• শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন

গল্প : নেকলেস

  কাজী সাবরিনা তাবাস্‌সুম

২০ এপ্রিল ২০১৯, ১৩:২১
গল্প
ছবি : প্রতীকী

আজ সকাল থেকে আমি ছটফট করছি । অস্বস্তি ভাবটা জোঁকের মতো চুষে চুষে খাচ্ছে আমাকে। অবশ্য আমার এই অবস্থার জন্য দায়ী আমি নিজেই। আমি আজ সকালে একটা নেকলেস চুরি করেছি। আমার বান্ধবী আদিবার নতুন বিয়ে হলো। বিয়েতে যেতে পারিনি, তাই বিয়ের অভিনন্দন জানাতে ভাবলাম দেখা করে আসি। খালি হাতেও যাইনি কিন্তু। সুন্দর একটা ফুলদানী কিনেছিলাম আদিবার জন্য। সে আবার খুব ফুল পছন্দ করে কিনা! কিন্তু গিয়ে দেখি সে কি কাণ্ড! ফুলপাগলি ঐ আদিবা কোথায়? গা ভর্তি গহনা পরে টুকটুকে একটা বউ বসে ছিল বিছানার এক কোণে। আমায় দেখে সে কি হাসি। টেনে ধরে ডাইনিং টেবিলে নিয়ে বসালো। এত বড় ডাইনিং টেবিল, এত বাহারি খাবার আর মিষ্টিতে ভরপুর থাকতে পারে, তা ছিল আমার ধারনার বাইরে। টেবিলে আবার খাদ্যসামগ্রী ছাড়াও আরও অনেক দৃষ্টিনন্দন জিনিসে ভর্তি। এই যেমন মোমবাতি, ফুলদানী আরও কত কি! 

আমি খেতে খেতে ফুলদানীগুলো দেখলাম। আদিবার জন্য কেনা ফুলদানীটা ছুঁড়ে ফেলে দিতে মন চাইলো! আচ্ছা! আমি যে কত দোকান ঘুরে ফুলদানীটা কিনলাম, কই কোথাও তো আদিবার টেবিলে রাখা ফুলদানী চোখে পড়লো না! এগুলো মনে হয় বিদেশী। ফুলদানী যে এত সুন্দর হতে পারে তা আমি জানতামই না! কিন্তু ফুলদানির কি এত সুন্দর হওয়া উচিত? তাতে রাখা হবে ফুল। ফুলের চেয়ে ফুলদানী দৃষ্টিনন্দন হবে কেন? 

আমি যখন এইসব অপ্রয়োজনীয় কথা ভাবছিলাম, আদিবা একটা ধাক্কা দিয়ে আমার চিন্তার ব্যাঘাত ঘটিয়ে দিলো। বাচ্চাদের মতো লাফালাফি শুরু করলো বিয়েতে পাওয়া গহনা আমাকে দেখাবে বলে। আমি দেখতে লাগলাম। আরে বাবা! কত গহনা হতে পারে মানুষের? আদিবা একটা একটা করে বের করছে আর বিছানায় রাখছে। নেকলেস, ঝুমকো, চুড়ি, আংটি আরও কত কিছু, আমি তো নামটাও জানিনা। আমি গহনা দেখছিলাম কম আর আদিবাকে দেখছিলাম বেশি। 

হঠাৎ কি মনে করে যেন একটা নেকলেস ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেললাম! আমি কিন্তু চোর নই। আদিবাকে দেখে হিংসেও জাগেনি মনে। আবার এমনও নয় যে আমার নুন আনতে পান্তা ফুরায়! আদিবার মত টাকার বিছানায় ঘুমাই না, কিন্তু ছোটখাটো একটা চাকরি করে দিন চলে যায় আমার। তাহলে নেকলেস টা চুরি করলাম কেন? ওহ হো! আসলে তা আমি নিজেই জানিনা। হয়তো আমারও আদিবার মত গহনা পরে সেজে গুজে বসে থাকার বাসনা জেগেছিল! কে জানে? 

আদিবার গহনার পসরায় আমি ভুলেই গিয়েছিলাম চুরির কথা। এখন বাসায় এসে ছটফট শুরু হয়ে গেছে। কেন চুরি করলাম? কি করে পারলাম? কি হবে এইটা দিয়ে? আদিবা যখন বুঝতে পারবে-

তখন কি হবে? শুনেছি ধনীদের বাড়িতে সিসি ক্যামেরা লাগানো থাকে। যদি আমার চুরির ঘটনা কেউ দেখে ফেলে? 
এতসব ভাবতে ভাবতে নেকলেসটা বের করে গলায় পরলাম। বাহ! আমাকে তো ভালোই মানায়। রেখে দিবো নাকি? কি যে বোকা আমি! রেখে দিলে তো সবাই জিজ্ঞেস করবে কোথায় পেলাম এই নেকলেস? ধরা পড়ে যাবো। বিক্রি করে দিতে হবে। কত টাকা পাওয়া যাবে? নিশ্চয়ই অনেক। এটা হীরা নাকি স্বর্ণ? কিংবা হীরা, স্বর্ণ, চুণী, পান্না সবকিছুর সন্নিবেশও হতে পারে। কত সুন্দর এইসব জিনিস। চুরি করে আনলাম বলে অন্তত গলায় পরে নিজেকে দেখতে তো পারলাম! কেমন দেখায় আমাকে। ফোনটা হাতে নিলাম একটা ছবি তোলার জন্য। হঠাৎ মনে হলো আদিবা তো ফোন করলো না! সে কি বুঝতে পারেনি একটা নেকলেস গায়েব? ঠিক সেই সময় কলিং বেল বাজলো। আমি তড়িঘড়ি করে নেকলেস টা একটা ড্রয়ারে রেখে দৌড়ে গেলাম দরজা খুলতে । 
সে কি! আদিবা দাঁড়িয়ে। সেই বউ বউ আবেশটা নেই। কেমন হন্তদন্ত চেহারা। আমায় দেখেই জড়িয়ে ধরলো খুব দ্রুত। হাউমাউ করে কেঁদে চলছে। বহু কষ্টে বাসার ভেতরে এনে বসালাম। ওর অবস্থা দেখে নেকলেস এর কথা ভুলেই গেলাম। বললাম, এত রাতে এখানে?  

আদিবা যা বললো তার জন্য আমি কখনোই প্রস্তুত ছিলাম না। আমি ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসার পর ও আর ওর শ্বাশুড়ি মিলে গহনা গুছাচ্ছিলো। হঠাৎ খেয়াল করলো একটা নেকলেস গায়েব।আদিবা কে জিজ্ঞেস করলো। কিন্তু সে বেচারী তো কিছুই জানেনা। ওর শাশুড়ি কিছুতেই বিশ্বাস করলেন না। তিনি ভাবলেন আদিবা ঐ নেকলেস চুরি করে বিক্রি করে দিয়েছে। রেগেমেগে তিনি আদিবাকে বাসা থেকে বের করে দিলেন। বলে দিলেন গহনা ছাড়া বাসায় ঢোকা নিষিদ্ধ। এই রাতে মেয়েটি কোন কূল কিনারা খুঁজে না পেয়ে আমার কাছে আসলো একটুখানি আশ্রয়ের আশায়। 

আমি এক মিনিট দেরী না করে নেকলেসটা এনে ওর হাতে দিলাম। বললাম ভুলে হয়ত আমার ব্যাগের সাথে আটকে গিয়েছিলো, আমি নিজেই দিয়ে আসতাম! ও এসে ভালোই করেছে, ওর জিনিস ওই নিয়ে যাক। আদিবা ভয়ে আর শোকে এমন পাথর হয়ে ছিল যে নেকলেস হাতে নিয়েই দৌড় দিলো। কিছুই জানতে চাইলো না। আমিও বেঁচে গেলাম লজ্জার কাহিনী লুকাতে পেরে! 

কিন্তু এই চুরি আজ আমায় বড় একটা শিক্ষা দিলো। সকালে আদিবার ডাইনিংয়ের ঐ দামী দামী ফুলদানির মূল্য আমি এখন বুঝলাম। এ সমাজে প্রাকৃতিক ফুলের চাইতে সিরামিকের ঐ ফুলদানী বেশি মূল্যবান। ফুল ফেলে দিতে দ্বিধাবোধ করেনা কেউ কিন্তু ফুলদানীর কোন ক্ষতি যেন না হয় লক্ষ্য সেদিকেই। হঠাৎ আমার আদিবাকে মনে হলো ফুল আর ওর গহনা গুলো এক একটা মহা মূল্যবান ফুলদানী। সুখে থাকুক আদিবা নামের ফুলটি। সারাদিনের ছটফট ভাবটা কেটে গেল একদম। 

ওডি/এসএন

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড