• সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ৩ পৌষ ১৪২৬  |   ২১ °সে
  • বেটা ভার্সন

গল্প : খুঁড়তে খুঁড়তে কতদূর যাও

  মনি হায়দার ১০ নভেম্বর ২০১৮, ০২:১২

গল্প
ছবি : প্রতীকী

তুমি কি বলতে চাও? রাহুল তীব্র চোখে তাকায় মনিকার দিকে। বললেই আমি বিশ্বাস করবো? আমার কি চোখ নেই? কি মনে করো নিজেকে? আমি অফিসে থাকলেও আমার একটা চোখ থাকে তোমার দিকে।

- আমার দিকে?
- হ্যাঁ, তোমার দিকে।
- তুমি আমাকে সন্দেহ করো?

না বললে মিথ্যা বলা হবে। হাতের গ্লাস মুখের কাছে নিয়ে এক চুমুক গ্রহণ করে মনিকার একটু কাছে আসে, হ্যাঁ মনিকা, আমি তোমাকে সন্দেহ করি।
আমাকে! তুমি আমাকে সন্দেহ করো? অবিশ্বাস্য চোখে তাকায় মনিকা, কেনো আমাকে তুমি সন্দেহ করো?
করি.. হ্যাঁ তোমাকে সন্দেহ করি.. কারণ তুমি-

- শেষ করো। রাহুল শেষ করো, কেনো তুমি আমাকে সন্দেহ করো?
- বলছি তো করি..
- আমিওতো জানতে চাই, কেনো করো? কি সন্দেহ করো?

রাহুল হাতের গ্লাসটা রাখে টেবিলের উপর, একটু একটু টলছে, চোখের পাতা কাঁপছে, নিজেকে প্রাণপণে স্থির রাখার চেষ্টা করছে। মনিকা এগিয়ে যায়, হাত বাড়ায় ওর দিকে। হাতটা সরিয়ে দেয় রাহুল, না, আমাকে ধরতে হবে না। আমি ঠিক আছি। তোমার কি মনে হয়, আমি মাতাল? না, আমি একদম মাতাল নই। তুমি স্কুল থেকে বাসায় ফিরতে দেরী করো কেনো?

- আমি স্কুল থেকে বাসায় ফিরতে দেরী করি!
- হ্যাঁ, করো।
- তুমিতো থাকো অফিসে, কেমন করে জানো আমি স্কুল থেকে বাসায় ফিরতে দেরী করি!
- বললাম না, আমি অফিসে গেলেও একটা চোখ তোমার জন্য বাসায় রেখে যাই।
- রাহুল, তুমি ঠিক আছো?
- আমি রাহুল সব সময়ে ঠিক থাকি। আমার কোনো দ্বিধা নেই।

তুমি কেনো আমাকে সন্দেহ করো? আমরা যদি আমাদের সন্দেহ করি, দুনিয়ায় আমাদের কেউ বিশ্বাস করবে? কেউ আমাদের মানুষ ভাববে? কোনো বন্ধু আমাদের কাছে আসবে? রাহুল, প্লীজ বোঝার চেষ্টা করো। আমাদের জায়গা খুব কম। তুমি আর আমি ছাড়া আমাদের কেউ নেই– বলতে বলতে মনিকার গলা ধরে আসে। টেবিল ধরে নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করে। 

রাহুল জানালার কাছে যায়, তাকায় রাতের ঢাকা নগরীর দিকে। স্রোতের মতো গাড়ি যাচ্ছে। গতিশীল গাড়ির আলোর ফোয়ারা ছুটে চলেছে দিকবিদিক। হাতের গ্লাস মুখের কাছে নেয়, চুমুক দেয় না, সময় নেয়। তাকায় মনিকার দিকে, মনিকার বিষাদ কান্নাকাতর মুখ রাহুলকে একটুও আকর্ষণ করে না। অথচ মাত্র বছর দুয়েক আগেও মনিকার একটু মন খারাপ হলে দিশেহারা হতো রাহুল। দুই বছর.. বছরে বারো মাস.. দুই বছরে চব্বিশ মাস… একজন মানুষের জীবনে দুই বছর কি খুব বড়? পরিস্থিতির কারণে কখনো বড়, কখনো খুব ছোট হতে পারে। বাইরে থেকে ফিরে তাকায় রাহুল, শ্লেষের সঙ্গে প্রশ্ন।

- করে,তুমি অস্বীকার করতে পারো, তোমার কাছে ওই লোকটা আসে না?
- কোন লোকটা আসে আমার কাছে?
- ন্যাকা! মনে করো তোমার ন্যাকামিতে আমি সব ভুলে যাবো? কখনোই না।
- কে আসে আমার কাছে? মরিয়া হলে জানতে চায় মনিকা। লোকটার নাম বলো–
- কে আবার? তোমার আগের স্বামী। কুহুক।

মনিকা কোনো কথা বলে না, বলতে পারে না। রাহুলের কথায় মনিকার কথা বলার সব শক্তি হারিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত রাহুল এভাবে বলতে পারলো?মাত্র দুবছরের ব্যবধানে একজন রাহুলের এতো পরিবর্তন! কিন্তু কিসের উপর ভিত্তি করে রাহুল এমন নির্মম অসত্য বলতে পারলো? কবে থেকে ও এমন ভাবতে শুরু করেছে- মনিকা মনে করতে পারছে না। তবে হ্যাঁ মাস ছয়েক আগে দুপুরে স্কুলে গিয়েছিল রাহুল। হঠাৎ যাওয়ায় যেমন বিস্মিত হয়েছিল, আনন্দিতও হয়েছিল। স্কুলের প্রিন্সিপালকে বলে ছুটি নিয়ে রাহুলের সঙ্গে একটা রেস্টুরেন্টে যায়। দুজনে মিলে খেয়েছে, বিকেলে ঘুরেছে রিকশায়। সত্যি দিনটা অদ্ভুত ভালো লেগেছিল। এইজন্যই কুহককে ত্যাগ করে কুহকেইর বন্ধু রাহুলের হাত ধরে…। সেই আসাটা কি ভুল ছিল? কোনাটা ভুল? আর কোনটা ফুল? কাঁটার ভেতরইতো ফুলের জন্ম। আবার ফুলের পাশেই কাঁটার অবস্থান। কুহকের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল বছর আটেক আগে। সামান্য পরিচয় ছিল। কলেজ বন্ধু কামনার বড় ভাই কুহক। কামনাদের বাসায় গেলে দু একবার দেখা হয়েছে। কুহক একটা বে সরকারী কলেজে পড়ায়। কামনার মা বাবা বাসায় এসে প্রস্তাব দিলে মনিকার মা বাবও রাজি হয়ে যায়। মনিকার কারো সঙ্গে প্রেম ছিল না। দেখতে সুন্দরী বলা যায়, গায়ের রঙ হালকা কালো। মুখ অসাধারণ লাবণ্যবালু চিকচিক করে। লম্বা লতানো শরীর মনিকার। আর বড় সম্পদ ওর গভীর দুটো চোখ। দুই পরিবারের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে বিয়েও হলো। বিয়ের পর মনিকা আবিষ্কার করে কুহক কথা কম বলে। কিন্তু যখন বলে, যা বলে খুবই যুক্তিযুক্ত এবং পরিবেশের সঙ্গে মানানসই। গলাটা একটু ফ্যাসফেসে যদিও কিন্তু সহ্য করার মতো। হাসাহাসিও কম করে। এই নীরবতা মনিকার কাছে মনে হয়েছিল, অপার সৌন্দর্যরে ভিন্ন এক রূপান্তর। যারা বেশি কথা বলে, খ্যাল খ্যাল করে হাসে, তাদের ব্যক্তিত্ব থাকে না। কুহক শান্ত সমুজ্জ্বল এক প্রসবন। বেশ জমে ওঠে সংসার..। কিন্তু বছর তিনেকের মধ্যেই হাপিয়ে ওঠে মনিকা। এতো মানুষ নয়, পাথর। যে নীরবতাকে মনে হয়েছিল অম্লান সৌন্দর্য্যরে রূপরেখা সেটাই বিষাক্ত বেদনার মতো, শ্রাবণের কান্নার মতো মনিকাকে ঘিরে রাখে। বেচারা একটু ঝগড়াও করে না। রাগ করে না। কঠিন কথা বলে না। মনিকা কিছু বললে সামান্য দাঁত বের করে হাসে। ভাবটা যেনো সে এ যুগের গৌতম বুদ্ধ। মনিকা মন খারাপ করলে অবশ্য বিচলিত হয় কুহক।

- কি হয়েছে তোমার?
- কিছু হয়নি আমার।
- তাহলে মন খারাপ করে আছো কেনো?
- আমি মন খারাপ করে থাকলে তোমার কি?

কুহক একেবারে চুপ। মনে হয়, ওর সব কথা শেষ। মনিকা ভেবে পায়না, এই লোক ক্লাসে পড়ায় কেমন করে? কি পড়ায়? কিন্ত শুনেছে ক্লাসে ভালোই পড়ায়। এবং অনেকের প্রিয় শিক্ষকও। কোনো কাঁটা ক্যাম্পাসে মেলাতে পারে না কুহক নামক মানুষটির চরিত্র বা চরিত্র ব্যকারণ। কামনা বা শাশুড়ির কাছে জেনেছে, কুহক সব সময়েই বাসায় কম কথা বলে। এমন দিন গেছে বাসায়, চব্বিশ ঘণ্টায় কারো সঙ্গে একটা কথা বলেনি। কেমন করে পারে? দিনরাত, বাসায় যতটুকু সময় পায়, মুখের সামনে একটা বই নিয়ে বসে থাকে। পড়েও বিচিত্র ধরনের বই। যদিও কুহুক বাণিজ্যের ছাত্র, কলেজে পড়ায় বাণিজ্য সর্ম্পকে, কিন্তু পড়ে বিচিত্র প্রকারের বই। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রায় প্রশ্নহীন আনুগত্য আছে, জানেও বিস্তর কিন্তু নিশ্চুপ মৌন।

রাতে বিছানায় বিশেষ মুহূর্তে কুহক আশ্চর্য সবল, সাবলীল, মনে হয় তেপান্তরের ধাবমান অশ্ব। সে সময়ের কুহককে খুঁজে পায়না পর মুহূর্তে। কামকাতর মুহূর্ত শেষ হলে পাশেই শুয়ে পরে এবং মিনিট তিনেকের মধ্যে ঘুমিয়ে যায়। মনিকা বন্ধুদের কাছে শরীরের সংরাগ নিয়ে কতো অবাক ঘটনা শুনেছে। আর সে? তার স্বামী?

বিয়ের বছর খানেক পর কুহক কক্সবাজার নিয়ে গিয়েছিল। প্রথম সমুদ্র দেখার রোমাঞ্চ নিয়ে যখন সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়ায় মনিকা, গোটা মন প্রাণ শরীর আদিগন্ত বিস্তৃত বিপুল জলরাশি দেখে কাঁপছে। সমুদ্র এতো সুন্দর? এতো বর্নিল? এতো আনন্দ-মুখর? কুহককে ছাড়াই সমুদ্রে নেমে গেছে। নিজের মতো করে ভিজেছে। সাঁতার কেটেছে। আশ্চর্য, কুহুক একবারও সমুদ্রস্নান করেনি।

অবশ্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীরের পানি রেখার উপর দিয়ে হেঁটেছে। তীরে দাঁড়িয়ে ঢেউ গুনেছে। হাত ধরে টানছে মনিকা, চলো দুজনে মিলে স্নান করি।
নাহ, আমার ভালো লাগে না। তুমি করো।

সমুদ্রস্নান ভালো লাগে না কোনো পুরুষের! সম্ভবত সমুদ্র এই প্রথম শুনলো। অথচ চারপাশে কতো মানুষ স্বামী স্ত্রী প্রেমিক প্রেমিকা, ছেলে বুড়ো দাদা নানী গোছল করছে, সাঁতার কাটছে, ঢেউয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছে আর কুহুক আশ্চর্য নির্বিকার। সমুদ্রপাড় থেকে এসে কুহুক হোটেলের বাথরুমে গোসল সারে। অন্তর্গত বেদনায়, ক্ষতে, দুঃখে মনিকা ফেটে চৌচির হয়ে গেছে।

রাতে ছোট বোনের সঙ্গে সেলে সমুদ্র পাড়ের অভিজ্ঞতা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলে মনিকা, পিউ সমুদ্র কি সুন্দর, একবার এসে দেখে যা। ভালো লাগবে। কি বিশাল ঢেউ, কতো মানুষ-

- কথা শেষ হলে কুহুক মৃদু কণ্ঠে বলে, সমুদ্র দেখে এতো উচ্ছ্বাসের কি আছে?
- মানে? হতবম্ভ মনিকা। বলে কি লোকটা?
- সব কিছুর উচ্ছ্বাস দেখাতে নেই।
- তো মানুষের ভেতরে উচ্ছ্বাস আনন্দ এলে কি করবে? বুকে চেপে ধরে বসে থাকবে?

তা থাকবে কেনো? আমি মনে করি আনন্দ প্রকাশের নয়। আনন্দ একান্ত করে অনুভবের। সমুদ্র দেখেছো দেখার আনন্দ বা সুখ মনের ভেতরে ধারণ করে রাখা উচিৎ। অবশ্য আমার এই ধারনার সঙ্গে অধিকাংশ মানুষ একমত নয়, আমি জানি। কিন্তু এটাই আমি, আমার আমি।

এই প্রথম, বিবাহিত জীবনে কুহকের ভেতরের কুহককে কিছুটা চিনতে পারে মনিকা। কিন্ত এই চেনা দিয়ে কি করবে সে? কোথায় রাখবে? মনে হয়, ওর ভেতরের চারপাশটা একেবারে ভেঙ্গে আসছে। রুম থেকে বের হয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়ায়- হু হু বাতাসে গোটা কক্সবাজার উড়ে যাচ্ছে। চারদিকে নিয়ন আলোর বন্যা.. দূরে সমুদ্রের মাঝে টিমটিমে আলো জ্বলছে। ও গুলো মাছ ধরার নৌকা দুপুরে দেখেছে । কি সাহস জেলেদের? ভাবতে ভাবেতে মনিকা অনুভব করে ওর গাছ ভিছে যাচ্ছে। হাত দিয়ে দেখে চোখের পানি নামছে…।

কক্সবাজার থেকে ফিরে আসার কয়েকদিন পর কুহক বন্ধু রাহলকে নিয়ে বাসায় আসে। রাহুল একেবারে কুহকের উল্টো। সামান্য কারণেও প্রচুর-ভাবে হাসে। বড় বড় চোখ। হালকা চুল। চওড়া কপাল। হাসে আর সিগারেট টানে। সিগারেট একদম পছন্দ না মনিকার। গন্ধটা সহ্য করতে পারে না। ড্রইংরুমে বসে পরিচয়ের পর চা নাস্তা দেয় মনিকা। চায়ের সঙ্গে সিগারেট টানতে টানতে রাহুল তাকায় মনিকার দিকে, কিন্তু প্রশ্ন করে কুহককে, কুহক তুই কাজটা।
 
- ঠিক করিস নি?
- কোন কাজ?
- তুই বিয়ে করলি আমাকে জানালি না?
- কি করে জানাবো? ইউনিভারসিটির শেষ পরীক্ষার পর আর তোর দেখা পেয়েছি? শুননেছি তুই বিদেশে চলে গেছিস?
- ঠিক শুনেছিস। আর এই ফাকে এমন টুকুটুকে সুন্দরী বৌ ঘরে এনেছিস?

মৃদু হাসে কুহক। বিব্রত মনিকা। রাহুল হা হা হাসে, ভাবী আপনি ভাবছেন লোকটার বুঝি কাণ্ডজ্ঞান নেই। আছে, কা-জ্ঞান আছে। কিন্তু আমি সব সময়ে সত্যি বলি, আমার যা ভালো লাগে আমি অকপটে বলি। অনেকে খারাপভাবে নেয় কিন্ত আমি অসহায় আমার কাছে। আমি তো আমার মতো নাকি!

- সত্যি সবাই বলতে পারে না– মনিকা মৃদুকণ্ঠে বলে।
- রাইট ভাবী। প্রত্যেকে দাবী করে, সে সত্যবাদী। কিন্তু নিজের বিরুদ্ধে গেলে সে সেই সত্যটাকে আর প্রকাশ করে না। বেমালুম খেয়ে ফেলে, বলতে বলতে - সিগারেট ধরায় রাহুল।
- আপনি খুব সিগারেট খান বুঝি?
- তা খাই। আপনি কি পছন্দ করেন না?

মৌন মনিকা। একজন মানুষ সিগারেট খাবে তাতে ওর কি আসে যায়? আর কতক্ষণই বা থাকবে? কেনো বলতে গেলো কথাটা? ওর ভাবনার মধ্যে আবার প্রশ্ন করে রাহুল, আপনি সিগারেট খাওযা পছন্দ করেন না?

- না খেলেই ভালো হয়।
- ঠিক আছে, আপনার আদেশে আজকের এই প্যাকেটের সিগারেটকটা খেয়ে একদম ছেড়ে দেবো।
- জগতের সব চেয়ে সহজ কাজ কি জানিস? প্রশ্ন করে কুহক।
- কি কাজ?
- সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেওয়া আবার ধরা।
- তুই দেখিস, আজ এই প্যাকেটের গুলো খাওয়ার পর আর খাবো না। যদি না পারি আর তোর সামনে আসবো না।
- কি আশ্চর্য, আপনাকে এতোবড় প্রতিজ্ঞা করতে কে বলেছে? মনিকা প্রতিবাদ করে।
- আমিও অনেক দিন ধরে চাইছিলাম সিগারেট ছেড়ে দিই। কিন্তু কোনো ইস্যু পাচ্ছিলাম না। আপনাকে কেন্দ্র করে ইস্যু পেয়ে গেলাম।
আড্ডায় আড্ডায় বিকেল। রাহুল প্রস্তাব করে, কুহুক চল, নাটক দেখি।
- নাটক?
- মনে হয় আসমান থেকে পড়লি? তুই নাটক দেখিস না?
- নাহ, ওসব আমার পোষায় না।
- পোষায় না মানে কি?

ওস সাজনো জিনিষ আমার ভালো লাগে না। কিছু চোখা চোখা বাক্য থাকে নাটকের সংলাপে, যে লেখে সে ধারনাকে বমির মতো উগড়ে দেয়, চরিত্রগুলো মঞ্চে এসে উগড়ে দিয়ে যায়, সেই অনাদিকালের চর্বিত চর্বণ। নতুন কিছু হলে যাওয়া যেতাম।

তুই আগের মতোই রয়ে গেলিরে, কুহকভ রবোটিক। তাকায় মনিকা দিকে, বুঝলেন ভাবী, ওকে আমরা কুহকভ ডাকতাম ইউনিভারসিটিতে। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন দুনিয়া জোড়া সমাজতন্ত্রের জোয়ার, কমিউনিস্টদের মতো ও নি:শব্দ, নিশ্চল..। আছে সবার সঙ্গে আবার নেই। তাই সোভিয়েত লোকদের নাম ধার করে ডাকতাম কুহকভ। আমার ধারনা ছিল, এতোদিনে তোর পরিবর্তন হয়েছে, তুই কুহকভের জাল ছিঁড়ে বের হয়ে এসেছিস। কিন্তু আমার ধারনা ভুল, তুই এখনও কুহকভ। যাইরে..। ভাবী কি করেন? সংসার? না চাকরি বাকরি কিছু করেন?

- আমি একটা স্কুলে পড়াই।
- কোন স্কুলে?
- মর্নিংসান।
- খুব নামীদামী স্কুল। যাক, সারাদিন বাসায় থাকতে হয় না, কাজের মধ্যে থাকেন, এটা ভালো। কুহকভ, আমি আসি। এই নে কার্ড। দিলখুশায় আমার অফিস। সময় পেলে আসিস। আমি জানি, তুই আসবি না। কি আর করনা আমিই আসবো মাঝে মাঝে। ভাবী, আসলে বিরক্ত হবেন নাতো?
- আগেতো আসুন।
- গুড।

হাওয়ার বেগে চলে যায় রাহুল। রেখে যায় মনিকার জন্য কৌতূহল, উচ্ছ্বাস আর ভাবনার ছিন্নপাতা। একজন মানুষের একটাই জীবন কিন্তু কতভাবে তার প্রক্ষেপণ হতে পারে? রাহুলে বন্ধু কুহক বা কুহকের বন্ধু রাহুল কতো ব্যবধান দুজনার।
মাঝে মাঝে রাহুল বাসায় আসে। কুহকের সঙ্গে আড্ডা দেয়। মনিকারও ডাক পরে। চা যোগায় আর অবাক মনিকা, রাহুল সিগারেট খায় না। মনিকার বাবা সিগারেট খেতো, মা কতো বকেছে, কতো বার বলেছে ঠিক আছে ছেড়ে দিবো। কিন্ত কোনোদিন ছাড়তে পারেনি। আর রাহুল? মনিকা কিছুটা হলেও বুঝতে পারে, রাহুল এই বাসায় আসে কেবল তার জন্য। না কোনো প্রমাণ নেই ওর কাছে, কিন্তু নারীর মনের ইন্দ্রিয় ওকে পরিষ্কার বলছে, রাহুল তোমার প্রেমে পড়েছে। সত্যি! স্বামী সংসার থাকার পরও মনিকার ভেতরে নাম না জানা এক অলৌকিক পাখি গাইতে শুরু করে.. আমি চিনিগো চিনি তোমারে চিনি..।

- এই চেনা এবং অচেনার দরজায় এক দুপুরে রাহুলকে মুখোমুখি আবিষ্কার করে মনিকা। স্কুল ছুটির ঠিক আগ মুহূর্তে গেটে আসে রাহুল।
- আপনি?
- এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম আপনাকে দেখে যাই। কেমন আছেন?
- ভালো। আপনি?
- আমি? আমি আরো ভালো। কোথায় যাবেন? বাসায়?
- হ্যাঁ।

যদি কিছু মনে না করেন আমার সঙ্গে গাড়ি আছে। চলুন কোথাও বসি। মনিকাকে ভানার কোনো সুযোগ না দিয়ে রাহুল গেট পার হয়ে হাঁটতে শুরু করে। নিশ্চিত মনিকা আসবে। হ্যাঁ মনিকা যায়, যেতে বাধ্য হয়। কে তাকে নিয়ে যায়? মনিকা জানেনা। কিন্তু যেতে ভালো লাগছে..। গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়ায় রাহুল। মনিকা প্রবেশ করলে দরজা বন্ধ করে নিজের ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়িকে স্ট্রাট দেয়। গাড়ি চলতে থাকে। কেউ কোনো কথা বলে না। মনে হচ্ছে গাড়ি চালানো রাহুলের বড় একটা কাজ। আর মনিকা নির্বাক সামনে তাকিয়ে আছে। প্রায় পনেরো বিশ মিনিট পর গাড়ি একটা চমৎকার একটা বাড়ির সামনে থামে। নামে মনিকা, চারপাশটা দেখে বুঝতে পারে, এটা খুব অভিজাতপূর্ণ একটা রেস্টুরেন্ট। রাহুলের ইশারায় সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় ওঠে। ব্যালকনির সঙ্গে চমৎকার সাজানো একটা টেবিল। বুঝতে পারে মনিকা, রাহুল এখানে মাঝে মধ্যে আসে। বেয়াড়ারা পরিচিত। দুজনে বসে। মনিকার ভেতরটা কাঁপছে। জীবনে, এই প্রথম বাইরের কারো সঙ্গে..। রাহুল কি বাইরের কেউ? জানে না… মনের ভেতরে সুরের একটা কম্পন বয়ে যায়.. মনিকার।

- ভেতরে ভেতরে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
- কি খাবেন?
- আপনি এখানে আনলেন কেনো?
- দুপুরের খাবারের সময় না? দুপুরে প্রিয় অতিথিকে কি না খাইয়ে রাখবো? বলুন, কি খাবেন?
- জানি না।
- ঠিক আছে, আমিই বলছি।

নানা ধরনের মাছ আর তরকারিতে ভরে যায় টেবিল। ধীরে ধীরে খায়। খেতে খেতে রাহুল জানায়, আমি দীর্ঘদিন সিঙ্গাপুরে ছিলাম। চাকরি করতাম। প্রায় এগারো বছর। বাবা মা আছেন গ্রামে, ছোট ভাই একটা ব্যাংকের ম্যানেজার। বোন একটাই, বিয়ে হয়েছে। জামাইয়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া থাকে। এই হচ্ছে আমার জীবন।

- এসব আমাকে শোনাচ্ছেন কেনো?
- নিজের সব কাছের মানুষের জেনে রাখা ভালো। সিঙ্গাপুর থেকে এসে একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ি তুলেছি। ব্যবসা করছি আর ঘুরে বেড়াচ্ছি।
- চমৎকার জীবন আপনার।

হাসে রাহুর। খাওয়া শেখে বেয়াড়া সব নিয়ে যায়, দুজনে মুখোমুখি। রাহুলের দিকে তাকাতেও ভয় পাচ্ছে মনিকা। বাসায় যাওয়া দরকার। স্কুলের পর বাইরে থাকে না মনিকা। অথচ প্রায় দুঘন্টা বাইরে। কুহুক ফেরে বিকেলের দিকে। অনেক দিন রাতও হয় ফিরতে। না কেউ কিছু বলবে না লেটের জন্য। কিন্তু নিজের কাছে..

মনিকা! রাহুলের নাম ধরে ডাকে মনিকার ভেতরটা একেবারে উল্টে যায়। ভয়ার্ত চোখে তাকায়– তুমি নিশ্চয়ই জেনে গেছো তোমার সামনে বসা এই রাহুল বকশী তোমায় ভালোবাসে, প্রচণ্ড- ভালোবাসে। প্রথম যেদিন তোমায় রাহুল দেখেছে কুহকের বাসায়, সেই প্রথম দৃষ্টিতে রাহুল তোমাকে ভালোবেসেছে। রাহুল বুঝে গেছে, তুমি কুহকের সংসারের বড় বেমানান একটি প্রজাপতি। রাহুলকে তোমার কি কিছু বলার আছে?

মনিকা মাথাটা টেবিলের উপর রাখে। মাথার দুপাশে কালো চুলের বিশাল স্তূপ। রাহুল ঝুঁকে মাথার উপর মুখ রাখে, আমি বুঝে গেছি, তুমিও রাহুলকে ভালোবাসো। আমি জানতাম। কিন্তু একটু সংশয় ছিল। সেটাও কেটে গেছে। থ্যাঙ্ক ইউ- আমি কোনোদিন তোমায় কষ্ট দেবো না। বুকের ভেতরে প্রদীপের মতো জ্বালিয়ে রাখবো তোমাকে মনিকা। তুমি কেবল আমার অন্তর জুড়ে আলো আলো আর আলো ছড়াবে। তোমার আলোয় আমি বেঁচে থাকতে চাই।
ঘটনা ঘটান ছয় মাসের মাথায় মনিকা ডির্ভোস দেয় কুহুককে। চলে আসে রাহুলের বাসায়। বিয়ে হয়েছে কোর্টে। বিয়ের পর হানিমুনে গেছে মালয়েশিয়া। জীবন, একটাই যে জীবন সে জীবন কতো সুন্দর, কতো বর্ণাঢ্য, আলোকময় হতে পারে রাহুল বুঝিয়ে দিয়েছে। আর ভালোবাসা একজন নারীর জন্য একজন পুরুষের মতো তীব্র হতে পারে, মনিকা মর্মে মর্মে বুঝতে পারছে। রাহুলের সঙ্গে সংসার করার মুহূর্তে মনের ভেতরে যে দ্বিধা ছিল, সেটা একদম নেই। কয়েক মাস আগে কক্সবাজার গিয়েছিল মনিকা আর রাহুল। স্মৃতির ভেতরে দুটো পর্ব রেখে মনিকা মনে মনে নিজেকে বলেছে কতো সার্থক সুন্দর আর উপভোগ্য এই কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত? রাহুল আর মনিকা মিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কেটেছে। দিনে রাতে যখনই সময় পেয়েছে চলে এসেছে সমুদ্র পাড়ে, সমুদ্র মন্থনে। বাসা নিয়েছে ঢাকার অভিজাত এলাকায়। নিজের গাড়ি.. একটা চকচকে জীবনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। সময় কাটানোর জন্য আবার একটা স্কুলে চাকরি নিয়েছে মনিকা। কিন্তু এ কি দুর্যোগ শুরু হলো আবার?

- আমি দিব্যি করে বলছি, তোমার সঙ্গে বিয়ের পর আমি এক মুহূর্তের জন্য কুহককে ভাবিনি। ও আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে চিরকালের জন্য।
- আমি বিশ্বাস করি না। তুমি ওর সঙ্গে বাইরে যাও।
- অসম্ভব।

তুমি আর ও দুজনে মিলে বেস্টুরেন্টে খেতে যাও। হাসো, আড্ডা দাও। ও তোমাকে আদর করে.. আঃ আঃ আমাকে এসবও সহ্য করতে হচ্ছে?
সব তোমার কল্পনা, রাহুল। সব তোমার কল্পনা। তোমার সঙ্গে চলে আসার সময়ে বাবা মা সবাইকে ছেড়ে আসতে হয়েছে আমার। কুহকের সঙ্গে ডিভোর্স কেউ মেনে নেয়নি। আমি তোমাকে ছাড়া কাউকে চিনি না। জানি না। তুমি নিশ্চয়ই ভুল করছো রাহুল।

- রাহুল বকশী কোনোদিন ভুল করে না।
- তাহলে এক কাজ করো।
- কি কাজ?
- আমার বলতে লজ্জা লাগছে, তারপরও বলছি, যে কুহককে নিয়ে তোমার এতো সন্দেহ, চলো ওর কাছে যাই।
- কেনো? ওই লোকটার কাছে কেনো যাবো?
- কুহকের কাছে গেলে সত্যি মিথ্যাটা বুঝতে পারবে।
- না, আমি যাবো না। তোমার দরকার থাকলে তুমি যাও।
- দরকারটা আবার নয়, তোমার।
- না, আমি যাবো না।

হাত ধরে মনিকা, বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রাখে– চলো একবার, মাত্র একবার। যাওয়ার পরে কুহক যদি বলে আমি ওর সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি, রেস্টুরেন্টে খেয়েছি, তুমি যা বলবে আমি তাই শুনবো। যা করতে বলবে, তাই করবো।

- ঠিক আছে, কিন্তু ওর বাসায় যাওয়া যাবে না।
- ওকে, চলো ওর কলেজে যাই?

পরের দিন কলেজে গিয়ে জানতে পারে মনিকা আর রাহুল, কুহক বছর দুয়েক আগেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। গ্রাম, ঢাকার উপকণ্ঠে, গাজীপুরে। চলে যায় গ্রামে, বাড়ি খুঁজে বের করে জানতে পারে, কুহুক বছর খানেক আগে মারা গেছে। বাড়ির সামনেই কুহকের কবর। মনিকা হিসেব করে বুঝতে পারে– রাহুলের সঙ্গে বিয়ের পর মাত্র মাস তিনেক বেঁচে ছিল কুহক।

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড