বই আলোচনা

‘শ্বেতপদ্ম’ মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৫:২৫

  অপরাজিতা অর্পিতা

কাহিনী সংক্ষেপ:

অভিমানী ও চাপা স্বভাবের মেয়ে অর্পিতা, পেশায় নিষ্ঠাবান ডাক্তার। স্বামী নাফিস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, একে অন্যের প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসা তাদের। তাদেরই ছোটবেলার বন্ধু, উদার, পরহিতৈষী অথচ নিজেকে গোপন রাখতে পছন্দ করে এমন গুণী লেখক আজীম, প্রচণ্ড ভালবাসার মানুষ জ্যোৎস্নার কাছ থেকে অতি তুচ্ছ কারণে বঞ্চিত হয়ে সারাজীবন সেই ভালবাসা বুকে নিয়ে একাই জীবন কাটিয়ে দেয়। এদের সকলের প্রিয়, অত্যন্ত কাছের মানুষ, মেন্টর, কানাডা প্রবাসী ডাক্তার আবীর। যার আদর্শ, অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, জীবন দর্শন মুগ্ধ করে সবাইকে। অথচ তারই উপর ক্ষুদ্র কারণে পাহাড়-সম অভিমানের প্রতিশোধ নিতে প্রিয়তমা ঝুমুর রাগ করে বিয়ে করে ফেলে খুব অপছন্দের একজন মানুষকে।

অন্যদিকে, প্রবাসী তরুণী নাবিলাহ, বাবার মুখে দেশের কথা শুনে, দেশের প্রতি তীব্র ভালবাসার টানে, একাই দেশে আসে, দেশকে চিনতে ও জানতে। তখন মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশ। বাবা-মা, প্রবাসী জীবন সব ভুলে, জীবনের মায়া না করে একজন মেয়ে হয়েও ঝাঁপিয়ে পড়ে যুদ্ধে। আর এক ভালবাসার প্রতীক দরিদ্র রিকশাচালক জামাল ও তার স্ত্রী নির্মলা ওরফে প্রজাপতি। দরিদ্রতা ও ধর্মের ভিন্নতাও তাদের ভালবাসা ও সংস্কারকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। এছাড়াও রয়েছে রহস্যময়ী চরিত্র সালমা, কখনো লেখক তাকে স্পষ্টভাষী করে উপস্থাপন করেছেন, কখনও বা অভিমানী ও আবেগপ্রবণ করেও তুলে ধরেছেন তাকে। বিভিন্ন দেশের যুদ্ধ, সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাস ফুটে উঠেছে আজীম ও সালমার কথোপকথনে। 

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভুট্টো, ইয়াহিয়া এবং জুলফিকারের ষড়যন্ত্র, জনগণের জন্য অনুপ্রেরণা প্রদানকারী বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ, ২৫শে মার্চ কালরাত্রিতে ঘটে যাওয়া গণহত্যার বিভৎসতা, সাহসী তরুণ মুক্তিযোদ্ধার প্রতীক হিসাবে ফারুক ও এজাজের চরিত্র এবং মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা ট্রেনিং, তাদের মনোবল বৃদ্ধির ঔষধ সেই সময়ের জনপ্রিয় “দেশাত্মবোধক গানগুলো” ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে অভূতপূর্ব ভাবে ফুটে উঠেছে এ উপন্যাসে। অত্যন্ত কৌশলে উপন্যাসের নেগেটিভ চরিত্র রাজাকাররূপী আতর মুন্সির চরিত্রটি উপস্থাপিত হয়েছে শ্বেতপদ্ম উপন্যাসে। 

১৯৭১ সালের জানুয়ারি থেকে আরেক জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনা প্রবাহের সাথে, এগিয়ে চলে উপন্যাসের চরিত্র গুলোর জীবন। সালমার বিদায়, নাফিসের হত্যা, আজীম ও জ্যোৎস্নার হৃদয়বিদারক মৃত্যু, দেশ স্বাধীনের পর অর্পিতাকে ছেড়ে আবীরের চলে যাওয়ার ঘটনাগুলো পাঠক হৃদয়কে বারবার ভিজিয়ে দিয়েছে। বইটির প্রতিটি পাতার প্রতিটি শব্দ, যেন এক একটি দিনের গল্প বহন করে চলেছে। বহন করেছে একাত্তর সালের এক একটি দিনের ইতিহাস। উপন্যাসের সবগুলো চরিত্র, সব গুলো যেন ঘটনা একসূত্রে গাঁথা হয়ে যায়, মুক্তিযুদ্ধের ক্রান্তিকালে। উপন্যাসটিতে যেমন ফুটে উঠেছে অনেক গুলো সম্পর্কের মায়ায় জড়ানো চরিত্র, ভালবাসা ও আবেগের বন্ধন। তেমনি নির্ভুল ও সহজবোধ্যভাবে প্রকাশ পেয়েছে ইতিহাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক। বর্ণিত হয়েছে মর্মস্পর্শী মুক্তিযুদ্ধ, জীবনযাপন, দেশপ্রেম, প্রতিশোধের স্পৃহা।


পাঠ প্রতিক্রিয়া: 

মুক্তিযুদ্ধ পরিবর্তী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প, সব সময়ই প্রচণ্ড আকর্ষণের। আর তা যদি হৃদয়গ্রাহী করে উপস্থাপন করা হয়, তবে তো আর কথায় থাকে না। শ্বেতপদ্ম বইয়ে যা ফুটে উঠেছে খুব চমৎকার ভাবে। কখনো কখনো ফিকশনের চেয়ে প্রেম, আবেগ, বন্ধনও জীবনের অনেকটা অংশ জুড়ে জায়গা করে নেয়। ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস হলেও, শ্বেতপদ্মে মুক্তিযুদ্ধের নানা পটভূমিতে এদেশের মানুষের ভালবাসা, আবেগ, অনুভূতি খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক।

মনের সাথে মনের টান, প্রাণের বন্ধন, ইতিহাসের সাথে সরল রেখায় চলতে থাকা ভালোলাগা, অনুভূতি, অভিমান, পাকসেনাদের কারো কারো মাঝে জমে থাকা আক্ষেপ, মানবিকতা, মনুষ্যত্ব ... যা পাঠক হৃদয় আন্দোলিত করবেই। ইতিহাসের সাল তারিখ মনে রাখা অনেকের জন্য বেশ কষ্টের। কিন্তু বইয়ে উল্লেখিত ইতিহাসের নানা তারিখ, সাল, ঘটনা; এমন ভাবে লেখক উপস্থাপন করেছেন, যা খুব সহজেই পাঠক মনে জায়গা করে নেবে। বইয়ের প্রতিটা অধ্যায়ে রয়েছে চমক, তাই একটানে পড়ে ফেলতে ইচ্ছে করবে বইটি। আবীরের ব্যক্তিত্ব, অর্পিতার স্নিগ্ধতা, ঝুমুরের অন্ধ ভালবাসা যেমন মন ছুঁয়ে গেছে, তেমনি আজীমের উদারতা ও আত্মত্যাগ, নাবিলার দেশপ্রেম, জামাল ও তার স্ত্রী প্রজাপতির আতিথেয়তা, পাকিস্তানী ক্যাপ্টেন সোহেলের অন্যরকম চরিত্র আমার মনকে নাড়া দিয়েছে তীব্রভাবে।

লেখকের সৃষ্ট উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র, আবীরের মতো মানুষকে যে কেউ তার জীবনে চাইবে। কেয়ারিং মানুষকে সবাই খুব আপন ভাবে, নিজের ভাবে। প্রেমময়ী অর্পিতার ভালবাসার গভীরতা, স্নিগ্ধতা নারী চরিত্রের উল্লেখযোগ্য দিক। মেয়েদের অন্য আর এক স্পর্শকাতর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য; একক অধিকারিত্ববোধও নাড়িয়ে দিয়ে যায় মন। প্রতিদিন ভোরে আজীমের দরজার সামনে সালমার ছিটিয়ে রাখা শিউলি ফুলের উপর দিয়ে প্রথম পদক্ষেপ দিয়ে শুরু হয় যার দিবসের পথচলা, সালমার চলে যাওয়ায় তা থেমে যায়। মনটা হুহু করে ওঠে আজীমের, হু হু করে পাঠকের মনও। কাছে থাকতে যাকে প্রিয় মনে হয়না, চলে গেলে সে প্রিয়’র চেয়েও বেশি কিছু হয়ে যায়। পুরো উপন্যাস জুড়ে অত্যন্ত সুনিপুণ ভাবে একটু একটু করে প্লট পরিবর্তন করেছেন লেখক, চরিত্রের সাথে চরিত্রের মিলন ঘটিয়েছেন দক্ষতার সাথে। নিঃসন্দেহে এটা লেখকের একটা কালজয়ী সৃষ্টি।

ব্যক্তিগত অভিমত থেকে বলতে চাই, ভারত বর্ষের ও বিশ্বযুদ্ধের কিছু ইতিহাস কমিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আরো প্রাণস্পর্শী ঘটনা, আবীরদের গেরিলা বাহিনীর আরো আত্মত্যাগ এবং আজীম ও জ্যোৎস্নার বিদায় দৃশ্যের আরো গভীর বর্ণনা থাকলে পাঠক হিসাবে আমার আত্মতৃপ্তি পূর্ণতা পেতো শতভাগ এবং বইটিও সমৃদ্ধি পেতো।

দুঃখ কষ্ট, ভাললাগা, আবেগ উত্তেজনা, মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে বিজয় পর্যন্ত ধারাবাহিক ঘটনার বিবরণ সব মিলিয়ে ‘শ্বেতপদ্ম’ উপন্যাসটি নিঃসন্দেহে আমার পাঠক হৃদয়কে ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে গেছে।

বই সম্পর্কিত তথ্য-

উপন্যাস: শ্বেতপদ্ম 
লেখক: তাবারক হোসেন
প্রকাশনী: অন্যপ্রকাশ
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ