• সোমবার, ২৭ মে ২০১৯, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

গল্প : কাজলার বাবা

  রুজহানা সিফাত ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ১২:১৮

গল্প
ছবি : প্রতীকী

মধ্যরাত। আনুমানিক রাত দুইটা। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল সেদিন। রঘু দাস ময়লার ঢিপির উপর বসে বাংলা মদ খাচ্ছিল। রঘু এই শহরে ময়লা পরিষ্কার করার কাজ করে। পেশায় সুইপার। ময়লা গাড়িতে তোলার আগে ইচ্ছে করেই এক প্যাগ মদ গিলে নেয়। তাতে করে ময়লার বিদঘুটে দুর্গন্ধ আর খারাপ লাগে না। রঘু ময়লা তোলার কাজ শুরু করে দিল। হঠাৎ আলো আঁধারে দেখল দুই তিনটা কুকুর একটা বাজারের ব্যাগ নিয়ে টানাহেঁচড়া করছে। কুকুর গুলো রঘুকে দেখে মুহূর্তে ব্যাগটা ছেড়ে দিল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে রঘুর দিকে তাকিয়ে রইল। যেন‌ কিছু একটার জন্য অপেক্ষা করছে। কোন নিষিদ্ধ খাবার খাবে রঘু সরে পড়লেই। রঘু কুকুর গুলো তাড়িয়ে ব্যাগটা হাতে নীল। ব্যাগের ভিতর উঁকি দিয়ে কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে গেল। একটা মানুষের সদ্যজাত শিশু! পিঁপড়া আর কুকুরে খাওয়া ক্ষত বিক্ষত রক্তাক্ত ছোট্ট শরীর। বাচ্চাটার চোখ বন্ধ! কান্নার শব্দ নেই! রঘু বাচ্চাটার হৃৎস্পন্দন পরীক্ষা করল। এখনো হৃৎপিণ্ড সাড়া দিচ্ছে! চট করে গায়ের রেনকোটের ভিতর থাকা শুকনো জামা দিয়ে বাচ্চাটার শরীর মুছে ফেলল। একটা মেয়ে শিশু। মনে হয় বয়স কয়েক ঘণ্টা! শিশুটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রঘু ছুটছে আর ছুটছে। সামনে কয়েকগজ পরেই হাসপাতাল। দূর থেকে ইমারজেন্সির আলো দেখা যাচ্ছে! রঘু বাচ্চাটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল'মা রে! ঐ তো হাসপাতাল! আর একটু!

হাসপাতালে দুজন ইন্টার্ন ডাক্তার ছিলেন। আর তেমন কোন ডাক্তার ছিল না এই মধ্যরাতে। তারপর ও ডাক্তার আর নার্সের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। বাচ্চাটাকে ওয়াশ করে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করা হলো। ক্ষত পরিষ্কার করে ইনকিউবেটরের ব্যবস্থা করা হলো। বাচ্চাটা বেঁচে আছে তবে খুব মুমূর্ষ অবস্থায়। ততোক্ষণে রঘুর বাচ্চাটাকে পাওয়ার গল্প বেশ কয়েকবার বলা শেষ। বাচ্চাটার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কি মিষ্টি মায়াবী মুখ। চোখ দুটো কাজল কালো যদিও ওরা চোখদুটো বন্ধ করে ইনকিউবেটরে রেখেছে। রঘুর এবার ডাক পড়লো হাসপাতালের রেজিস্ট্রি অফিসে। একজন লোক বলল,

- কি নামে এন্ট্রি করবো?

রঘু একটু ভেবে বললো,

- কাজলা।

- গার্জিয়ান হিসেবে কার নাম দিব? তুমি কি সিগনেচার করবে?'

- আপাতত কাউকে না পাওয়া পর্যন্ত আমার নাম ই দেন।

তারপর কাঁপা কাঁপা হাতে রঘু সিগনেচার করলো-রঘু দাস।

ঠিক সেদিন রাতে ঐ শহরের একটি নামকরা বেসরকারি হাসপাতালে একটা মৃত কন্যা সন্তানের জন্ম দেন আয়েশা বেগম। তিনি ক্যান্সার গবেষক ড. ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী। এই মেয়েটি ছিল তার একমাত্র সন্তান। তাও বহু বছর পর এই বাচ্চাটা হয়েছিল। বাচ্চা হবার সময় বিভিন্ন জটিলতা জনিত কারণে ভদ্রমহিলা অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তারপর ও বারবার তিনি বলছেন বাচ্চাটার কান্নার শব্দ তিনি শুনেছেন। ড. ও বলছিলেন বাচ্চাটার পালস ছিলো। বাচ্চাটা সুস্থ ছিল। হঠাৎ কি হলো যে বাচ্চা মারা গেল? আরো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রিপোর্ট করলো মৃত সন্তান! সে জন্য ড. ইসমাইল হোসেন পুলিশ কেস করলেন হাসপাতালের বিরুদ্ধে। কিন্তু কেস করলেই বা কি মৃত সন্তান তো আর জীবিত হয়ে ফিরে আসবে না।

রঘু রোজ দুবেলা এসে কাজলার খোঁজ নিয়ে যায়। রোজ জিজ্ঞেস করে কেউ ওকে দত্তক নিতে এসেছে কিনা? কেউ ওর খোঁজ নিয়ে গেছে কিনা ?ওর কোন গার্ডিয়ান পাওয়া যায় নি। কাজলা এখন আগের চেয়ে বেশ সুস্থ হয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি সারতে আরো মাস খানেক লাগবে। রঘু তার সংসারে একাই থাকে। মা বাবা কেউই নেই। এক বড় বোন আছে। তার স্বামী ও সুইপার। ওরা একি সাথে সুইপার কলোনিতে থাকে। রঘুর বয়স চব্বিশ- পঁচিশ। এখনো বিয়ে করেনি। কিছু পয়সা জমাচ্ছিল। গত কদিনে কাজলার চিকিৎসায় অল্প কিছু খরচা হয়ে গেল। রঘু কাজলার জন্য কটা রঙিন জামা কিনে ছোট কাঁথা কিনলে। এমনি করে একদিন কাজলা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলো। সে এখন খট খট করে হাসে। থুতু উড়িয়ে খেলা করে। রঘু এখন তিনবেলা যায় ওখানে।

একদিন কাজলার ডাক্তার এসে রঘুকে বললো, ‘রঘু! আমাদের দায়িত্ব কিন্তু এবার শেষ। তোমার কাজলাকে এবার ছুটি দিয়ে দেবো। এতো দিন হয়ে গেল কাজলার তো কেউ খোঁজ নিতে এলনা। তোমার ও একার সংসার। তুমি তো ওকে নিয়ে যেতে পারবে না। একটা এনজিওর সাথে কথা বলেছি। ওরা কাজলা কে নিয়ে যাবে। এনজিও টার নাম সোনামনি। ওদের কাজ হচ্ছে হারিয়ে যাওয়া বাচ্চা দের রাখা। যদি কেউ দত্তক নিতে চায় ওরা সব কিছু ঠিক করে বাচ্চা দত্তক দেয়। কি বলো কাজলার জন্য ভালো হবে না?’

রঘু একটু ভাবলো। কাজলা তাকে ছেড়ে চলে যাবে ভাবতেই তার পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে গেল। রঘু বললো, ‘ডাক্তার বাবু কাজলাকে আমি দত্তক নিতে চাই।’

- তুমি? তোমার বয়স কম, তার উপর বিয়ে থা করনি। এমনিতেই তুমি যথেষ্ট করেছ। বাচ্চাটার জীবন দিয়েছে।

- জীবন যখন ঈশ্বর আমার ওছিলায় দিয়েছে তখন বাচ্চাটার কোন গার্ডিয়ান না পাওয়া পর্যন্ত আমি রাখতেই পারব।পরে কি হবে সেটা ঈশ্বর ঠিক করে দেবেন।ওর সত্যিকারের বাবা মাকে পেলে আমি ওকে ফিরিয়ে দেব। ততদিন ও আমার কাছে থাক।

ডাক্তার তখন ওকে বোঝাতে বললো, তুমি তো কাজে যাও। একটা বাচ্চা পালা কি চাঁটিখানি কথা? বাচ্চা খাওয়ানো, গোসল, অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখানো, নিয়মিত টিকা দেওয়া সব কিন্তু অনেক যত্ন নিয়ে করতে হয়। আর ও একটু বড় হলে শুরু হবে পড়াশোনা। তখন কিন্তু তোমার অনেক খরচা হবে। তুমি সব কিছু ঠিক করে করতে পারবে তো?’

- ইশ্বরের ইচ্ছে থাকলে নিশ্চয়ই পারব। ততদিনে হয়তো ওর বাবা মাকে ও পেয়ে যাব।দয়া করুন ডা. বাবু। কাজলাকে আমার কাছে দিয়ে দিন।

ডাক্তার সাহেব রঘুকে যতই বোঝাক রঘু নাছোড়বান্দা! অবশেষে বাধ্য হয়ে কাজলাকে রঘুর কাছে দিয়ে দিলেন ডাক্তার। রঘুর মোবাইল ফোন নাম ঠিকানা সব নিয়ে রাখলেন। যাতে গার্ডিয়ান পাওয়া গেলে খবর দেওয়া হয়। এদিকে কাজলা কে বাড়িতে আনার পর রঘুর দিদি রমা তো রেগে টং! কেন কাজলাকে ঘরে আনল। ঘরে সে সময় আরো চারটি নিজের বাচ্চা! ওদের সামলে আবার মানুষের বাচ্চা পালতে পারবেনা একথা স্পষ্ট জানিয়ে দিল দিল রমা। রঘু জানে এগুলো রমাদির মনের কথা না। রঘু সারাদিন কাজ করে বেলা শেষে ঘরে ফিরে কাজলাকে নিয়ে সময় কাটায়। আর সারাদিন রমাদি ওর খেয়াল রাখে। রমাদির বড়মেয়ের ঝুমুর কাজলাকে খাওয়ায় দাওয়ায় সব করে।কাজলা ভীষণ ন্যাওটা হয়েছে ঝুমুরের। তবে রঘু কাজ থেকে ফিরে আসার পর কাজলা আর কাউকে চিনে না।রঘুর কোল ছেড়ে আর কারো কাছে যেতে চায়না। রঘু ও এখন আর মদ খায় না। সারাদিন রাত মেয়েকে নিয়ে যত চিন্তা।

ক্যান্সার গবেষক ড. ইসমাইল হোসেনের দিন কাটছে অতি কষ্টে। মৃত কন্যাসন্তান এক প্রকারের মেনেই নিয়েছেন তিনি। কিন্তু সমস্যা হলো তার স্ত্রী আয়েশা বেগম কে নিয়ে। আয়েশা কিছুতেই মানতে রাজি নন যে তার মেয়ের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।বাচ্চা তো তার সুস্থ ছিল। তাহলে এমন কি হয়েছিল যে বাচ্চা মারা গেল? পুলিশ ইনভেস্টিগেশন করে অবশ্যই বেরিয়ে এলো এক অস্বস্তিকর তথ্য। যেদিন বাচ্চা মারা গেল ঠিক সেদিন একজন আয়া হসপিটালের কাজ ছেড়ে চলে গেছে।ঐ আয়ার নাম আলেয়া।আলেয়ার দায়িত্বে ছিল বাচ্চাটা।আলেয়ার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। আলেয়ার স্থায়ী ঠিকানায় গিয়ে ও কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। পুলিশ আপাতত আলেয়ার খোঁজ করতে থাকলো।

এদিকে কাজলা একপা দুপা করে হাঁটতে শুরু করল। ধীরে ধীরে কথা বলতে শুরু করল। রঘুকে ডাকে বাবাই। কাজলার বয়স যখন চার বছর তখন একদিন কাজলা দেখলো তার কোন মা নেই। কলোনির খেলার সাথী দের সবার মা আছে শুধু কাজলার নেই। কাজলা ভেবে পায় না তার মা নেই কেন। একদিন রঘুকে সে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবাই আমার মা কই?’

রঘুর কাজলার দিকে তাকিয়ে ভীষণ কষ্ট হলো। মা তো মা ই। রঘু কাজলাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তোর মাকে আমি খুঁজে এনে দিব। কথা দিচ্ছি।’

কাজলা বললো, ‘ততদিনে আমি কাকে মা ডাকবো?’

- আমাকেই ডাকিস।

- তুমি তো বাবাই।

- আমি মা ও।

কাজলা হেসে বললো, ‘মাবাবাই।’

তারপর থেকে সে রঘুকে মা বাবাই বলে ডাকে। এখন কাজলা পাঁচবছর বয়স। ওর স্কুলে যাবার সময় হয়েছে। বাড়ির কাছে জেবুন্নেছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু ভর্তি করতে গিয়ে রঘু পড়ল ফ্যাসাদে। বাবা মার নাম লাগবে। বার্থ সার্টিফিকেট লাগবে। ওর একটা ভাল নাম ও লাগবে। অগত্যা রঘু ছুটলো ডা. বাবুর কাছে। সেই হাসপাতালে।

ডাক্তার সাহেব রঘুকে একটা মেডিকেল কলেজের সার্টিফিকেট দিলেন। যেখানে পিতা মাতার নামের জায়গায় লেখা হলো অজ্ঞাত। আর অভিভাবকের জায়গায় লেখা হলো রঘুর নাম। কিন্তু একটা ভালো নাম তো লাগবেই। রঘুর চট করে মনে পড়লো মায়ের নাম। মায়ের নাম কুসুম কুমারী দেবী। রঘু মায়ের নামের সাথে মিলিয়ে নাম দিল কুসুম কানন।

কাজলার বার্থ সার্টিফিকেট নিয়ে বাড়ির পাশে জেবুন্নেছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিল কাজলাকে। কিছুদিন পরেই রাঘু বুঝতে পারল এই মেয়ে যেন তেন ঘরের মেয়ে নয়। কোন ভালো পরিবারের বড় মানুষের মেয়ে। পড়ালেখার প্রতি তার আগ্রহের সীমা নেই। এতটুকু মেয়ে অথচ সব পড়া কেমন চোখের নিমেষে শিখে দিতে পারে। দুদিনেই‌ স্কুলের শিক্ষক দের চোখের মণি হয়ে উঠলো কাজলা। রঘু মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো কাজলাকে সে ব্যারিস্টার বানাবে। আর তার জন্য যত পয়সা লাগবে লাগুক। রঘু কাজলার ঠিকমতো যত্ন হবেনা ভেবে ঠিক করলো আর বিয়ে করবেনা। এদিকে রমাদি রঘুর জন্য অনেক পাত্রী দেখলো। কিন্তু বাচ্চা সহ রঘুকে কেউই বিয়ে করতে রাজি হয়না।দেখতে দেখতে কাজলা বড় হয়ে উঠে। সমাপনী পরীক্ষায় কাজলা সব বিষয়ে (এ+)পায়। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে করে কাজলা স্বনামধন্য মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হয়। আর রঘু বিয়ে সাদি নিয়ে ভাবনা আরো রসাতলে যায়। শুধু ভাবতে থাকে কাজলা কিভাবে আরো ভালো করে পড়তে পারবে। রমাদি এ নিয়ে রোজ রাগারাগি করে। কিন্তু রঘুকে বুঝায় কার সাধ্য?রঘুর কেবল এক কথা কাজলার পড়াশোনায় অনেক খরচ আছে।কাজলাকে রঘু ব্যারিস্টার বানাবে।রঘুর কতো স্বপ্ন।

এদিকে পুলিশ এতবছর পর সেই হাসপাতালের আয়া আলেয়ার খোঁজ পায়। আলেয়া ধরা পড়ার পর বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। আয়েশা বেগম মেয়ের আশা ছাড়েননি এক বিন্দু ও। মেয়ের শোকে শোকে দ্বিতীয় বার মা ও হতে পারেন নি। ড. ইসমাইল হোসেন অবশ্য ভীষণ কাজ পাগল মানুষ। পুলিশ কেসের কথা তিনি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন। হঠাৎ অনেক রাতে পুলিশের ফোন পেয়ে কিছুটা বিরক্ত হয়ে গেলেন। কিন্তু আয়েশার পিড়াপিড়িতে গেলেন থানায়। থানার ওসি সাহেব বললেন,

‘স্যার অবশেষে আপনার ঐ আলেয়া কে পাওয়া গেল। প্রথম দিকে খুব দাবি করছিল বাচ্চা নাকি মৃত হয়েছে। তারপর মার খেয়ে একদম সুর পাল্টে গেল। বাচ্চাটা সে চুরি করে তার বদলে সদ্য কবর দেওয়া একটা মরা বাচ্চা ও রেখে যায়। আর আপনাদের মেয়েকে ফেলে দেয় সুগন্ধার আশে পাশে কোন ডাস্টবিনে।’

ড. ইসমাইল কথাটি শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি উদগ্রীব হয়ে বললো, ‘আমার সাথে তো আলেয়ার শত্রুতা নেই।’

- তবে আপনার সাথে তার কারো সাথে শত্রুতা আছে? মনে করে দেখুন।

- না।

- আছে। আলেয়াকে রিমান্ডে নেয়ার পর জানতে পারি আজগর আলী নামে এক লোক কাজটা করিয়েছে।

- কে? আজগর?

- চিনেন ওকে?

- চিনি। ও আমার এলাকা মানিকগঞ্জ এ নামকরা ঠিকাদার। ওখানে একটা জমি কিনেছিলাম। ক্যান্সার হসপিটাল বানাবার জন্য। জমিটা ও তিনগুণ দামে কিনতে চেয়েছিল। শপিং মল বানাবে বলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জমিটা আমিই কিনেছিলাম। তখন আজগর খুব ক্ষেপে যায়। বারবার বলছিল আমাকে দেখে নেবে।আর দেখে নিলো আমার সদ্য জাত শিশুকে। এখন ওকে কিভাবে খুঁজে পাব?’

‘ডাস্টবিনে বাচ্চা ফেলে দেওয়া হলো। তার মরে যাবার সম্ভাবনা নব্বই ভাগ আর মরে যাবার সম্ভাবনা দশভাগ। দশ ভাগ সম্ভাবনা নিয়ে আগাই। দেখি ভাগ্যে কি আছে।’

ইনভেস্টিগেশন চলছে দ্রুত গতিতে। পুলিশ প্রথম গেল পত্রিকা অফিসে। ঐ এলাকার স্থানীয় পত্রিকা অফিসে। কোন নিউজ আছে কিনা দেখতে। এগারো বছর আগের ঘটনা। অনেক বেগ পেতে হলো ফাইল পত্র ঘেঁটে বের করতে। সেরকম কিছুই নেই। তারপর গেল হাসপাতালে। ঐ ডাস্টবিনের পাশে যে হাসপাতাল ছিল সেটা এখন বিশাল এপেক্স শোরুম। পুলিশ ও সময় হসপিটালের চেয়ারপার্সন ড. আসলাম মির্জার সাথে দেখা করতে গেলেন।। ড. ইসমাইল তার পূর্ব পরিচিত। তিনি খুব অবাক হলেন খবরটা শুনে। কিন্তু হাসপাতাল যখন নেই তখন তো কাগজ পত্র কিছুই নেই। তারপর ও মেডিকেল ইনচার্জের নম্বরটা দিয়ে দিলেন।

মেডিকেল ইনচার্জ ঘটনা বিবরণ শুনেই ভাবলেন। তারপর মনে পড়লো সে দিন টিপটিপ বৃষ্টি আর রঘু নামের একজন সুইপার একটা বাচ্চা মেয়ে খুঁজে পেয়েছিল। তারপর ও মেয়েটাকে নিয়ে গেল লালনপালন করবে বলে। তারপর ঐ তো ক বছর আগে এসেছিল বার্থ সার্টিফিকেট তুলতে। কি যেন নাম দিয়েছিল মনে আসছে না। তবে ঐ সুইপারের নাম রঘু। আপাতত পুলিশের জন্য এই তথ্যটি অনেক বিশাল বড় তথ্য। পুলিশ এই শহরে মোট তিনটি সুইপার কলোনিতে পঞ্চাশ ষাট জন রঘুর সন্ধান পেল। কিন্তু কাজলার বাবা তো শুধু একজনই। রঘু দাস। রঘু আর কাজলার সন্ধান যখন পুলিশ পেল তখন প্রায় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। পুলিশ কাজলার লালা সংগ্রহ করল। ইসমাইল হোসেনের সাথে যদি ডিএনএ ম্যাচ করে তাহলে কাজলা কে নিয়ে যাবেন ইসমাইল। কাজলার জীবনটা মুহূর্তে তছনছ হয়ে গেল। আর তছনছ হলো রঘুর জীবন।

কাজলা আগে থেকেই জানতো তার মা বাবাই তার আসল বাবা না। কিন্তু কাজলা এক প্রকারের নিশ্চিত ছিল তার বাবা মা কে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। নিজের ছোট্ট জীবনটা শুধু রঘু, রমা পিসি, স্কুল, বন্ধু বান্ধব, স্যার ম্যাডামদের নিয়ে। আর মা-বাবাই কে ছাড়া সে কিভাবে থাকবে? অসম্ভব সে কিছুতেই থাকতে পারবে না।সে তার মাবাবাইকে ছেড়ে কিছুতেই যাবেনা। রঘু সারা রাত আর বাড়ি ফিরলনা। শেষ রাতে রঘু যখন বাড়ি ফিরল তখন কাজলা ঘুমিয়ে পড়েছে। রঘু কাজলার মাথায় হাত রেখে ডুকরে কেঁদে উঠলো। রঘুর কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল কাজলার। কাজলা রঘুর চোখ মুছে দিয়ে বললো, ‘মা-বাবাই আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবনা।’

- না রে মা। ডাক্তার সাহেবের সাথে তোর পরীক্ষায় সব মিল হইলে তুই চলে যাস। আমি সেই প্রথম দিনে ভগবানকে কথা দিয়েছিলাম তোর বাবা মাকে পেলে তোকে ফিরিয়ে দেব। তুই তো আমার লক্ষ্মী মা। মারে আমাকে কথা দে তুই মন দিয়ে পড়বি। বড় ব্যারিস্টার হবি একদিন। আমি সকলকে তোকে দেখিয়ে বলব-আমার মেয়ে আমার মা কাজলা। ব্যারিস্টার হয়েছে।’

- মাবাবাই কে জড়িয়ে ধরে হিক্কি তুলে তুলে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু রঘুর তো ঘুম আসে না।

পরদিন সকালে থানা থেকে পুলিশ এসে রঘুর বাড়ি ভরে গেল। সাথে এলেন ড. ইসমাইল আর তার স্ত্রী আয়েশা। নতুন বাবা-মার দিকে মন নেই কাজলার। দু’চোখ শুধু মাবাবাইকে খুঁজছে। কিন্তু মাবাবাইকে কোথাও দেখতে পেল না। রমা পিসি আর তার সব ভাইবোনদের জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদল। রমা পিশিকে বললো, ‘পিসি মাবাবাইয়ের খেয়াল রেখো।’

- তুই কি আর কোন দিন আসবি না?

- আসব। নিশ্চয়ই আসব।

আয়েশা কাজলাকে জড়িয়ে ধরল অনেক্ষণ। কাজলার জীবনটা এক্কেবারে পাল্টে গেল। ডাক্তার সাহেবের বিশাল বাড়ি, তার আলাদা কামরা। এসি, ফ্রিজ, এল ই ডি টিভি সব আছে রুমে। বিছানা বড্ড নরম। ঘুম আসে না। নতুন বাবা মা খুব আদর করে। সব চেয়ে বেশি আদর করে মা। মাবাবাইয়ের মতো। তার আরো সুবিধা হলো বাড়িতে দুজন টিচার আছেন। মা ও পড়া দেখিয়ে দিতে পারেন। আগের মতো পড়া না বুঝলে আর কষ্ট পেতে হয় না। স্কুলে যে সব বন্ধুরা আগে কাজলাকে এড়িয়ে চলতো সুইপার কলোনির মেয়ে বলে তারা কাজলাকে এখন সারাক্ষণ ঘিরে রাখে। তারপর ও কাজলার মনে শান্তি নেই। মাবাবাইয়ের কাছে সারাদিন পড়ে থাকে। সুইপার কলোনি থেকে আসার পর ওখানে আর যাওয়া হয়নি। ডাক্তার ইসমাইল হোসেন সুইপার কলোনির সাথে মেলামেশা বিশেষ পছন্দ করেন না। রঘু এসে প্রায় ছুটির সময় স্কুলে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আড়াল থেকে কাজলাকে দেখে। কাজলাও লুকিয়ে একবার গিয়েছিল কলোনিতে। কিন্তু রঘুর সাথে দেখা হয়নি। রঘু বাড়িতে ছিল না। কাজলা আসার পর রঘুর মদের নেশা জেঁকে বসেছে। সারাদিন মদ খেয়ে নেশায় চুর হয়ে থাকে। নাওয়া নেই খাওয়া নেই। কেবলই সেই ছোট্ট বেলার কাজলা চোখে ভাসে।

একদিন স্কুলে কাজলার নাম ডাকা হলো তাবাসসুম হোসেন। তার নতুন বাবা তাকে এই নাম দিয়েছে। এখন থেকে এই নামে তাকে ডাকা হবে। কাজলার খুব রাগ হলো। তার অতীত, শৈশব এসব তাদের কাছে কিছুই না। তার মাবাবাইয়ের যেন কোন অস্তিত্ব নেই এদের কাছে। কাজলার চাই না নতুন বাবা-মা। যে নাম নিয়ে সে বড় হয়েছে যে নামে সে স্কুলে এতগুলো সময় পার করেছে সেই নাম বদলে দেওয়া হলো তার অনুমতি ছাড়াই। রাগ করে টিফিন খেলনা। সারাদিন মুখ ভোঁতা করে বসলো রইল। স্কুল ছুটির পর মা এল। সে গেল না। স্কুলের পিছনে বড় বেল গাছের নিচে বসে রইল। মা এসে ডাকল। সে কথা বলল না। বাবাও চলে এল। এক পর্যায়ে তাকে ঘিরে জটলা বেঁধে গেল। প্রিন্সিপাল ম্যাম এসে মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘কি হয়েছে?’ - আমার নাম ফেরত চাই।ঐ নাম ফেরত না নিয়ে আমি যাবনা।

প্রিন্সিপাল ম্যাম কাজলার মানসিক অবস্থা ড. ইসমাইল সাহেবকে বুঝালেন। আয়েশা ও অনেক কান্নাকাটি করল। এতকাল পর মেয়েকে পেয়েছে। সামান্য কারণে আর হারাতে চান না। অবশেষে কাজলার নাম বহাল রইল কুসুম কানন। কাজলা তার নাম নিয়ে ফিরে গেল বাড়িতে। ড. ইসমাইল হোসেনের মনটা খচখচ করছিল। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই মেয়ের বাবা তিনি হতে পারবেন না। বাবা হয়ে থাকবে সেই রঘু নামের সুইপারটা।

পরিশিষ্ট: অনেক গুলো বছর কেটে গেল। রঘু এখন ষাট বছরের বুড়ো। কাজলা কাজলা করে মদ খেতে খেতে লিভার ক্যান্সার বাধিয়ে বসে আছে। আর কাজলা রঘুর কথা রেখেছে। দেশের নামকরা একজন জজ। রঘু এখন আর সুইপার কলোনিতে থাকে না। ও থাকে সুগন্ধায় নিজের বিশাল এপার্টমেন্টে। কাজলা রঘুকে নিয়ে সামনের সপ্তাহে জাপান যাবে। লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করতে। একজন ডোনার যাচ্ছে রমা মাসির মেয়ে ঝুমুর। ঝুমুরের ব্লাড গ্রুপ সব কিছু রঘুর সাথে ম্যাচ। রঘুর ক্যান্সার আক্রান্ত লিভারের অংশ বাদ দিয়ে ঝুমুরের লিভার কেটে যোগ করা হবে। ঝুমুর দু’তিন দিনে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কাজলার যত চিন্তা রঘুকে নিয়ে। রঘুর অবশ্য আর কোন চিন্তা নেই দুঃখ নেই। কারণ সে সত্যি সত্যিই কাজলার বাবা হতে পেরেছিল।

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড