• বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

‘মেঘভোর’ উপন্যাসের একাদশ পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘভোর

  রোকেয়া আশা ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:২৯

ছবি
ছবি : প্রতীকী

শাহীন ভাই চট করে উঠে দাঁড়ায়, একটাবারও রূপু আপার দিকে আর তাকায় না। আমার আর মাহিনের হাত ধরে টেনে হুড়মুড় করে বেড়িয়ে আসে ছোট্ট দোকানটার প্রাঙ্গণ থেকে। আমি যেতে যেতে পেছনে তাকাই, রূপু আপার মুখটা কিরকম অসহায় দেখায় ।

ভাই যখন দুহাতে আমাদের দুজনকে টেনে ঘাটের কাছে নিয়ে আসছে তখন আধো আধো অন্ধকার। একটু আগের কমলা, সিঁদুর লাল মাখা নীল আকাশ বেশ বদলে গেছে পুরোটুকু। কালচে বেগুনী আকাশ, নদীর জল কালো। রূপু আপার চোখের মত কালো। 

আমি ভূতে পাওয়া মানুষের মত নির্বিকার চলি, মাহিনও কি আমার মত? আমার কোন জাগতিক ইচ্ছা নেই, শাহীন ভাই যখন আমাদের দুজনকে নিয়ে নৌকায় উঠে তখনো কিছু টের পাই না, কি অসীম শূন্যতা চারপাশে। 

আমি আর মাহিন নিঃশব্দে নৌকার পাটাতনে বসে থাকি, শাহীন ভাই আমাদের মাঝখানে বসে দুহাতে আমাদের দুজনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। অদ্ভুত ব্যাপার, আজ আমি আর কাঁদছি না। নৌকাটা যখন আমাদের তিনজনকে নিয়ে পার হচ্ছে, তখন হঠাৎ নদীর কালো পানিটা ফুঁড়ে একটা শুশুক আমাদের নৌকার ঠিক ধার দিয়ে লাফিয়ে উঠে আবার ডুব দিলো। 

আকস্মিক এই পানির আন্দোলনে কেঁপে উঠলো আমাদের নৌকাটাও। শাহীন ভাই আমাদের দুজনকে শক্ত করে ধরে রেখেছে বলে আমরা কেউ পড়ে যাইনি, অথচ নৌকার ঝাঁকুনিটা বড্ড জোরেই ছিলো। মাহিন শুধু অস্ফুটে একবার প্রশ্ন করলো, ‘ওটা কি শুশুক?’

শাহীন ভাই উত্তর দেয় না, শুধু নৌকার বুড়ো মাঝি আবছা অন্ধকারে দাঁত বার করে হেসে বলে, ‘হরে বাবা। তুমার কপাল ভালা। রাইতের বেলা সস্রাচর শুশুক দেহন যায় না। তুমরা দেখতে পারইলা।’

মাহিন কোন কথা বলে না। হয়তো, এরকম একটা সময়ে শুশুকের মত তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কথা বলে ফেলেছে বলে বিব্রত বোধ করছেও। শাহীন ভাইও চুপ। আমাদের নৈঃশব্দ্য বুড়ো মাঝির উৎসাহ আর আগ্রহে ভাটা ফেলে দেয়। আমি শুধু তার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিই। 

কখনো কখনো ভাষাহীন এক আধ টুকরো হাসিই মূল্যবান হয়ে ওঠে কত জায়গায়। মাঝি লোকটা কি বুঝতে পেরেছে? আমার বিশ্বাস হতে থাকে তিনি বুঝতে পেরেছেন, তিনিও পাল্টা করুণ অথচ স্নেহের একটা হাসি বিনিময় করেন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে। 

অথবা হয়তো আগাগোড়াই এটা আমার ভ্রম। হয়তো তিনি মনে মনে বিরক্ত হচ্ছেন আমাদের ওপর। হয় তো তিনি আমাদের অহংকারী, উগ্র আধুনিক ভাবছেন। তাতে কি যায় আসে আমাদের? কিচ্ছু না। আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো না, সমাজে আমাদের দাম কম। ওপরের মানুষ গুলোর ভাবনা নিয়ে আমরা অজস্র কুণ্ঠার মধ্যে থাকি, অথচ বুড়ো একজন মাঝির ভাবনাকে কেয়ার করারও প্রয়োজন নেই আমাদের।

আমার ভাবনায় ছেদ পড়ে আরেকটা ধাক্কায়, নৌকা ঘাটে পৌঁছে গেছে। নৌকা ভেরানোর সময় জল আর স্থলের প্রবল আন্দোলন আমাদের ছোট নৌকাটাকে মৃদু ধাক্কা দিয়েছে। আমি কেঁপে উঠি, কিছু বলি না। 

বাড়ি ফিরতে কিছুটা রাত হয়ে যায় আমাদের। আমি জানতাম আমাকে নিয়ে রাত অব্ধি বাইরে থাকাটা আম্মার পছন্দ হবে না। আমি জানি, আম্মা বিরক্ত, কিন্তু মুখে কিছু বললো না আর। সেই কবে এগারো বছর আগে বড় আপার বিয়ের সময় হাউমাউ করে কাঁদা শাহীন ভাই যে কখন, কিভাবে, আমাদের পরিবারের সবটুকু কেন্দ্রে চলে এসেছে সেটা বোধ করি আম্মা নিজেও বুঝে উঠতে পারেনি। 

আমার নিজেরও মাঝে মাঝে বুঝতে ইচ্ছে হয়, বুঝি না। এক একটা সময় আমার সাড়ে চৌদ্দ বছরের কিশোরী সত্ত্বা ভুলে যাই। মনে হয় আমি অনেক বড় হয়ে গেছি, অনেক বুড়ো হয়ে গেছি। এই এগারোটা বছরে আমার বয়স একশো বছর বেড়ে গেছে। 

আম্মা নীরবে আমাদের তিনজনকে ভাত বেড়ে খেতে দিয়ে পাশের ঘরে চলে গেলেন। মাহিন আসার পর থেকে একটা কথাও বলেনি। আমার মতই এই ছেলেটার বয়সও দ্রুত বাড়ছে। আমি এখানে বসে থেকেই গলা তুলে আম্মাকে ডাকি, ‘আম্মা, ভাত খেয়ে তারপরে যাও।’
 
আম্মা আমার ডাক শুনে ভ্রু কুঁচকে এঘরে আসে।

(চলবে....)

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড