• বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৮ ফাল্গুন ১৪২৫  |   ২৫ °সে
  • বেটা ভার্সন

‘হঠাৎ পাওয়া’-এর দ্বাদশ পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস : হঠাৎ পাওয়া

  শারমিন আক্তার সেজ্যোতি ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৩:০৮

উপন্যাস
ছবি : শারমিন আক্তার সেজ্যোতি

কণা ভেবে চলেছে, ‘মানেটা কি? সবাই কি এই লোকটিকে ইচ্ছেমত সব নামে ডাকে নাকি। আর লোকটা খাচ্ছে না কেনো? খাওয়া বাদ দিয়ে এমন হা করে বাচ্চাদের মতো চুপচাপ বসে লাইবার মায়ের কথায় মাথাই বা নাড়াচ্ছে কেনো?
অদ্ভুত তো! উনি কি এই বয়সেও খেতে লজ্জা পাচ্ছেন নাকি?’

কণার সামনে বসে থাকা ভারী স্বভাবের, শান্ত ছেলেটির নাম শ্রাবণই বটে, পুরো নাম হিমেল শাহারিয়ার শ্রাবন। ভালো নাম শাহারিয়ার এবং তার ডাক নাম শ্রাবণ!

তবে শুধু লাইবার মা অর্পিতা বেগমই ডাকেন হিমেল নামে। ছোটবেলা থেকে শ্রাবণকে যেই তার নাম জিজ্ঞেস করুক না কেনো বাচ্চা-ছেলের মতো প্রতিবারই সে তার পুরো নামটাই বলে। প্রথম যেদিন লাইবার মা তার নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন,
শ্রাবণ শান্ত গলায় একপলক তাকিয়ে বলেছিলো, ‘হিমেল শাহারিয়ার শ্রাবণ!’

নামটা শোনা মাত্রই লাইবার মা শ্রাবণের দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলেন, ‘বাবা কে রেখেছে তোমার নাম?’

শ্রাবণ পুনরায় তার দিকে এক পলক তাকিয়ে নির্লিপ্ত ভাবে গড়গড় করে উত্তর দেয়, ‘আমার জন্মের পরে আমার তিন ফুঁপি আমার জন্যে তিনটা নাম পছন্দ করেছিলেন আন্টি, তিনটি নামই খুব সুন্দর হওয়ায় কোনটি আসলে আমার নাম হবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কঠিন ছিলো এবং ফুঁপিদের কারোই কোন ছেলে ছিলো না। তাই তাদের শখের ব্যাপারটাও মায়ের মাথায় ছিলো, মা কাউকে কষ্ট দিতে চাননি তাই তিনটা নামই একসাথে রেখে দিয়েছিলেন।’

শ্রাবণের চপল চোখে নামের এমন রহস্য শুনে লাইবার মায়ের রীতিমতো চোখ কপালে ওঠার উপক্রম, শ্রাবণের উত্তরের ভঙ্গিই বলে দেয়, জীবনে নিজের নাম নিয়ে এমন প্রশ্ন সে এই প্রথমবার শোনেনি। বরং এটি তার কাছে নিতান্তই কমন প্রশ্ন। তাই উত্তরটাও তার আগে থেকেই গোছানো। 

মিসেস অর্পিতা দুই বার বড় বড় ঢোক গিলে বলেন, ‘শাহারিয়ার সাইজে কি লম্বা নাম বাবা। আর শ্রাবণ! এহে! সেই আগেকার দিনের গল্প উপন্যাসের ছ্যাঁচড়া সব নাম। হিমেলটা ঠিক আছে। তা হিমেল বাবা কাল থেকেই চলে আসো পড়াইতে, পড়ানোর সময় আমি আশেপাশেই থাকবো সবসময়। লজ্জা পাওয়ার কোন কারণ নাই।’

এরপরে শ্রাবণ এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়িয়ে তার সম্মতি জানিয়ে দিয়ে সপ্তাহে চারদিন নিয়ম করে লাইবাকে পড়াতে শুরু করেছে।

কিন্তু  সেসব ব্যাপার কণার জানার কথা না, সামনে বসে থাকা ছিপছিপে গড়নের, তামাটে ফর্সা বর্ণের ছেলেটিকে নিয়ে কণার কৌতূহল এর শেষ নেই।ছেলেটার নাম নিয়েও একটা বিশাল লবডঙ্ক অবস্থা,উপরন্তু হিমেল নামটার হিমুর সাথে বেশ মিল আছে, কণার হিমু চরিত্রটি একেবারেই পছন্দ  না! হুমায়ুন আহমেদের সব গল্পের বই গুলো সে খুঁজে খুঁজে পড়ে তবে হিমু সমগ্র থেকে সে যথাসম্ভব দূরত্ব বজায় রাখে।বিখ্যাত এই হিমু চরিত্রটিকে নিয়ে তার অসন্তোষের শেষ নেই,একটা লোক বিয়ে করবে না প্রেম করবে না! হলুদ পাঞ্জাবি পড়ে ঘুরে বেড়াবে আর জ্ঞান দিয়ে বেড়াবে,প্রেমহীন ভবঘুরে এমন চরিত্র তার পছন্দ না! তাই হিমেল নামটাও তার ভালো লাগলো না,এর থেকে শ্রাবন বেটার! যদিওবা শ্রাবন নামটা শুনলেই আদিকালের বিরহের কোন মুভির সাইড রোলে থাকা নায়কের নামটা অজান্তেই চোখের কোনে ভেসে উঠে, তবুও চলে আরকি।

লাইবার মায়ের আড্ডায় পড়াশুনোতে ছেদ পড়লো, উনি আকারে ইঙ্গিতে শ্রাবণকে বোঝাচ্ছেন, ‘তুমি ভালো একটা ছেলে বাপ। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশবরেণ্য বিদ্যাপীঠে ইঞ্জিনিয়ারিং এর মতো কঠিন একটা সাবজেক্ট এ পড়তাছো। তোমার উচিত এখন বিয়ে সাদি প্রেম থেইকা দূরে থাকা! তারউপ্রে লাইবা আর কণা তো তোমার ছোট বোনের মতো। ওগোরে ভালো জায়গায় চান্স পাওয়াইতে ভাইয়ের মতো সাহায্য করবা বাপ!’

শ্রাবন শুধু শুনছে।

শ্রাবন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসইতে স্নাতক শেষ বর্ষের ছাত্র!কিছুদিন আগেও কোচিং এ ক্লাস নিতো। সামনে পরীক্ষা তাই বাসায় টিউশন করাচ্ছে, এতে তার সময় এবং শ্রম দুটোই সেইভ হচ্ছে। তাছাড়া, লাইবার বাবার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের ছেলে সে, সেই সূত্রেই টিউশনি।

লাজুক স্বভাবের চুপচাপ ছেলে শ্রাবন,লাইফ নিয়ে খুব সিরিয়াস! অনিয়ম শব্দটির সাথে তার পরিচিত থাকলেও এখনো সখ্যতা গড়ে ওঠেনি বরং তার লাইফে সবকিছু রুটিন মেনে হয়। অনিয়ম আর বদ অভ্যাসে সময় নষ্ট করা তার স্বভাবের বাইরে।

পড়া শেষে কনা সোজা বাড়িতে চলে এসেছে, বহুদিন পরে আজ আবার সে রাতজেগে পড়ছে, সেই সাথে তার এখন তুষারের কথা প্রচণ্ড মনে পড়ছে।

ভাবছে লাইবা, মেঘ যখন রাত জেগে পড়তো ওদের সঙ্গী ছিলো ব্লাক কফি নয় তো কড়া লিকারের চা। কিন্তু কণার সঙ্গী ছিলো তুষার ,তুষারকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইনে বসিয়ে রেখে সে দিব্যি ম্যাথ করে যেতো। পড়তে পড়তে বিরক্ত হয়ে গেলে তুষার কে বলতো, ‘তুষার একটা জোকস বলোতো!’

সাথেসাথেই তুষার জোকস বলোতো, ‘আগুন পুড়াইয়া মারে,পানি ডুবাইয়া মারে কিন্তু তুষার থাপ্রাইয়া থাপ্রাইয়া মারে!’

তুষারের এক একটা ম্যাসেজ পড়েই কণার ঘুম চলে যেত। চুপচাপ থাকলেও কণা যে অসম্ভব রাগী তা কারো অজানা ছিলো না, কিন্তু সে যে ভুতে ভয় পায় তা শুধু তুষারই জানতো। কোথাও কোনকিছুর আওয়াজ হলে সে তৎক্ষণাৎ  তুষার কে নক করতো, ‘তুষার, ঘুমাইছো?’

সাথেসাথেই তুষার বেশকিছু  নাচানাচির স্টিকার দিয়ে জানান দিতো যে সে এখনো আছে। লিখে পাঠাতো, ‘ভুত আসছে না? ওইটা তুষার, দেখতে গেছিলাম পড়াশোনা করো না ঝিমাও।’

কণার ভয় কেটে যেত। সে আবার অফলাইন চলে আসতো। মাঝেমাঝে সে বলতো, ‘ঘুমাইয়া যা বিড়িখোড়,আমি পড়ার লাইগা রাত জাগি। তুই কি করস! নিদ্রাহীন পাপী।’

তুষার তখন রাগের সব স্টিকারগুলো খুঁজে খুঁজে একের পর এক সেন্ড করতো, ‘আমিও কাজ করি, আকাইম্মা নাহ! হুহ রাত্তির জাইগা কবিতা লেখি। তুষার কবি হইবো।’

- চাপাবাজ।

- দেখো কণা, বুঝবা একদিন যেদিন তুষার এর অটোগ্রাফ এর জন্য বাড়ির নিচে সুন্দরী কন্যারা লাইন দিবে সেইদিন বুঝবা তুষার কি ছিলো হুহ!

কণার আজ তুষারের সে সব কথা গুলো প্রচণ্ড মনে পড়ছে,তুষার দেখতে ঠিক কি রকম কণার জানা নেই, ফেইসবুকে ছবি দেখে কারো ব্যক্তিত্ব বোঝা মুশকিল। ছবিতে শুধু মানুষের উপরের মলাটে আবদ্ধ পরিপাটি পর্দাটুকুই দেখা যায়। তার হাসি, তার কান্না, তার ভেতরের অবয়ব আর ভাবনা চিন্তা গুলোকে চাইলেও ছবিতে দেখা সম্ভব না। বন্ধুত্বটা এতো গাঢ়  হলেও তাদের মধ্যে দেখাসাক্ষাৎ নিয়ে কখনোই কোন কথা হয়নি। তবে একবার তুষার মজা করেই বলেছিলো, তারা কখনো দেখা করবে না ঠিক তবে দুজনের বিয়ে হলে চারজনে মিলে একটা গেট টুগেদার করবে। সেখানে কনা বসবে তুষারের পাশে এবং কণার বর বসবে তুষার এর বউ এর পাশে।

এই পরিকল্পনাটির মধ্যেও একটা ছোট্ট খুনসুটি থাকবে সেটা হলো দুজনের অধিকার-অধিকারিণীকে একেবারেই পাত্তা না দিয়ে সেদিন তারা তাদের বন্ধুত্বের গল্প করে যাবে সমানে। উদ্দেশ্য বাকি দুই জনকে পরখ করে দেখা। তাদের জীবনের ভাগাভাগির খাতায় নাম লিখানো মানুষ দুটো সেটা দেখে হিংসেয় জ্বলে পুড়ে মরবে। সাথে কোথাও তাদের খুব কষ্ট হবে কিন্তু কনা কিংবা তুষার অন্তত সেদিন তাদের অভিমানে কিছুটা ঘি ঢেলে তাদের ভালোবাসার একঘরে হওয়াকে উপভোগ করবে।

তুষার রাত জেগে তার বউয়ের কাছে কণার গল্প বলবে। একপর্যায়ে তার অর্ধাঙ্গিনী যখন কণাকে তার প্রেমিকা ভেবে গাঢ়, চাপা অভিমানে চোখের কোনে টলটল করে জল ভাসানো শুরু করবে ঠিক তখনও তুষার গল্প বলেই যাবে। কিন্তু যখন তার অভিমানী ভালোবাসার চোখ গড়িয়ে টুপ করে এক ফোঁটা জল বেরিয়ে তার গাল গড়িয়ে পড়তে শুরু করবে একমাত্র তখনই সে কালবৈশাখী হাসি দিয়ে বলবে, ‘আরে ধুরো ময়নাকেন, কণা তো সেই পিচ্চিকালার বান্ধবী, তুমি না হইলা আমার পিঞ্জিরার পাখি, কান্দে না কান্দে না, আসো তো একখান ঝাপ্পি দিয়ে কলিজার ভিতরে’

তবে তুষারের এই ঝাপ্পি নিয়ে কণার বেশ আপত্তি ছিলো। তার মতে মিসেস তুষার তখন কোন মূল্যেই তুষারের ঝাপ্পির ডাকে সাড়ে দিবে না বরং আরো দিগুণ অভিমানের কান্নাকাটিতে ঘর ভাসিয়ে দিবে। এবং তার প্রিয়তমার কন্নায় তাদের ঘরে ঢেউতোলা পানির স্রোতের ন্যায় বন্যা হবে আর তা সবকিছুকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

উত্তরে তুষার বলেছিলো, ‘আমাদের ঘরের পানিতে বন্যা হবে না কণা। ছুঁইছুঁই পানিতে আমি আর আমার লক্ষ্মীপেঁচা পা ডুবিয়ে বসে থাকবো। আমাদের অভিমানী প্রেম আকাশের বুকে মেঘ ভাসাবে। চারদিকে ঝি ঝি পোকার ডাকে আকাশের বুক বেয়ে টুপটাপ আওয়াজে প্রেমের পাপড়ি ঝড়তে শুরু করবে।তোমরা দেখবে বৃষ্টি হচ্ছে আর আমরা দেখবো গম্ভীর বাতায়নের থেমে থাকা জ্যোৎস্নার গায়ে ভালোবাসা লুটোপুটি খাচ্ছে।

পুরনো সেসব কথা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ কণার কানে জানালার কাঁচে জলের আছড়ে পড়ার টুপটাপ শব্দ ভেসে আসছে,ঘাড় বাকিয়ে জানালার মুখে উঁকি দিতেই দেখা গেলো আকাশের বুকে আজ অভিমান ছাড়াই মেঘ জমেছে আর চলতো ছলাৎ শব্দে মেঘের বাড়ি বেয়ে বৃষ্টি নামছে।

(চলবে...)

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড