• শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

পুতুল নাচের ইতিকথা : এক বৃহদায়তন উপন্যাসের জৈবনিক বিস্তার

  জামি জাহান

১৯ মে ২০১৯, ১০:৪৬
পুতুল নাচের ইতিকথা

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিক্ষার শ্রেষ্ঠ ফসল তাঁর পুতুল নাচের ইতিকথা উপন্যাস। এই উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে গাওদিয়া গ্রাম। সেখান থেকে খাল পথে বাজিতপুর যাতায়ত চলে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র শশী ডাক্তার। উপন্যাসের কাহিনী শুরু হয়েছে হারু ঘোষকে দিয়ে। আদরের মেয়ে মতির জন্য সে পাত্র দেখতে গিয়েছিল। ফেরার সময় বজ্রপাতে অপঘাতে মারা গেল। শশী শহর থেকে গোবর্ধনের নৌকায় ফিরছিল। নৌকা থেকে সে দেখতে পায় গাছের সাথে ভূতের মতো এক লোক ঠেস দিয়ে দাড়িয়ে আছে। সে ডাক দেয় কিন্তু সাড়া পায় না। কাছে গিয়ে দেখে হারু ঘোষ মৃত। গ্রামে লোক দিয়ে খবর পাঠায়। লোকজন এসে শ্মশানে নিয়ে যায়। হারু এর মেয়ে মতির জ্বর,  শশী তাকে দেখতে বাড়ির পথে পা বাড়ায়।  

রসালো ফলের মতো রং, প্রতিমার মতো নিখুঁত মুখ মতির। সে গ্রাম্য কুসংস্কারাচ্ছন্ন মেয়ে। তার খুব ইচ্ছা বড়লোক বাড়িতে শশীর মতো বরের সাথে তার বিয়ে হবে।যাত্রাদলের কুমুদের সাথে মতির প্রথম দেখা হয় তালপুকুরের ধারে। পরে যাত্রার মঞ্চে কুমুদকে দেখে মতি বিস্মিত হয়। তার মনে হয় কুমুদ রক্ত মাংসে মানুষ নয়, সে রাজপুত্র। গাওদিয়া ছেড়ে গেছে কুমুদ। শুধু মাত্র তাকে খুজতেই, মতি শশীর সাথে কলকাতায় যায়। কিন্তু কাউকে বুঝতে দেয়নি। হারু ঘোষের সাথে মারা যায় বাসুদেব বাড়ুজ্জের নাতি ভূতো। তার মৃত্যু হয় জামগাছের মগডাল থেকে পড়ে।শশীর বাড়ির আশ্রিতা মেয়ে ক্ষেমী আতুড় ঘরে ঢুকে নিউমোনিয়ায় মারা যায়। গোপাল হলো শশীর বাবা। গাওদিয়াতে প্রচুর জমিজমার মালিক তিনি। গ্রামে খুব শক্ত অবস্থান তার। অল্পবয়স্কা সেনদিদিকে সে বয়স্ক যাদবের কাছে মোটা অঙ্কের টাকায় বিক্রি করেছে। তার নিজের মেয়ে বিন্দুকে বিয়ে দিয়েছে, নন্দকে ফাঁদে ফেলে। পুত্রের সাথে তার বিরোধ। সূর্যবিজ্ঞানে বিশেষজ্ঞ যাদব পন্ডিত। তার মতে সে মারা যাবে রথের দিন। সত্যিই মারা গেলেন আত্নহত্যা করে । যামিনী বিখ্যাত কবিরাজ, বহুদূর হতে তাকে চিকিৎসার জন্য ডাকে।

শশী এ গল্পের নায়ক এটা ধরাই যায়। সে কলকাতা ফেরত ডাক্তার। তার বাবা গোপাল, গাওদিয়া গ্রামের শক্ত ভিতে তার প্রতিষ্ঠা। তার বেশ বদনাম আছে, এমন কি সেনদিদির সাথে সম্পর্ক নিয়েও কানাঘুষা চলছে। কুমুদ শশীর বন্ধু সে গাওয়াদিয়া গ্রামে আসে যাত্রা দলের সাথে। এখানে এসে মতির সাথে তার কথা হয়। মতি কুমুদকে আকৃষ্ট করে। কুমুদ গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। মতি কলকাতা শহরে যায় এবং ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। হারুর পুত্রবধু কুসুম হলেও তার দ্বিতীয় অস্তিত্ব হলো, সে শশীর প্রেমিকা। শশীর মাঝে উত্তাপ খোঁজে। অনন্ত বাবুর তিন মেয়ের মধ্যে ছোট মেয়ে কসুম। সে হারুঘোষের পুত্র পরানের বৌ। তার সাথে শশীর দেখা হয় মতিকে দেখতে  গিয়ে।কুসুমকে গায়ের লোকে পাগল মনে করে। আসলে কুসুম পাগল নয়।  তার ননদ মতি কে যখন শশী দেখতে আসে, তখন তার খুব হিংসা হয়। পাগলামী করে শশীর জন্য। শশীকে ছোটবাবু সম্মোদন করে। শশীর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়লেও কুসুম তার জন্য অপেক্ষা করেছে। ভালবাসার উষ্ণ প্রবাহ একসময় কোনদিকে দাবিত হয়েছে তা পাঠকই ভালো বুঝবেন। 

পুতুল নাচের ইতিকথার মাঝে আক্ষরিক অর্থে পুতুল নাচের কোনো কাহিনী নেই। কিন্তু মানুষ গুলো যে কি করে পুতুলের মতো নেচে বেড়ায়। আড়াল থেকে কেউ একজন কলকাটি নাড়ছেন। তার প্রকাশিত হয়।এখানে শুধু পুতুল দের কথা ব্যক্ত হয় নি, বরং মানুষ স্বত্বার মধ্য দিয়ে মানুষ ও পুতুলের দ্বৈরত নির্মান করেছেন। এই উপন্যাসের আর একটি দিক হলো, প্রতিটি চরিত্র একই সাথে দুটো জীবনযাপন করে। শশী কি কুসুম কে ভালোবাসে না? বাসে। তার চরিত্রের দুটো ভাগ-একটাতে তার আবেগ, কল্পনা।  অন্য দিকে বাস্তবতা। কুসুমকে পুরোপুরি প্রশ্রয় দেয় না ঠিকই কিন্তু, সে একদিন না এলেই সে ব্যাকুল হয়। যুগ্ম অস্তিত্বের আরো উদাহারন আছে উপন্যাসে।
তাছাড়া শশীর সাথে কুসুম এর কথপকথন, অসাধান।  বই শেষে ঠিক কার দিকে মন পড়ে থাকে তা বুঝা মুসকিল। উপন্যাসের যে কয়টা অংশ আছে তার প্রতিটাতে প্রধান হলো শশী। তারই অনুভবে অভিজ্ঞতায় ওগুলো দানা বেধেছে। 

কুসুম এর বাবা শশীকে বলেছেন, "সংসারে মানুষ চায় এক হয় আর এক, চিরকাল এমনি দেখে আসছি ডাক্তার বাবু। পুতল বৈ তো নই আমরা, একজন আড়ালে বসে খেলাচ্ছেন।"

লেখক বোঝাতে চেয়েছেন, প্রতিটি মানুষই আত্নকাম, নিজের লোভ এবং আকাঙ্ক্ষার দ্বারাই সে পরিচালিত। এখানে মানুষ  মানুষের শত্রু না হলেও বিরোধী।মানুষ এই আত্মকামনার কারনেই নিজেকে নিয়ে খেলে। যে খেলায় সে যেমন খেলনা,  তেমনি খেলোয়াড়ও। মানুষ নিজেই নিজের নিয়ামক। এই নিজেকে নিয়ে খেলার ইতিহাসই পুতুল নাচের ইতিহাস। 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যতম ঔপন্যাসিক। পুতুল নাচের ইতিকথা তার শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম। পুতুল নাচের ইতিকথা বৃহদায়তন উপন্যাস, মহাকাব্যের মতোই এর জৈবনিক বিস্তার, অসংখ্য মানুষ এবং অসংখ্য মানসিক গঠনের মানুষ এই উপন্যাসে ভিড় করেছে। এখানকার প্রতিটি মানুষ নিজেদের স্বার্থ আর নিজেদের আকাঙ্ক্ষা দ্বারা পরিচালিত।

বই সম্পর্কে বিস্তারিত: 

নাম: পুতুল নাচের ইতিকথা
লেখক: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
ধরন: উপন্যাস
মূল্য: ১৮০
পৃষ্ঠা: ১৬৫
প্রকাশক: ঝিনুক প্রকাশনী
 

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড