• মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ১০ বৈশাখ ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

গল্প : আবছায়া

  শারমিন আক্তার সেজ্যোতি ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:৫৩

গল্প
ছবি : শারমিন আক্তার সেজ্যোতি

শিরশির ঠাণ্ডা হাওয়াটা যেন অণুর গা ভেদ করে শরীরে শিহরণ দিচ্ছে, প্রচণ্ড শীতে কুঁকড়ে আছে অণু। উঠে বসবার ইচ্ছে কিংবা ক্ষমতা কোনটাই তার নেই। অবশ্য তার জন্য এ নতুন নয়। রোজ বিকেলেই অণু রায়েতের সামনের বাড়ির পুকুর পাড়ে এসে চুপ করে বসে থাকে। হোক সে বর্ষা-বাদল, শীত, গ্রীষ্ম! ওসব তাকে ভাবায় না।

এক দৃষ্টিতে পুকুরের ওপারে তাকিয়ে থাকে দিব্যি। পলকহীন চাহনিতে। এই তো সেদিন বিনুর ছোট ছেলে সন্ধেবেলা পুকুরে এসেছিলো স্নান করতে কিন্তু অণুকে ভূত ভেবে এক দৌড়ে বাড়ি গেলো ছেলেটা। তারপর থেকে জ্বরে পরেছে, ভালো হওয়ার নাম নেই।

বিনু অণুর ছোটবেলার সখি কিন্তু তাতে কি বিনু তো আর অণু নয়! তার ভরা সংসার। স্বামী সন্তান নিয়ে বেশ জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছে। আর অণু?

অণু নিজের ধ্বংস উপভোগ করছে রায়তের পুকুর পাড়ে। বিকেল গড়িয়ে রাত হলে অণুর শাশুড়ি এসে তাকে ধরে-বেঁধে নিয়ে যাবে নিশ্চিত। কিন্তু আজ অণুর শাশুড়ির শরীরটা ভালো নেই, হয়তো ভুলে গেছে তার পাগল বউ পুকুর পাড়েই ঠায় বসে আছে।

গত চারটা বছর অণুর বিকেল কাটে এখানেই আর রাত কাটে বদ্ধ ঘরে। জোড় করে টেনে নিয়ে ওকে তালা দিয়ে দেয়া হয়। রোজরোজ পাগল বউদের পাগলামি মেনে নেওয়ার কোন যৌক্তিক অর্থ তো নেই।

বিকেল হলে অণু কাঁদে। ভাঙচুর শুরু করে বদ্ধঘরে। আর সমানে বলে যায়, ‘মা দরজাটা একটু খুলে দাওনা, এঘরটা বড়ো অন্ধকার। তোমার ছেলে ডাকছে তো! মানুষটা সেই কখন থেকে ডেকে যাচ্ছে এরপরে না গেলে তো বাড়ি ফিরবে না আর। খোলো না দরজাটা।’

অণুর শাশুড়ি রোজই কিছুক্ষণ এর জন্য হলেও তাকে তালামুক্ত করে। কারণ সে জানে নইলে অণু অন্ন-জ্বল ছাড়বে। এ বয়সে অণুর বাড়াবাড়ি সহ্য করার মতো সহ্যশক্তি তার থাকা উচিত না আর তাই সামান্য স্বস্তির-স্থবিরতা নিশ্চিত না করতেই বোধহয় তিনি অণুর পাগলামি মেনে নেন। এ ছাড়া অন্য উপায় তার কাছে নেই। ভাবেন, ‘এই মেয়েটিই একদিন নিপুণ হাতে সংসার সামলেছে আর আজ সে শূন্য সংসারেও শাখা- সিঁদুরের ছোঁয়ায় নিজেকে পূর্ণ ভাবার কি নিখুঁত অভিনয় করে চলেছে।’

এই অণুই একদিন তার ছেলের উপর হাজারো অভিযোগ নিয়ে নির্বোধ ভাবে বড়ো আবদার নিয়ে বরের নামে নালিশ দিয়ে যেত। বউ-শাশুড়ি সম্পর্ক যে রেষারেষির। মা-মেয়ের মাখামাখি সম্পর্ক না। তা অণু সেদিনও বোঝেনি আজও বুঝবে না। কণ্ঠে একরাশ কাকুতি নিয়ে সে আজও বলবে, ‘মা আমায় একটু যেতে দাও। তামার পায়ে পড়ি মা যেতে দাও। তারে না দেখলে যে আমার দেহ মন ক্ষুধার্তই রয়ে যাবে। কোনদিন আমার তৃষ্ণা মিটবে না-যেতে দাওনা মা, যেতে দাও আমায়।’

কিন্তু অণুর এই অযৌক্তিক উন্মত্ততা ঘোচানোর উপায় অণুর শাশুড়ির জানা নেই। বহুবার অণুকে বাপের বাড়ি পাঠানোর চেষ্টা বৃথা গেছে। না সে এখানেই পরে থাকবে আর প্রলাপ বকে যাবে, এই তার সংসার। অণু আজও সিভুর একটু আলতো ছোঁয়ার অপেক্ষায়। ওর চিবুক ধরে আলতো করে কপালে সিভুর ঠোঁটের সেই ঠাণ্ডা ছোঁয়ার অপেক্ষায়। আর সেই স্বর্গ মাতানো প্রেমের রাজরানী হয়ে এক পশলা ভালোবাসার বৃষ্টির অপেক্ষা..।

আজ অমাবস্যা। ঘুটঘুটে অন্ধকার। সাথে গাছের মগডালের হুড়মুড় করে দুলে উঠার বিকট অনুভব। অণু বসে আছে পুকুরে পা ডুবিয়ে। অন্ধকারে ভয় পাবার মতো ভয় অণুর নেই। কেন না ভয় অনুভব করতে নির্ভয় আর ভয়ের পার্থক্যের অনুভব থাকা চাই, যা অণুর নেই। সে কথা বলছে, বলেই চলেছে। অমাবস্যা কিংবা জ্যোৎস্নার আলো-অন্ধকার তাকে ছোঁয় না। অণু প্রেমে মত্ত, গভীর প্রেমে! যে প্রেমের প্রখর তেজে সে পার্থিব অনুভবকে অগ্রাহ্য করে চলেছে।

এই তো সেদিন খেলার ছলে অণু আর সিভু এখানেই নিজেদের পুতুলের বিয়ে দিয়েছিলো। আবার পুতুল বিয়ের নাড়ু নিয়ে ঝগড়া করে দুজনই নিজের নিজের পুতুল এই পুকুরেই ভাসিয়ে দিয়েছিলো। রাগ করে গুনেগুনে তিনদিন একে অপরের মুখ দেখেনি। সেই তিনদিনই! এরপরে আর কখনো তারা এমন রাগ করেনি।

তারপর একদিন তাদের বিয়ের ধান-চাল ভাসলো এই পুকুরে। বিয়ের পরে কারণ-অকরণে অণু গাল ফুলিয়ে ছো মেরে এখানে আসতো। উদ্দেশ্যে সিভু এসে তার মান ভাঙ্গাক। তবে সিভুর যে অভিমানী অণুকেই বেশি ভালো লাগতো। তাই মান -অভিমানের পালা দীর্ঘ হতো। পাড়া জুড়ে ওদের প্রেমের বয়ান হতো ঘরেঘরে। সিভুর আহ্লাদী অণু বলে ঝি-বৌ হাসিতে ফেটে পড়তো।

কিন্তু আহ্লাদ তো আবছায়া, রেশ কাটতেই আহ্লাদ মিলিয়ে যায়। বড় সত্য সামনে আসে!আহ্লাদ সেখানে নিতান্তই তুচ্ছ। অনেক চেয়ে কেবল দুমাসের ছুটিই পেয়েছিলো সেবার সিভু, তাও অণুর সে কি কান্না। অণুকে জড়িয়ে ধরে সিভু বারবার বলেছিলো, ‘এত জোড়ে আঁকড়ে ধরেছো আমায় যেনো জীবনের তরে যাচ্ছি। একটাবার তাকাও আমার দিকে অণু, একটু হাসো। কেঁদে কেঁদে আমার বুকে সাগর বহিয়ে দিচ্ছো যে।’

উত্তরে অণু সিভুকে আরো জোড়ে আঁকড়ে ধরে চুপ হয়ে ছিলো। সেদিন কোন কথাই আর বের হয়নি অণুর মুখ থেকে। অজানা কোন এক ভয় তাকে গিলে খাচ্ছিলো। তাই সে সিভুর বুকেই লুকিয়ে থাকতে চেয়েছিলো অনেকক্ষণ। অনেককাল ধরে...

কিন্তু সিভুর যে যেতেই হবে। অণুকে লুকিয়ে রাখার জায়গা সমেতই সিভুকে যেতে হবে। শুধু অণুকে রেখে। যেতে যেতে সিভু বলেছিলো, ‘এই যে এত কাঁদছো, আর আসবো না তো! দেখো, কেঁদো তখন।’

ক্ষণিকেই চোখ মুছে অণু মুখ ভেংচে বলেছিলো, ‘বয়েই গেছে আমার এসো না যেনো, মনে রেখো। একটুও ভালোবাসো না আমায় তুমি, বুঝি তো।’

সিভু এক চিলতে হাসি দিয়ে প্রস্থান করেছিলো। যাবার বেলায় নিজের অভিমানী ভালোবাসাকে ফিরে ফিরে দেখেছে আর ভেবেছে, ‘এই একটি মেয়ের অভিমানের রাজ্যটাই কিভাবে এত বড় হতে পারে। কারো ভালোবাসা কিভাবে এত মোহময় মায়ার হতে পারে? কিভাবে কাছে না থেকেও অণু সিভুর ভিতরটা রেখে দিতে পারে। কিভাবে সিভুকে শুধু নিজের ভেতরকার খোসাটা নিয়েই যেতে হচ্ছে।আর কি অসীম ক্ষমতার অধিকারিণী এই অণু। হ্যাঁ, ঠিক এ জন্যই বোধহয় প্রেয়সীর মায়া কাটানো যায় না। ঠিক এ জন্যই অভিমানী অণুকে শাসন করা যায় না।’

সিভু চলে যাওয়ার পরে অণু নিজের মূর্খতার উপর হেসেছিলো। এই সামান্য দুদিনের বিরহে অণুর এতটা পাগলামো না দেখালেও চলতো। শুধুশুধু সিভুকে মন খারাপের ভারটা না দিলেই কি অণুর হচ্ছিলো না। এই এতটুকু খারাপ লাগা অণু চাইলেই সিভুর থেকে আড়াল করতে পারতো। তবে কেনো অণু সিভুর উপর এই অহেতুক খারাপ লাগাগুলো ছুড়ে দেয়? আর অণু তো জানে সিভু কথা রাখবে, ঠিক ফিরে আসবে। কিন্তু সেই শেষবার সিভু অণুকে দেয়া কথা রাখেনি, সে আর ফিরে আসেনি অণুর কাছে।

অণুর রাগ হয়েছিলো, ভেবেছিলো আর কখনো কথা বলবে না সে সিভুর সাথে। কিন্তু না রাগ কি শুধু তার একারই হতে আছে। সিভুর বুঝি রাগ হতে পারে না। অণু যে বলেছিলো এসো না যেনো। তাতে ও তো সিভুর রাগ হতে পারে। আর তার রাগ ভাঙ্গাতে শত-সহস্র অভিমানের সাক্ষী এই পুকুর পাড়ের চেয়ে ভালো আর কিই বা হতে পারে....’

এই পুকুর পাড়েই সিভু আসবে। হুট করে পিছন থেকে এসে জাপটে ধরেই সিভু তার অভিমানী অণুর দিকে তাকিয়ে অকারণ হেসে দেবে। অণু শতচেষ্টা করেও নিজের রাগ ধরে রাখতে পারবে না। সিভুর অট্টহাসির কাছে তার তিলেতিলে জমানো অভিমান ভেঙে খসে পড়বে, হাসতে তাকে হবেই। আর তখন অণুর নির্বাক চোখ জোড়া সিভুর ক্লান্ত জোড়া চোখের দিকে তাকিয়েও লজ্জায় নুয়ে পড়বে, শুকনো পাতার ঝড়ে পড়ার মতোই অভিমানের দহনে ভালোবাসার ঝুম বৃষ্টি হবে।

কিন্তু সিভু বড় শক্ত মনের। আজও ওর রাগ ভাঙলো না। অণু বলে চলেছে, ‘আচ্ছা ভুল হয়েছে আর হবে না, এই তোমার নামে বলছি তাকাও একটিবার আমার দিকে, তাকাও না! সেই কবে গেলে,মনে পড়েনা বুঝি একটি বার? এজন্যই বলেছিলাম একটুও ভালোবাসো না আমায়,দেখলে তো মিথ্যে বলি নি।’

এমন সময় বিনুর কণ্ঠ, ‘কিরে অণু? তুই এই ভোরেও এখানেই বসে আছিস? ওরে এখন তো ট্রেন এলো বলেরে, ওই দ্যাখ ট্রেনের শব্দ! এইযে পুকুরের ওই পাড়ের ওইখানেই কাঁটা পড়েছিলো আমাদের সিভু! তোর পোড়া কপাল রে অণু, কেঁদে কি হবে আর ‘

- অণু? অণু? - চোখ খোল, কি হলো রে তোর! অণু?

বিনুর এই অহেতুক সত্য বলে দেওয়াটা অণুর চোখে নিরাশার ঘুম ডেকে আনলো। তার জেগে থাকা ইন্দ্রিয়গুলো স্বেচ্ছায় সব ঘুমিয়ে যেতে লাগলো।তবে অণুর চোখে অবছা প্রতিবিম্ব। অণু একে চেনে! কাছে আসতেই ক্রমশ আরো স্পস্ট হচ্ছে ট্রেনে কাঁটা পরা সিভুর ক্ষতবিক্ষত দেহটা। অণু ভাসছে স্মৃতিতে ,ভোরের আলো ওকে অন্ধকারের আভাস দিচ্ছে। সিভুর দৃষ্টি ওকে ফ্যালফ্যাল করে দেখছে। নিথর দেহের সিভু ওকে রোজকার মতো আজও নিথরে আমন্ত্রণ দিচ্ছে। অণু ঠিক এখনই সিভুতে মিশে যাবে ঠিক এখনই। ওদের দীর্ঘ অভিমানের, বিরহের সমাপ্তি হবে আজ সিভু এখনই হাত বাড়াবে অণুর জন্য! কিন্তু সিভু....!’

এমন সময় আরো একটা পরিচিতি নিষ্ঠুর কণ্ঠস্বর অণুর কাছে ভেঙে ভেঙে আসছে। ঠিক যেমন হাতুড়ি দিয়ে কেউ অণুর কানে বাড়ি দিয়ে যাচ্ছে সমানে। কণ্ঠটা অণুর শাশুড়ির, ‘অণু! বউমা আমার। চল মা ঘরে চল! সকাল হয়ে গেছে যে!’

আজ প্রথমবারের মতো অণুর মনে হচ্ছে হ্যাঁ এটা সত্যিই ওর শাশুড়ি। আজ অণুর মন বলছে মা-মেয়ের সম্পর্ক বোধহয় এ না। এ সম্পর্ক রেশের, যুদ্ধের, অপ্রাপ্তির আর নিষ্ঠুরতার। নইলে আজ এই মহিলা অণুকে এভাবে নিয়ে যেতে পারেন না। চূড়ান্ত প্রাপ্তির দরজায় দাঁড়িয়ে এভাবে কোন মা অণুকে বঞ্চিত করতে পারেন না।

হাজারো অভিমানে অণুর মস্তিষ্ক বিকল হতে চলেছে। অণু প্রাণপণে নিজেকে অনড় রাখার চেষ্টা করছে কিন্তু না সে বুঝছে পারছে তাকে আজও টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সিভুহীন সেই বদ্ধঘরে। যে ঘরে প্রেমের বাতাস পৌছায় না। যেখানে ভালোবাসার সন্ধ্যা হয় না। যেখানে ভালোবাসার বৃষ্টি নামে না।যেখানে শুধু হাহাকার আর শূন্যতা খেলা করে ,অপ্রাপ্তি আর লাসের গন্ধ ভেসে বেড়ায় বাতাসে। অণু লড়াই করার শক্তি হারাচ্ছে, যেন তার সমস্ত শক্তি আজ আমাবস্যার অন্ধকার সুষে নিয়ে যাচ্ছে।

অণু অধীর হয়ে আকাশের দিকে একবার তাকানোর চেষ্টা করলো। ওর অতৃপ্ত দৃষ্টি সকালের আলোর প্রতিবাদ জানাচ্ছে কিন্তু সে সিভুকে দেখছে। সিভু আজও তার দিকে ফিরেফিরে তাকাচ্ছে, সিভুর সেই জোড়া চোখ বেয়ে আজ ফোটায় ফোটায় রক্ত পড়ছে। অণু তার সমস্ত অভিমানকে ছুটি দিয়ে আবারও সিভুর দিকে হাত বাড়াল। সাথেসাথেই সিভুর আবছা ছায়াটা নিমিষেই অণুতে বিলীন হয়ে, তাকে আবার সেই বদ্ধঘরে ঘুম পাড়িয়ে দিলো।

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড