক স্থান।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের এই খোয়াবনামা বা চিলে কোঠার সেপাই উপন্যাস দুইটি পড়লেই মগজে অনুধাবন করা যায় দুটি উপন্যাসের দুটি অঞ্চলে কী সুক্ষ্মতিসুক্ষ্ম বর্ণনা করা হয়েছে এবং সেই অঞ্চলের মানুষের হাসি-কান্না, দুঃখ-যন্ত্রণা, আন্দোলন সংগ্রামের কথা কত নৈপূণ্যের সাথে তিনি সমগ্রজাতির কথাই রূপান্তর করেছেন তা সহজেয় অনুমেয়। 

শিল্প তখনই শক্তিশালী শিল্পে রূপান্তরিত হতে পারে যখন নিজের হাসি কান্না, প্রত্যাশ-প্রাপ্তি, স্বপ্ন আর বাসনার কথা বা নিজের চিন্তা চেতনার কথা অন্যের অন্তরে প্রভাব ফেলে এবং তাকে ভাবিত করে তখনই সেটা মহত শিল্প হিসেবে পরিগণিত হয়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তেমনই একজন মহৎ সাহিত্য কর্মী যার প্রতিটি লেখায় পাঠককে প্রভাবিত করে। তাকে উল্লেখ করতে পারি বাংলা সাহিত্যের একজন মেধাবী সাহিত্যিক হিসেবে যা গল্প বা উপন্যাসের দিকে দৃষ্টিপাত করলেই এর সঠিক পরিচয় মেলে। তাঁর উপন্যাস বা গল্পের মানুষ জন রাজধানী ঢাকা শহরের উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে রিকশা চালক, শ্রমিক, ভূমিহীন কৃষক, মাঝি, চোরাচালানী কিংবা সমাজের সাধারণ মানুষজন। কিন্তু এখানে একটা কথা উল্লেখ যে, তিনি পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে কোনো কোনো আঞ্চলিক গোষ্ঠিকে উপস্থাপন করেছেন যা সমগ্র দেশকে খুঁজে পেলেও কোনো এক সময়কেই শুধুমাত্র ধারণ করে। সমগ্র সময়কে ইলিয়াসের সাহিত্যে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয় যে কারণে তাঁর সাহিত্য শুধুমাত্র অ্যাকাডেমিক্যাল পড়াশোনা এব্ং কোনো এক গোষ্ঠির কাছেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যা হবার কথা ছিল সামগ্রীক কিন্তু সেটার দাবি কতটুকুই তিনি পূরণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তবুও তিনি বাংলা সাহিত্যের আলাদা এক স্বর সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। যে কারণে সৃষ্টি করতে পেরেছেন ’খোয়াবনামার’ মতো সাধারণ মানুষের জীবন ঘনিষ্ঠ শিল্প । আমরা এ কর্মেও এক আলাদা গদ্যশৈলী সৃষ্টির আখতারুজ্জামানকে খুঁজে পাই । 

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের শিল্পকর্মে আমরা পরাবাস্তবতা, হতাশা, জীবনকে ভেঙে চুরে খণ্ড-বিখণ্ডের পরিচয় পাই যা কোনো এক সময়ের পরিচয় মেলে। তিনি তাঁর সাহিত্যে সময়কে ধরতে চেয়েছেন যে কারণে সময়কে চরিত্রের মূখ্য নায়ক বানিয়ে তিনি নিমার্ণ করেন গল্প, উপন্যাস। এ কারণেই সময়ের সাথে নিজেকে ভেঙেছেন এবং নতুনভাবে নিজেকে নিমার্ণ করেছেন। হতাশ হয়েছেন, প্রচণ্ড আঘাতে ভাঙতে চেয়েছেন মূল্যবোধকে আবার কঠোর জীবনবোধের জায়গা থেকে অন্বেষণ করেছেন মানবসমাজ আর মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে যা কখনো কখনো ইতিহাস নির্ভর হয়ে উঠতে পারে। তাঁর সাহিত্যে একটা সময়কে ধরার চেষ্টা থাকলেও এটা কিন্তু সামগ্রীক সময় নয় যা খণ্ডিত সময় হয়ে ফুটে উঠেছে যে কারণে তাঁর সাহিত্যে আমরা একটি খণ্ডিত সময়ের সঠিক বর্ণনা কিন্তু ঠিকই পাচ্ছি । যেমন-সেই সময়ের পূর্ব বগুড়ার মানুষের যাপিত জীবনসংগ্রাম, শ্রেণিসংগ্রাম, ধর্ম, জাত, পেশা ইত্যাদির পরিচয় পাচ্ছি। বর্তমানের সাথে সেই সময়কে কতটায় মেলাতে পেরেছি যা আজ অনেকটা আমাদের কাছে ইতিহাস সদৃশ্য।

‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের এক পরিপক্ক সাহিত্যের পূর্ণাঙ্গ চারণভূমি মনে হয়। এ চারণভূমিতে আবাস গড়েছে শোষিত চাষা, মাঝি, প্রান্তিক শ্রেণির সর্বহারা মানুষজন ও সামন্ত শ্রেণির ভূমি মালিক, বর্গাদার, বর্গাচাষি। এসব মানুষের জীবন সংগ্রামের দ্বন্দ্ব আর দ্বান্দ্বিকতাকে আশ্রয় করে এবং রাজনৈতিক অনুষঙ্গকে সঙ্গী করেই তৎকালীন সময়ে গ্রামীণ মানুষের সত্য জীবনলিপি হিসেবে পরিগণিত হয়ে উঠেছে ‘খোয়াবনামা’ এ উপন্যাসে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে কথাসাহিত্যিকের ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধ স্থানিকের ব্যবহার যা আমাদের প্রসিদ্ধ কালের সাক্ষী ইতিহাসকে ধারণ করে আছে।

পুণ্ড্রনগরী যা ইতিহাস প্রসিদ্ধ আজকের বগুড়াজেলার বিভিন্ন জনপদ। ঘটনার চরিত্র চিত্রায়নের জন্য বা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত্রে চরিত্রের পূর্ণতাবিকাশের স্বার্থে এসেছে - শেরপুর, সান্তাহার, জয়পুর, পাঁচবিবি বা নাটোরের বর্ণনা। এ উপন্যাসে মিথলজিক্যালের যথার্থ ব্যবহার বিদ্যামান যা বিশ্লেষণেরও দাবি রাখে। এ গ্রন্থের চরিত্র চেরাগ ও কুলসুম যাদের কথোপকথনে এর সত্যতার প্রমাণ মেলে-

মাদারি পাড়াত না তোমার দাদা পর দাদা ব্যাবাক মানুষের গোর আছে। একজন মানুষের কব্বর হয় কয় জায়গাত? হয় না তাও হয়। চেরাগ আলি নজির দেয়, শেরপুর একপীরের দুই মোকাম, দুই মাজার। একটা শির মোকাম, সেটি গোর দিছে পীর সাহেবের কাল্লাখানা। আরেকটা ধড়মোকাম সেটি আছে তেনার শরীলটা। দুষমনেপীর সাহেবকে কাটিছে দুই ছ্যাও কর‌্যা। গোরও হচ্ছে দুই জায়গাত। এক ক্রোশ তফাত। (পৃ.৩২)

‘খোয়াবনামা’র কাহিনি ঘটনাবিস্তার লাভ করেছে মূলত কাৎলাহার বিলের দুই পাড়ের গ্রাম গিরিরিডাঙ্গা এবং নিজগিরিডাঙ্গাকে কেন্দ্র করে। কাৎলাহার বিলের জমিদখল, কৃষককে ভূমিহীন করে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল তাদের একমাত্র লক্ষ্য। যেখানে মানবিকমূল্যের উপস্থিতি সঙ্কটাপন্ন। এ উপন্যাসের ক্যানভাসে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তেভাগা আন্দোলন, বিদ্রোহ, মুসলিমলীগ প্রতিষ্ঠা এমনকি পাকিস্তান আন্দোলনের ঘটনার আশ্রয়স্থান এই ‘খোয়াবনামা’। গিরিডাঙ্গা এবং নিজগিরিডাঙ্গার মানুষের জীবনযাত্রা, আচার-ব্যবহার সংস্কৃতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এখানকার পোড়াদহের মেলা যা গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির বিশাল স্থান দখল করে আছে। এই হাজার বছরের মেলাকে আশ্রয় করেই বেঁচে থাকে গ্রামীণ মানুষের লোকসংস্কৃতি যা মাঘ মাসেই গ্রামের বিভিন্ন স্থানে বসতে দেখা যায়। এ মেলায় আগমন ঘটে কৃষিজীবী, মৎস্যজীবী, কামার, কলু, কুমার, মুচি, মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান। যেখানে সবাই একই সম্পর্কের মমতায় যেন একত্রীভূত হয়ে ওঠে। এই গিরিডাঙ্গা বা নিজগিরিডাঙ্গার পার্শ্ববতী গ্রামগুলোতেও শীতের মৌসুমে মেলা বসে। মাঘের প্রথম বুধবার ‘এলাঙ্গীর’ মেলা, দ্বিতীয় বুধবার বকচর মেলা, তৃতীয় বুধবার তেকানী এবং চতুর্থ বুধবার অর্থাৎ শেষের বুধবার পোড়াদহের মেলা বসে। এ মেলার বিবরণ আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কাছ থেকেই শোনা যাক-পরশু পোড়াদহের মেলা। মেলা উপলক্ষে আশ-পাশের মেয়েরা এসে গেছে বাপের বাড়ি, জামাইরা এখনো আসেনি। পোড়াদহের চারিদিকের গ্রামগুলো মানুষজনে গিজগিজ করছে (পৃ.১৬১) ।


আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর লালায়িত স্বপ্নকে বাস্তবিক রুপ দিয়েছেন সাহিত্যকর্মে যা সর্বস্থানে সর্বজনিত হয়ে ওঠার পথে কিছুটা ম্লান হলেও বলব তাঁর নিজের আকাঙ্ক্ষা একসময় নিজের না থেকে তা সমষ্টিক আকাঙ্ক্ষায় রুপান্তিত হয়েছে। চিত্রকল্প নিমার্ণেও শিল্পী একজন সিদ্ধপুরুষ হিসেবে স্বার্থকতার পরিচয় দিয়েছেন যা আমাদের সাহিত্য সৃষ্টিতে নতুন করে ভাবিত করে ধর্মীয় গোড়ামী- অন্ধত্ব, কুসংস্কার আর ভণ্ডামীর বিরুদ্ধে আখতারুজ্জামানের অটুটতায় প্রমাণ করে তিনি কত বড় মহৎ সাহিত্যিক। তাঁর চিন্তাশক্তির প্রগাঢ়তায় তাকে শৈল্পিক উৎকর্ষতায় সাহায্য করেছে। যে কারনে তিনি সৃষ্টি করেন- ‘চিলেকোঠার সেপাই’-এর মতো হাড্ডিখিজির, আনোয়ার আলি কিংবা ‘খোয়াবনামা’র মুন্সি বায়তুল্লাহ, তমিজ কিংবা কুলসুমদের মতো চরিত্র আর বিষাদে নিমগ্ন হলে রেখেও আসতে পারেন কলকাতার হাসপাতালে নিজের রেখে আসা পা যেখানে লেগে থাকে বগুড়ার মাটি যে প্রেক্ষাপটে সৃষ্টি হয় ‘খোয়াবনামার ক্যানভাস’।

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড