• শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

না পাওয়ার গল্প

  লুৎফুল কবীর

০৫ জুন ২০২২, ১৪:২১
কবি চন্দ্রাবতীর মন্দির
চন্দ্রাবতীর মন্দির

চন্দ্রাবতী ছিলেন ষোড়শ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম বাঙালি নারী কবি, যার পিতা ছিলেন ‘মনসা মঙ্গল’ কাব্যের অন্যতম রচয়িতা দ্বিজ বংশীদাস ভট্টাচার্য।

বাল্যকালে চন্দ্রাবতীর বন্ধু ও খেলার সাথী ছিলেন জয়ানন্দ নামক এক অনাথ বালক। পুষ্পবনে শিবপূজার ফুল তোলার সময় চন্দ্রার সঙ্গে জয়ানন্দের পরিচয় ও সখ্য ঘটে। ক্রমশ কৈশোর উত্তীর্ণ হয়ে দুজনে যৌবনে পৌঁছুলে চন্দ্রার বাবা তাদের বিবাহের দিন স্থির করেন।

আর তখনই ঘটে চন্দ্রাবতীর জীবনের সবচেয়ে নির্মম ঘটনা, যা তার জীবনের গতিপথকে সম্পূর্ণভাবে পাল্টে দেয়। চন্দ্রাবতীর সঙ্গে সম্পর্ক থাকার পরও জয়ানন্দ আসমানী নামক এক মুসলিম নারীর অসামান্য রূপে মুগ্ধ হয়ে প্রেমে আসক্ত হন এবং এই ত্রিকোণ প্রেমের ফলাফল হয় মারাত্মক।

বিবাহের দিন সন্ধ্যাবেলায় চন্দ্রাবতী যখন বিবাহের সাজে পিত্রালয়ে বসে ছিলেন, তখনই সংবাদ পেলেন জয়ানন্দ ধর্মান্তরিত হয়ে প্রভাবশালী মুসলিম শাসনকর্তার মেয়ে আসমানীকে বিবাহ করেছেন৷ ঘটনার এই আকস্মিকতায় চন্দ্রা হতভম্ব হয়ে পড়েন।

শ্লোকগাথা আছে-

“না কাঁদে না হাসে চন্দ্রা নাহি কহে বাণী

আছিল সুন্দরী কন্যা হইল পাষাণী।”

চন্দ্রাবতী এ বিয়োগব্যথা মেনে নিতে পারেননি। তিনি পিতার কাছে এসময় তার উপাসনার জন্য একটি মন্দির প্রতিষ্ঠার অনুরোধ করেন। এছাড়া চন্দ্রাবতী সিদ্ধান্ত নেন তিনি চিরকুমারী থাকবেন।

তার পিতা কন্যার আব্দার অনুযায়ী ফুলেশ্বরী নদীর তীরে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। সে অবধি এটি চন্দ্রাবতী মন্দির নামে দাঁড়িয়ে আছে ফুলেশ্বরী নদীতীরে।

ইতোমধ্যে বেশ কিছুকাল পরে জয়ানন্দ বুঝতে পারলেন যে, আসমানীর প্রতি তার টানটা ছিল মোহ মাত্র ৷ মনের থেকে তিনি চন্দ্রাবতীকেই প্রকৃত ভালবাসেন৷ অনুতপ্ত জয়ানন্দ স্থির করেন চন্দ্রাবতীকে তার মনের কথা জানাবেন এবং সেই সুবাদে তিনি চন্দ্রাবতীকে একটি পত্র লিখে পাঠান-

“শুন রে প্রাণের চন্দ্রা তোমারে জানাই

মনের আগুনে দেহ পুড়্যা হৈছে ছাই।

শিশুকালের সঙ্গী তুমি যৌবনকালের মালা

তোমারে দেখিতে মন হৈয়াছে উতলা।”

প্রত্যাখ্যাত জয়ানন্দ ফুলেশ্বরীতে ডুবে আত্মহত্যার পূর্বে চন্দ্রাবতীকে লেখা জয়ানন্দের পত্র-

“ভাল নাহি বাস কন্যা এ পাপিষ্ঠ জনে

জন্মের মতন হইলাম বিদায় ধরিয়া চরণে

একবার দেখিয়া তোমা ছাড়িব সংসার

কপালে লিখেছে বিধি মরণ আমার।”

জয়ানন্দের আত্মহত্যার আঘাত সইতে পারেননি অভাগী চন্দ্রাবতী। দেহ ভাসছে ফুলেশ্বরীর জলে৷ এ দৃশ্য দেখার পর চন্দ্রা তীব্র অনুশোচনায় নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না এবং তিনিও অচিরে প্রেমিকের সাথে পরলোকে চিরমিলনের কামনায় ফুলেশ্বরীর জলে ডুবে প্রাণত্যাগ করেন।

মধ্যযুগের এক বেদনাবিধুর প্রেমের সাক্ষী চন্দ্রাবতীর মন্দির : নীলগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ। চন্দ্রাবতী অমর হয়ে আছেন ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র ‘জয়-চন্দ্রাবতী’ উপাখ্যানের নায়িকারূপে।

কিশোরগঞ্জ জেলা শহর হতে পাঁচ মাইল উত্তরে নীলগঞ্জ, পাশে ফুলেশ্বরী নদীর পরেই গ্রাম পাতুয়াইর। এই গ্রামেই জন্ম নেন কবি চন্দ্রাবতী।

এ এক অমর প্রেমের মহাকাব্য। পরতে পরতে লেখা বেদনা, না পাওয়ার গল্প!

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো. তাজবীর হোসাইন  

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড