• মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৬ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

গল্প : অপরিচিত

  কামরুন কেয়া

১৫ জুন ২০১৯, ১৪:৩৩
গল্প
ছবি : প্রতীকী

ঘুম ভেঙেই চমকে উঠল আতশি, কাল রাতেও তো সবকিছু  ঠিক ছিল। এখন সকাল বেলা হঠাৎ করে কি হলো তার। সামনে সবকিছু অন্ধকার তার। চিৎকার করে কাউকে ডাকতে চাইল। ডেকে উঠল কিন্তু কেউ শুনেছে বলে মনে হয় না। আশে পাশের কোন শব্দও পাচ্ছেনা সে। কোথায় গেল সবাই? আস্তে আস্তে ডাকল তার বাবাকে।

- বাবা, বাবা। তুমি কোথায়?

কোনো শব্দ নেই। এবার ভয় পেতে লাগল সে। আস্তে আস্তে নিচে হাতড়াতে লাগল। এটা ভেবে অবাক  গেল সে তার স্পষ্ট মনে আছে কাল রাতে সে বিছানায় ঘুমিয়েছিল। কিন্তু এখন সে শক্ত মাটির ওপর। 

কিন্তু সব থেকে ভয়াবহ বিষয়টা সে এর পরপরই বুঝতে পারল। সে তার হাত অনুভব করতে পারছেনা। বুকের ভেতর দিয়ে হিমশীতল কিছু একটা চলে গেল। সে পুরোপুরি ভাবে জমে গেল তখন যখন সে বুঝতে পারল আসলে সে তার কোনো অঙ্গই অনুভব করতে পারছেনা। সে ভাবছিল, ‘আমি কি মরে গেছি?’

যদি তাই হয় তাহলে এই যে চিন্তা করছি এটা কীভাবে সম্ভব? আচ্ছা এমন কি হয়েছে যে কোনো দুর্ঘটনায় আমি কোমায় চলে গেছি। নাহ আর ভাবতে পারছেনাও। আস্তে আস্তে আবার ডাকল আতশি, ‘কেউ কি আছে আশেপাশে?’ 
- কে? এইমাত্র কে কথা বলল?
- আমি আতশি। আপনি কে? আর আপনাকে আমি দেখতে পাচ্ছিনা কেন?
- মানে কি? আমি নিজেও তো আপনাকে দেখতে পারছিনা। কোথায় আপনি?
- আমি কোথায় তাতো বলতে পারছি না। তার আগে বলুন আপনি কে আর এখানে কিভাবে এলেন? আর আমার বাবা কোথায়? সবথেকে বড় কথা আমার কি করেছেন আপনি? 
- আমি নিহাল। আসলে আমি নিজেও বুঝতে পারছিনা এখানে কি করছি। আমি নিজেই ফেঁসে আছি আর আপনার কি করবো আমি বলুন?

আতশি এবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পরলো। এখন কি হবে? কি করবে সে? হঠাৎ কাকে জানি একটু দূরে তাদের নিয়ে কথা বলতে শুনলো তারা।

ঠিক সেই মুহূর্তে লিট তার ল্যাবে বসে মানব প্রজাতির দুইটা মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করছিল। হটাৎ সে খেয়াল করলো মস্তিষ্ক দুটির নিউরন গুলো কম্পিত হচ্ছে!



আতশি শুনতে পেলকে যেন কথা বলছে। কিন্তু তারা কি নিয়ে কথা বলছিল এবং সেসব কথার অর্থ সে কিছুই বুঝতে পারছেনা। শুধু  দুই’টা কণ্ঠ শুনছিল সে।

কথাবার্তাগুলো অনেকটা এরকম-

- আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা। এটা তো কখনোই সম্ভব নয় । তোমার কি মনে হয়? কোন টেকনিক্যাল ফল্ট নয় তো?
- আমিও তো কিছুই বুঝতেছিনা । এই দুইটা থেকে কখনোই ডাটা ট্রান্সফার হওয়া সম্ভব নয়। আমাদের কোথাও ভুল হচ্ছে
- ভুল? তুমি এটাকে ভুল বলছো? তুমিও দেখেছ আমিও দেখেছি এখানে একটু আগে ডাটা ট্রান্সফার হচ্ছিল। কিন্তু এটা কখনোই হওয়ার কথা ছিল না ।
- আমাদের কি অনুষ্ঠুক কে খবর দেওয়া উচিত?
- না থাক । আমার মনে  হয় আমরা নিজেরাই এটাকে কন্ট্রোল করতে পারবো। তাছাড়া এখন তো আর কিছু হচ্ছেনা।।

তারপর আস্তে আস্তে কথা গুলো দূরে সরে যেতে লাগলো । একসময় আর কিছু শুনতে পারল না।

কতক্ষণ সময় ধরে আতশি এখানে আছে বুঝতে পারছেনা। একটু আগে সে নিহাল নামে  যার সাথে কথা বলছিল সেই মানুষ টা সত্যি কি না সে এখনো বুঝতে পারছেনা।  কিন্তু সে তো  স্পষ্ট শুনেছে। এভাবে থাকার কোন মানে হয়না। বাবার কথা মনে পড়ছে তার। বাবা কোথায় আছে কে জানে। নিশ্চয়ই এতক্ষণে বাবা তাকে খুঁজতে বেরিয়েছে। বাবার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখটার কথা ভেবে আতশির অনেক মায়া হল।

ঠিক এই মুহূর্তে আব্দুল হাকিম সাহেব হাসপাতালে তার মেয়ের নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে ছল ছল চোখে তাকিয়ে আছেন। একটু আগে ডাক্তার যা বললো তা তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। Ischemic stroke এর কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। তার মেয়ে আর নেই।  তখনই পাশে এসে দাঁড়ালেন তার স্ত্রী নীলা রহমান । অফিস থেকে তার মেয়ে র অসুস্থতার জন্য সোজা হাসপাতালে চলে এসেছেন। 

কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, ‘কি হয়েছে  আমার আতশির?’


লিট আর অনুষ্ঠুক এর মধ্যে কথা হচ্ছে। অনুষ্ঠুক এই ল্যাবের প্রধান গবেষণা কর্মী। তার অধীনে লিট, নিপু সহ আরো দশ জন গবেষণার কাজ করে।

টিরিন প্রজাতির প্রধান নবলিক, তার সর্বাধীনেই  তারা সবাই কাজ করে। নবলিকের অনুমতির  বাইরে তারা কিছু  করতে পারেনা। এই  মুহূর্তে অনুষ্ঠুক লিট আর নিপুর উপর প্রচণ্ড রেগে আছে।

মস্তিষ্ক দুটি থেকে যে ডাটা ট্রান্সফার হচ্ছিল, সেটা তারা তৎক্ষণাৎ তাকে জানায়নি। এই রাগ তারই ফল।

- তোমরা  এত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় আমাকে জানাওনি কেন? 

- ভুল হয়ে গেছে অনুষ্ঠুক। আমরা বুঝতে পারিনি।

- ভুল হলে গেছে বললে তো হবেনা । দাড়াও আমি দেখছি । আইটেম দুটো কোথায়? 

- ল্যাবেই আছে।
- আচ্ছা চল গিয়ে দেখি।

কত টা সময় গেছে আতশি বুঝতে পারছেনা।কারো কোন কথা ও শুনতে পারছেনা। অনেকবার সে নিহাল নামের ছেলেটাকে ডাকলো কিন্তু কেউ শুনেছে বলে মনে হয় না। কোন সাড়া শব্দ নেই। অগ্যতা সে চুপ মেরে গেল। তারও অনেকক্ষণ পর সে কিছু শুনতে পেল।

- কই এখন তো কিছু হচ্ছেনা। সব তো ঠিকই আছে ।

- কিন্তু তখন হচ্ছিল। আমি আর নিপু স্পষ্ট দেখেছি।।

- তাহলে তুমি এখানেই থাকো । আবার সেরকম  হলে সাথে সাথে আমাকে ডেকে আনবে ।

- জ্বি। ঠিক আছে।

অন্য কোন সময় হলে আতশি এটা কখনোই বিশ্বাস করতো না। কিন্তু এখন সে করছে। এই সব কিছু তার সাথে ঘটছে। আবার ডাকার চেষ্টা করলো। 
- শুনছেন? আপনি কি আমাকে শুনতে পারছেন? নিহাল?

- জ্বি পারছি। বলুন!

- এতক্ষণ আওয়াজ দেন নি কেন?

- কারণ আমিও এতক্ষণ আপনাকে ডাকছিলাম, কিন্তু আপনি শুনতে পাননি...….

ঠিক তখনই লিট উদাস হয়ে ল্যাবের দক্ষিণ দিকের এক মাত্র জানালাটার দিকে তাকিয়ে ছিল। তা না হলে  এখন তার অনুষ্ঠুকের কাছে যাওয়া উচিত ছিল কারণ মস্তিষ্ক দুটির  নিউরন আবার কম্পিত হচ্ছে....


একটু চুপচাপ থাকার পর যখন আতশি আর নিহাল কথা বলছিল তখনো লিট জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। আতশি বলছিল, ‘আচ্ছা, সময় কাটছেনা কেন? কতটা সময় গেছে তাও বুঝতে পারছিনা। আপনি কি আমাকে একটু হেল্প করবেন?’ 

নিহাল বললো, ‘আমি নিজেই গোলধাঁধায় পড়েছি। আপনাকে আবার কি হেল্প করবো। সেই পরিস্থিতিতে আমি এখন নাই।’

- আমরা এখানে আসলাম কিভাবে? কেই বা আমাদের কে এনেছে? 

- জানিনা। আর জানার চেষ্টাও  করছিনা।

- কেন?

- জানলেই  বা কি করতে পারবো। আমার শরীর অনুভব করছি না।

- এইযে যারা কথা বলছে তারা কে? তারাই কি আমাদের এখানে এনেছে?

- হতে পারে।

- আপনি কাল কে রাতে , মানে এখানে আসার আগে কোথায় ছিলেন।

- ধান ক্ষেতে। শুয়ে শুয়ে পোকার ডাক শুনছিলাম।  সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম থেকে উঠেই দেখি এই অবস্থা।

- আমার খুব খারাপ লাগছে। বাবা মার জন্য মন খারাপ লাগছে। আপনার লাগছেনা?
-  আমার মনে পড়ার জন্য কেউ নাই। তবে খারাপ লাগছে না। বিষয় টা খুবই ইন্টারেস্টিং বলে মনে হচ্ছে।  এইযে আমরা কথা বলছি এই বিষয় টাও অবাক করার মত। আমরা দুইজন পাশাপাশি আছি , দুই জনকে শুনছি কিন্তু দেখছিনা। 

- সেটা আপনি ঠিক বলেছেন। আচ্ছা, এখন থেকে বের হয়ে আমরা কি দুজন দুজনকে দেখতে পাবো? আমার কেন জানি আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করছে।

- দেখতে পারি আবার নাও পেতে পারি। জীবন বড় অদ্ভুত। যাকে দেখার জন্য চোখ জ্বলে যায় তাকে দেখিনা অথচ কতশত অচেনা মানুষ কে দেখে বেড়াই ।

আতশির মনে হল এই যে নিহাল নামের মানুষটি একজন হতাশাবাদী মানুষ। আবার এমনও হতে পারে সে অনেকটা হিমু টাইপের। কিন্তু তার কথা বলার ধরন ভালো লেগেছে  আতশির। খানিকটা ইতস্তত করে সে আবার বলল, ‘আচ্ছা আপনার বয়স কত?’

ছেলেটার পাশ থেকে একটু মৃদু হাসির শব্দ শোনা গেল। কিন্তু কোন উত্তর  না পেয়ে হতাশ হল খানিকটা। লিট জানালার পাশ থেকে সরে পূর্ব দিকের টেবিলটায় চোখ রাখলো। আর তখনই সে কিছু একটা বুঝতে পারলো। সে তাড়াহুড়ো করে বের হয়ে গেল। সম্ভবত সে অনুষ্ঠুক কে ডাকতে গেল।


অনুষ্ঠুক তাড়াহুড়ো করে আসলো। সত্যি সত্যিই এটা হচ্ছে। অবাক হয়ে তাকাল সে।  তার ছয় শত বছরের  অভিজ্ঞতায়  এমন কখনোই দেখেনি সে। মস্তিষ্ক দুটি নিয়ে আসা হয়েছে গবেষণার কাজে। টিরিন রা যেন মানুষ প্রজাতিকে বুঝতে পারে। কিন্তু মস্তিষ্ক দুটি বেচেঁ আছে। যেভাবেই হোক তারা দুজনই যোগাযোগ করছে একে অপরের সাথে।

সে  ধুপ করে বসে পড়ে ভাবলো মনে মনে বললো, ‘এটা হতে পারে না। আর এটা হলেও আমার কিছু করা উচিত।’ 

লিটের দিকে তাকিয়ে সে কিছু একটা দেখলো। লিট তাকে কিছু একটা বুঝতে চাচ্ছে। 

লিট বললো, ‘আমরা যদি কিছু একটা করি তাদের জন্য?’
অনুষ্ঠুক বললো, ‘তুমি যা বলছো তো কি তুমি করতে পারবে?’
- গত দশ বছর থেকে তো আমি এই বিষয় এই গবেষণা করছি। নতুন প্রাণ সৃষ্টি। আর এখানে তো প্রাণ আছেই। আমাদের শুধু  নতুন কোষ তৈরি করতে হবে। তারপর তাদের আগের শরীর ফিরিয়ে দিতে হবে।
- ঠিক আছে। তাহলে কাজ শুরু করে দেও।

তারপর হাতের কাজগুলো সেরে লিট মানব প্রজাতিকে এই উপহার দেওয়ার কাজে লেগে গেল।

আতশির মৃত্যুর দশ দিন হয়ে গেছে। তার  বাবা মা এখনো শোকের সাগরে ডুবে আছে। আত্মীয় স্বজনের মধ্যে যারা এসেছিল সবাই কোলে গেছে । শুধু আতশির নানী আর ফুপু আছেন। তারা কয়েক দিন পরে যাওয়ার চিন্তা করছেন। ওর মা নীলা শুয়ে শুয়ে মৃত মেয়ের ছবি দেখছেন আর কান্না করছেন। আর ওর বাবা সোফায় বসে আছেন শুকনো মুখে। বাবারা তো মায়েদের মত কান্না করতে পারেন না। কলিংবেল বেজে উঠল। বিরস মুখে হাকিম সাহেব দরজা খুলতে গেলেন। দরজা খুলেই তার বুকটা ধক করে উঠলো। তার সামনে দাড়িয়ে আছে আতশি। আর তার হাত ধরে অপরূপ সুন্দর দেবশিশু দের মত একটি ছেলে দাড়িয়ে আছে।

আতসি আস্তে করে বলে উঠল, ‘বাবা!’

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড