• মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯, ৪ আষাঢ় ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

‘ডায়েরি’-এর ৫ম পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস : ডায়েরি

  তাবাস্সুম মুন ১৩ জুন ২০১৯, ০৯:৪৫

গল্প
উপন্যাসছবি : আপসারা ওরিন (নিশা)

চাঁদ বলে ‘আকাশ কে? আমি মাথা ঘুরে কিভাবে পড়লাম, আমি তো ঠিক ছিলাম। সত্যি করে বলুন আমাকে ধরে এনেছেন এখানে। প্লিজ কিছু করবেন না আমার সাথে’।

রোকসানা বলেন, আরে মেয়ে ভয় পেয়ো না, আমরা তোমাকে ধরে আনিনি। আর ঐযে দেখো লেকের ওই জায়গাটায় তুমি বসে ছিলে। আর এই লেকটার পাশেই আমার বাসা। 

আমি বাসায় যাবো।

যেও তবে এখন না আমাকে তোমার মা ভাবতে পারো। আর তুমি এখন অসুস্থ। তোমার সাথে আমার অনেক কথা আছে এখন একটু খেয়ে নেও। আর তোমার বাসায় ফোন দিয়ে বলো যে তুমি আজ আসবেনা। আজকে তুমি এখানে থাকবে তোমার কোনো ভয় নেই।এইটা আমার বাড়ি এখানে আমি আর আমার ছেলে থাকি, তুমি কেনো ভয় পাচ্ছো আমি বুঝতেছি। এখানে তুমি অনেক নিরাপদ থাকবে।

চাঁদ কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। খুব সাহস করে বলে,আচ্ছা আমি থাকবো এখানে তবে আন্টি আপনি আমার সাথে থাকতে হবে,আর আমার ফোনটা আমার ব্যাগে ছিলো ব্যাগটা কোথায়। চাঁদ ব্যাগ চাওয়ার সাথে সাথে আকাশ ব্যাগটা চাঁদকে দিয়ে বলে, এই নেও তোমার ব্যাগ। 

চাঁদ আকাশের দিকে এই প্রথম তাকিয়ে চোখ ফিরাতে পারেনা। এতো সুন্দর হালকা খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি সাথে চুলগুলোতে কোনো অংশে নায়কদের থেকে কম না, টি-শার্টে রংটা একদম গায়ের সাথে মিশে গেছে মনে হচ্ছে তার সামনে বলিউডের কোনো মডেল না হয় ফেইরি টেলসের কোনো রাজকুমার, এতটা সুন্দর ছেলেরা দেখল  হয় তার ধারনার বাহিরে। আসলে চাঁদ এতদিন ছেলেদের থেকে দুরে থাকতো, বলতে গেলে তার ছেলেদের প্রতি তার একধরনের এলার্জি কাজ করতো। তার বান্ধবীরা দিনে হাজারটা ক্রাশ খেতে খেতে এইটা ওদের রুটিন হয়ে গেছিলো।কিন্তু চাঁদ এইসব নিয়ে মোটেও ভাবতো না সে শুধু পড়ালেখা করতেই ভালোবাসতো।ছেলেরা কতো প্রেমপত্র দিয়েছে সব নাকচ করে দিতো বলে কতো ব্যঙ্গাত্মক কথা শুনতে হতো। যেমন, ‘বেশি সুন্দর বলে নাকি সে এইসব ছেলেদের কদর করে না, তার নাকি নায়ক লাগবে।’ চাঁদ এসব কথা গায়েও নিতো না। ছেলেদের দিকে তাকাতেও কেমন লাগতো তার।কিন্তু আজ আকাশকে দেখে তার তাকিয়ে থাকতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে।

আকাশ চাঁদ এর চাহনি দেখে বলে, কি হলো এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো। এতক্ষণ তো আমাকে ভয় পাচ্ছিলে আর এখন।

চাঁদ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলে, ককককই কিছুনা, দিন ব্যাগটা। চাঁদ ব্যাগ নিয়ে ফোন দেয় নিশিকে আর সবটা জানায়।নিশি বলে সকালে এসে তাকে নিয়ে যাবে আর চাঁদ এর বাবা মাকে নিশিই ফোন দিয়ে জানাবে যে আজ চাঁদ নিশির বাসায়।

চাঁদ ফোনে কথা বলছে আর আকাশ চাঁদ এর অনবরত চলা ঠোঁট  দুটির দিকে লোভনীয়ভাবে তাকিয়ে আছে।এতো সুন্দর করে কোনো মেয়ের  ঠোটগুলোকে চলতে পারে সে আগে তো বুঝতোই না। একটা ঠোঁট আরেকটা ঠোঁটকে আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে।   আকাশ কখনো কোনো মেয়ের দিকে মোটেও পর্যবেক্ষণ করেনি কিন্তু আজ ইচ্ছে করছে এই ঠোঁট গুলোতে ডুব দিতে। রোকসানা বেগম তার ছেলের চাহনিকে বুঝার চেষ্টায় আছেন। তিনি বেশ বুঝতেও পারছে,তার ছেলেটা ঠিক প্রেমে পড়েছে।

চাঁদ ফোন রাখার পর আড়চোখে আকাশকে দেখে রোকসানা বেগমের সাথে কথা বলতে থাকে।রোকসানা বেগম চাঁদকে নিজ হাতে খাইয়ে দেন, তা দেখে চাঁদ এর চোখে পানি এসে পড়ে। তার মাও তো তাকে এভাবে খাইয়ে দেয়। মহিলাটা কি সত্যি ভালো এতক্ষণে পুরো মেয়ে বানিয়ে ফেলছে তাকে।

চাঁদ এতক্ষণে খেয়াল করে সে অন্য জামা পড়ে আছে। তার জামা কোথায়, আসলে আন্টি আমার জামাটা কই আর এ জামাতো আমার না। আমার সাথে...

রোকসানা বেগম চাঁদ এর কথা থামিয়ে বলেন, এই পিচ্চিটা শুন তোরই জামা এগুলো। আমি দিয়েছি আর তোর জামা আমি চেন্স করে দিয়েছি ভয় পাস না। এত ভয় পাস কেনো বলতো। আর তুই এখানে এই লেকে প্রতিদিন কি করিস। আমাকে বলতো? এটা আমার অনুরোধ না আদেশ আমাকে তোর সব সমস্যা না বললে বাসায় যেতে দিবো না।

চাঁদ বলে, কই আমি তো এমনি এখানে বসে থাকি। কিছুই করিনা, এমনি বসতে আসি।

রোকসানা বলেন, চুপ আমায় মিথ্যে বলবি না। বল।

আসলে আন্টি আমি একটু রেস্ট নিতে চাই।  

রোকসানা বেগম চাঁদ এর মনের অবস্থা বুঝে বলেন, আচ্ছা তুই রেস্ট নে। পরে বলিস সব। আর মনে রাখবি আমি তোর মা। আমি কিন্তু সব জানতে চাই। 

চাঁদ কিছুনা না বলে একসাইড হয়ে শুয়ে পড়ে।

আকাশ এতক্ষণ দাড়িয়ে সব কথা শুনে, তার এতরাগ উঠে চাঁদের উপর। বললে কি হয় এখন। পরে বলবে।আমি শুনার জন্য অস্থির হচ্ছি আর সে পরে বলবে।

রোকসানা বেগম আকাশকে বাহিরে ডেকে এনে বলে, তুই অন্য রুমে গিয়ে ঘুমা আমি ওর সাথে আছি চিন্তা করিস না । আমি সব জানবোই।

মা কিচ্ছু বাদ রাখবে না ওর প্রথম থেকে শেষ সব জানতে চাই, না হলে আমার ঘুম আসবেনা। 

আচ্ছা, তাই নাকি আমার ছেলে কারো জন্য এতটা চিন্তা করতে এই প্রথম দেখছি আমি। আর আমার ছেলের পছন্দ এতো সুন্দর আমিতো জানতামই না। এখন গিয়ে ঘুমা ওকে আমি দেখে রাখছি। আর চাইলে রাতে এসে দেখে যেতে পারিস। 

সারারাত রোকসানা বেগম চাঁদ এর পাশে বসে চাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন।সে জেনো তার একটা মেয়ে পুতুল পেয়েছে এতোটা আদর করছেন। চাঁদ শুয়ে শুয়ে চোখের পানি ফেলছে। রোকসানা বেগম জিজ্ঞেস করেন,কিরে চাঁদ কাঁদছিস কেনো। 

চাঁদ বলে, কই আন্টি না তো এমনি।

রোকসানা বলেন,আমাকে কি মা বলা যায় না।আমি কিন্তু অনেক কিছু জানি তোর পড়া অফ তোর বাবা অসুস্থ, তুই জবের নাম দিয়ে এখানে বসে থাকিস কেনো। চাঁদ চমকিয়ে উঠে বলে, আন্টি আপনি জানলেন কিভাবে। 

রোকসানা বলেন, সেটা না হয় পড়ে বলি আগে বল তোর সব কথা।চাঁদ আস্তে আস্তে তার জীবনের কথা সব বলতে থাকে। বিভিন্ন জায়গায় চাকরি নিতে গিয়ে তাকে কতো পশুর সম্মুখীন হতে হয় সব বলছে। রাস্তা ঘাটে ছেলেরা তার একা হাটা নিয়ে কতো উপহাস করে, তাকে তাদের থেকে কতো কষ্টে বেচে থাকতে হয় তা বলতে গিয়ে কান্না করে দেয়। রোকসানা বেগম চাঁদ এর দিকে অপলকভাবে তাকিয়ে থাকেন, এইটুকু মেয়ে একা সংসার চালাচ্ছে সাথে জীবন যুদ্ধ ও করছে। রোকসানা চাঁদকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে বলেন,মা আর চিন্তা নেই তোর এই মা আছে তোর আর একা পথ চলতে হবেনা। এখন ঘুমা আর একটা কথা তোর চোখে যাতে আর পানি না দেখি।

চাঁদ হাসবে না কাঁদবে ভেবে পায়না রোকসানা বেগমের পায়ের উপর মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে।

রোকসানা আর চাঁদ এর সাথে আরও একজন চোখের পানি ফেলতে ব্যস্ত সে আর কেউনা আকাশ।রাতে আকাশ চাঁদকে দেখতে এসেছিলো দরজার বাহির থেকে চাঁদ এর কথা শুনে থেমে যায়।মেয়েটার জীবনটা এতো কষ্টের। এইটুকু জীবনে এতো যুদ্ধ সে করছে। মেয়টা ডাক্তার হতে চায় তাও পারছেনা। আমি একজন ছেলে হয়ে পড়ালেখা শেষ করে তারপর সংসারের দায়িত্ব নিয়েছি আর এই মেয়েটার বয়স আঠারো কি উনিশ হবে এই বয়সে সে সংসার চালাচ্ছে সাথে সবার কাছে মিথ্যে বলে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।আকাশের ইচ্ছে করছে মানুষরূপে পশুগুলোকে যারা চাঁদএর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে তাদের খুঁজে খুঁজে এখনি কিছু করতে তার চাঁদ এর উপর হাত দিয়েছে।মনে মনে আকাশ আজ শপথ নিয়েছে,হাটতে দিবে না একা তার চাঁদকে। পাশে থাকবে তার দরকার হলে নিজের কাছে নিয়ে আসবে। ওর স্বপ্ন পুড়ন করবে, চাঁদ আবার পড়া শুরু করবে। ওই মায়াবী চোখে যে পানি মানায় না। 

সকাল নয়টা। চাঁদ লাফ দিয়ে উঠে সে ভেবেছিলো সে বাসায়। তাড়াতাড়ি বাহির হতে হবে কিন্তু উঠে সামনে আকাশকে দেখে কাল রাতের কথা মনে পড়ে।

আকাশ কফি নিয়ে এসে চাঁদ এর সামনে রেখে বলে।তা ম্যাডামের কি ঘুম ভেঙেছে? এরকম লাফ দিলে কেনো?

আসলে, না মানে আমি ভেবেছিলাম বাসায় আছি। বাহিরে বের হতে হবে।তাই উঠে পড়ি।

আচ্ছা শুনো এখন থেকে কোথাও বসে থাকা লাগবেনা বুঝলে।

মানে?

রোকসানা বেগম রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলেন, ‘মানে হচ্ছে তুই প্রতিদিন আমার বাসায় আসবি আমার কাছে থাকবি। আর হুম্ম তোর টাকার কোনো চিন্তা করতে হবেনা।মনে কর তুই আমকে দেখাশুনা করবি গল্প করবি এটাই তোর জব।তোর পরিবারের কথা চিন্তা করতে হবেনা বুঝলি আর মানা করতে পারবি না। আর হম একটা কথা এখন থেকে তোর পড়ালেখাও শুরু হবে। ডাক্তার কিন্তু তোকে হতেই হবে। পারবি না এই মায়ের স্বপ্নপূরন করতে।’

চাঁদ হা হয়ে আছে। কি শুনছে সে। সে চাকরি পেয়েছে তার পরিবার এখন ভালো থাকবে। সে আবার পড়বে। চাঁদ ফুফিয়ে কেঁদে দেয়। আপনারা আমাকে দয়া করছেন। তাতেও হবে, আমার পরিবার ভালো থাকলে আমি দয়াও মেনে নিবো।

আকাশ বলে, এই মেয়ে কাঁদো কেনো। আমরা কি বলেছি তোমাকে দয়া করছি, আর কখনো এটা ভাববে না। তোমাকে চাকরি দিয়েছি সেই অনুযায়ী তুমি বেতন পাবে। আর কাঁদবে না।মা বলো তো মেয়েটাকে ওকে যাতে কাঁদতে না দেখি। এই বলে আকাশ চলে যায়, কারণ চাঁদ এর চোখের পানি আকাশ দেখতে পারছেনা।

রোকসানা বেগম চাঁদ এর কাছে এসে বলে, এই পাগলি কাঁদে কেউ এভাবে। কখনো কাঁদবিনা তোর কাঁদার দিন শেষ। আর শোন ফ্রেশ হয়ে আয় খাবার খেয়ে বাসায় যাবি আকাশ দিয়ে আসবে।

আকাশ আর চাঁদ গাড়িতে করে চাঁদ এর বাড়ি যাচ্ছে। আকাশ আড় চোখে চাঁদকে পরখ করে যাচ্ছে। চাঁদ গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে আছে চুলগুলো মুখের উপর উড়ছে।আকাশ অনেকক্ষণ ধরে নিজেকে সামলাতে পারছেনা তাই না পেরে চাঁদ এর চুলগুলো সরিয়ে দেয়। আচমকা আকাশের স্পর্শ  চাঁদ পেয়ে নড়ে উঠে।এ প্রথম কোনো ছেলের স্পর্শ পেয়েছে চাঁদ। 

আকাশ চাঁদ এর অবস্থা দেখে মুচকি হেসে দিয়ে গাড়ি চালাতে থাকে। চাঁদদের বাসার সামনে এসে আকাশ গাড়ি থামালে চাঁদ নেমে পড়ে আশেপাশের লোকগুলো কেমন করে তাকিয়ে আছে।প্রতিবেশীদের একটাই স্বভাব নিজের ঘরের খবর রাখে না কিন্তু পাশের বাসায় কি হইতেছে সব খবর রাখতেছে।চাঁদ এর বেলায়ও তা হচ্ছে। এই প্রতিবেশীরাই তার জীবনটাকে পাল্টে দিবে তা কি সে জানতো? সামনে যে তার কি হতে যাচ্ছে হয়তো সেও জানেনা।হয়তো ভালো কি, হয়তো খারাপ। 

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড