• সোমবার, ২৭ মে ২০১৯, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬  |   ৩৬ °সে
  • বেটা ভার্সন

গল্প : অবেলায়

  নিরব আহমেদ ইমন ১৪ মে ২০১৯, ১১:১৩

গল্প
ছবি : প্রতীকী

জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। মাথা সোজা করে দাঁড় করাতে পারছে না। নিজের মাথার ওজন নিজেই বহন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা শুরু করেছে। কাজের ফাঁকে বিশ্রাম নেয়ার জন্য বাড়ির দক্ষিণ পাশে সুপারি গাছের তৈরি বেলকুনিতে বসলো। সুপারি গাছের সাথে মাথা হেলিয়ে দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় বসে শরীরের অজানা এক তীব্র যন্ত্রণায় লুকিয়ে লুকিয়ে চোখের জল ফেলছে।

কেউ নেই ওর আপন। কাকেই বা নিজের দুঃখের কথা বলে মনের মধ্যে প্রশান্তি বোধ করবে। ওর কথা শোনার মতো কেউ নেই। এত বড় পৃথিবীতে ও এখন নিঃস্ব। থাকবেও বা কেমন করে! যার মা নেই তার কেউ নেই। দূরসম্পর্কের এক খালার বাসায় কাজ করে খেতে হয়। জিতুর যখন ৭ বছর বয়স তখন ওর মা ক্যান্সার রোগে জিতুকে আর ওর বাবাকে রেখে চলে যায় না ফেরার দেশে। বাবার যৌবনবয়স শেষ হয়নি বলে মেয়েকে অন্যের বাড়ি কাজ করতে দিয়ে নিজে একটা নতুন বিয়ে করে সুখে-শান্তিতে ঘর করছে। মেয়ে কেমন আছে?, কিভাবে থাকে?, কি খায়? এসব দেখার প্রয়োজন মনে করে না!

মধ্যাহ্নসূর্য পূর্ব আকাশ থেকে মাথার উপরে এসে অবস্থান করে দুপুর নিয়ে আসলো। রৌদ্রতেজ আরো তীব্র হওয়ায় সুপারি গাছের বেলকুনি থেকে উঠে ঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। সারা শরীরে এক ভয়ংকর তীব্রতর ব্যথা। মাথার যন্ত্রণায় পা যেন সামনের দিকে এগোচ্ছে না। কোনো রকমে ঘরের সামনে আসছে। ঘরের সামনে আসতেই চোখ পড়লো ওর খালার দিকে। রক্তবর্ণ চোখের চাহনি। এলো চুলগুলো হালকা বাতাসে উড়ছে। ফুটবলের মতো মাথা, মার্বেলের মতো রক্তবর্ণ দুটি চোখ। হাত মেহেন্দি পাতা দিয়ে থপথপে লাল করা। পুষ্ট পুষ্ট দুটো ঠোঁটে লাল লিপস্টিক দিয়ে পূর্ণ। হাত ভরা চুড়ি বড় বড় নখ আবার রং ও করেছে তাতে। সব মিলিয়ে যেন এক আধুনিক শাঁকচুন্নি এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। বুড়ি হয়ে গেছে এখনো মরার ভয় নেই। সারাদিন শুধু সাজগোজ নিয়েই পড়ে থাকে। আর ঘরের সব কাজ জিতুকে দিয়েই করায়। ছোট মেয়েটিকে কখনো ভালো খাবার ও দেয় না পর্যন্ত । সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ।

কতগুলো খেয়ে এখন হাতে থালাবাসন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জিতুর সামনে। সারা শরীর সাজসজ্জাকরণ করে জিতুকে দিয়ে থালাবাসন ধোয়াচ্ছে। দুপুর হয়ে গেছে মেয়েটা খেয়েছে নাকি সেটা দেখারও প্রয়োজন নেই। নিজে কতগুলো খেয়ে ক্ষুধার্ত, অসুস্থ মেয়েটাকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে।

সূর্যের তীব্রগম্ভীর তেজ। টলমল চোখের দৃষ্টি। ক্ষুধার্ত পেট, অসুস্থ শরীর নিয়ে বারবার মিনতি করলেও হেরে যাচ্ছে। বারবার খালাকে ওর অসুস্থতার কথা বলছে। খালা যেন এখন ওর কথা কানেই তুলছে না। তার একটাই কথা ‘ঘরের কাজ না করলে খাবার বন্ধ।’ জিতুর প্রত্যেকটা মিনতির শেষে খালার একটাই কথা ‘কাজ না করলে খাবার বন্ধ।’

নিরুপায়ের মতো টলমলায়মান মায়া মাখা চোখের দৃষ্টি, শরীরের সব যন্ত্রণাদায়ক ব্যথা কে লুকিয়ে রেখে স্পন্দনশীল হাত বাড়িয়ে দিয়ে থালাবাসন নিয়ে চলে গেল পুকুরপাড়ে। সেই পুকুরপাড় যে পুকুরের ঘাটে বসে কাটিয়েছে জীবনের দুঃসময় কিছু মুহূর্ত। এটা সে পুকুরপাড় যেখানে মায়ের কথা মনে পড়লে সবাইকে লুকিয়ে একলা এসে চোখের জল ফেলতো।

আজ আবার ও সেই মুহূর্তের সাথে সাক্ষাৎ হলো। মরন্ত যন্ত্রণা নিয়ে চোখের জলের সাথে পুকুরের জলকে একাকার করে তুলছে। কোনো রকম থালাবাসন ধুয়ে ঘরে চলে আসলো। খালা এখনও সাজগোজ নিয়ে ব্যস্ত । ক্ষুধার তাড়নায় পেটের মধ্যে যেন এক যুদ্ধ শুরু হতে লাগলো। জ্বর, স্বাদহীন মুখে খাওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও পেটের মধ্যে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে তাকে থামানোর জন্য অল্প কিছু মুখে দিতে হবে। ঘরে ভাত ছাড়া কিছুই নেই। খালার তিন বছরের এক ছেলে আর স্বামী নিয়েই সংসার। তাই এক বেলায় যা রান্না করে তা খেয়ে যদি অবশিষ্ট থাকে সেটাই জিতুর জন্য রাখা হয়। আর অবশিষ্ট না থাকলে সেদিন শুধু ভাত পানি দিয়ে চালিয়ে দিতে হয়।

আজও ঘরে সরিষা ইলিশ রান্না হয়েছে। জিতুর প্রিয় খাবার এটা। মায়ের হাতে সরিষা ইলিশ খাওয়ার কতই না বায়না ছিল। আজ বায়না করলেও বায়নার ইচ্ছে পূরণ করার মতো কেউ নেই। আজ বায়না করেও কোনো লাভ হবে না।

আজ অবশিষ্ট ছিল না বলে সরিষা ইলিশ খাওয়া হলো না। এখন আপসোস করে কি বা হবে! গরম ভাত, ভাতের সাথে ঘরে থাকা মিঠে আর নারিকেলকোরা দিয়ে চালিয়ে দিতে হয়েছে। জ্বরভাব শরীরে স্বাদহীন মুখে নারিকেল মিঠে দিয়ে খাওয়ার কোনো বাসনা না থাকলেও ক্ষুধার টানে দু’মুটো পেটে দিতে হচ্ছে।

জ্বর নিয়েও আজ অনেক কাজ করেছে। এখন শরীরটা খারাপ। খালাকে বলার পরেও জিতুর কথার কোনো মূল্যায়ন করলো না। বেলা বাড়ার সাথে সাথে শরীরের অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকে। ঘরের বারান্দায় আধ ভাঙা খাট। এখানেই ওর থাকার স্থান। সারা শরীরে এক অদ্ভুত রকম ব্যথার অনুভূতি নিয়ে ভাঙা খাটের উপরে শুয়ে আছে। ব্যথার তাড়নায় চিৎকার করছে। চিৎকারের শব্দ খালা বা ঘরের অন্য কারো কানে গিয়ে পৌঁছায় না। ঘরে আছে খালা আর তার ছেলে । তার স্বামী রহমত মিয়া ব্যবসার কাজের জন্য শহরে গেছেন। আর তার ছেলে রাফি এখনো ছোট।

পাষাণহৃদয় খালা চিৎকারের শব্দ শুনলেও আসবে না। অসহনীয় ব্যথা নিয়ে বিকেল কাটিয়ে দিলো। এই অসুস্থতার মধ্যে হাজারো মিনতির পরেও খালাকে পাশে পেলো না মেয়েটি। বাবাকে একটিবার দেখার জন্য খালার কাছে অনেক বার মিনতি করেছে। খালা এর জন্য জিতুর উপর রেগে গিয়ে বকাঝকা করেছে। তাই গ্রামের অন্য লোকদের দিয়ে বাবাকে খবর দেয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেটাও পারেনি এই জল্লাদী খালার জন্য। এখন আড়ালে লুকিয়ে কান্না করা ছাড়া কোনো পথ নেই ওর কাছে।

সন্ধ্যা নামলো, আমাবস্যার রাত। চারিপাশে নিকষ কালো অন্ধকার। শব্দহীন এক পরিবেশে শনশন বাতাস বইছে। ঘরের কোনে চালে কানা কুয়োর ডাক, মনেতে এক শঙ্কার সৃষ্টি করছে। ঘরেতে হারিকেনের নিবুনিবু আলো জ্বলছে। বিকেল থেকে শরীরের শেষ ক্ষমতাবল হারিয়ে বারান্দায় বিছানাতেই শুয়ে আছে। জ্বরে শরীরের অবস্থা খারাপ । চোখ মুখে এক লালচে বর্ণ ধরেছে। আজ মাকে বড্ড মনে পড়ছে। আজ মা বেঁচে থাকলে হয়তো এমন অবহেলার মাঝে পড়তে হতো না। খুব ইচ্ছে করছে মায়ের কাছে চলে যেতে। মায়ের সাথে থাকতে। মায়ের হাত থেকে একটু স্পর্শ পেতে। মায়ের হাত ধরে চিরচেনা সেই দিনগুলোকে ফিরে পেতে।মাকে একটু দেখতে ইচ্ছে করছে। আর ভালো লাগে না এই অবহেলা।

বাবা টা আজ নিখোঁজ। সে তার পরিবারকে নিয়ে সুখেই আছে তাই আজ আমার কথা মনে পড়ছে না। খালাকেও কতবার বললাম বাবাকে আমার অসুস্থতার কথা জানাতে কিন্তু সে কোনো কথাই শুনলো না আমার। আবার একাবার মায়ের হাতের ভাত আর বাবার স্নেহরূপটা দেখতে ইচ্ছে করছে। খুব ইচ্ছে করছে। হয়তো কখনো সম্ভব না। মাকে জড়িয়ে ধরে যদি আর একটিবার কাঁদতে পারতাম, সেটা তো কখনই সম্ভব না। বাবা তো পারতো একটি বার আমার খোঁজ নিতে। আজ সুখে আছে বলে নিজের মেয়েকেই ভুলে গেছে।

বাবা তোমাকে আজ শেষবারের মতো একটিবার দেখতে ইচ্ছে করছিল। তুমি আজ পারলে না আমার শেষ ইচ্ছেটি পূরণ করতে। কতদিন হলো তোমাকে দেখি না। তোমার কাছে কিছু চাই না। আজ একটিবার দেখতে চেয়েছিলাম সেটাও পারলাম না। পৃথিবী নামক এই গ্রহটিতে আমার সুখ লেখা নেই। তোমাকে চিরতরে শেষবারের মতো মুক্তি দিয়ে চলে যাচ্ছি। ভালো থেকো নতুনত্ব নিয়ে।

মা তোমাকে আজ খুব মনে পড়ছে। আমি খুব তাড়াতাড়ি তোমার কাছে চলে আসবো। এ গ্রহে আমি বড্ড একা অবহেলিত এক জীব। আমি তোমার কাছে আসতে চাই। তোমার বুকে মাথা রেখে সুখ পাখি আর সুখ তারার গল্প শুনতে চাই। তুমি কি আমায় শুনাবে না সেই ছোট্ট বেলার মতো তোমার বুকে মাথা রেখে সুখ পাখি আর সুখ তারার গল্প? নাকি তুমিও এদের মতো আমায় অবহেলার চাদরে মুড়ে রাখবে? জানি সেটা কখনো পারবে না। আমি তোমার কাছে আসতে চাই। তোমার কাছে থাকতে চাই।

গলাটা শুকিয়ে শরীরটা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে খুব পানির পিপাসা পেয়েছে। শরীরে এক অজানা ভয়ংকর যন্ত্রণায় চিৎকার করে খালাকে ডাক দিল জিতু। ভয়ংকর চিৎকারের শব্দে পাষাণহৃদয় খালা ঘর থেকে এসে জিতুর পাশে দাঁড়ালো। জীতুর অবস্থা দেখে খালা ভয় পেয়ে গেল। খালাকে দেখে জিতু আধোআধো ভাবে বলতে মুরু করলো, ‘খালা তোমাকে অনেক কষ্ট দিছি অনেক জ্বালাইছি। তোমার মন মতো সব কাজ করতে পারিনি। যদি কখনো কোনো ভুল করে থাকি তাহলে ক্ষমা করে দিও। আমি আজ তোমাদের মুক্তি দিতে চাই।’

অনর্গল কথাগুলো বলে অধশোয়া অবস্থায় বিছানায় বমি করে দিল। খালার বুঝতে পারে জীতুর অবস্থা প্রচণ্ড খারাপ। একা একা কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি। জিতুকে একটু পানি খায়িয়ে,পরিষ্কার করে, হারিকেন জিতুর কাছে রেখে অন্ধকারের মধ্যে পাশের বাড়ির রিয়াদের মা কে ডেকে আনতে চলে যায়। কিন্তু আসতে একটু দেরি হয়ে গেলো। সারা বছর যে অবহেলার অনাদর এর মধ্যে বড় হয়েছে। যাকে সারা বছর অবহেলার মধ্যে রেখেছে তাকে শেষ বারের মতো ও একটু রক্ষা করতে পারলো না। পাষাণহৃদয় খালার পাষাণমূর্তি ভেঙ্গে পাষাণীকতার ইতি টেনে কাজল মাখা দু-চোঁখ দিয়ে টলমল করে ঝর্নার মতো জল বইছে। ওই চিরদিনের মত বন্ধ হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে কেন জানি আজ এক অজানা মায়ার সৃষ্টি হচ্ছে।

খালা আর কান্না থামিয়ে রাখতে না পেরে নিজের ভুলের কথা শিকার করে চিৎকার করে কান্না করছে। খালার চিৎকার শুনে আশেপাশের বাড়ি থেকে লোকজন এসে ভিড় পড়ে গেছে। আশেপাশের বাড়ির মহিলা জিতুর অকাল মৃত্যুর কথা শুনে কান্না থামিয়ে রাখতে পারেনি। সবার মুখে আজ একটাই কথা, ‘মেয়েটি খুব শান্তশিষ্ট ভদ্র ও ভালো ছিল।’

সেই অবহেলিত অনাদরণীয় মেয়েটি আজ পাষাণহৃদয়ের খালার পাষাণীকতার ইতি ঘটিয়ে সবার চোখে জল এনে চিরদিনের মতো চলে গেল না ফেরার দেশে। সকালবেলা জিতুর বাবকে খবর দেয়া হয়। বাবা এসে মেয়েকে প্রথমে দেখে দু-এক ফোঁটা জল ফেলে। অনাদরি মেয়েটিকে আজ খুব আদরের সাথে গরম জল ও বড়ই পাতা দিয়ে গোসল করিয়ে চারিপাশে সুগন্ধি ছড়িয়ে চিরদিনের মতো বিদায় দিয়ে মায়ের কবরের পাশে শুইয়ে রাখা হয়।

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড