• সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ২০ °সে
  • বেটা ভার্সন

গল্প : প্রতিচ্ছবি

  ফারিয়া হাওলাদার ঐশী ০৮ নভেম্বর ২০১৮, ১৮:৫০

গল্প
ছবি : প্রতীকী

ঘন কুয়াশার চাদর গায়ে পেঁচিয়েই শিশির সিক্ত ঘাসের উপর দিয়ে ক্ষেতের আল ধরে কাঁপতে কাঁপতে যার ছুটে চলা সে কি কখনো চায় না সুন্দর পশমি গরম কাপড়ে নিজেকে জড়াতে? সে কি চায় না মোজা জুতা পরে তার গন্তব্যে যেতে? অবশ্যই সে চায় তবে তার সাধ্য কই!
 
রোজ যখন খুব ভোরে উঠে সে কোনো গরম কাপড় ছাড়াই ২ কিলোমিটার পথ হেটে স্কুলে পৌঁছে যায় তখন দেখতে পায় স্কুল বাড়িটাও ঘুমিয়ে আছে কারণ সূর্য মামার আলো তখনো কুয়াশা ভেদ করে প্রকৃতিতে ধরা দেয় না।

এতটাই সকাল সকাল সে জেগে ওঠে যে প্রকৃতিও হয়তো তখন অবাক হয়ে প্রশ্ন রাখে ‘এত কিসের তাড়া ছেলেটার?’ 

ছেলেটার আসলেই খুব তাড়া। স্কুলের সব কক্ষের চাবি ছেলেটার কাছেই থাকে শুধু হেডমাস্টারমশাই আর অন্যান্য শিক্ষকদের বসার কক্ষ বাদে। তার কাজ স্কুলের সব কক্ষ আর বড় উঠানটা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করা। তার কাজ শেষ হতে না হতেই রোজ আলী স্যারের আগমন ঘটে। স্যারকে দেখা মাত্রই রাজার চোখ আনন্দে চকচক করে ওঠে। হ্যাঁ, ছেলেটার নাম রাজা। বাস্তবে একটা চালচুলোহীন ছেলে হলেও নাম তার রাখা হয়েছিলো রাজা।

রাজা আলী স্যারকে খুব ভালোবাসে তার সাথে খুব শ্রদ্ধাও করে আর এমনটা হবে নাই বা কেন? একমাত্র আলী স্যারই আছে যে রাজাকে ভালোবাসে, অন্যদের মত দূরে তো ঠেলে দেয় না।

রাজার বয়স বছর দশেক হবে যার তিনবেলা খাবার জোটে না। স্কুল পরিস্কার করার পয়সায় তার কাছে পড়ালেখা তো ডুমুরের ফুলের মত কিন্তু তার ভাগ্য কিছুটা হলেও তার সহায় আছে। যখন থেকে আলী স্যার এ স্কুলে এসেছেন। কারণ আলী স্যারই রাজাকে খুব সকালে এসে পড়ান। ছেলেটার মেধা আর তীব্র ইচ্ছা আছে বটে।

এগারো মাস হলো স্যার এ স্কুলে এসেছেন। প্রথম থেকেই সে রাজা কে পড়াচ্ছেন যা কেউ জানে না। স্কুলের প্রথমদিনেই যখন তিনি ৫ম শ্রেণীর ক্লাস নিচ্ছিলেন তখন কিছু সাধারণ প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে করেছিলেন কিন্তু অনেকেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারছিলো না। হঠাৎ ক্লাসরুমের বাইরে থেকে উত্তর শোনা গেল তখন সবাই দেখলো জানলার ওপারে রাজা দাড়িয়ে আছে এবং উত্তর সেই দিয়েছে। তখন তিনি রাজাকে ডাকলেন। 

- কে তুমি? নাম কি তোমার?

- আমার নাম রাজা। আমি এইহানে কাম করি।

- পড়াশোনা করো না?

- করি তো স্যার এইহানেই করি তয় আমি এই বাইরে থাইকাই পড়ি ঐ জানালা দিয়া, আমর লগে তো কেউ বইতে চায় না আর টেকা পয়সাও নাই যে খাতা কলম কিনমু। আমি মাডিতে দাগ টাইনা টাইনা লিখি স্যার। অন্য স্যারেরাও আমারে পছন্দ করে না, তারা কয় আমি নাকি রাস্তার পোলা। রাস্তার পোলায় পইড়া করবো কি আর ওনাগো কাম করনের লাইগা নাকি রাস্তার পোলাই লাগে। আমারে তো কেউ পড়ায় না স্যার। 

রাজার কথাগুলো শুনে আলী স্যারের চোখ বেয়ে নিজের অজান্তেই পানি পড়তে শুরু করেছিলো সেদিন। তার চোখেও ভাসতে থাকে কিছু স্মৃতি, তার একান্ত নিজের স্মৃতি। সেও তো একদিন চালচুলোহীন বাউণ্ডুলে ছিল। তাকে যদি গ্রামের মক্তবের মাওলানা নিজের বাড়িতে নিয়ে মানুষ না করতো তাহলে এতদিনে হয়তো সে হারিয়ে যেতো, হয়তো খেতে না পেয়ে চুরি ছিনতাই করতো। 

পুরনো স্মৃতিগুলো একবার হাতড়ে নিয়েই সে আবার স্বাভাবিক হয়ে এলো তারপর ক্লাস সমাপ্ত করে চলে এসেছিলো বাইরে। 

সেদিনই তার রাজার সাথে আবার দেখা হয়েছিল স্কুল ছুটির সময়। তিনি রাজাকে আবার ডেকে বললেন 'তোর গল্প শোনাবি? ‘চল বসে গল্প করি।’

রাজা বলতে শুরু করলো, ‘গেরামের লোকে কয় আমার বয়স যহন চাইর বছর আছিলো তহন আমার বাপ মইরা গেছিলো তারপরে আমার মায় নাকি আবার নিকা করছে আমারে থুইয়া। আমার মায় আমারে ছাইড়া যাইবার পরে আমার বাপজানের বন্ধু করিম কাকায় আমারে তাগো লগে রাখছিলো।’

‘আমার বয়স যহন আট হইলো তহন করিম কাকারে আল্লায় একটা পোলা দিলো। করিম কাকায় আমারে আর তাগো লগে রাখে নাই। আমারে কইছিলো তগো ঘরডায় আমি ধান-পাট রাখি, ঘরের এক কোণে জায়গা কইরা দিমুনে তুই ঐহানে থাকিস। পোরথম পোরথম খাওন দিতো দুই বেলা তারপরে একবেলাও দিতে না।’

‘না খাইতে পাইয়া ভিক্কা করতাম। একদিন হেডস্যারে কইলো হেয় আমারে খাওনের টেকা দিবো তয় আমারে স্কুল পরিস্কার কইরা দিতে হইবো। সেই থেইক্কা স্কুলে আইতাম। স্কুলে যহন সবাই পড়তো আমার ও মনে চাইতো পড়বার কিন্তু কেউ আমারে পড়তে দেয় নাই তাই জানালার বাইরে দাড়াইয়া শিখি।’

সেদিন তিনি রাজাকে নিয়ে গেলেন নিজের বাড়িতে কিন্তু তার স্ত্রী সাফ সাফ মানা করে দিয়েছিল যে সে কোনো রাস্তার ছেলেকে মানুষ করার দ্বায়িত্ব নিতে পারবেন না, রাজাকে যেনো তিনি আর এ বাড়িতে না দেখেন। সেদিন বাধ্য হয়ে তিনি রাজাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তবে রাজাকে কথা দিয়েছিলেন তিনি রাজাকে পড়াবেন। সেই থেকে রাজার পড়াশোনা শুরু যার খরচ তিনি নিজেই বহন করেন কখনো বই দিয়ে কখনো বা খাতা-কলম।

এভাবেই বেশ চলছিলো রাজার পড়াশোনা। একদিন হঠাৎ আলী স্যার স্কুলে না আসায় রাজা তার বাড়িতে যায়। গিয়ে দেখতে পায় স্যারের একমাত্র ছেলেটা মারা গেছে আর স্যার পাথর হয়ে লাশের সামনে বসে আছেন। সেদিন রাজা খুব মন খারাপ করে সেখান থেকে চলে এসেছিলো। তারপর অনেকদিন স্যার আর স্কুলে যায় নি তাই রাজা স্যারের বাড়িতে যায় খোজ নিতে। স্যারকে দেখেন তার অসুস্থ স্ত্রীর সেবা করতে যিনি ছেলে হারানোর শোকে তখন বিভোর ছিলেন। রাজা ধীর পায়ে স্যারের দিকে এগোতে থাকে এমন সময় তার স্ত্রী রাজাকে দেখে জড়িয়ে ধরে। বিধির কি বিচার! যাকে একদিন ঘরে আনতে মানা করেছিলেন তাকেই আজ আঁকড়ে ধরেছেন। তারপর থেকে রাজার জায়গা স্যারের বাড়িতেই হয়েছিলো। তিনিই রাজাকে মানুষ করে তোলেন এবং পরবর্তীতে রাজা তার স্যারের আদর্শে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে একজন শিক্ষক হয়ে ওঠে।

অনেক বছর পার হয়ে গেছে। রাজা আজ নিজে একজন হেডমাস্টার। একদিন তিনি লক্ষ্য করলেন মাঝির ছেলেটা রোজ জানালার বাইরে দাড়িয়ে থাকে যতক্ষণ ক্লাস চলে। তিনি বুঝতে পারলেন নতুন এক রাজা সৃষ্টির সময় এসে গেছে এ যেনো তারই প্রতিচ্ছবি।

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড