• রবিবার, ২৬ মে ২০১৯, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬  |   ৩৪ °সে
  • বেটা ভার্সন

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প

গল্প : এমন যদি হতো

  কাজী সাবরিনা তাবাস্‌সুম ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:০৯

ছবি
ছবি : প্রতীকী

নিজের নাম শুনতে পেয়ে থমকে দাঁড়ায় মিতু। কিন্তু পেছন ফিরে তাকায় না। এত আবেগ আর দরদ মাখা গলায় তাকে কে ডাকবে? মনের ভুলও তো হতে পারে! ঠিক তখন আবার শুনতে পেল নিজের নাম - ‘মিতু’

এইবার সে না তাকিয়ে থাকতে পারলো না। হ্যাঁ, যা আশংকা করেছিল ঠিক তাই! এত দরদ ভরা কণ্ঠে যার ডাকার কথা ছিল সেই লোকটাই দাঁড়িয়ে আছে তার ঠিক কয়েক গজ সামনে, মুখোমুখি! মিতু জানতো, এই দিনটা হয়তো কখনো আসবে। কিন্তু সে কোনোদিন অপেক্ষা করেনি এমন মুহূর্তর জন্য। তার মা সবসময় বলতো, কিছুর জন্য অপেক্ষা করার মানেই হলো সে জিনিস না পেলে অনেক বেশি কষ্ট সহ্য করা। কি দরকার? অপেক্ষায় না থাকলে আশা থাকে না। আশা না থাকলে যন্ত্রণার ভয়টাও থাকে না।

তাই মিতু কখনো আশা করেনি যে তার বাবা একদিন ফিরে এসে তার নাম ধরে এভাবে ডাকবে! হ্যাঁ, মিতুর সামনে দাঁড়ানো এই লোকটি মিতুর বাবা এবং একসময়ের প্রিয় বন্ধু। কত বছর আগের কথা সেটা মিতু এখন আর মনেও করতে পারে না। আসল কথা হলো মনে করতে চায় না। সংখ্যা খুব খারাপ জিনিস। সংখ্যার পেছনে গল্প মনে পড়ে যায়, অতীত নাড়া দেয়। সব অতীত সুখের হয় না, মিতু তাই অতীতে বিলীন হতেও চায় না।

কি আশ্চর্য! সারাজীবন মিতু ভেবেছে বাবা কে যদি কোনোদিন দেখে, ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরবে। আজ এত সামনে বাবা দাঁড়িয়ে, মিতুর একটুও ইচ্ছা করছে না জড়িয়ে ধরতে! তার মন চাইছে পালিয়ে যেতে! এইসব আবেগ আর দরদ ছাড়াই সে বেশ ছিল। কিন্তু সে পালাতে পারছে কই? তার পা দুটো কেউ যেন শক্ত শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে! পালাবার উপায় নেই! সত্যি কথা বলতে, বাবার দিকে তাকাতে খুব লজ্জা করছে তার। মাটির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে যখন সে ইতস্তত, তার বাবা তার নামটি ধরে আবারো ডাকলো। তার কাছে এসে মাথায় একটা হাত রাখলো! মিতুর সারা শরীরে কেমন একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। প্রচণ্ড আবেগ কোথা থেকে এসে তার সমস্ত অভিমানকে দুমড়ে মুচড়ে দিলো। মিতুর অজান্তে চোখ বেয়ে নামলো জল। সে জলের ধারা যেন আর বন্ধ হয়না! মিতু কাঁদতেই থাকলো।

কতক্ষণ কাঁদলো সে জানে না, যখন সম্বিত ফিরে পেল তখন দেখলো সে তার বাবার বুকের উপর। বাবার শার্টটা পুরোই ভিজে গেছে মিতুর অশ্রুজলে। অবশেষে সমস্ত অভিমান বোধহয় জল হয়ে গড়িয়ে গেল। মিতু এখন অনেক স্বাভাবিক। বাবার দিকে তাকালো সে! নয়টা মাসের নিদারুণ কষ্ট কি করে বোঝাবে সে? সেই যে কোন এক বিকাল বেলা হন্তদন্ত হয়ে বের হয়ে গেল ঘর থেকে! সে ঘুম ছিল বলে তাকে ডেকে জড়িয়েও ধরলো না। এরপর আর তো সে বাবাকে দেখলো না। কত শত ঘটনা ঘটে গেল। মাথার উপর ছায়া হয়ে থাকা সেই বাবা ছিল না তখন। কোথায় আছে , কি করছে, কেউ জানতো না। মিতুর মা শত পরিস্থিতি সামলে মিতুকে আগলে রাখার যুদ্ধ করে গেছেন।

এখনো তার মনে আছে, কতদিন তারা খাওয়ার কিছু পায়নি। পচা গলা ডোবার ঠাণ্ডা পানি খেয়েছে দিনের পর দিন। তার ডাক্তার বাবা কোথায় ছিল তখন? ক্রমাগত গুলি আর বোমার শব্দে টিকে থাকাটা কত কঠিন ছিল, তা কি বাবা জানে? মিতু দেখেছে তার মায়ের প্রতি মুহূর্তের আতঙ্ক! তার অসম্ভব স্বাধীনচেতা মা কিসের যেন ভয়ে জবুথুবু হয়ে থাকতো। কিসের যেন ভয়ে মিতুর সব চুল কেটে বয়কাট করে দিয়েছিল মা। হাফপ্যান্ট আর শার্ট পড়িয়ে ছেলে বানিয়ে রাখতো তাকে। মিতু বুঝতে পারতোনা, কেন তার মা এইসব করছে? এই প্রিয় বন্ধুরূপী বাবা তখন তাদের পাশে ছিলনা। মা মেয়ে ছন্নছাড়া হয়ে ঘুরেছে এই বাড়ি থেকে ঐ বাড়ি, এই গ্রাম থেকে ঐ গ্রাম, এই দেশ থেকে ঐ দেশ! সেসব ছিল শুধুই পালিয়ে বেড়ানোর দিন। কতবার মিতু ভেবেছে হঠাৎ করে হলেও বাবার সাথে দেখা হয়ে যাবে। বাবা তাকে কাঁধে তুলে তার মায়ের হাতটা ধরে বাড়ি ফিরবে। সেই বাড়ি, যেটাকে মিতু দাউদাউ করে আগুনে জ্বলে পুড়তে দেখেছে। কিন্তু তার ধারনা, বাড়িটা আসলে কেউ পুড়িয়ে দেয়নি। সে হয়ত স্বপ্ন দেখেছিল! মিতু সবসময় তার অপছন্দের ঘটনা গুলোকে স্বপ্ন ভাবে। তার বাবাই শিখিয়েছিল তাকে! খেলায় হেরে গেলে সে যখন কান্না করতো, বাবা বলতো, ‘খেলায় হেরে গেলে ভাববে সেটা স্বপ্ন। পরের খেলায় জেতার চেষ্টা করবে। জিতে গেলে ভাববে এটাই সত্য’।

সেই নয় মাসের বিভীষিকা শেষ হয়ে বছর গড়িয়ে গেল! তারপর বছরের পর বছর। কোথায় ছিল তার বাবা? কোনোদিন জানতেও চাইলো না কেমন আছে মিতু? একটা চিঠিও দিলো না কখনো! এইরকম শত প্রশ্ন মিতুর মনে জমা ছিল এতদিন ধরে। কিন্তু আজ সে কোনো প্রশ্নই করলো না।

মিতুর বাবা মিতুর হাতটা ধরলো। সেই পরম মমতামাখা হাতের ছোঁয়া! কতদিন পর! মিতুর হৃদয়ে কেমন একটা আদর পাওয়ার উত্তোলন শুরু হল। বাবার চোখের দিকে চেয়ে শুধু বললো, ‘কেন আসলে?’

মিতুর বাবা আরও মায়া ভরে মিতুর হাতটা নিজের দিকে টেনে নিলেন। পরম যত্নে পকেট থেকে কিছু একটা বের করলেন । মিতুর হাতে দিয়ে বললেন, ‘আমার কন্যার জন্য স্বাধীনতা আনতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি ঘর বাড়ি স্ত্রী কন্যা কেউ নেই। সেই থেকে পথে পথে ঘুরছি আর খুঁজছি! এতগুলো বছর পর আমি কন্যাকে খুঁজে পেলাম। এই নাও স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। এইটা অর্জন করতে গিয়ে পরিবার বর্জন করতে হয়েছে মা।’

মিতু পতাকাটা মেলে ধরলো। সবাই বলেছিল তার বাবা আর ফিরবে না। কিন্তু তার মনে বিশ্বাস ছিল বাবা ফিরবেই। ছোটবেলার মত বাড়ি ফেরার সময় মিতুর জন্য কিছু একটা নিয়েই ফিরবে। মিতুর ধারনাই ঠিক হলো তবে! তার বাবা ফিরেছে স্বাধীন দেশ নিয়ে। মিতু প্রবল আকর্ষণে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো। আর কখনোই ছাড়বে না সে তার বাবাকে।

অদ্ভুত একটা প্রশান্তিতে মিতু বাবার ছবিটার দিকে তাকিয়ে হাসলো। বাবার ছবি হাতে নিলেই এক এক দিন এক এক রকম গল্প মাথায় আসে তার। বাবা মেয়ের পুনর্মিলনের গল্প। একা বসে বসে কত ধরনের গল্প যে বানায় সে! ইশ! এমন যদি সত্যিই হতো! সত্যিই যদি ফিরে আসতো বাবা! বাবার ছবির পাশেই লাল সবুজ পতাকাটা। আহা! বাবা যদি দেখতো এই পতাকাটা কত স্বাধীন ভাবে ওড়ে এখন স্বাধীন বাংলাদেশে। বাবা তাকে স্বাধীন দেশ দিয়ে গেছে, পেয়েছে শহীদের সম্মান, তবুও মিতুর ভিতরে কিসের যেন হাহাকার!

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড