• বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন

উপন্যাস হিসেবে ‘মেমসাহেব’ অপক্ব

  রবিউল করিম মৃদুল ০৫ নভেম্বর ২০১৮, ১৯:৩১

কবিতা
প্রচ্ছদ : মেমসাহেব

নিমাই ভট্টাচার্যের বই আমি আগে পড়ি নাই। তবে মেমসাহেব নামে তার একটা বিখ্যাত বই আছে এরকম শুনেছিলাম। সেদিন ঘটনাচক্রে বইটা হাতে এলো। আমার একটা বদ অভ্যাস হল বই হাতে আসলে মূল গল্প শুরু হওয়ার আগে একেবারে কভার থেকে ভেতরে যা যা থাকে সব পড়ি। নাম, প্রকাশক, প্রকাশকাল, মূল্য, প্রচ্ছদ, ডিস্ট্রিবিউশন, সংস্করণ, মুদ্রণ পারলে আইএসবিএন নাম্বারটাও দেখি। মেমসাহেব পড়তে গিয়েও সেইরকম করলাম। এইসব পার করতেই গোটা পৃষ্ঠা জোড়া লেখকের অন্যান্য বইয়ের একটা তালিকা দেওয়া। নিমাই ভট্টাচার্যের বইয়ের সংখ্যা এত? ১০৯ টার তালিকা এখানে? অথচ এর একটাও পড়ি নাই? এক মেমসাহেব বিনে আর কিছুর নামই শুনি নাই? নিজেকে গাল দিলাম মনে মনে। পড়া শেষ করেও গাল দিলাম নিজেকে। তবে দুই গালির মধ্যে বিস্তর ফারাক। যে আগ্রহ নিয়ে শুরু করেছিলাম বইটা, কয়েক পাতা পড়েই ধীরে ধীরে হোঁচট খেতে শুরু করলাম।

গল্পের শুরুতেই লেখক যে দোলা বৌদিকে চিঠি লিখতে শুরু করলেন বাস্তবিক পক্ষে গোটা বইয়ে দোলা বৌদিকে জীবন্ত খুঁজে পাওয়া গেল না। নিমাই সাহেব শুধু তাকে চিঠি লিখলেন, সে কে, তার কি ভূমিকা কিছুই প্রকাশ করলেন না। এইটা পাঠকের সাথে প্রতারণার সামিল। দোলা বৌদিরে হাজির করতে পারতেন তিনি। যদি না-ই করলেন, তবে তাকে এত গুরুত্ব দিয়ে বারবার কাহিনীর বয়ান বিরক্তির উদ্রেক করেছে।

এইখানে আমি মেমসাহেবের কাহিনী-টাহিনী কিচ্ছু বলব না। যার যার লাগে পড়ে নিবেন। এইটা পড়ে আমার কি কি মনে হয়েছে সেইটাই বলার চেষ্টা করব আপন ভাষায়। প্রথমত যেটা হয়েছে, মেমসাহেব শুরু করার আগে নিমাই ভট্টাচার্যের একশ নয়টা বইয়ের তালিকার সবগুলোই না পড়া দেখে যে আফসোস তৈরি হয়েছিল, সেইটা কিছুটা প্রশমন হয়েছে। আরেকটু শক্ত করে বলতে গেলে বাকিগুলো পড়ার আগ্রহে যেন খানিকটা ভাটার টান লক্ষ করলাম।

লেখকের নিজের বয়ানে বলা হয়েছে গল্প। প্রথম কয়েক পাতা বেশ আগ্রহের সাথেই পড়লাম। বেশ রোমান্টিক ব্যাপার-স্যাপার। কিন্তু যতই পাতা উল্টাতে লাগলাম মনে হতে লাগল নিমাই সাহেব যেন কিছু শব্দের জালে আটকা পড়ে গেছেন। বারবার ঘুরে ফিরে আসছে শব্দগুলো। একই চিত্রের ভিন্ন বর্ণায়ন পুনঃ পুনঃ উপস্থিত হতে লাগল। এবং গোটা বই এইভাবেই শেষ হয়ে গেল। কতবার যে নিমাই মেমসাহেবের হাত নিজের হাতে টেনে নিয়েছেন পুরো গল্পে, কতবার যে আদর করেছেন তার বর্ণনা একই ধাঁচের। ‘ইচ্ছে করে মেমসাহেবকে টেনে নিই বুকের মধ্যে। ইচ্ছে করল আদর ভালোবাসায় ওকে স্নান করিয়ে দিয়ে বলি, সেদিন তোমাকে হাজারগুণ বেশি ভালোবাসব। কিন্তু পারলাম না। কম্পার্টমেন্টে আরো ক’জন যাত্রী ছিলেন। তাই শুধু মেমসাহেবের হাত টেনে নিয়ে বললাম- আমাকে নিয়ে আজও তোমার দুশ্চিন্তা হয়? মেমসাহেব তাড়াতাড়ি দু’হাত দিয়ে আমার হাতটা চেপে ধরে বলল- না না। আমি জানি, তুমি আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসবে। আমি জানি তুমি আমাকে শুখি করবে।’ ধরা যাক বিশতম পাতায় এক রোমান্টিক মুহূর্তে নিমাই যেভাবে মেমসাহেবকে বা মেমসাহেব নিমাইকে সাড়া দিয়েছে ঠিক প্রায় একই ভাবে চল্লিশ তম, ষাটতম, একশ তম পাতায়ও। ভিন্ন কিছু ঘটেনি।

ঘটনার বর্ণনা ও দৃশ্যকল্প তৈরিতে ন্যাকামির যথেষ্ট ছাপ। একজন নারী আর পুরুষের প্রেম ভালোবাসা কতক্ষণ গেলা যায়? তার ওপর যদি কোনো আপ-ডাউন না থাকে! নিমাই সাহেব যদি তার সাথে দিনের পর দিন ডেটিং এ গিয়ে থাকেন, এবং ঘুরে ফিরে পাতার পর পাতা ইনিয়ে বিনিয়ে তাই লিখতে থাকেন, তা আর সুখাদ্য থাকে না। কেঁচে যায়। মেমসাহেবও তাই গেছে। 

পুরো গল্পটা পড়তে গিয়ে কোন চরিত্রের গভীরে হারিয়ে যাওয়ার চান্স পাওয়া যায় নি। মেমসাহেবের একটা মূর্তি গড়েছে বটে, সেটা কেন জানি মন ছুঁয়ে যায়নি। তবে দরিদ্র শ্রেণির যেসব প্রেমিক নিজের উত্থানের পক্ষে একজন নিবিষ্ট প্রেমিকা চান, তারা নিজের প্রেমিকার ভেতরে মেমসাহেবকে খুঁজতে থাকবেন বারবার। সেইদিক থেকে মেমসাহেব চরিত্রটি অনেকেরই আগ্রহের মধ্যে পড়বে। বিশেষ করে নিমাই সাহেব নিজের সাংবাদিক জীবনের দু:খ-কষ্টমূলক উত্থান পর্ব দেখাতে চেয়েছেন বলে তিনি নিজে ভূমিকায় বলেছেন- কেন যেন সেটাও স্পর্শ করে যায়নি। শুরুর দিকে যেটা অবশ্য একটু একটু টানছিল। শেষ হতে হতে সেটা নেহায়েতই গৎবাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবকিছুই যেন ছিল মেঘ-ভাসা ভাসা। উড়ে গেছে কিন্তু কোথাও গভীরে প্রথিত হয় নাই।

তিনি বলেছেন “পুরুষের জীবনে কর্মজীবনের চাইতে বড় কিছু আর হতে পারে না। কর্মজীবনে ব্যর্থতা, কর্মক্ষেত্রে পরাজয়, পুরুষের মৃত সমান। কর্মজীবনে ব্যর্থ, পরাজিত, অপদস্থ পুরুষের জীবনে নারীর ভালোবাসার কি মূল্য?” এই বয়ানে তারে ব্যাপকভাবে আত্মকেন্দ্রিক/পুরুষ চরিত্রে পাওয়া যায়। যাতে এরকম দাঁড়ায় যে নারী কর্মজীবনে ব্যর্থ হলেও কিছু যায় আসে না। পুরুষ ব্যর্থ হলেই দুনিয়া গেল। নারীরে এইখানে তিনি যথাযথ সম্মানের জায়গায় স্থাপন করেন নাই। তাছাড়া তিনি জীবনে সফলতা বলতে যেরকম তরতর করে ফুটপাথের সাংবাদিক থেকে রাজসাংবাদিক স্তরে নিয়ে যাওয়াকে ঠাহর করেছেন, সেই বিচারে সাধারণ জনতা যারা জীবনেও জেলা শহরের বাইরে যাওয়ার দিশা পায় না, তাদেরকে হেও করেছেন। অথচ তারাও দিব্যি স্ত্রী পুত্র কন্যা লয়ে সংসার ধর্ম পালন করে যাইতেছেন। নিমাই সাহেব কারো ঘরে ঘরে ঢুকে দেখেন নাই কে নারীর ভালোবাসা পাইল আর কে পাইল না। মোটের ওপর তিনি ভালোবাসাটাকে মেটারিয়ালিস্টিক করে ফেলছেন খানিকটা। যেইটা সার্বজনীন লাগে না। মনে হয় যেন প্রেম করার অধিকার কেবল ধনী লোকের পকেটের মধ্যে।

অন্তত গোটা দশেকবার তিনি মেমসাহেবরে দিয়ে তারে প্রণাম করিয়ে নিয়েছেন। এইখানেও নিমাই সাহেব মানুষ থেকে বারবার পুরুষ হয়ে উঠেছেন। সমাজের গণ্ডির ভেতর আটকা পড়েছেন। ভাঙার চেষ্টা করেন নাই। সেই দিশাও দেন নাই। শতশত বছর ধরে পুরুষ যাত নারীকে যেমন অবদমন করে রেখে আসছিল, নিমাই সেই পথেই হাঁটলেন।

বড় সাংবাদিক হয়ে তার কিছু বিদেশে ঘোরাফেরার ব্যাপারস্যাপার আছে। এইগুলো স্রেফ কলেবর বৃদ্ধি করেছে কিন্তু টানে নাই। তিনি সঠিক করে বলেনও নাই ওই সময় আসলে ভারতবর্ষে কী কী সংকট চলছিল। “রাজনৈতিক দুনিয়ার জল আরো ঘোলা হল। যমুনার জল আরো গড়িয়ে গেল। কংগ্রেসি পার্লামেন্টারি পার্টিতে সরকারী নীতির সমালোচকদের সংখ্যা বাড়ল। সমালোচনা তীক্ষ্ম থেকে তীক্ষ্মতর হল। এখন আর গোপনে নয়। প্রকাশ্যে সর্বজনসক্ষে ঢাক ঢোল বাজিয়ে কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির সেক্রটারিরা এইসব সমালোচনার খবর দিতেন।” এখানে ইঙ্গিত আছে বটে। কিন্তু ঘটনা কই? রাজনৈতিক অস্থিরতার বয়ান কই? হয়ত ইচ্ছে করেই ঝামেলা এড়ানোর তাড়নায় ঘটনার নিগুঢ় ঘাটতে যাননি। তাতে লাভ হয়নি। বরং লোকসানই হয়েছে। নেহায়েত প্রেম প্রেম লেকচারের মধ্যে একটু বৈচিত্র্য আনার যে সুযোগ ছিল, নিমাই সাহেব সেটা কাজে লাগাতে পারেন নাই। 

খোকন নামের যেই চরিত্রটি হাজির করেছিলেন গড়লেন না তাকেও। যে গোপনে পলিটিক্স করছিল বলে দেখালেন, তাকে গল্পের করলেন আবার করলেনও না। এখানেও একটু ভিন্নতার সুযোগ ছিল গল্পে। যা কাজে লাগে নাই। অবশ্য খোকন হাজির ছিল বলেই শেষে মেমসাহেবকে ফেলে দেওয়া গেল। যেইটা যুতসই লাগে নাই। 

মোটের ওপর মেমসাহেব বইটা অস্ফুট মনে হয়েছে। কী বর্ণনায়, কী চিত্রায়নে, কী চরিত্র রূপায়নে সবকিছুতেই বইটা একেবারে সাদামাটা লেগেছে। বলা চলে রীতিমত আশাহত হয়েছি। তাছাড়া লেখক শুরুতেই যে ভূমিকা দিয়েছেন, বা যে সময়ের ভেতর দিয়ে তিনি গেছেন, সেই সময়ের সমসাময়িক প্রেক্ষাপট চরমভাবে অনুপস্থিত। যে সামাজিক রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিয়েছেন তার কিছুটাও যদি ফুটত, সেটাও একটা শক্তিশালী দিক হত। অন্তত তখনকার সময়টাকে ধরতে পারলেও মেমসাহেব হয়ে উঠতে পারত দারুণভাবে অনন্য। 

এটা নিছক একটি প্রেমের গল্প। শুধু প্রেমের গল্প বললে আমার ঠিক যুতসই লাগছে না। এটা আসলে একটা ন্যাকিমময় প্রেমের গল্প। বহুদিন পর একটা বিখ্যাত বই পড়ে হোঁচট খেলাম। এইজন্যই বোধহয় মুরব্বিরা বলতেন- যার হাতের রান্ধন খাই নাই, সে নাকি বড় রাঁধুনি, আর যারে দেখি নাই, সে নাকি বড় সুন্দরী। 

তবে যারা মেমসাহেব পড়বেন, তারা আমার কথাকে বেদবাক্য নিবেন না। আপনার পছন্দ আমার থেকে ভিন্ন হবে এইটাই স্বাভাবিক। অনেকেরই ভালো লেগেছে এটা। অনেকেই চোখের জলে বালতি ভরে ফেলেছেন বলেও শুনেছি। বিশেষ করে মেমসাহেব যখন গত হন, একটু তো ধাক্কা লাগেই। তবে খটকাও লাগে বেশ খানিকটা। আমার স্রেফ মনে হয়েছে নাটকীতায় জীবন নেওয়া হল মেমসাহেবের। যার প্রেক্ষাপট একেবারেই ধোঁয়াটে। গল্পটাকে জোর করে বিয়োগান্তক করার প্রয়াস। যে পরিমাণ দু:খবোধ হওয়ার কথা, তার ধারেকাছেও গেল না। গল্পের বিস্তৃতি খুবই ন্যারো। কেবল দুটি চরিত্রের পারস্পারিক বয়ান ভিন্ন তেমন কোনো কাহিনীর বিন্যাস ঘটেনি।

তাছাড়া আরেকটা ব্যাপার হল, কোনো লেখা হোক সেটা গল্প উপন্যাস সিনেমা বা অন্যকিছু যখন সেটা মোটের ওপর আপনাকে আনন্দ দেবে বা ধরে রাখবে, তখন ছোটছোট অনেক দোষ ত্রুটিও মার্জনা পেয়ে যায়। অনেক ফাঁকফোকর থাকা স্বত্বতেও একটা ভালো লাগা সবকিছুকে পার করে নিয়ে যায়। অন্যথায় উল্টোটা হবার সম্ভাবনাই বেশি। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। মেমসাহেব চরিত্রটি ঠেলেঠুলে উৎড়ে গেলও গল্পের বিচারে মেমসাহেব উপন্যাস অনেকটা অপক্ব।

বই: মেমসাহেব
লেখক: নিমাই ভট্টাচার্য
প্রকাশক: সুধাংশু শেখর দে, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা
প্রথম প্রকাশ: অক্টোবর, ১৯৮৫
বর্তমান মুদ্রিত মূল্য: ২৫০ টাকা

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড