• বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন

প্রবন্ধ : সাহিত্য কথা

  পারভেজ আহমেদ ০৬ নভেম্বর ২০১৮, ১৮:১৬

কবিতা
ছবি : প্রতীকী

সাহিত্যের মাঝে আমরা যে বিষয়টা খুঁজি তা হলো রসাস্বাদন। আর রসদান করাই সাহিত্য ও সাহিত্যিকের উদ্দেশ্য। নদী চলতে চলতে প্রসারিত হতে থাকে, তেমনি সাহিত্যও চলতে চলতে একজনের মনের মাধুরী মিশ্রিত রস-বাণী বিশ্বময় ব্যাপ্তি লাভ করে। এ সাহিত্যটা অন্তরের, জীবন-গভীরের গোপন কথা। মুখের ভাষায় যা প্রকাশ করা যায় না তা প্রকাশ করতে হয় ছবির মাধ্যমে। আর অঙ্কিত ছবিই মূলত সাহিত্য, যা সবার জন্য সৃষ্টি হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'সাহিত্য' গ্রন্থে বলেন, অন্তরের জিনিসকে বাইরের, ভাবের জিনিসকে ভাষায়, নিজের জিনিসকে বিশ্বমানবের ও ক্ষণকালের জিনিসকে চিরকালের করিয়া তোলার নামই সাহিত্য।

ক্ষুধাতৃষ্ণা ছাড়াও মানুষ এক কাল্পনিক জগতের চাহিদায় ব্যাকুল। এ কাল্পনিক জগৎ যখন শিল্পসম্মত ভাবে প্রকাশ পায় তখন তা সাহিত্য। কারণ মন একান্তে যা গড়ে তোলে তা তার নিজের জন্য এবং মনের কথা ভাব, রস, রূপক, অলংকার, ছন্দ ইত্যাদি আভাস-ইঙ্গিতের আশ্রয় গ্রহণ করে অন্যের মনে প্রবেশ করাই সাহিত্য। মানব হৃদয় ও মানব চরিত্রের মাঝে সাহিত্য বিচরিত। তাই নিজের আনন্দের জন্য লেখা বিষয় সাহিত্য নয়। নিজেকে প্রকাশ করার প্রবল ইচ্ছা, চারদিকের অবস্থার সাথে সংযোগ স্থাপনের ইচ্ছা, কাল্পনিক ও বাস্তব জগতের সাথে মিলবন্ধন এবং রূপ বা রসপ্রিয়তার সংস্পর্শে সাহিত্য রূপ লাভ করে। 

মানুষ নিজে নিজে সম্পূর্ণ নয়। তাকে সম্পূর্ণ করে তুলতে প্রকৃতি প্রভাবিত করে থাকে। অর্থাৎ প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক নিগূঢ় হলে তবে সে পূর্ণতর হয়ে ওঠে। তেমনি সাহিত্যকেও পূর্ণত্বর করে তুলতে বিশ্বপ্রকৃতি, জীবপ্রকৃতি, দৃশ্য-অদৃশ্য, সুখ-দুঃখ সাহিত্যের সামগ্রী হিসেবে কাজ করে। সাহিত্যিক তখন এসব সামগ্রীর মাঝে আপন কল্পনার রং মিশিয়ে ভাবময়ী করে তুলেন। তাই বলে সাহিত্য প্রকৃতির অনুকৃতি বা অনুলিপি নয়, বরং প্রকৃতিতে যা আছে তার বিশেষিত ও রূপান্তরিত রূপ। আর কাজী আব্দুল ওদুদও বলেন, মহৎ শিল্পীদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মহীকরণ।

ব্যক্তি ও বস্তুসত্তার দিক থেকে সাহিত্যকে দুইটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন: মন্ময় সাহিত্য ও তন্ময় সাহিত্য। সাহিত্যিক যখন তার সাহিত্য একান্তভাবে ব্যক্তিগত বা অন্যের অনুভূতি ও দৃষ্টিকোণ থেকে মানবিকতার খাতিরে ভাব ও রসের মাধ্যমে প্রকাশ করেন তখন তা মন্ময় সাহিত্য। গীতিকবিতা মন্ময় জাতীয় সাহিত্য। তন্ময় সাহিত্য কোন ব্যক্তি-বিশেষের মনের গভীরের কথা নয়। এ সাহিত্যে মানবিক বা মনের গভীরের কথা অনুপস্থিত থাকে এবং সেই সাথে বস্তুসত্তার প্রাধান্য থাকে বেশি। এখানে সাহিত্যিক বিশেষ একটা বিষয়ের উপর একাগ্রতা প্রকাশ করেন বা তার মতামত চাপিয়ে দেন।

সাহিত্যের আরো দুটি প্রধান বিভাগ রয়েছে। তার একটি হলো, ভাবের সাহিত্য আর অন্যটি হলো জ্ঞানের সাহিত্য। জ্ঞানের সাহিত্য হলো, এখানে সাহিত্যিক রসের মাধ্যমে পাঠকের বুদ্ধিকে জাগ্রত করে দেন। এ সাহিত্যে ব্যক্তি ও বস্তুসত্তা এবং জীবন অনুভূতি থাকে না বা এসব দ্বারা রঞ্জিত হয় না। আর ভাবের সাহিত্য তার বিপরীত। এখানে একজন সাহিত্যিকের তার নিজের ভাব, কল্পনা ব্যক্তি অনুভূতি দ্বারা রূপান্তরিত হয়ে প্রকাশ পায়। জ্ঞানের সাহিত্য আর ভাবের সাহিত্যের এক দিকে প্রবন্ধ এবং অন্যদিকে প্রধানত নাটক, উপন্যাস, কবিতা, ছোটগল্প ইত্যাদির প্রতিনিধিত্ব করে।

সাহিত্যের বিষয় জ্ঞানের নয়, ভাবের। এজন্য জ্ঞানের সাহিত্যকে বিশুদ্ধ সাহিত্য হিসেবে গণ্য করা হয় না। একজন সাহিত্যিক কখনো বিচারকের আসনে আসীন হন না। তাই, সাহিত্যিকের পক্ষে সরাসরি শিক্ষাদান বা কোন বিষয়ের উপর মতবাদ প্রচার করা সম্ভব না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ এবং ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাস তার অন্যতম উদাহরণ। তাই সাহিত্যিক জ্ঞানের কথা না বলে জ্ঞানের কথাকে প্রমাণ করবেন এবং ভাবের কথাকে বিশ্বময় সঞ্চার করবেন। এতে, তিনি যা বলেছেন তা মিথ্যা এবং তিনি যা বলেছেন তা সত্য নয় এই একই অর্থের দুই স্বতন্ত্র ভাবের উদয় হয়। ভাবেরও দুটি স্বতন্ত্র দিক রয়েছে। তার একটা নিজের জন্য এবং অন্যটা পরের জন্য। আর শেষেরটাই হলো সাহিত্য।

বিশ্বপ্রকৃতি তথা মানবজীবন সাহিত্যের প্রাণস্বরূপ। কিন্তু জ্ঞানের সাহিত্যে এর পদচারণা নাই, এবং এর প্রধান উদ্দেশ্য বুদ্ধিবৃত্তি__হৃদয়বৃত্তি নয়। যুগে যুগে জ্ঞানের সাহিত্য পরিবর্তন, সংস্করণের মাধ্যমে এক ধাপ থেকে অন্য ধাপে প্রবেশ করে। আবার এর উপর একেক জনের একেক মত থাকে, কিন্তু ভাবের সাহিত্য মৌলিক এবং এখানেই তার শ্রেষ্ঠত্ব। কেবল তাই নয়, ভাবের সাহিত্য হৃদয়কে অধিকার করে বহুল সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে আর তা কেবল সাহিত্যিকের কথা থেকে যায় না; ধীরে ধীরে তা বিশ্বের সকল মানুষের কথা হয়ে দাঁড়ায়।

সাহিত্য জীবন ও জগতকে সুন্দর করে তুলে তার সত্যকে আমাদের কাছে প্রকাশ্য করে আনন্দ দান করে। একটা সাহিত্য কতটা সফল তার বিচারে এখানে দেখতে হবে, বিশ্বের উপর সাহিত্য এবং সাহিত্যিকের অধিকার কতটুকু, কীরূপ প্রভাব পড়েছে এবং কতটুকু স্থায়ী আকারে প্রকাশিত হয়েছে।

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড