• মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯, ৮ শ্রাবণ ১৪২৬  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন

‘তোমার শহর’ উপন্যাসের ৯ম পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস : তোমার শহর

  রোকেয়া আশা

২৫ জুন ২০১৯, ১৩:৩২
কবিতা
ছবি : প্রতীকী

টিএসসি ঢোকার মুখে পৌঁছেই দেখি, সম্রাট সিঁড়িতে বসে হাঁপাচ্ছে। ওর আশেপাশে কয়েকজন জটলা লাগিয়ে আছে। মোকাম্মেল ভাই প্রথমে দেখলো আমাকে। দেখার সাথেসাথেই বললেন,  ‘এই যে তুনু, তোমার বন্ধুকে নিয়ে যাও। ও তো ভয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ’

মোকাম্মেল ভাইয়ের মুখে আমার নাম শুনে সম্রাটও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। হাসে আমার আর তন্ময় ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে। মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আছে ওর। আমি সম্রাটের হাত ধরে টেনে তুলে মোকাম্মেল ভাইয়ের দিকে তাকাই আবার। পৌঢ় এই ভদ্রলোক আমাদের টিএসসির চাবি মাস্টার। এই টিএসসির সব রুমের চাবির দায়িত্বে ইনি। 
আমি মোকাম্মেল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘ওর কি হয়েছিলো?’
- তোমার বন্ধুকে দেখে বুলেট একটু বন্ধুত্ব করতে আসছিলো। তাতেই তোমার বন্ধু চিৎকার দিয়ে দুনিয়া মাথায় তুলে ফেলছে। 
মোকাম্মেল ভাইয়ের কথা শুনে আমি অন্তত সম্রাটের আচরণে অস্বাভাবিক কিছু পাই না। সম্রাট কুকুর ভয় পায়, জানি আমি। সত্যি বলতে, আমি নিজেও খুব ভয় পাই। সম্রাটকে আমি আর তন্ময় ভাইয়া আমাদের ক্লাব রুমে নিয়ে আসি আর কথা না বাড়িয়ে। 
রুমে এসে সম্রাটের দিকে পোস্টার পেপার আর মার্কার বাড়িয়ে দিই বললাম, ‘তুইও লেখ আমার সাথে।’
সম্রাট সাথেসাথে মুখ বাঁকিয়ে ফেলে এতগুলো পোস্টার হাতে লেখার কথা শুনে।

- কুকুর এত ভয় পাওয়ার মতন কিছুও কিন্তু না। 
তন্ময় ভাইয়ার কথা শুনে আমি আর সম্রাট ঝট করে মুখ তুলে ভাইয়ার দিকে তাকাই। ভাইয়া হাসে আমাদের দিকে তাকিয়ে। আবার বলতে থাকে, ‘মানুষের চাইতে কুকুর ভালো। একটা মানুষকে তুই সারাজীবন আগলে আগলে রাখবি, খাওয়াবি পরাবি - তারপরও সেই মানুষটা যে কখন তোর পিঠে ছুড়ি মারবে তুই টেরই পাবি না। আর একটা কুকুরকে তুই জাস্ট একদিন মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিবি, দেখিস ও তোর জন্য জান দিয়ে দেবে। জন্তু জানোয়ার বেঈমানী করে না রে, মানুষই বেঈমানী করে।’

আমি আর সম্রাট দু’জনই মনেমনে জানি, তন্ময় ভাইয়ার প্রত্যেকটা কথাই খুব বাস্তব। অথচ সব জেনেও, বারবার প্রতারিত হয়েও আমরা কেন যেন আবার কোথাও না কোথাও কিছু মানুষকে বিশ্বাস করতে চাই। 

দরজায় ছায়া পড়েছে কারও। আমি না দেখেও বলে দিতে পারি, এটা নিবিড় ভাইই। ছায়াতেও সেই একই অগোছালো চুল, একই দাঁড়ানোর ভঙ্গি, একই আদল। আমি তাকাই না তার দিকে, তার ছায়ার দিকেই তাকিয়ে থাকি, কেন যেন ভালো লাগে। মানুষটার ছায়ার একাংশ আমার হাতের ওপর এসে পড়েছে। 
ছায়াটা এগোয় আরও; এগুতে এগুতে ছায়াটা ছোট হতে থাকে। তিনি এসে আমার সামনে বসেন। মুখোমুখি।
- কি লিখছিস তুনু? 
- ভূগোল।  
নিবিড় ভাই আমার উত্তর শুনে ভ্রু কুঁচকায় প্রথমে। তারপর ফিক করে হেসে ফেলে। 
- তোর ফিচকামির অভ্যাসটা যাবে না তুনু? 
আমি খুব নিরীহ মুখ করে সরল গলায় উত্তর দেই, ‘আমার মত এত নিষ্পাপ একটা মেয়েকে ফিচকা ভাবলে আপনার পাপ হবে।’
আমার এবারের কথায় ঘরটায় থাকা বাকি তিনজনই হাসতে শুরু করে এবার। 
সম্রাট হাসতে হাসতে বলে উঠলো, ‘তুনু তুই নিষ্পাপ? আমি তাহলে এখনো পৃথিবীতে জন্মই নেই নি।’

আমরা খুব হাসিখুশি ভাবেই এখানে কাজ চালিয়ে যেতে পারতাম। ঝামেলাটা হয়ে গেলো তন্ময় ভাইয়া আমার হাতে একটা খালি বোতল ধরিয়ে দিয়ে পানি আনতে বলার পর। আমি বোতলটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে এক পা বাড়ানোর পরেই হঠাৎ টের পেলাম, আমার আশপাশের সব অন্ধকার লাগছে। এটাকে সম্ভবত জ্ঞান হারানোও বলে না। আমি চোখ মেলে তাকাতে পারছি না, আমি শরীরের কোন অংশ নড়াতে পারছি না। এক অদ্ভুত অসাড়তা ঘিরে ধরেছে আমাকে। যদিও, আমি বেশ বুঝতে পারছি আমাকে নিয়ে আমার পাশে থাকা তিনজন খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে; উঁচুগলায় কথা বলছে ওরা। বিরক্ত লাগছে আমার। একটু আস্তে কথা বলতে পারে না ওরা? 

কতক্ষণ পার হয়েছে এরপর জানি না; চোখ খুলে দেখি আমার মাথাটা সুরভী আপুর কোলে। আপুর তো এখন টিএসসি থাকার কথা না। এখানে কি করছে তাহলে? আমি বেশি কিছু ভাবার সময় পাই না। আমাকে চোখ খুলতে দেখেই আমার পাশ থেকে আরও চারজোড়া চোখ আমার মুখের ওপর স্থির হয়। 

তন্ময় ভাইয়া বললো, ‘তোকে জিজ্ঞেস করছিলাম জ্বর আসছে নাকি, মিথ্যা কেন বললি তখন?’
আমি তন্ময় ভাইয়ার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ারও সময় পাই না; তার আগেই নিবিড় ভাই গলাটাকে খুব রুক্ষ করে প্রশ্ন করে, ‘গতকাল রাতে আমি আপনাকে একটা টেক্সট করেছিলাম। আপনি কি সেটা পড়েছিলেন নীলিমা?’

নিবিড় ভাইয়ের মুখে ‘আপনি’ আর ‘নীলিমা’ শুনেই বাকিরাও বুঝে গেছে, ভাই যথেষ্ট খেপে আছে। আমার সামনে এখন এই তোপ থেকে বাঁচার সহজ রাস্তা একটাই। আমি মুখটা যতটুকু সম্ভব করুণ করে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে আবার চোখ বন্ধ করে ফেলি।

(চলবে...)

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড