• শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

গল্প : আজিজ সাহেবের সমুদ্র দর্শন

  শানজানা আলম

২১ মার্চ ২০১৯, ১২:৫০
গল্প
ছবি : প্রতীকী

আজিজ সাহেবের সমুদ্র দেখার খুব ইচ্ছে, সেই ছাত্রজীবন থেকে। গল্প উপন্যাসে যখনই সমুদ্রের বর্ণনা বা উপমা আসে, তিনি উদাস হয়ে যেতেন। বিস্তৃত জলরাশির বিশালতা তিনি চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে চাইতেন কিন্তু যা কস্মিনকালেও দেখেননি। তার কল্পনা কিভাবে করবেন! তাই মনে সুপ্ত বাসনা জমা করে রাখেন একদিন সমুদ্র দর্শনে যাবেন।

লেখাপড়ার পাট শেষ হয় বি.এ পরীক্ষার পরে। একটি স্কুলে সহকারী শিক্ষকের চাকরিও জুটে যায়। মনে তার সমুদ্র দেখার বাসনা। তাই প্রথম মাসের মাইনে থেকেই টাকা জমাতে শুরু করেন। বলাবাহুল্য, গ্রামের একজন স্কুল শিক্ষক এর বেতন এমন কিছু নয় যে মাস দুই জমালে সমুদ্র দেখার টাকা জমে যাবে। বলছিলাম নব্বই দশকের প্রথম দিককার কথা। মাস আটেক পরে আজিজ সাহেবের বাবা তাকে ডেকে পাঠান।
- মো.আব্দুল আজিজ, (বাবা তাকে পুরো নামে ডাকেন) টাকা পয়সা কিছু জমলো নাকি? প্রায় বছর ঘুরে এলো মাস্টারি করছো!
তিনি উত্তর দেন, জি আব্বা সামান্য কিছু।
- সামান্য কিছু মানে কত?
- ইয়ে মানে আব্বা হাজার সাতেক মতো হবে, কিছু কমও হতে পারে।
আব্বা বললেন, ‘হুম, আমার হাজার দশেক মতো টাকা দরকার। দক্ষিণ পাড়ার দিকে একটা জমি দেখেছি। কিছু টাকা কম পরছে হাতে। তুমি আজ রাতে টাকাটা আমাকে দিয়ে যাবে।’
আজিজ সাহেব একটু বিষণ্ণ মনে বললেন, ‘আচ্ছা।’ 
তার আব্বা বললেন, ‘তোমার টাকা নিতেছি মানে মনে কইরো না যে টাকা ফেরত পাবা না। টাকা না দিতে পারি জমি লিখা দিবো মউয়াতের আগে।’
আজিজ সাহেব লজ্জা পেলেন। আব্বা সরাসরি এভাবে কথা বলেন, তিনি কঠিন মানুষ। আজিজ সাহেব আব্বার কোন গুণই পাননি। সেবার টাকা লাগলো জমি কিনতে। পরের বছর আজিজ সাহেব আবার কিছু টাকা জমালেন। এবার তিনি টিউশনি করেও টাকা রাখলেন কিছু। প্রায় ষোল হাজার টাকা জমে গেলেও সুযোগ হচ্ছিল না সমুদ্র দর্শনে যাবা। এবার আবার আব্বা ডাকলেন একদিন রাতে।
- কি খবর তোমার? টিউশনি করছো শুনলাম, ইনকাম তো মনে হয় ভালোই।
আজিজ সাহেব বললেন, ‘জি আব্বা, আলহামদুলিল্লাহ।’
এবার আব্বা বললেন, ‘বয়স হয়ে যাচ্ছে। এবার সংসার করা লাগে। পাশের গ্রামে একটা মেয়ে দেখেছি। মেয়ে মাশাআল্লাহ সুন্দর, আদব কায়দা ভালো, নামাজ কালাম পড়ে। তুমি রাজি থাকলে সামনের জুম্মার দিন যাবো। একবারে কলেমা পড়িয়ে নিয়ে আসবো। বিয়েতে বেশি খরচ খরচা আমার পছন্দ না।’

আব্বা বলেছেন, ‘তাই আর কোন কথাই চলে না। পরের জুম্মার দিনে, আজিজ সাহেব, আজিজ সাহেবের মামা, খালু, চাচাসহ এলাকার মুরুব্বিদের নিয়ে আব্বা গেলেন কলেমা পড়াতে। আজিজ সাহেবের সাথে রাবেয়ার বিয়ে হয়ে গেল। বিয়েতে বেশি খরচ পছন্দ না করলেও আব্বা বউয়ের জন্য শাড়ি, গয়না কিনলেন সাধ্যমতো।

আর আজিজ সাহেব পাড়াপ্রতিবেশি, আত্মীয় স্বজনদের একদিন অনুষ্ঠান করে খাওয়ালেন। টাকা প্রায় শেষ হয়ে গেল। যে টাকা ছিল, সেটা দিয়ে বউয়ের জন্য একটা আংটি কিনলেন। বাসর রাতে তিনি নতুন বউকে বললেন, ‘জানো মোসাম্মাৎ রাবেয়া বেগম, আমার না খুব সমুদ্র দেখার শখ।’ তুমি কি ওই কবিতার লাইন জানো-

‘সিন্ধুর টিপ সিংহল দ্বীপ কাঞ্চনময় দেশ.....’

এটা কিন্তু সমুদ্রের কবিতা না, শ্রীলঙ্কা নিয়ে লেখা।
গ্রামের ষোড়শী রাবেয়া কিছুই বুঝলো না শুধু এটুক বুঝলো মানুষটা একটু পাগলা আছে।

সংসারে ঢোকার পরে খরচ বাড়লো আজিজ সাহেবের। মাসের বাজার থেকে সংসারের টুকটাক খরচে টাকা আর জমতো না। তার মধ্যেও তিনি কষ্ট করে হাজার পাঁচেক টাকা জমালেন। তখন রাবেয়া সন্তান সম্ভব্য। জানা গেল পেটের বাচ্চা ব্রীজ বা উল্টো, মানে অপারেশন করে বের করতে হবে। সেখানে আজিজ সাহেবের জমানো টাকা শেষ হয়ে গেল।

এরপর সংসার, একে একে তিনটি সন্তান। আজিজ সাহেব পুরাদস্তুর সংসারী হয়ে গেলেন। এত খরচ সামলে আর টাকা হাতে থাকে না। এর মাঝে বাবা অসুস্থ হয়ে ছিলেন কয়েক বছর। তার চিকিৎসার জন্য ধার দেনা করতে হয়েছে কিছু। কয়েক বছর পরে বাবা মারা গেলেন, আজিজ সাহেবের খরচ কমলেও দেনা শোধ করতে বেশ কিছু সময় লাগলো।

এসবের মাঝেও তার মনে উকি দেয়,
‘উল্লাসে ফিরিয়া আসি, কল্লোলে ঝাঁপায়ে পড়ো বুকে,
....
কোথা তার তল! কোথা কূল বলো কে বুঝিতে পারে’

তিনি আবার কিছু টাকা জমান। এবারে কোন সমস্যা ছিল না, কিন্তু ছেলে ন্যাশনাল টিমে ক্রিকেট খেলবে, তার টেস্ট ম্যাচ এজন্য ছেলের কিছু ইকুয়েপমেন্ট, জার্সি, বুট কিনতে হয়। আজিজ সাহেবের শখ পুরোন না হলেও ছেলের জন্য সব কিছু কিনে দেন। আজিজ সাহেবের ছেলে টিমে ভাল খেলার জন্য ক্লাব থেকে কক্সবাজার ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। 

আজিজ সাহেব তাকে বলেন, ‘ওখানে নাকি বড় বড় শামুক পাওয়া যায়। শামুক কানে দিলে নাকি সমুদ্রের গর্জন শোনা যায়। সেগুলো নিয়ে আসিস কিছু ।’
ছেলে নিয়ে আসে বাবার জন্য। তিনি শামুক কানে ধরেন, সমুদ্রের গর্জন শুনতে। 
সত্যিই, কেমন শো শো আওয়াজ হয়‌‌!
তিনি তার বড়মেয়েকে বললেন শুনবি নাকি!
মেয়ে হেসে বললো, ‘বাবা, এটা বাতাসের শব্দ। তুমি কানে একটা স্টিলের বাটি ধরো, একই শব্দ পাবে।’
আজিজ সাহেবের মন ভরে না তাতে। তিনি শামুক কানে ধরে সমুদ্রের গর্জন শোনেন।

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]l.com
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড