• শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

ছোটগল্প : কোথায় হারিয়ে মানবতা

  নাসিম আহমেদ রিয়াদ

১৩ মে ২০১৯, ১০:৪২
গল্প
ছবি : প্রতীকী

প্রত্যেক দিন গল্প লেখা আর আজকের গল্প লেখাটা অন্যরকম। কি লিখবো খুঁজে পাচ্ছিনা। পাশে বসা রনি ভাইকে বললাম, ‘ভাই মাথায় কিছুই কাজ করছেনা?’
- কি ভাবছিস নাসিম?
- ভাইয়া একটা গল্প লিখবো কিন্তু খুঁজে পাচ্ছিনা থিমটা।
- তোকে আজ একটা গল্প বলবো, এই গল্পটা হয়তো ঘটেছিলো, প্রায় বছর চল্লিশেক আগে, আমাকে বাড়ীর পাশের এক কাকু বলেছিল!
- আমার মনে হয়না গল্পটা আমি লিখতে পারবো, রনি ভাই যেভাবে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলে।

আমি একদম অন্যরকম একটা ছেলে কেউ কোন কাজ করতে বললে একদম মনোযোগ দিয়ে করি এবং গল্প শোনার ব্যাপরটা শুধু আমিনা প্রায় সকলেই অনেক মনোযোগ দিয়ে শুনে। আমি টেবিলের উপরে বসে গালে হাত দিয়ে শুনতে লাগলাম, সে এক অন্য রকম অনুভূতি। রনি ভাইয়া বলতে শুরু করলো!

আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে আমাদের সিরাজগঞ্জ বাজার স্টেশনের প্লাটফর্মে প্রায় অনেক অসহায়, সুবিধা বঞ্চিত পাগলরা থাকতো, অনেকেই আবার ভিটেমাটি হীন। ট্রেনে ঢাকা থেকে আসতো প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আবার হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করতো ট্রেনে। সন্ধা হলেই প্লাটফর্মের লাইটের আলোয় আলোকিত হয়। ঝকঝক শব্দ করে ট্রেন আসে। ট্রনের প্লাটফর্মে সারাদিন যাত্রীদের কাছে থেকে সাহায্য এবং রাত্রিতে একটা কাঁথা এবং বালিশের উপরে সারাটারাত্রি কাটাতো অনেক অসহায়, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষেরা। অনেকে ট্রেনে প্লাটফর্ম দিয়েছে ছোট মুদিখানার দোকান কেউ বা জুতা পালিশের দোকান দিয়ে কোন মতো খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছে। তেমনি একটি অসহায় পাগলি মা এবং মেয়ে থাকতো ট্রেনের প্লাটফর্মে সারা দিন মা-মেয়ে টাকা চায়তো যাত্রীদের কাছে থেকে। যে টাকা দিতো সেটা দিয়ে কিছু দোকান থেকে কিনে খেতো মা-মেয়ে। মা টা শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং মেয়ে টা কথা বলতে পারে না বোবা কনে একটু কম শোনে। মেয়েটা নাম পরী, বয়স এই বছী পনের হবে। পরনে ধূলা বালী ভরা একখানা জামা, চুলগুলা এলো মেলো দেখতে শুনতে চলে মোটামোটি।

প্রত্যেক দিনের মতো সেদিন ও দুপুরে ট্রেন থামলো স্টেশনে। পরী তখন ট্রেনের দরজার কাছে গিয়ে হাজির। মুখ দিয়ে কথা বলতে পারেনা। কিন্তু হাতের ইশারায় বুঝাতে পরে যে সে ক্ষুধার্ত। সে ট্রেনে দরজার সকল যাত্রীর কাছে হাত পাতলো। কেউ কেউ মায়া করে সাহায্য করে কেউবা ফিরেয়ে দেয় তাকে। পরীর আসলে বাবার কোন পরিচয় নেই সে জানেনা তার বাবাকে, দেশে অনেক জানোয়ারের মতো মানুষ রুপে পশু আছে তাদের মধ্য একজন হয়তো তার বাবা। সে নিয়ে এলাকার কোন মানুষের কথা শুনতে হয়না করন, ওর মা একজন পাগলি, শারীরিক প্রতিবন্ধী।

প্রায় বিকেল হয়ে গেল, পরী সকলের কাছে ইশারায় সাহয্য চেয়ে মাত্র পেয়েছে ২০ টাকা। সে সেইটাকা নিয়ে বাজরের ভিতরে করিম চাচার মোগলাই এর দোকানে গেল। করিম চাচার দোকানটা একমাত্র দোকান যেখানে বসে যাত্রীরা ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা করে এবং কেউ টিভি দেখে কেউবা পেপার পরে সেখানে চা এবং মোগলাই বিক্রি করে করিম চাচা। পরী ওর কুড়ি টাকা নিয়ে করিম চাচার দোকানে গিয়ে হাজির। করিম চাচা মোগলাই ভাজছে গরম করাইয়ে ইশারায় পরী করিম চাচাকে কুড়ি টাকা দেখিয়ে বলছে...
- চাচা আমাকে একটা মোগলাই দিন?
- এটার দাম ৪০ টাকা আর কই? 
- পরী হাত দিয়ে দেখিয়ে বলছে দিন না চাচা, আমার কাছ আর নেই, এই বলে পরী মোগলাইয়ে হাত দিতেই।
- যাবি এখন থেকে, না হলে ঘার ধরে বের করে দিবো?
- তখন পরীর মন টা খারাপ হয়ে গেল, তবুও হাত পেতে রইল।

পাশেই বসে অজ্ঞত এক যুবক চা খাচ্ছে এবং পেপার পড়ছে, সে তখন পরীর দিকে তাকালো, কু-দৃষ্টিতে আর বলল
- করিম ভাই, বোবা মেয়ে দিয়ে দিন ও যান আমি বিলটা পরিশোধ করে দিবো।
তখন পরী হাতে মোগলাই পেয়ে অন্যরকম খুশি হলো। অপলক দৃষ্টিতে অজ্ঞত যুবক তাকিয়ে রয়েছে পরীর দিকে। পরী মোগলাই খেতে খেতে প্লাটফর্মে চলে গেল। রাত্রী ঘনিয়ে আসলো, পরী এবং ওর মা কাঁথাতে ঘুমালো।

পরের দিন সকালে আযান দিতে না দিতেই, পরীর ঘুম ভাঙ্গল। একটু পরেই সকালের মিষ্টি আলো চারদিক ছড়িয়ে পড়লো। নিত্য দিনের মতো চুলাতে রান্না করলো ওর মা ও তারপর দুজন প্লাটফর্মে বসে সেটা খেলো। নিত্য দিনের মতো পরী আজও পরী অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে বের হল। কিছুক্ষন পর ট্রেন আসলো, পরী সহায্য চাইতে লাগলো সকল যাত্রীর কাছে। তারপর পরী টাকাটা ওর মায়ের কাছে দিয়ে এলো।

তারপর পরী গ্রামের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল এমন সময় একজন হাওয়ায় মিঠাইওয়ালাকে দেখে পরী তার পিছু পিছু যেতে লাগলো। অনেকই টাকা দিয়ে কিনছে, আর পরী শুধু দেখছে। ঝুনঝুনির শব্দে বাচ্চারা কিনতে আসছে দল বেধে। এভাবে সে গ্রামের রফিক স্যারের বাড়ীর সমনে যেতে না যেতেই দেখে সে অজ্ঞত মানুষটাকে। দূর থেকে দেখে বলতেছে এটা তো সেই মেয়েটা। 
- এই হাওয়ায় মিঠাই এ মেয়ে এখানে কেন?
- আর বইলেন না বাবা সেই বাজার থেকে আমার পিছু ধরেছে আর ছাড়ছে না। কাছে নেই টাকা আবার হাওয়ায় মিঠাই।
- চাচা ও যা চায় দিয়ে দাও? টাকা আমি দিচ্ছি।
- হাওয়ায় মিঠাই ওয়ালা বলল এই নাও এখন তো ফিরে যাও?
- ইশারায় পরী ধন্যবাদ দিলো।
- তুই কোথায় থাকিস?
- অজ্ঞাত মানুষটাকে পরী বুঝিয়ে দিলো সে স্টেশনে থাকে।
এই বলে পরী হাটটে থাকে হাওয়ায় মিঠাই খেতে খেতে। অজ্ঞাত লোকটি পিছন থেকে পরীকে কু-নজরে দেখতে লাগলো এবং ধিরে ধিরে কি যেন বলতে লাগলো। রাস্তা দিয়ে হাটার সময় হঠাৎ মতি পাগল গাছ থেকে লাফ দিয়ে পরীর হাত থেকে ছিনিয়ে, হাওয়ায় মিঠাই নিয়ে গেল পরী ভয় পেয়ে গেল।

সন্ধা ঘনিয়ে এলো পরী এবং ওর মা নিত্যদিনের মতো আজও কাঁথাতে শুয়ে পরলো। পরী তখন ঘুমিয়ে পড়েছে, এমন সময় অজ্ঞাত লোকটা এসে হাজির।
- পরীকে গায়ে হাত দিতেই পরীর ঘুম ভেঙ্গে গেল।
- এই চল ঐ দিকে তোকে অনেক খাবার কিনে দিবো [ইশারায়]
পরীর মনে কোন ভয় নেই করণ সে এরা আগে অনেক কিছু কিনে দিয়েছে। কিছু না ভেবে পরী তার পিছু পিছু যেতে লাগলো অন্ধকারে।

একটু দূরে যেতেই কালি মুন্দির যেখানে সন্ধার পর কেউ যায় না একা। এমন জায়গাতে অজ্ঞাত লোকটা নিয়ে গেল চারিদিক অন্ধকার এবং জংঙ্গলে ভরা চারিদিক। পরী তোকে অনেক খাবার দিবো একটা কথাও বলবিনা। যা করবো চুপ করে থাকবি এই বলে একজন নর পশুর মতো পরীর শরীরে ঝাঁপিয়ে পরলো লোকটি। পরী তখন অসহায় না পরছে চিৎকার করতে কারণ সে বোবা। কিছুক্ষণ পর লোকটা শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে চলে গেল। পরী মাটিতে পড়ে রইল, কিছুক্ষণ পর হাটতে থাকলো চুল গুলো এলোমেলো। এই সমাজ টা কিছু অসহায় মানুষের জন্যে বড়ই নিষ্ঠুর। 
একটু পর পরীর মায়ের ঘুম ভাঙ্গতেই দেখে কাছে পরী নেই। ওর মা চিৎকার করতে লাগলো আমার পরী? আমার পরী?
একটু পরে পরী এসে হাজির, অসহায় মানুষের আর্তনাদ।
- এই পরী কোথায় গেছিলি?
ওর মায়েকে বুঝিয়ে দিলো ইশারায় কি অমানবিক কাজটা ঘটেছে ওর সাথে। পরীকে জড়িয়ে ধরে ওর মা কান্না করতে লগলো।

গল্পের শেষটা বড়ই অদ্ভুত, আমার মুখে আর কোন কথা নেই মানুষ এতো নিষ্ঠুর হতে পারে। আমি রনি ভাই এর সাথে কোন কথা না বলে একদম চলে গেলাম বাসার ছাদে। আর এই যান্ত্রিক শহরটার দিকে তাঁকিয়ে রইলাম। এই সমাজে এমন জঘন্য মানুষ আছে যাদের জ্ঞান বলে কিছু নেই। আমি ভাবতে থাকলাম ওদের ঘরে তো মেয়ে আছে। এই সমাজে কতো শ্রেনীর মানুষের বাস ভাবাই বিরল।

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড