• সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

‘ব্যাকুল ফুল’-এর প্রথম পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস : ব্যাকুল ফুল

  মোবারক হুসাইন রাজু

১৯ মার্চ ২০১৯, ১১:৫১
গল্প
ছবি : প্রতীকী

গ্র্যাজুয়েশন এর পর কাস্টমস অফিসে খুব ভালো একটা জব এর অফার পায় সাফওয়ান। তার বাবা হাজী সামাদ মুনশিকে এই সুসংবাদটা দিলে হাজী সাহেব বলেন, ‘রোজ বাড়ি থেকে গিয়ে অফিস করা যাবে তো?’

- না বাবা, আমাকে স্টাফ কোয়ার্টার দেয়া হবে। ওখানেই থাকতে হবে।

- তাহলে বাবা এসব চাকরিবাকরির লোভ নিজেও করোনা আর আমাকেও দেখিও না। তুমি খুব ভালো করেই জানো, তোমাকে আমি দূরে যেতে দেব না। একবেলা রাতের খাবারও আমি তোমাকে ছাড়া খেতে পারবো না। তোমার যা খুশি এলাকায় থেকেই করো, আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টায় তোমাকে সাপোর্ট করবো। তুমি চাইলে আমার ব্যবসাটাও চালিয়ে যেতে পারো। এত এত স্টাফ এত হিসেব-নিকেশ আমার পক্ষে ম্যানেজ করা কষ্টের বটে। তুমি আমার সাথে থাকলে আমার বড় উপকারই হবে। এটা আমার একটা মতামত মাত্র, আদেশ নয়। তোমার সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার একান্তই তোমার। তবে আমার একটাই দাবি, তোমাকে আমার চোখের সামনে থাকতে হবে। দূরে যাওয়া চলবে না।

বাবার ব্যবসা দেখাশোনার পাশাপাশি সাফওয়ান এখন একটি কলেজের খণ্ডকালীন ইংরেজি শিক্ষক। তাও আবার তার নিজের কলেজ। যেখানে সে নিজে লেখাপড়া করেছে। যে কেনো শিক্ষার্থীর জন্য এর চেয়ে গৌরবের আর কিছুই হবার নয়!

সাফওয়ানের বাল্যবন্ধু নাঈম এর ভয়াবহ শারীর খারাপ। সদর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। পেপটিক আলসার, পাকস্থলী ও পরিপাক নালীর সবচেয়ে পরিচিত রোগ। রোগটি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। পরিপাক নালী বা পাকস্থলীর ভিতরের আবরণে (mucosa) ক্ষত বড় হয়ে এটা সৃষ্টি হয়েছে। স্বাস্থ্য শুকিয়ে কঙ্কালসার হয়ে গেছে। চিনতেই নাকি কষ্ট হয়!

নাঈমকে দেখতে মেডিকেলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাইকে করে রওয়ানা হলো সাফওয়ান। একা’ই যাচ্ছে সে। ঘটা করে বন্ধুদের নিয়ে ডেট ফিক্সড করে যাওয়ার মত সময় এখন সাফওয়ানের নেই।

পথে নাঈমকে নিয়ে তার বহু স্মৃতি চোখে ভাসছে। ক্লাসের সবাই ছিলো ওর বেস্টফ্রেন্ড। সবাই যেকোনো প্রয়োজনে তাকেই প্রথম স্মরণ করতো। আর নাঈম বাম হাতে তুড়ি মেরে বলতো ‘এইডা কোনো ব্যাপারই না!’

সাফওয়ানের চাচাতো ভাই রেজাউল একদিন খুব সকালে স্টেশন যাওয়ার পথে বাইক এক্সিডেন্ট করে। মাথা ফেটে প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় রক্তের প্রয়োজন হয়। রেজাউল হাসপাতালে ভর্তি, সাফওয়ান দৌঁড়ে নাঈমের বাসায় গিয়ে ওকে ঘুম থেকে তুলে রক্তের কথা বললে নাঈম শুয়ে থেকে চোখ বন্ধ রেখেই হামি দিতে দিতে বলে, ‘এইডা কোনো ব্যাপারই না!’
  
ঠিকই আধঘণ্টার মধ্যে একজন বি নেগেটিভ ব্লাড ডোনার জোগার করে নিয়ে এসেছিলো নাঈম। হাসপাতালে পৌঁছে জলদি করে পা ফেলে ৪০৭ নাম্বার কেবিনের দিকে এগুচ্ছে সাফওয়ান। কেবিনে থাকা নাঈম এর স্বজনদের কাওকে ভ্রুক্ষেপ না করে সে সোজা নাঈমের সিটের পাশে দাঁড়িয়ে তার মাথায় হাত দিলো। চোখ মেলে তাকালো নাঈম। বলতে পারছেনা কিছুই। আপ্রাণ চেষ্টা করছে কিছু একটা বলতে। 

মনের কথাগুলো মুখ দিয়ে না বেরিয়ে হঠাৎ চোখ দিয়ে বেরুতে লাগলো। কি আশ্চর্য ব্যাপার! সাফওয়ানও কথা বলতে পারছেনা। বাতাসের একটা বল যেন আটকে আছে তার গলায়। চোখের জলের জবাব কি মুখে দেয়া যায়? মনের অজান্তে তারও চোখ বেয়ে গড়াতে লাগলো কিছু লবণাক্ত অশ্রু। সাফওয়ান ঝাপসা চোখে নাঈমের দিকে তাকিয়ে আছে ও কলেজের সেই চিরচঞ্চল মি.সলিউশন নাঈমকে স্মরণ করছে। যেখানে তার ছিল চঞ্চল, বাকপটু ও জ্ঞানগভীর ব্যক্তিত্ব। কাওকে সামান্য মন খারাপ করে থাকতে পর্যন্ত দিতো না অথচ আজ সে কঙ্কালদেহ নিয়ে শুয়ে আছে পাঁচ জনের বোঝা হয়ে।
 
নাঈম কেন? সফওয়ানের ঘোরতর কোন শত্রুর ক্ষেত্রেও সে এমন পরিস্থিতি কামনা করবেনা কখনো। চিকিৎসার খোঁজখবর নিয়ে নাঈমের আম্মার হাতে চুপিচুপি পাঁচ হাজার টাকা গুঁজে দিয়ে বললো, ‘নাঈম আমার কাছে টাকাটা পেতো, রেখে দিন!’
 
সম্মানের সাথে বন্ধুকে এতটুকু সহযোগিতা করতে মিথ্যা বলাটা ন্যায্য ছিলো। ব্যাপারটা নাঈমের আম্মা বুঝতে না পারলেও এমন বিপদের সময় টাকাটা হাতে পেয়ে অনেকটা ভরসা এলো উনার। কেবিন থেকে বেরিয়ে মসজিদে গিয়ে তৃপ্তির সাথে আসরের সালাত আদায় করে বন্ধুর আরোগ্যের জন্য দোয়া করে সাফওয়ান। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বেরিয়ে মেডিকেল কলেজের নান্দনিক ক্যাম্পাসটা ঘুরে দেখার প্রবল ইচ্ছে হলো তার। কৃত্রিম লেকের পাশে ছনের ছাউনি বেষ্টিত বেঞ্চগুলোর একটাতে বসা মাত্রই টেবিলে চমৎকার ডিজাইনের একটা ডেইলি নোটবুক(ডায়েরী) দেখতে পেল সাফওয়ান। প্রাইভেট নোট হতে পারে, তাই খুলে দেখার প্রশ্নই আসেনা তবে ডিজাইনটা খুব সুন্দর হওয়ায় ডায়েরিটা হাতে নিয়ে দেখলো এবং দেখে রেখে দিবে মাত্রই পেছন থেকে শুনতে পেলো মিষ্টি গলায় কর্কশ সূর করে অতি রূপবতী শ্রেণির কমবয়সী এক তরুণী বলছে, ‘হাউ ডিয়ার ইউ, কাম ইন হেয়ার এন্ড টাচ সাম প্রাইভেট থিংস? গেট লস্ট ফাস্ট ডেম ইট!’

নিঃসন্দেহে কথাগুলো ভয়ংকর অপমানজনক। সাফওয়ান অতিমাত্রায় লজ্জিত। সে ভাবছে আসলেই কি সে খুব বড় কোন অপরাধ করে ফেলেছে? নাকি মেয়েটি বাড়াবাড়ি করছে? সাফওয়ান নির্বাক! লজ্জিত মুখে তাকালো মেয়েটির দিকে। কিছু না বলেই ফিরে আসছে সাফওয়ান। মেয়েটি আরো কী যেন বলছে ইংরেজিতে। হঠাৎ সাফওয়ানের মনে হলো মেয়েটিকে ‘সরি’ বলে আসা দরকার এবং তা বলার জন্যই ফিরে তাকালো, কিন্তু কী যেন ভেবে সরি আর বলা হলো না । তবে যা বললো তা সে আর কাওকে কখনো বলেনি। 
‘প্লিজ জাস্ট বিহেইভ উইথ পিপল হুয়াট দে এক্সপেক্ট সিইং ইউর ফেইস!’

সাফওয়ান বাসায় ফিরে আসলো কিন্তু সে নিজেও জানেনা এই একটা বাক্য দিয়ে কিসের বীজ সে বপন করে এসেছে! 

~ রুমে ওরা চারজন থাকে। তাহজিবা, জেনিফার, তাশফিয়া ও তাবাছ্‌ছুম। দেখতে মিষ্টি ও ছেলেমানুষি স্বভাবের হওয়ায় রুমের সবাই তাশফিয়াকে স্নেহের চোখে দেখে। তাছাড়া মেধাবী ও মিষ্টভাষী হিসেবে পুরো ফরেইন হোষ্টেলে তার একটা পরিচিতি আছে। ইরানি এই মেয়েটা এখানে খুব একা। উর্দু জানা থাকায় ইন্ডিয়ান ও আফগান রুমমেটদের সাথে কিছুটা মানিয়ে নিতে পারছে সে। তা নাহলে মা-বাবার কনিষ্ঠ কন্যার পক্ষে দূরদেশে থেকে পড়াশোনা করা হয়তো সম্ভব হতো না। আজ বিকেলে ঘটে যাওয়া ব্যাপারটা সে এখনো কাওকে বলতে পারেনি। এমন কাওকে খুঁজে পাচ্ছেনা যাকে সে জিজ্ঞেস করবে যে, সে কি খুব বড় ভুল করে ফেলেছে? কিছু কি করার আছে তার?

অবশ্যই করার কিছু আছে। থাকতেই হবে, সে তো আর সারাজীবন অপরাধী হয়ে থাকতে পারবেনা! সে স্থির করল ডিনারের পর রুমের সবার সাথে বিকেলে ঘটে যাওয়া ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করবে। ঝটপট ডিনার শেষ করে সবাই পড়তে বসে গেল। তাশফিয়া সবার কন্ডিশন বোঝার চেষ্টা করছে। এই বলবে এই বলবে করে অনেকটা সময় পার হয়ে গেল। সবার মধ্যে বুদ্ধিমতী ও চতুর তাহজিবা তার এই অপ্রস্তুত ও অস্থির ভাবটা ধরে ফেললো এবং ইশারায় বাকি দু‘জনকেও অবগত করলো। মূহুর্তের মধ্যে তিনজন তাশফিয়ার বিছানায় উপস্থিত। তাশফিয়া তখন আর তাদের প্রশ্নের অপেক্ষা করলো না। নিজে থেকেই আদি-অদ্য বর্ণনা করলো ও উপস্থিত করণীয় জানতে চাইলো সবার কাছে। 

কবিরাজের ভঙ্গিতে তাহজিবা বললো, ‘আদৌ করণীয় কিছু আছে কি না তা এখনো স্পষ্ট হয়নি, তুই আগে বল ঐ ছেলেটা দেখতে কেমন? বা চিনতে পারার কিছু বৈশিষ্ট্য থাকলে বল, বাকিটা পরে দেখা যাবে’।

তাহজিবা খুব ভালো করে জানে যে, কারো প্রতি তার বিন্দুমাত্র হলেও দুর্বলতা আছে কি না তা ফুটে উঠে ঐ মানুষটার সম্পর্কে তার বর্ণনা বা বিশেষণ ব্যবহারের মধ্যে। তাশফিয়ার বর্ণনায় যে ছেলেটা প্রতিষ্ঠিত হলো সে হলো পৃথিবির শুদ্ধতম পুরুষ, ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতায় পরিপূর্ণ এক মহান ব্যক্তিত্ব। সবকিছু শুনে তাহজিবা বললো, ‘অবশ্যই আমাদের করণীয় কিছু আছে।’

জেনি : কী? তাশফিয়াকে পুকুরে নিয়ে গিয়ে চুবিয়ে আনা?

তাহজিবা : চুপ কর জেনি, এই পুলে আমাদের তাশফিয়া আর আটঁবে না। সে এখন সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে সিন্দাবাদের হাতছানির অপেক্ষায়।

তাবাচ্ছুম : আচ্ছা বাবা বল কী করণীয় আমাদের? বেচারি টেনশনে আছে।

তাহজিবা : আমাদের তিনজনের করণীয় ঐ মহাপুরুষটিকে খুঁজে বের করা আর বাকিটা তাশফি‘র নিজের।

জেনি : ওর আবার করণীয় কী?

তাহজিবা : আরে টিউবলাইট, তোর জানার তো কোন প্রয়োজন নাই, যার জানার কথা সে অবশ্যই জানে। তাই না তাশফি?

তাশফিয়া মুচকি হাসে।

তাবাচ্ছুম : তো কিভাবে খুঁজব ঐ মহাপুরুষটিকে? গুগলে?

তাহজিবা : ‘সিস্টেম জানা আছে’ বলে ফোনে তার বয়ফ্রেন্ড সরফরাজের সাথে নিচু স্বরে কিছুক্ষণ কী যেন বললো। তার পর আরো কিছুক্ষণ কয়েকজনের সাথে কথা বললো।

ফোন করা শেষ হলে সবার মাঝে নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো ‘মিশন দ্যা সার্চ অব মহাপুরুষ’, জেনি-তাবাচ্ছুম তাহজিবার হাতে হাত রাখার পর তাশফিয়াও রাখতে যাবে হঠাৎ কী মনে করে যেন আর হাতটা রাখলনা। রুমে হাসির বাজার বসে গেল।

(চলবে...)

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড