• সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ৩ পৌষ ১৪২৬  |   ২১ °সে
  • বেটা ভার্সন

গল্প : পূর্বে মহানিশা

  মৌ কর্মকার ০৬ নভেম্বর ২০১৮, ১৬:৪২

গল্প
ছবি : প্রতীকী

‘যাত্রা কালে পিছুডাক ভালো নয়’ -মার মুখে এই কথা শুনেছি বহুবার। এত ভালো একটা কাজে বের হয়েছি! তাই পিছু ডাক শুনে রেগেই বলে উঠলাম, ‘এই, কেরে?’ পিছনে তাকিয়ে দেখি পুলিশ, হাতে একটা লম্বা বন্ধুক। ভাব দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তিনি আজ রাতে এই রাস্তায় টহল দিচ্ছেন। এমন ভাবে চেয়ে আছেন যেন ‘উনি পুলিশ বলেই আমি চোর। এ যেন চোর-পুলিশ খেলা।’ সামনে এসে দাঁড়ালেন। 

‘নাম কি?’ উত্তরে নিজের অজান্তেই অনুকরণ করে বলে ফেললাম, ‘নাম কি?’ সামনে এক জোড়া লাল চোখ আমার দিকে রেগে তাকিয়ে আছে! একদম সোজা হয়ে বললাম, ‘আমার নাম মেহেক’। ‘মেহেক? এ আবার কেমন নাম? মেহেক নামের অর্থ কি?’ জিজ্ঞেস করলেন। খুব কনফিডেন্ট সহকারে বললাম, ‘ভাগ্যবান’। ‘কে ভাগ্যবান?’ উনার এই প্রশ্নে আমার কনফিডেন্ট আবার চলে গেল। ভয়ে ভয়ে বললাম, ভাগ্যবান হচ্ছে ‘মেহেক’ মানে আমার নামের অর্থ। আমি চুপ করেই দাঁড়িয়ে রইলাম। ‘দেখে তো ভদ্র বাড়ির ছেলেই মনে হয়, তা কেন আসা হয়েছিল এখানে? বন্ধুকটা মাটিতে ঠেকিয়ে রেখে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন’। 

আজ অমাবস্যা; অমাবস্যার রাতে এই কালো অন্ধকারে মহাসড়কের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে খুব ভালো লাগে। গাড়িগুলো সামনের হেডলাইট দুটি জ্বেলে সামনে এগিয়ে যায়। কারো হয়ত পথের ঠিকানা জানা থাকে কারো আবার থাকে না। ট্রাকগুলোর মাথায় লাগানো থাকে রকমারি লাইট। কখনো জ্বলে আবার কখনো নিভে। দেখে মনে হয়, কোন বিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছে সে। রাস্তার পাশের দোকান গুলোকেও রাতের এই আধারে অচেনা মনে হয়। রাস্তার ঠিক মাঝখানের ঐ আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকে হলুদ সোনালু গাছের দল। গাড়ির হেড লাইটের আলোতে আরো সুন্দর লাগে ওদের। সৌন্দর্য দেখার লোভে আমি প্রায়ই আসি এই আইল্যান্ডে। ঐ সোনালু গাছ গুলোর নিচে বসে থাকি। আইল্যান্ডের দুই পাশের দুইটি পথ। এক পথে গাড়ি আসে অন্য পথে চলে যায়। আমার সাথে আরো অনেকেই থাকে। কোন এক স্বপ্ন যাত্রা শুরু করার ইচ্ছা নিয়ে আমরা সবাই বসে থাকি এখানে। সজল, মনির, সন্ধি, তরু মাঝেমাঝে মমিনও যোগ দেয় আমাদের সাথে। মনিরের গানে চলতে থাকে আমাদের এই আড্ডা। আজ আমার সাথে কেউ নেই। ওরা গেল কোথায়? পুলিশ মহাশয় উত্তরের আশায় সেই ভাবেই আমার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু এই সব উনাকে বলি কিভাবে! যদি ঢুকিয়ে দেয় গারদে! ‘কালকে পরীক্ষা আছে, পড়তে পড়তে মাথা ধরে গিয়েছিল তাই চা খেতে বের হয়েছি’। সাহস করে বলেই ফেললাম। ‘বাসায় চুলা নেই, চা করে খাওয়া যায় না?’ রেগে জিজ্ঞেস করলেন। বললাম, ‘আমি মেসে থাকি, বাড়িতে থাকলে হয়ত মা চা করে দিতেন কিন্তু এখানে তো মা নেই।’ ‘ঠিক আছে যাও। আর বের হবে না, বাসায় চা করে খাবে।’ অনেক ভেবে চিন্তেই বললেন উনি। মার কথা শুনে খুব আবেগ প্রবণ হয়ে গেছেন মনে হয়। কিন্তু আমি তো বাঁচার জন্য মিথ্যা কথা বললাম। পুলিশকে বোকা বানিয়ে খুব হাসি পাচ্ছিলো। আমি নরম সুরে বললাম, ‘তাহলে আমি আসি।’ উনি কিছু বললেন না। আমি পা বাড়ালাম। ‘আমিও অনেক দিন বাড়ি যায় নি, মাকে দেখিনি, মার হাতের চা…!’ বলেই থেমে গেলেন উনি। আমিও থেমে গেলাম। ফিরে দেখি, উনার চোখে জল। উনি কাঁদছেন। আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মুছে বললেন, ‘যাও বাসায় যাও, আর বের হবে না। একটু থেমে আবার বললেন, তোমার কিছু হলে তোমার মা কি করবেন ভেবেছ কখনো?’ আমি কিছু বলতে পারলাম না, শুধু চেয়ে রইলাম। 

রাত আর কত হবে? মোবাইল বের করে দেখার চেষ্টা করলাম। এইরে! তিনটা বেজে চার মিনিট। রাস্তা ফাঁকা কিন্তু রাস্তার দুই পাশে চলছে চা খাওয়ার ধুম। রাত্রি যাপনের এই একটিই অবলম্বন। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠে দূরে হারিয়ে যাচ্ছে। সেই হারিয়ে যাওয়া পথ ধরেই হাঁটা শুরু করেছি আমি। পাহাড়ি পথ, রাস্তার পাশেই উঁচু-নিচু পাহাড়। দুই পাশের পাহাড়গুলোকে সঙ্গে নিয়েই এই পথ চলে গেছে বহুদূর। দানবের মতো ট্রাকগুলো সামনের হেডলাইট জ্বালিয়ে ছুটে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতার এই রাজ্যে থামার সময় নেই যে! আঁকাবাঁকা পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে এঁকে-বেঁকে চলে গেছে এই পথ। চালক একটু ব্যতিক্রম ঘটালেই রক্তের অঝর ধারা বয়ে যাবে এই পথে। পিছনের গাড়িগুলো তাতে হোঁচট খেলেও বিষয়টি সবার নজরে আসতে খানিক সময় তো লাগবেই! কেননা জীবনের এই যান্ত্রিকতার মতোই যান্ত্রিক হয়ে গেছে মানুষের মন। রক্তের বন্যা দেখেও হয়তো তারা পরখ করে নিবে, ‘এটা কি আসলেই রক্ত? নাকি ডাকাত বাহিনীর কোন চাল, ডাকাতি করার জন্য!’ এটাই বাস্তবতা। এই পথে ডাকাতি হয় অনেক। ডাকাতি করার জন্য ছল, বল, কৌশল কম প্রয়োগ করা হয় না। সব বিবেচনায় রেখে ভুক্তভোগীদের এমন আচরণ করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। রাতের অন্ধকারে যারা বিলীন হয়ে যায় দিনের আলোতে তারাই আবার পাখা ঝাপটায়। তাই ঐ ডাকাতদের নাগাল পাওয়া আমার সাধ্য নয়। ঐ যে পুলিশ মহাশয়, আমার কথা শুনে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন তিনি পেলেও পেতে পারেন। 

অনেক পথ চলে এসেছি কিন্তু ওরা কোথায়। ঘুমিয়ে পড়েছে কি? আসে নি আজকে? কি জানি? পাশেই একটা কাঠের মিল। দানবের মতো কাঠগুলো পড়ে আছে তার চারপাশে। আশ্চর্য ব্যাপার, গাছ যখন নিজের শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তখন তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই আমরা। দেহ কেটে স-মিলে নিয়ে আসলে সেই আমরাই তাদের বলি দানব! ভাগ্যিস গাছের প্রাণ থাকলেও তা তেমন ভাবে প্রকাশিত নয়। প্রকাশিত হলে, দানব না বলে তাদের আবার বলতে হত ভূত! মিল হয়ে যেত কাঠের মিল থেকে ভূতের মিল। এখনো মানুষের পদচারণে মুখর হয়নি এই রাস্তা। মিলটির সামনেই কালো পিচ ডালা রাস্তায় সাদা রঙের আঁচড়ে আঁকা হয়েছে তীর চিহ্ন। উল্টো দিকে মুখ দিয়ে আছে তারা। মাঝখানে আবার টানা হয়েছে কিছু রেখা । কি অর্থ আছে এই রেখা গুলোর? এর অর্থ সবাই বুঝে কি? দূর থেকে দেখতে পেলাম, খুব মনোযোগ সহকারে তীর চিহ্নগুলো দেখছে সজল। দেখে মনে হচ্ছে, ও এইবার এই চিহ্ন গুলোর রহস্য খুঁজে বের করবেই। ওর সামনে গেলাম। আমাকে দেখে বলল, ‘কোথায় ছিলি তুই? কতক্ষণ ধরে খুঁজছি তোকে জানিস?’ বললাম, এসেছিলি কখন? ‘অনেকক্ষণ, ওভারব্রিজের নিচে এক এক্সিডেন্ট হয়েছে সেখানেই ছিলাম।’ ও উত্তর দিয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আমি কিছু বুঝতে পারলাম না। আবার বলল, ‘আরে ঐ যে, যেখানে পুলিশ টহল দেয় সেখানে।’ অবাক হলাম আমি তো মাত্র সেখান থেকেই এলাম। ‘একজন বয়স্ক মহিলা রাস্তা পাড় হচ্ছিলেন। উপরে ওভারব্রিজ ছিল কিন্তু উনি সেখান দিয়ে না এসে এসেছিলেন পথ দিয়েই। যা হয়, আইল্যান্ডে এসে আটকে ছিলেন অনেকক্ষণ।

সামনে বসে থাকা পুলিশ দেখছিলেন এই কাহিনী। কি ভেবে তিনি মহিলাটিকে পাড় করে দেওয়ার জন্য এগিয়ে গিয়েছিলেন।’ রাস্তার তীর চিহ্ন গুলোকে আমাকে দেখিয়ে আবার বলল, ‘রাস্তায় এই দাগ গুলো ঐ খানেও ছিল তবু একটা ট্রাক এসে উড়িয়ে দিয়ে যায় সব। মহিলাটি বেঁচে গিয়েছিল কিন্তু পুলিশটি।’ বলতে বলতে থেমে গেল সজল। উত্তেজিত হয়ে বললাম, ‘পুলিশটি?’ ‘আর বেঁচে নেই মনে হয়।’ বলতে বলতে আবার থেমে গেল ওর গলা। কানে ভেসে আসলো সেই কথা, ‘তোমার কিছু হলে তোমার মা কি করবেন ভেবেছ কখনো?’ কিছু বুঝতে পারলাম না। ছুটতে লাগলাম, পেছনে ছুটল সজল। কে হন উনি আমার? ভাই, বন্ধু, আত্মীয় ? নয়তো! তবে কিসের এই মায়ায় জড়িয়েছি আমি, কিসের এই টান? কোন উত্তর পেলাম না। শুধু উনার বলা একটা কথায়ই মনে হল বারবার, ‘তোমার কিছু হলে তোমার মার কি হবে, ভেবে দেখেছ কখনো? 

সেই জায়গা যেখানে আমাকে পিছু ডেকেছিল পুলিশটি। এখন উনি এখানে নেই। সামনে অনেক ভিড়। এত রাতে এত মানুষ কোথা থেকে এলো? উনি কি সেখানেই? এগিয়ে গেলাম। চোখে পড়ল সেই তীর চিহ্ন  গুলো। কি অর্থ আছে এদের? বুঝতে পারলাম না। রক্তে ভেসে আছে চারদিক। রাস্তার মাঝখানে সেই আইল্যান্ড। আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে সেই হলুদ সোনালু ফুল। ডাল-পালা নেই কি ভয়ানক চেহারা হয়েছে তাঁর!  টুকরো টুকরো হলুদ ফুল পড়ে আছে নিচে ভেসে যাওয়া রক্তের উপর। একটু দূরে পড়ে আছে সেই বন্ধুক যা দিয়ে ভয় দেখানো হয়েছিল আমাকে। কিন্তু উনি কোথায়? উনাকে দেখতে পারছি না। সজল এগিয়ে গেল এম্বুলেন্সের দিকে। আমিও গেলাম। অনেক পুলিশ এখানে, মানুষও এসেছে অনেক। হঠাৎ আমাকে ঠেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হল এম্বুলেন্সের ভেতরে। আমি চিৎকার করে বললাম, ‘আমি উনার কেউ হই না।’ কেউ শুনলো না। বাইরে সজলের চিৎকার শুনতে পেলাম। এম্বুলেন্স ছুটে চলল। সজলের চিৎকারও সময়ের সাথে সাথে ঝাপসা হয়ে গেল। 

রক্তে ভেজা একটি দেহ। মুখ ডাকা। উপরের সাদা চাদরটা রক্তে লাল হয়ে আছে। কি অবাক করা কাণ্ড একটু আগে যে দাঁড়িয়ে ছিল এখন সে আমার সামনে শুয়ে। কি করবো বুঝতে পারলাম না। হয়তো এম্বুলেন্সের উপরে সেই লাল লাইট জ্বলছে। বাইরে শব্দ হচ্ছে, ‘পে পো!’ যে শব্দ শোনে সবাই আঁতকে উঠে বলছে, ‘আহারে, কার যেন কি হল?’ আমি হলেও তাই বলতাম। বলতাম কি? আমি এখানে, এম্বুলেন্সের ভেতরে। সামনে উনি। উনাকে লাশ বলবো কিনা বুঝতে পারছি না। একেই মনে হয় বলে ভাগ্যের পরিহাস। কখন যে কার কি হবে কেউ কি বলতে পারে?
 
পাহাড়ি রাস্তার মধ্যে দিয়ে অনেক পথ অতিক্রম করে এম্বুলেন্স এসে থামল উনার বাড়ির সামনে। এখনও চলছে এম্বুলেন্সের সেই ভয়ানক শব্দ। যার সাথে এখন যুক্ত হয়েছে কিছু মানুষের আর্তনাদ। কি ভয়ানক সেই আর্তনাদ। ‘ও রহমতরে’ বলে কেউ একজন চিৎকার করল। উনার নাম হয়তো রহমত। মনে হয়, উনার মা চিৎকার করছেন! লাশ নামানো হল। লাশকে ঘিরে অনেকেই চিৎকার করছেন। কিন্তু উনার মা কোন জন বুঝতে পারলাম না। কান্নার আর্তনাদ উঠেছে সবার মুখে। অপরিচিত একজন আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, ‘কে হয় তোমার?’ আসলেই তো কে হয় আমার? খানিক চুপ করে থেকে বললাম, ‘পরিচিত!’ উনার মা কে জানার খুব ইচ্ছা হল। অপরিচিত সেই লোকটাকেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখানে উনার মা!’ শেষ করার আগেই তিনি বললেন, ‘হ ওর মার কবরের লগেই ওরে কবর দেওয়া হইবো।’ আবার স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কি হচ্ছে এই সব আমার সাথে। ‘এই মা ই আছিল ওর এক মাত্র সঙ্গী। আর কেউ নাই এই সংসারে, বাপ মইরা গেছে অনেক কাল আগেই। ঐ তো এক বছর আগে এই সময়েই ওর মা ডাও মারা গেছিল আর আজ ও।’ বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন লোকটি। আমি কোন কিছু বলার শক্তি পেলাম না। বুকের মাঝখানে কেমন যেন লাগছে! বুঝতে পারছি না। কে হন উনি আমার? বন্ধু, ভাই, আত্মীয়? কেউ নয়তো! তবে?  ফিরতে হবে আমায়। এম্বুলেন্স এখনি চলে যাবে। চেয়ে দেখলাম উনাকে গোছল করানো হচ্ছে। একটু পর হয়ত কাফনের কাপড় পড়ানো হবে। উনি পাড়ি জমাবেন অন্য কোন রাজ্যে। যেখানে উনার মা আছেন।
 
এম্বুলেন্স চলছে। ভেতরে বসে আমি? কানে ভাসছে সেই কথা, ‘তোমার কিছু হলে তোমার মার কি হবে, ভেবেছ কখনো?’ মার কথা খুব মনে হচ্ছিল। মাকে কল দিলাম। রিং বেজে বেজে কেটে গেল। ভোর বেলা, ঘুমচ্ছেন হয়ত। মায়ের মন! মা সাথে সাথেই কল ব্যাক করল। ‘কি হয়েছে মেহেক শরীর খারাপ, বাবা কিছু হয়েছে?’ উত্তেজিত গলায় মা বলতে শুরু করল। ‘মা ভালো আছ?’ মা ঘুমের গলায় উত্তর দিলো, ‘কি হয়েছে বাবা?’ ‘কিছু না মা, তোমার কথা মনে হচ্ছিলো!’ মা হেসে বললেন, ‘দূর পাগল ঘুমো।’ ‘ঘুমচ্ছি মা তুমি ঘুমোও।’ বলে ফোন রেখে দিলাম। বুক টার মধ্যে কেমন যেন মুচড় দিয়ে উঠল। এখন এম্বুলেন্সে সেই ভয়ানক শব্দ আর নেই। হয়তো আওয়াজহীন এই গাড়িকে দেখেও মানুষ মনে হয় বলছে, ‘কার বুকের মাণিক জানি গেল রে?’ এখন এই গাড়ির জানালার গ্লাস গুলোও খোলা। ভেতরে লাশ নেই যে! জানালা দিয়ে মুখ বাড়ালাম। চেয়ে দেখলাম রাস্তাটির দিকে। আহা! এই রাস্তার চর্চার জন্য প্রতিদিন আগমন ঘটে কত প্রসাধন সামগ্রীর। কখনো তরমুজের লাল রং আকস্মিক ভাবেই ধুয়ে দেয় এর শরীর আবার কখনো মানুষের তাজা রক্তে প্রশমন ঘটে তাঁর তীব্র জ্বালার। প্রতিনিয়ত এরকম নানা রূপ, রং, রস মিলিয়ে মাটির সাথে মিশে থাকে মহান এই সড়ক।

ব্যাস-বাক্য রূপে যে পরিচিত নয়, এর পরিচয় এক কথায় ‘মহাসড়ক’ নামে। ছোট খাট সড়কের সাথে আবার এর তুলনা চলে না। সারা দেশে ইনি এক নামেই পরিচিত। অবশ্য অজগর সাপের মতো তাঁর চেপটা দেহে সৌন্দর্যও কম নয়। এই সৌন্দর্যের রটনায় তাকে ঘিরে অনেক ঘটনাই ঘটে গেছে। গ্রামের প্রশান্তিতে ভেরে উঠা বাঁদরলড়ি ফুল সোনালু ফুল নামে জায়গা করে নিয়েছে এই সুনামি মহাসড়কের আইল্যান্ডে। সাথে নাম না জানা সহচরী আরো অনেকেই আছেন। মহাসড়কের মাঝে থাকবেন বলে কথা, পারলে সব চলে আসে। আমরাও চলার পথে তাদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই বারবার। এখনো মুগ্ধ হচ্ছি। অজানা মুগ্ধতায় ভেসে যাচ্ছে মন। তবে কিসের এই মুগ্ধতা? বুঝতে পারছি না। একপাশ দিয়ে গাড়ি আসছে, অন্য পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। গাড়ি যাওয়ার সময় গাছগুলো একদিক হেলছে আবার আসার সময় অন্যদিকে দলছে। এইভাবে হেলে-দলেই কেটে যায় তাদের সময়। তবু তাদের নেই কোন অভিযোগ। এমনকি মাঝরাতেও একটু ঘুমনোর সময় নেই তাদের, একটু ঘুমলেই দুঃস্বপ্নের মতো হানা দেয় রাত্রিপ্রিয় মানুষের দল, সেই দলের একজন আমি নিজেই। 

মাঝরাতের মায়া কাটিয়ে ভোরের দিকে পা রেখেছে সময়। রাস্তার পাশে দোকান গুলো গত দিনের ক্লান্তিতে যে ঘুম দিয়েছিল তার ঘোর কাটেনি এখনো। এখন নেই চা খাওয়ার ধুম। নেই সেই ধোঁয়াও।  দানবের মতো ট্রাকগুলো এখনো সামনের হেড লাইট জ্বালিয়ে ছুটে যাচ্ছে বহুদূর। একের পর এক যান ছুটে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতার এই রাজ্যে থামার সময় নেই যে! এম্বুলেন্স আমাকে নামিয়ে রেখে চলে গেল। সজল এখনো সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে সাথে সন্ধি, মমি, তরু ওরা সবাই আছে। এই সেই জায়গা যেখানে কালকে ছিলাম আমি আর সেই মানুষটি। তবে আজ! সন্ধি জিজ্ঞেস করল, ‘কি হয়েছিল রে কাল রাতে?’ সজল আমার দিকে তাকিয়ে রইল। হেসে বললাম, ‘কাল রাত এসেছিল কি?’ 

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড